মানবজনম
‘কেন বলুন তো ?’
‘আপনি সম্ভবত আমাকে চিনতে পারেন নি, এইজন্য আমাকে আপনি করে বলছেন।’
নয়ন থতমত খেয়ে গেল। ছেলেটাকে সে চেনে। কিন্তু কোথায় দেখেছে সেটা হঠাৎ মনে করতে পারল না। রাহাত নয়নের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘কী হয়েছে আপনার ? এত বিধ্বস্ত লাগছে কেন ?’
‘তেমন কিছু না। একটু ইনসমনিয়া। ঘুম হচ্ছে না অনেক দিন।’
‘আপনি কি কিছু খাবেন ?’
‘না না। আমি বাসার দিকেই যাচ্ছিলাম। এখন ক’টা বাজে বলো তো ?’
‘দুটা।’
‘আমাকে একটা রিকশা ডেকে দেবে ?’
রাহাত রিকশা খুঁজে এসে বলল, ‘এত রাতে অতদূর কেউ যেতে চাইছে না। আপনি চাইলে আমি ফোন করে আমার একটা ফ্রেন্ডকে বাইক নিয়ে চলে আসতে বলতে পারি। সে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।’
নয়ন ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সে দেয়ালের সঙ্গে ভর দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘আচ্ছা, বলো।’
বাইকে উঠেই নয়ন হঠাৎ রাহাতকে ডাকল। তারপর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তোমার নাম রাহাত... তুমি হেমার সাথে পড়ো। আমরা বার কয়েক একসাথে আড্ডাও দিয়েছিলাম। তাই না ?’
‘জি।’
‘তোমাকে না-চেনার তো কিছু নেই। যাই তাহলে ? আবার দেখা হবে।’
রাহাত মাথা নাড়ল। তবে নয়ন অদৃশ্য হওয়া অবধি কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর চিন্তিত ভঙ্গিতে ফোন করল হেমাকে। কিন্তু হেমার ফোন বন্ধ। বিষয়টা আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে ফেলল রাহাতকে।
আজকাল হেমারও যে কী হয়েছে!
প্রায়ই সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখছে সে। ফোনটাও বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ। কী হচ্ছে দুজনের ?
হেমাকে সে ভালোবাসে এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে এই ভালোবাসায় তার কোনো প্রত্যাশা নেই। এ যেন এক যুক্তিহীন অমোঘ আকর্ষণ। অনেক চেষ্টা করেও এই ঘোর থেকে সে বের হতে পারে নি। ফলে এখন আর ওই চেষ্টাটাও সে করে না।
হেমার সাথে রাহাতের কথা হলো পরদিন দুপুরে। রাহাত বলল, ‘দেখা করতে পারবি ?’
হেমা হাসল, ‘কেন ? না দেখলে মরে যাবি ?’
‘আমি না, তুই।’
‘তোকে না দেখলে আমি মরে যাব ?’
‘যেতেও তো পারিস।’
‘তাহলে আর চোখের সামনে আসিস না। বেঁচে থাকতে ভাল্লাগছে না। তোর কারণে হলেও না হয় মরে যাই।’
‘নয়ন ভাইয়ের বিষয়ে জরুরি কথা আছে।’
হেমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। নয়নের বিষয়ে কী এমন জরুরি কথা বলবে রাহাত!
তাদের দেখা হলো ঘণ্টাখানেক পর। হেমা বলল, ‘কী হয়েছে ?’
‘তার আগে বল নয়ন ভাইয়ের কী হয়েছে ? সে যে ঢাকায় তুই জানিস ?’
‘হু, জানি।’
‘কোনো সমস্যা না তো ? মানে তোদের দুজনের মধ্যে ?’
হেমা হাসল, ‘নাহ। উই আর অলরাইট। অ্যান্ড ইউ ডোন্ট হ্যাভ এনি চান্স... বন্ধু।’
রাহাত হাসল না। বলল, ‘নয়ন ভাইয়ের কি কোনো সমস্যা যাচ্ছে ? অন্যকোনো সমস্যা ?’
হেমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘হুম।’
‘কী সমস্যা ?’
হেমা খানিক সময় নিয়ে অবশেষে বলল, ‘ও খুব একা বড় হয়েছে। ওর মা-বাবাও কেমন চুপচাপ ধরনের। কারও সঙ্গে তেমন মেশেন না। ওকেও মিশতে দিতেন না। তো এই ধরনের বাচ্চারা হয় খুব জেদি হয় অথবা চুপচাপ, শান্ত। ও ছিল দ্বিতীয়টা।’
‘হুম। সারাক্ষণ কেবল বই পড়ত ? নিজের আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়েছিল ?’
‘হ্যাঁ। আর সেই জগতটা খুব শান্ত, স্নিগ্ধ। ধর, একটা হাতে আঁকা সুন্দর দৃশ্যের ছবির মতন। সবকিছুতেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। এভাবেই স্কুল, কলেজ, মেডিকেল। মানুষ ওকে পছন্দ করত, কিন্তু ও কারও সঙ্গেই সেভাবে মিশতে পারত না। সব সময় নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকত। কারও সাথে তেমন মিশত না। খুব ঘরকুনো স্বভাবের। ক্লাস শেষ হতেই বাসায় গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যেত। ওই ঘরটাই ওর জগৎ। ওই সময়ে গ্রাম থেকে একটা মেয়ে আসে ওদের বাসায়। নাম আছমা। বছর চার-পাঁচ আগের ঘটনা। খুব অল্পদিনেই মেয়েটার প্রতি একটা মায়া জন্মে যেতে থাকে নয়নের...।’
‘বয়স কত মেয়ের ? অন্য কোনো ব্যাপার নয়তো ?’
হেমা আচমকা গম্ভীর হয়ে উঠল, ‘রাহাত! নয়ন ওকে কী ডাকতে শিখিয়েছিল জানিস ? দাদা। ও বলত আছমা যখন ওকে দাদা বলে ডাকত, ওটা ছিল ওর কাছে জগতের সবচেয়ে আনন্দময় ব্যাপার।’
‘তার মানে ওনার একার ওই জীবনে মেয়েটা হয়ে উঠেছিল ওনার ছোট বোন। ছায়াসঙ্গী... ?’
‘হুম। অনেকটা তা-ই।’ বলে ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাল হেমা। তারপর স্পষ্ট কিন্তু ভেজা গলায় বলল, ‘একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই দেখল আছমা মারা গেছে। সে মরেছে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে। শি কমিটেড সুইসাইড।’
রাহাত রীতিমতো ঝাঁকির মতো খেল। সে খপ করে হেমার হাত ধরে বলল, ‘কী বলছিস তুই ? কেন ?’
‘কেউ জানে না কেন! নয়ন পাগলের মতো হয়ে গেল।’
‘তারপর ?’
‘তারপর হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল। কিছুদিন বাদে জানা গেল সে গিয়েছে ফতেহপুর।’
‘তুই শিওর ? অন্য কিছু নয় ? মানে নয়ন ভাইয়ের সঙ্গে...।’
‘নয়নকে তুই চিনিস ?’ থমথমে গলায় বলল হেমা।
রাহাত চুপ করে রইল।
‘নয়ন আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো না রাহাত। আমি তাকে চিনি। সে অন্যরকম। অন্য কেউ। তাকে তুই তোর এভারেজ চিন্তা দিয়ে কখনো মাপতে পারবি না।’
‘কিন্তু...।’ বলে আবারও চুপ করে রইল রাহাত। তারপর গতরাতের ঘটনা খুলে বলল সে। হেমা বলল, ‘কী হয়েছে ওর ? শরীর খারাপ কোনো কারণে ?’
‘জানি না। তবে উনি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। টকটকে লাল চোখ। যেন ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিলেন না। আমাকে চিনলেন না অবধি। কিছু মনে করিস না, উনি কি ড্রাগস ট্রাগস কিছু নিতেন ?’
