Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

রক্তিম সূর্যাস্তের অভিশাপ

 রক্তিম সূর্যাস্তের অভিশাপ: মায়াপুরের গুপ্তধন


প্রথম অধ্যায়: মানচিত্রের রহস্য

গল্পের শুরু হয় বর্তমান সময়ের কোলকাতায়। অর্ক একজন তরুণ প্রত্নতাত্ত্বিক। তার ঠাকুরদা ছিলেন একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর অর্ক তার পুরনো লাইব্রেরি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পেল। সেটি ছিল একটি সোনার নূপুর আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা একটি চামড়ার মানচিত্র। মানচিত্রের নিচে লেখা ছিল— **"মায়াপুর: যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায়।"**

অর্ক জানত না মায়াপুর কোথায়। সে তার বন্ধু বিহানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল এই রহস্যের সন্ধানে। বিহান একজন প্রযুক্তিবিদ, ড্রোন আর আধুনিক সেন্সর নিয়ে সে সিদ্ধহস্ত। তারা ঝাড়খণ্ডের গভীর জঙ্গলের ভেতরে এক পরিত্যক্ত জনপদের হদিস পেল, যার উল্লেখ কোনো মানচিত্রে নেই।
🚩
🇧🇩🇧🇩
### দ্বিতীয় অধ্যায়: অভিশপ্ত তোরণ

জঙ্গলের গভীরে তারা যখন পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবুডুবু। সামনে এক বিশাল পাথুরে তোরণ। তোরণের গায়ে খোদাই করা আছে অদ্ভুত সব লিপি। অর্ক তার ডিকোড করার যন্ত্র দিয়ে পড়তে পারল— *"যে রক্তিম সূর্যাস্তের সময় এই দ্বারে প্রবেশ করবে, সে অতীতের পাতায় হারিয়ে যাবে।"*

অর্ক আর বিহান অবাক হয়ে দেখল, সূর্যাস্তের শেষ আলো যখন তোরণের মাঝখানের নীল পাথরে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত কাঁপন শুরু হলো। চারপাশের জঙ্গল যেন হঠাৎ বদলে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক থেমে গেল, আর ভেসে এল হাতির গর্জন এবং পুরনো বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। তারা যখন চোখ মেলল, দেখল তারা আর আধুনিক পোশাকে নেই। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একদল সশস্ত্র সৈন্য!

### তৃতীয় অধ্যায়: মায়াপুরের রাজদরবার

সৈন্যরা তাদের বন্দী করে নিয়ে গেল রাজপ্রাসাদে। সেই প্রাসাদের জাঁকজমক দেখে অর্কর চোখ ছানাবড়া। দেওয়ালে জ্বলছে মশাল, দাস-দাসীরা ব্যস্ত। রাজসিংহাসনে বসে আছেন রাজা বীর বিক্রম সিংহ। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কারা? তোমাদের পোশাক আর এই আজব যন্ত্রগুলো (বিহানের ড্রোন) কোথা থেকে এল?"

অর্ক বুঝতে পারল তারা 'টাইম স্লিপ' বা সময় ভ্রমণে পড়ে গেছে। সে বুদ্ধিমত্তার সাথে উত্তর দিল যে তারা দূরের এক দেশ থেকে এসেছে জ্ঞান অর্জন করতে। রাজা তাদের অতিথি হিসেবে থাকতে দিলেন, কিন্তু সতর্ক করে দিলেন যে প্রাসাদের উত্তর দিকের ঘরে যেন কেউ না ঢোকে।
🚩
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### চতুর্থ অধ্যায়: মায়াবিনী রাজকুমারী

সেদিন রাতে অর্কর সাথে দেখা হলো রাজকুমারী ইশার। ইশা ছিল মায়াপুরের একমাত্র উত্তরাধিকারী। সে অর্ককে বলল এক করুণ কাহিনী। মায়াপুর আসলে একটি অভিশপ্ত রাজ্য। এক তান্ত্রিকের অভিশাপে এই রাজ্যটি প্রতি ১০০ বছর অন্তর একদিনের জন্য জেগে ওঠে এবং সূর্যাস্তের পর আবার মাটির নিচে হারিয়ে যায়।

ইশা অর্কর হাতে রাখা সেই সোনার নূপুরটা দেখল। সে কেঁদে উঠে বলল, "এটা তো আমারই নূপুর! হাজার বছর আগে আমি এটা হারিয়েছিলাম।" অর্ক বুঝতে পারল, সে আসলে অতীতে ফিরে এসেছে রাজকুমারীকে উদ্ধার করতে। কিন্তু সময় খুব কম। পরের সূর্যাস্তের আগেই তাদের এই অভিশাপ ভাঙতে হবে, নইলে তারা চিরকালের জন্য পাথরে পরিণত হবে।

