অন্ধকার কুঠুরির আর্তনাদ: নিশিগঞ্জের হাবেলী
১. অভিশপ্ত উত্তরাধিকার
নীলম্বর চ্যাটার্জি একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে সে সবসময় রহস্যের খোঁজ করে। একদিন তার নামে একটি উহ্য চিঠি এল। চিঠিতে লেখা ছিল যে, বীরভূম জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম 'নিশিগঞ্জ'-এ তার পূর্বপুরুষদের একটি বিশাল হাবেলী বা জমিদারি বাড়ি আছে, যা এখন তার নামে হস্তান্তরিত হতে যাচ্ছে। নীলম্বর জানত না তার কোনো জমিদারি বংশ আছে, কিন্তু কৌতূহল আর নতুন ছবি তোলার নেশায় সে রওনা দিল।
নিশিগঞ্জ গ্রামটি যেন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো জায়গা। স্টেশনে নামার পর সে দেখল জনমানবশূন্য প্ল্যাটফর্ম। গ্রামের মানুষ যখন শুনল সে 'চ্যাটার্জি হাবেলী'তে যাচ্ছে, তারা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। গ্রামের মোড়ল বৃদ্ধ হরিপদ তাকে সাবধান করে বলল, "বাবা, ওখানে সূর্য ডুবলে আর কেউ কথা বলে না। দেওয়ালে কান পাতলে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। রাত কাটাতে চাইলে নিজের আত্মাটা সামলে রেখো।"
🚩
🇧🇩🇵🇸🇧🇩
### ২. হাবেলীর বিভীষিকা
হাবেলীটা দেখতে অনেকটা দৈত্যের মতো। প্রাচীন পাথর, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আর বিশাল সব জানলা। নীলম্বর যখন বড় কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, এক অদ্ভুত পচা গন্ধ তার নাকে এল। ঘরের আসবাবপত্রগুলো সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা, যেন মৃতদেহ সারিবদ্ধভাবে শুয়ে আছে।
সেদিন রাতে নীলম্বর তার ক্যামেরা আর ট্রাইপড সেট করল। হঠাৎ তার মনে হলো উপরের তলায় কেউ খুব দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল। সে টর্চ নিয়ে উপরে উঠে দেখল কিছুই নেই। কিন্তু একটা ঘরের সামনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল। ঘরটা তালাবন্ধ, কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে এক ফোঁটা রক্ত বাইরে বেরিয়ে আসছে। সে যখন ভালো করে দেখতে গেল, রক্তটা চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল!
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### ৩. আয়নার প্রতিবিম্ব
সেদিন রাত দুটো। নীলম্বর ড্রয়িং রুমে শুয়ে আছে। হঠাৎ তার মনে হলো ঘরের কোণে রাখা বিশাল আয়নাটা কাঁপছে। আয়নার ওপর কুয়াশা জমে উঠল আর সেখানে ফুটে উঠল একটি করুণ মুখ। মুখটি তার নিজের নয়, বরং অবিকল তার মতো দেখতে এক যুবকের, যার গলায় একটি মোটা শিকল দিয়ে ফাঁস লাগানো।
আয়নার ভেতরের সেই ছায়াটি ফিসফিস করে বলল, *"তুমি ফিরে এসেছ? ওরা তোমাকে যেতে দেবে না নীলম্বর। ওরা তোমার শরীরের ভেতর দিয়ে আবার এই পৃথিবীতে ফিরতে চায়।"*
নীলম্বর আতঙ্কিত হয়ে ক্যামেরা দিয়ে একটি ছবি তুলল। ফ্ল্যাশের আলোয় সেই ছায়াটি অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু ছবির স্ক্রিনে সে যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল—ছবির মধ্যে সে একা দাঁড়িয়ে নেই, তার পেছনে চারটে কুচকুচে কালো হাত তাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
🚩
### ৪. অন্ধকারের হাতছানি
নীলম্বর ঘর থেকে পালাতে চাইল, কিন্তু দেখল হাবেলীর প্রধান দরজাটা ভেতর থেকে কেউ অদৃশ্যভাবে লক করে দিয়েছে। হঠাৎ সিঁড়ির ওপর থেকে ঘুঙুর আর হাসির শব্দ শোনা গেল। সেই শব্দগুলো মানুষের নয়, মনে হচ্ছিল অনেকগুলো ভাঙা কণ্ঠস্বর একসাথে কথা বলছে।
