অভিশপ্ত কামনার ভ্রুন
লাইব্রেরির পিনপতন নীরবতার মাঝে আরিশ নিজের জায়গা থেকে উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। মেয়েটি যে টেবিলে বসে আনমনে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল, আরিশ ঠিক তার সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। মেয়েটি নিজের চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে সামনে কারও উপস্থিতি সে প্রথমে টেরই পায়নি। 🔴
আরিশ একটু ঝুঁকে, অত্যন্ত মার্জিত ও শান্ত গলায় ডাকল, — এক্সকিউজ মি, আপু! মেয়েটি চমকে মুখ তুলে তাকালো। আরিশ তার ঠোঁটে এক চিলতে ভদ্র হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল, — আপু, আপনি কি কোনো বইয়ের নাম জানেন, যা সাই*কোদের নিয়ে লেখা? মানে, সিরিয়াল কি*লার বা সাই*কোপ্যাথদের সাইকোলজি নিয়ে? 🔴
কথাটা শুনে মেয়েটি কেমন যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। সে আরিশের দিকে তাকালো। আরিশও ঠিক সেই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিল। সে সরাসরি মেয়েটির চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। আরিশ খুব ভালো করেই জানে, আই কন্ট্যাক্টের মাধ্যমে যেকোনো মানুষের অবচেতন মনকে খুব সহজেই দুর্বল করে দেওয়া যায়। 🔴 তার চোখের সেই সম্মোহনী ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেয়েটির ভেতর কেমন যেন এক অজানা অস্বস্তির জন্ম দিল। মেয়েটি আর বেশিক্ষণ সেই দৃষ্টির সামনে টিকতে পারল না। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, — না... না, আমি এ ধরনের কোনো বইয়ের নাম জানি না। 🔴
কথাটা শেষ করেই মেয়েটি আর এক মুহূর্তও সেখানে বসল না। নিজের খোলা বইটা বন্ধ করে টেবিলেই ফেলে রেখে প্রায় ছুটন্ত পায়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেল। আরিশের ঠোঁটের কোণে এবার এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে মনে মনে বলল, "তার মানে কাজ হয়েছে! মেয়েটার মেন্টাল স্টেট এখন এতটাই ভঙ্গুর যে সামান্য আই কন্ট্যাক্টেই ভয় পেয়ে পালিয়েছে।" 🔴
থানায় এক গুমোট আর শোকাবহ পরিবেশ। সজলের পরিবারকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে। ছেলের মৃ*ত্যুর খবর শুনে সজলের মা-বাবা থানার মেঝেতেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। ফাহিম নিজের কেবিনে সজলের বড় ভাইকে ডাকলেন। সজলের ভাই চোখ মুছে ভারী গলায় বললেন, — না স্যার, এরকম কোনো শ*ত্রুতা আমাদের কারও সাথে নেই। 🔴
একটু পরেই সাব-ইনস্পেক্টর রিমন কেবিনে ঢুকল। রিমন হতাশ গলায় জানালো, সজলের বন্ধুরা কিছুই জানে না। ঠিক তখনই ওয়্যারলেস সেটে একটা জরুরি খবর ভেসে এল। শহরের বাইরের একটা নির্জন বাইপাস রাস্তার পাশে ঝোপের ভেতর একটা কালো পলিথিনের বস্তা পড়ে আছে। 🔴 ফাহিম আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফাহিম যা দেখলেন, তার জন্য তিনি মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। বস্তার মুখ খুলতেই বেরিয়ে এল রিয়া নামের সেই মেয়েটির খণ্ডিত লা*শ! 🔴