‘না।’ শান্ত গলায় বলল হেমা।
‘আচ্ছা। কিন্তু হয়তো ঘুমের জন্য হাই ডোজ কোনো স্লিপিং পিল বা সিডেটিভ নিয়েছেন। মানে উনি ইনসমনিয়ার কথা বলছিলেন।’
হেমা কথা বলল না। তবে উঠে দাঁড়াল। রাহাত বলল, ‘কী হলো ?’
‘বাসায় যাব। শরীরটা ভালো লাগছে না।’
‘চল পৌঁছে দিয়ে আসি।’
‘না, আমি যেতে পারব।’
সে রাহাতকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না। সোজা হেঁটে টিএসসি থেকে বেরিয়ে রিকশা ধরল। কিন্তু হেমার ভাগ্য খারাপ। সে সামনের ডানপাশের রিকশাটাতে যাকে দেখল, তাকে এখানে আশা করে নি!
রিকশায় তার বাবা আসলাম সাহেব।
তার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল এক মেয়ে।।
মেয়েটি হেসে হেসে মজার কোনো কথা বলছে।
সেই কথা শুনে আসলাম সাহেব হাসতে হাসতে তার গায়ে ঢলে পড়ছেন।
তাদের দেখে মনে হচ্ছে জগতের সুখীতম মানব-মানবী। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
পর্ব- ২৩ [মানবজনম — সাদাত হোসাইন]
তাবারন একা একা কাঁদছে। কিন্তু কান্নার কারণ বলছে না। পারুল বলল, ‘তাবারন খালা, কান্দেন ক্যান ? কারণটা বলেন। কারণ না বললে সমস্যার সমাধান হইবো কেমনে ? আপনের বুকে কি আবার ব্যথা হইতেছে ? ঘা শুকায় নাই পুরাপুরি ?’
তাবারন কথা বলল না। সে বরং কান্না থামিয়ে চুপ হয়ে গেল। পারুল তাবারনের পাশে গিয়ে বসল। বলল, ‘ডাক্তার বলছিলো ঘা না শুকাইলে জানাইতে।’
তাবারন এবারও জবাব দিল না। পারুলের হঠাৎ রাগ উঠে গেল। সে বলল, ‘আপনেরা সবাই কি পাইছেন আমারে ? আমিও তো একটা মানুষ, নাকি ? হয় কথা বলবেন। না হইলে আর একবারও কানবেন না। একবারও না। যদি কান্দেন তাইলে এই বাড়ির বাইরে গিয়া কানবেন। এই আমার এক কথা। এই বাড়িতে থাইকা আর কান্দন যাইবো না। কথা বুঝছেন ?’
তাবারন আচমকা বসা থেকে শুয়ে পড়ল। তারপর আরও চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
পারুল কিছুক্ষণ সেই কান্না দেখল। তারপর প্রচণ্ড রাগ, বিরক্তি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নুরুন্নাহার আজ সুস্থ।
তিনি ভরদুপুরে উঠানের মাঝখানে বসে কচুরলতি কুটছেন। কিছুক্ষণ আগে পুকুরপাড়ের নিচু জলাভূমি থেকে এই কচুরলতি নিজেই কুড়িয়ে এনেছেন। পারুল মাকে দেখে বলল, ‘এইগুলান যে রানবা, এইগুলান খাইলে যে গলা চুলকায়, সেইটা তুমি জানো না ?’
নুরুন্নাহার বললেন, ‘গলা চুলকাইবো ক্যান ?’