দেওয়ালের পুরনো ঘড়িটা রাত তিনটের সময় থেমে গেল। নীলম্বর দেখল দেওয়ালে টাঙানো তার পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্রগুলো বদলে যাচ্ছে। ছবিগুলোতে থাকা মানুষের চোখ দিয়ে কালো তরল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই সময় তার কানের কাছে কেউ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিঃশ্বাস ফেলল এবং বলল, **"আমাদের ঘরে তোমাকে স্বাগতম, বংশধর।"**
### ৫. রহস্যের সন্ধান
নীলম্বর মরিয়া হয়ে লাইব্রেরি ঘরে ঢুকল। সেখানে একটি পুরনো ডায়েরি খুঁজে পেল সে। ডায়েরিটি ছিল তার প্রপিতামহের। সেখানে লেখা ছিল, এই চ্যাটার্জি পরিবার একসময় কালো জাদুর সাধনা করত। তারা দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য এই হাবেলীর নিচে একটি গোপন কুঠুরিতে গ্রামের নিষ্পাপ শিশুদের বলি দিত। সেই আত্মারা আজও মুক্ত হতে পারেনি এবং তারা এই বংশের প্রতিটি পুরুষকে টেনে নিয়ে যায় সেই অন্ধকার কুঠুরিতে।
হঠাৎ ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই উল্টাতে শুরু করল। ডায়েরির শেষ পাতায় নীলম্বর তার নিজের ছবি দেখতে পেল—যেখানে তার চোখের জায়গায় দুটো গর্ত আর কপালে রক্ত দিয়ে লেখা: **"পরবর্তী বলি।"**
নীলম্বর যখন ডায়েরিটা বন্ধ করতে চাইল, অনুভব করল তার পায়ের নিচ থেকে মেঝেটা সরে যাচ্ছে। সে পড়ে যাচ্ছে এক গভীর, অন্ধকার গর্তে।
দ্বিতীয় পর্বে আপনাকে স্বাগতম। পরিবেশটা আরও রহস্যময় আর গা-ছমছমে হতে চলেছে।
🚩
---
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
## অন্ধকার কুঠুরির আর্তনাদ: শেষ তর্পণ (চূড়ান্ত পর্ব)
### ৬. পাতালের বিভীষিকা
নীলম্বর যখন জ্ঞান হারাল, তার মনে হচ্ছিল সে অনন্তকালের জন্য কোনো এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। যখন চোখ মেলল, দেখল সে এক স্যাঁতসেঁতে কালকুঠুরিতে পড়ে আছে। চারপাশের দেওয়ালে মশাল জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই—বরং এক নীলাভ শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছে। কুঠুরির চারদিকে মানুষের হাড় আর পুরনো কঙ্কালের স্তূপ।
হঠাৎ অন্ধকারের ওপার থেকে শিকল টানার শব্দ শোনা গেল। ঘড়ঘড়ে গলায় কেউ বলে উঠল, *"রক্তের ঋণ রক্ত দিয়েই শোধ করতে হয়, নীলম্বর।"* নীলম্বর দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কুৎসিত অবয়ব। তার সারা শরীর ঝুলে পড়া চামড়ায় ঢাকা, আর চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো লাল। সে আর কেউ নয়, নীলম্বরের প্রপিতামহ—যিনি কালো জাদুর মাধ্যমে নিজের আত্মাকে এই মাটির নিচে আটকে রেখেছেন।
🚩
### ৭. প্রেতাত্মাদের আসর
নীলম্বর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু দেখল তার হাত-পা অদৃশ্য শক্তিতে কেউ বেঁধে রেখেছে। হঠাৎ কুঠুরির দেওয়ালগুলো ভেদ করে ডজন ডজন ছায়া বেরিয়ে আসতে লাগল। এগুলো সেই শিশুদের আত্মা, যাদের শত বছর আগে এখানে বলি দেওয়া হয়েছিল। তাদের কান্নার শব্দে বাতাসের কম্পন বাড়তে লাগল।
প্রপিতামহের আত্মাটি হাসতে হাসতে বলল, *"এরা আমার বন্দী। এদের মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো তোমার শরীর। আমি যখন তোমার দেহে প্রবেশ করব, তখন আমি আবার পৃথিবীতে ফিরে যাব, আর এই আত্মারা অনন্তকাল এখানে চিৎকার করবে।"* নীলম্বর বুঝল, তার পূর্বপুরুষরা শুধু অপরাধীই ছিলেন না, তারা শয়তানের সাথে চুক্তি করেছিলেন। সে তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল, তার ছোট পকেট ক্যামেরাটি এখনো আছে। কিন্তু এই দানবের সামনে ক্যামেরা দিয়ে কী হবে?