### পঞ্চম অধ্যায়: কালভৈরবের মন্দির

অভিশাপ ভাঙার একমাত্র উপায় ছিল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কালভৈরবের মন্দিরে সেই নূপুরটি ফিরিয়ে দেওয়া। অর্ক, বিহান আর রাজকুমারী ইশা ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়ল। পথে তাদের বাধা দিল রাজপুরোহিত, যে আসলে সেই তান্ত্রিকের বংশধর। সে চায় না এই অভিশাপ ভাঙুক, কারণ অভিশপ্ত থাকলে সে এই রাজ্যের ওপর অলৌকিক ক্ষমতা ভোগ করতে পারে।

শুরু হলো তলোয়ার আর জাদুর লড়াই। বিহান তার ড্রোন দিয়ে তান্ত্রিকের সৈন্যদের বিভ্রান্ত করে দিল। অর্ক আর রাজকুমারী পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাল। তান্ত্রিক যখন তাদের ওপর আক্রমণ করতে চাইল, ঠিক তখনই অর্ক সোনার নূপুরটি বিগ্রহের চরণে ছোঁয়াল।
🇧🇩🇧🇩
### ষষ্ঠ অধ্যায়: মুক্তি ও প্রত্যাবর্তন

এক বিকট শব্দে পাহাড় কেঁপে উঠল। আকাশ থেকে ঝরে পড়ল রূপালী আলো। রাজকুমারী ইশা আর রাজপ্রাসাদ ধীরে ধীরে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে শুরু করল। ইশা শেষবার অর্কর দিকে তাকিয়ে হাসল এবং বলল, *"ধন্যবাদ বন্ধু, আমাদের আত্মা আজ মুক্ত হলো।"*

এক প্রবল ঝটকায় অর্ক আর বিহান অজ্ঞান হয়ে গেল। যখন তাদের জ্ঞান ফিরল, তারা দেখল তারা সেই পুরনো ধ্বংসস্তূপের সামনে পড়ে আছে। চারপাশ অন্ধকার। মানচিত্রটা তাদের হাতে নেই, সেটা ধুলোয় মিশে গেছে। কিন্তু অর্কর পকেটে রয়ে গেছে একটি ছোট হীরের আংটি—যা রাজকুমারী ইশা তাকে উপহার দিয়েছিল।



### সপ্তম অধ্যায়: তান্ত্রিকের মায়াজাল ও রক্তক্ষয়ী লড়াই

পাহাড়ের চূড়ায় কালভৈরবের মন্দিরের সামনে যখন অর্ক, বিহান আর রাজকুমারী ইশা পৌঁছাল, তখন আকাশ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। সূর্য ডুবতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ঠিক সেই সময় মন্দিরের অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে এল রাজপুরোহিত ভৈরবনাথ। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে অট্টহাসি হেসে বলল, "এত সহজে অভিশাপ ভাঙবে ভেবেছ? এই রাজ্য আমার ক্ষমতার উৎস। তোমরা এখান থেকে জীবিত ফিরবে না!"

ভৈরবনাথ তার হাতের জাদুদণ্ড মাটিতে ঠুকল। সাথে সাথে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ডজন খানেক কঙ্কাল সৈন্য। তাদের হাতে মরচে ধরা তলোয়ার। বিহান চিৎকার করে উঠল, "অর্ক, তুমি আর রাজকুমারী মন্দিরের ভেতরে যাও! আমি এদের সামলাচ্ছি।"

বিহান তার পিঠের ব্যাগ থেকে ড্রোন বের করল। এই ড্রোনটি সাধারণ ছিল না, এতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার লাইট লাগানো ছিল। ড্রোনটি যখন কঙ্কালদের মাথার ওপর ঘুরতে শুরু করল, তীব্র আলোর ছটায় কঙ্কালগুলো দিশেহারা হয়ে গেল। বিহান তার কন্ট্রোল প্যানেল থেকে বিশেষ সাউন্ড ওয়েভ ছেড়ে দিল, যা কঙ্কালদের হাড়ের কম্পন বাড়িয়ে দিয়ে তাদের গুঁড়ো করে দিচ্ছিল।
🚩
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### অষ্টম অধ্যায়: মন্দিরের ভেতরের রহস্য

ভেতরে অর্ক আর ইশা যখন বিগ্রহের দিকে দৌড়াচ্ছে, তখন মন্দিরের দেওয়ালগুলো নড়াচড়া শুরু করল। দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এল পাথরের হাত, যা তাদের পথ আগলে ধরল। অর্ক তার প্রত্নতাত্ত্বিক বুদ্ধি খাটিয়ে দেখল, মেঝের পাথরগুলোতে বিশেষ কিছু চিহ্ন আছে। সে ইশাকে বলল, "ইশা, শুধুমাত্র 'সূর্য' চিহ্ন দেওয়া পাথরগুলোর ওপর পা দাও!"