‘তুমি জানো না, ক্যান গলা চুলকাইব ? এগুলা পানিতে থাকা ভেজা মাটির লতি না ? ভেজা মাটির লতিতে গলা ধরে'।
নুরুন্নাহার হাসলেন। বললেন, ‘তুই তো দেখি বয়সে বাড়ছস, বুদ্ধিতে বাড়স নাই। রান্ধনের সময় একটু তেঁতুল দিবি। দেখবি কী জিনিস কী হয়। বুঝলি ? আর ওই মাগির কী অবস্থা ? চুলকানি এখনো কমে নাই ? নাকি ফইরসাবরে লাগব ? ডাক্তারি ওষুধে তো তার কাজ হইব না। তার লাগবো আব্দুল ফইরের মলম।’
পারুল দীর্ঘসময় মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘একখান কথা বলো তো মা ? তুমি কি আসলেই অসুস্থ ?’
নুরুন্নাহার এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। পারুল বলল, ‘নাকি অসুস্থের ভান ধইরা থাকো ? তুমি যখন সুস্থ থাকো তহনও তাবারন খালারে দেখতে পারো না। আবার অসুস্থ থাকলেও পারো না। ঘটনা কী, আমারে কও তো ?’
‘আমি মাগিছাগি দেখতে পারি না।’
‘তোমার মুখখান এত খারাপ ক্যান মা ? সব সময় খালি খারাপ ভাষা...।’
‘আমি নিজে খারাপ। এইজইন্য আমার ভাষাও খারাপ। তুই আর তোর বাপে সাধু। এইজইন্য তোগো মুখ দিয়া সাধুবচন বাইর হয়।’
‘তুমি খারাপ মানুষ ক্যান হইবা ? তুমি মানুষ ভালো।’
‘আমি ভালো মানুষ হইলে কি আর আমার ভাতার আমারে ছাইড়া অন্য মাগিগোর লগে শুইতে যাইতো!’
বাবা আব্দুল ফকিরকে নিয়ে মা প্রায়ই এমন কথাবার্তা বলেন। এর অবশ্য কারণও আছে। বাবার কাজের ধরনটাই এমন যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তার কাছে আসে। ফলে এই নিয়ে নানান মুখরোচক গল্পও প্রচলিত আছে। কিন্তু পারুল সেসব বিশ্বাস করে নি। বাবাকে সে চেনে। এমন অসাধারণ মানুষ পৃথিবীতে কমই আছে।
পারুলের স্পষ্ট মনে আছে, তার বাবা আব্দুল ফকির একবার তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন রায়গঞ্জের রাইসমিলে ধান ভানাতে। তখন অভাবের কাল। চালের বড় আকাল। ফলে ধান ভানিয়ে খুব সাবধানে চাল নিয়ে ফিরছিলেন আব্দুল ফকির। ফেরার পথে হঠাৎই তুফান উঠল নদীতে। ভয়াবহ হাওয়ায় নাওয়ের পাল উড়ে গেল।
আব্দুল ফকির তখন ভয়ে কাঁপছেন।
চালভর্তি এই নাও ডুবে গেলে পুরো বছর সবাই মিলে উপোষ করতে হবে। তিনি বহুকষ্টে নাওখানা তীরের কাছাকাছি নিয়ে এলেন। কিন্তু নদীর পাড়জুড়ে নলখাগড়ার বন। এখানে নৌকা আটকে গেলে সমস্যা। উপায় একটাই। যদি গুণ টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু কে টানবে গুণ ?
আব্দুল ফকির হঠাৎ নাও থেকে নেমে গেলেন। তারপর দড়ির একপ্রান্ত বাঁধলেন নৌকার গলুইয়ের সাথে, আরেক প্রান্ত তার কাঁধে। তারপর হাঁটুপানিতে নেমে নৌকা টেনে নিয়ে যেতে থাকলেন সামনে।
পারুল একা ভয়ে কাঁপছে। আর চিৎকার করে কাঁদছে। তিনি তখন গুণ টানা রেখে মেয়ের কাছে গিয়ে বললেন, ‘কী গো মা, কান্দো ক্যান ?’