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### ৮. শেষ লড়াই: আলোর শক্তি
নীলম্বরের হঠাৎ মনে পড়ল তার প্রপিতামহের সেই ডায়েরির কথা। সেখানে একটা কথা লেখা ছিল— *"অন্ধকারকে তলোয়ার দিয়ে কাটা যায় না, তাকে কাটতে হয় পরম সত্যের আলো দিয়ে।"* নীলম্বর বুঝতে পারল, এখানে 'আলো' মানে শুধু বাল্ব বা ফ্ল্যাশ নয়, বরং হৃদয়ের সাহস আর পবিত্রতা।
সে চোখ বন্ধ করে নিজের মৃত মা-বাবার কথা মনে করল। সে প্রার্থনা করল যেন এই নিষ্পাপ আত্মাগুলো মুক্তি পায়। হঠাৎ তার শরীরের চারপাশ থেকে এক মৃদু সাদা জ্যোতি বের হতে লাগল। প্রপিতামহ চিৎকার করে উঠল, *"থামাও এটা! এই আলো আমার সহ্য হচ্ছে না!"*
নীলম্বর তার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বাটনটা টিপে ধরল এবং মনের সমস্ত জোর দিয়ে বলল, *"আমি তোমাদের ক্ষমা করছি! তোমাদের এই অভিশপ্ত বংশের আমিই শেষ পুরুষ, আর আমিই এই অন্ধকার শেষ করব!"*
### ৯. হাবেলীর পতন
মুহূর্তের মধ্যে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থেকে বের হওয়া আলো আর নীলম্বরের আত্মিক শক্তি মিলে এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণ তৈরি করল। সেই তীব্র আলোয় প্রপিতামহের কালো ছায়াটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যে আত্মাগুলো বন্দি ছিল, তারা নীল কুয়াশার মতো আকাশে উঠতে শুরু করল। তাদের কান্নার শব্দ বদলে গেল এক শান্তিভরা সুরে।
পুরো হাবেলীটা তখন তাসের ঘরের মতো কাঁপছে। দেওয়ালগুলো ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। নীলম্বর মরিয়া হয়ে সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে উপরে ওঠার পথ খুঁজতে লাগল। ঠিক যখন ছাদটা ধসে পড়ার উপক্রম, তখন একজোড়া ছোট হাত (হয়তো কোনো এক মুক্ত হওয়া আত্মার) তাকে ধাক্কা দিয়ে হাবেলীর বাগানে বের করে দিল।
🚩
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### ১০. ভোর ও নতুন সূর্য
নীলম্বর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখল সে হাবেলীর ধ্বংসস্তূপের সামনে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছে। দূরে ভোরের সূর্য উঠছে। চ্যাটার্জি হাবেলী এখন আর নেই—সেখানে শুধু এক স্তূপ ভাঙা পাথর আর মাটি। গ্রামের মানুষরা তখন ভয়ে ভয়ে কাছে আসছে। হরিপদ মোড়ল নীলম্বরের মাথায় হাত রেখে বললেন, *"তুলে নিয়ে গেছ বাবা, নিশিগঞ্জের বুক থেকে পাথরটা সরিয়ে দিয়েছ। আজ থেকে আর কেউ মাঝরাতে কাঁদবে না।"*
নীলম্বর তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল ক্যামেরাটা গলে গেছে, কিন্তু তার মেমোরি কার্ডটা অক্ষত আছে। সে যখন সেই কার্ডটা পরে চেক করল, দেখল তাতে কোনো ভূতের ছবি নেই—কেবল এক দল হাসিখুশি শিশুর ছবি দেখা যাচ্ছে, যারা ভোরের আলোর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।
---
0 Comments