তারা সাবধানে এগোতে লাগল। কিন্তু ভৈরবনাথ ততক্ষণে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সে তার জাদুবলে এক বিশাল আগুনের গোলক ছুঁড়ল অর্কর দিকে। ইশা ক্ষিপ্রতার সাথে তার কোমরের ছোট খঞ্জরটি বের করে সেই আগুনের গোলকের দিকে ছুঁড়ে মারল। খঞ্জরটি আগুনের গোলকটিকে মাঝখান থেকে চিরে দিল, কিন্তু ইশা নিজে ছিটকে পড়ে গেল।

অর্ক চিৎকার করে ইশার কাছে যেতে চাইল, কিন্তু ইশা হাত তুলে ইশারা করল— "সময় নেই অর্ক! বিগ্রহের মাথায় নূপুরটি ছোঁয়াও, জলদি!"
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### নবম অধ্যায়: মহাকালের গর্জন

অর্ক বিগ্রহের দিকে এক লাফ দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ভৈরবনাথ তার তলোয়ার নিয়ে অর্কর পিঠে আঘাত করতে উদ্যত হলো। কিন্তু অর্ক তার হাতের সোনার নূপুরটি বিগ্রহের কপালে থাকা সেই তৃতীয় নয়নের গর্তে ঢুকিয়ে দিল।

হঠাৎ এক তীব্র নীল আলো পুরো মন্দিরকে ভরিয়ে দিল। ভৈরবনাথের তলোয়ার অর্কর শরীরের কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকতেই সে পাথরের মূর্তিতে পরিণত হতে শুরু করল। তার মুখ দিয়ে এক শেষ আর্তনাদ বেরোল এবং মুহূর্তের মধ্যে সে ধুলোয় মিশে গেল।

পুরো মন্দির কাঁপতে লাগল। পাহাড়ের চূড়া থেকে বড় বড় পাথর খসে পড়ছে। অর্ক দেখল ইশা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। তার শরীরের চারপাশ থেকে সোনালী কণা ঝরছে। ইশা হাসিমুখে বলল, "অর্ক, তুমি আমাদের হাজার বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিলে। আমাদের আত্মা আজ পরম শান্তিতে বিলীন হবে। বিদায় বন্ধু!"

### দশম অধ্যায়: ফিরে আসা এবং শেষ চিহ্ন

বিহান তখন বাইরে কঙ্কালদের সাথে লড়তে লড়তে ক্লান্ত। সে দেখল পুরো মায়াপুর শহরটা ধোঁয়ার মতো উপরে উঠে যাচ্ছে। সে দৌড়ে মন্দিরের ভেতর ঢুকে অর্কর হাত ধরল। "অর্ক, আমাদের এখনই ঝাঁপ দিতে হবে! এই জগতটা ভেঙে পড়ছে!"
🚩
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

দুজনে মিলে পাহাড়ের খাদ দিয়ে নিচের সেই তোরণের দিকে ঝাঁপ দিল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর এক তীব্র আলোর ঝলকানির পর সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

পরদিন সকালে যখন জঙ্গল পরিষ্কার করার শব্দে অর্কর ঘুম ভাঙল, সে দেখল সে আর বিহান সেই পুরনো তোরণের তলায় শুয়ে আছে। তাদের জামাকাপড় ধুলোয় মাখা। পাশে পড়ে আছে বিহানের ভাঙা ড্রোন। বিহান উঠে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলল, "সব কি তবে স্বপ্ন ছিল?"

অর্ক কিছু বলল না। সে তার পকেটে হাত দিল। পকেট থেকে বেরিয়ে এল সেই হীরের আংটি আর এক টুকরো পুরনো ভোজপত্র। তাতে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল— *"ইতিহাস কখনো মরে না, সে শুধু ঘুমিয়ে থাকে।"*

তারা যখন বনের বাইরে আসছিল, অর্ক পেছন ফিরে দেখল। সেই তোরণটি আর নেই, সেখানে শুধু এক বিশাল বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে। মায়াপুর আবার মাটির নিচে চলে গেছে, কিন্তু এবার আর অভিশপ্ত হিসেবে নয়, বরং এক শান্ত স্মৃতির শহর হিসেবে।

---

Post a Comment

0 Comments