ফাহিম আবার রিয়ার কলেজে চলে এলেন। রিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড সাবিনা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, — স্যার, কিছুদিন আগে রিয়া আর সজলের মধ্যে খুব বড় একটা ঝ*গড়া হয়েছিল। তখন রিয়া বলেছিল, ওর নাকি নতুন একটা বন্ধু হয়েছে। সেই বন্ধুই নাকি ওদের ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছিল। 🔴 ফাহিম বুঝতে পারলেন, খু*নি রিয়ার খুব কাছের কেউ হওয়ার ভান করে ওদের দুজনের মাঝে ঢুকেছিল। কিন্তু রিয়ার ফেসবুক আইডি পুরোপুরি ডিজেবল করে দেওয়া হয়েছে। 🔴
ফরেনসিক ল্যাবে ডা. মাহমুদ অত্যন্ত বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। ফাহিমকে দেখে তিনি বললেন, — ফাহিম, আমার এই পঁচিশ বছরের ক্যারিয়ারে আমি জীবনেও এরকম বীভৎস আর বিকৃত মস্তিষ্কের খু*ন দেখিনি! সজলকে মৃ*ত্যুর আগে জোর করে বিড়ালের রান্না করা মাং*স খাওয়ানো হয়েছে! 🔴 আর রিয়াকে মৃ*ত্যুর আগে সজলের শরীরের রান্না করা মাংস খাওয়ানো হয়েছে! ফাহিম বুঝতে পারলেন, তারা এমন এক দানবের মুখোমুখি হয়েছেন, যার কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। 🔴
শহরের কোলাহল মুখর জীবনের আড়ালে স্নেহা নামের একটি মেয়ে বড্ড একা। আরিশ গত কয়েকদিন ধরে খুব সন্তর্পণে স্নেহার প্রতি লক্ষ রাখছে। 🔴 আজ সে নিজের পরিচয় গোপন রেখে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে স্নেহার ঠিকানায় বেশ কিছু প্রিয় বই পাঠিয়ে দিয়েছে। স্নেহা পার্সেলটা খুলে দেখল তার প্রিয় লেখকদের নতুন সব বই। 🔴
বইয়ের ভেতর থেকে একটা নীল রঙের চিরকুট নিচে পড়ে গেল। চিরকুটে লেখা ছিল, "আপনার চোখের নিচের ওই কালচে দাগগুলোই বলে দেয়, আপনি খুব কষ্টে আছেন। যদি কখনো মন চায় কথা শেয়ার করতে, লাইব্রেরির পেছনের পুরনো দেওয়ালটায় শুধু লিখবেন— 'কে তুমি?'" 🔴 স্নেহা পাথর হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো, এই নিস্তব্ধ অন্ধকারে কেউ যেন তার দিকে একটা আশ্রয়ের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। 🔴
পুলিশ স্টেশনে ফাহিম দুহাতে মাথা চেপে ধরে আছেন। সাব-ইনস্পেক্টর রিমন জানালো, খু*নি এমন কেউ যার ব্যাপারে রিয়ার কোনো বন্ধুবান্ধব কিছুই জানে না। 🔴 ফাহিম বুঝলেন এই কেসের সমাধান একজনই করতে পারবে—ডিটেকটিভ আসিফ। আসিফের সহকারী রাজিব বলল, — বস, এই সাইকোপ্যাথ তো এখানেই থামবে না। 🔴
আসিফ আর রাজিব রিয়ার বাসায় গিয়ে তার রুম তল্লাশি করতে শুরু করল। হঠাৎ আসিফের নজর গেল ছোট বুকশেলফটার দিকে। সেখানে কিছু নতুন রান্নার রেসিপির বই রাখা। 🔴 আসিফ বইয়ের পাতা ওল্টাতেই একটা সাদা চিরকুট পেল। তাতে লেখা ছিল, "আমার পক্ষ থেকে তোমাকে কিছু বই দিলাম। একদিন কিন্তু তোমার নিজের হাতে আমায় রান্না করে খাওয়াবে।" 🔴
আসিফের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে চিরকুটটা এভিডেন্স ব্যাগে ভরে বলল, — পুলিশ বলছে খু*নি কোনো প্রমাণ রাখেনি। কিন্তু খু*নিরা নিজেদের সিগনেচার কোথাও না কোথাও ঠিকই রেখে যায়। 🔴 খুনি রিয়াকে দিয়ে মানুষের মাংস রান্না করার প্র্যাকটিস করাচ্ছিল! আসিফ বুঝতে পারল, খেলা এখন মাত্র জমতে শুরু করেছে। 🔴
এই সাইকোপ্যাথের মনের গভীরে ঢোকার একটা রাস্তা সে পেয়ে গেছে। শহরের অন্ধকারে নতুন কোনো শিকার হয়তো এখনই প্রহর গুনছে। 🔴 রহস্যের প্রতিটি বাঁক এখন মৃত্যুর গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে। 🔴
0 Comments