পারুল বাবার কথার জবাব দিল না। সে কাঁদতে কাঁদতেই তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আব্দুল ফকির দুই হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। বাইরে তখন তুমুল ঝড়বৃষ্টি। সন্ধ্যা নামতেও বেশি দেরি নেই। এই অবস্থায় এখানে রাত নেমে গেলে বিপদ।
কিন্তু কী করবেন তিনি ?
মেয়েকে এভাবে একা নৌকায় রেখে গুণ টানবেন কী করে ?
শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত এক কাজ করলেন আব্দুল ফকির। ছোট্ট পারুলকে কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর সেই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কোমরে দড়ি বেঁধে ওই ঘন নলখাগড়ার ভেতর দিয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গুণ টেনে চালভর্তি নাও নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
এশার আজানের সময় যখন তিনি নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, পারুল ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে।
গুণের শক্ত দড়ির ক্রমাগত ঘর্ষণে আব্দুল ফকিরের কোমরের চামড়া ছিলে দরদর করে রক্ত নামছে। হাঁটু অবধি নলখাগড়ার ঝোপের মধ্য দিয়ে হেঁটে আসার ফলে পা দুখানা কেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। রক্ত ঝরছে সেখানেও।
দিন সাতেক প্রায় বিছানা থেকেই উঠতে পারলেন না আব্দুল ফকির।
প্রচণ্ড জ্বর ও ব্যথায় শয্যাশায়ী হয়ে রইলেন তিনি।
এমন কত স্মৃতি যে পারুলের মনে আছে!
একবার হাত কেটে ফেলল সে। বাবা সেই কাটা হাত দেখে কেঁদে বুক ভাসালেন। তারপর সারা রাত জেগে বসে রইলেন পাশে।
যদি ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরতে গিয়ে কাটা হাতে ব্যথা পায় সে ?
কিংবা কেঁদে ওঠে!
সেই বাবাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে পারুলের কষ্ট হয়।
তবে কিছু বলে না সে।
এমনকি বাবার সঙ্গে যে তার খুব মাখামাখি সম্পর্ক, তাও না। বরং যত বড় হয়েছে, ততই যেন একটা স্পষ্ট দূরত্বও তৈরি হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাবা তার কাছে সব সময়ই আলাদা কেউ। অসাধারণ স্নেহময় এক পিতা।
পারুল অবশ্য মাকে বলল, ‘মা, আব্বারে নিয়া সব সময় এমন আকথা কুকথা বইলো না।’
‘ক্যান ? কষ্ট হয় ? বাপের আসল রূপখান যদি দেখতি, তাইলে আর হইতো না।’
‘তোমার বাপরে নিয়াও তো তুমি কতো ভালো ভালো কথা কও! অথচ সে বিয়া করছিল তিনখান। তার তিন বউর কাছে গিয়া জিজ্ঞাস করলেই বোঝা যাইতো, সে কেমন লোক আছিলো। সব ব্যাটা মানুষই নিজের বউর কাছে খারাপ।'
নুরুন্নাহার শক্ত নুখে বললেন, ‘তখনকার সময়ে সব বড় গৃহস্থ বাড়ির পুরুষ মানুষেরই দুই-তিনটা কইরা বউ থাকত। এইটা খারাপ কিছু আছিলো না। তখন বড় গৃহস্থ বাড়িতে কাজকামের জন্য লোক লাগতো মেলা। শত শত মণ ধান-পাট উঠতো। এতো ফসল লওনের লোক পাইবো কই ? এইজইন্য বিয়া করত তারা। এতে খারাপ কিছু নাই।’
পারুল হঠাৎ হা হা হা করে হেসে উঠল । নুরুন্নাহার বললেন, ‘দাঁত কেলাইয়া হাসনের মতোন কিছু কই নাই আমি।’
‘তা কও নাই। তয় এই প্রথম কাউরে দেখলাম যে সে নিজের বাপের দুই-তিনটা বিয়ার পক্ষেও যুক্তি দেয়, কথা কয়। তোমার বাজান লোক যেমনই হোউক, মাইয়া একখান জন্ম দিছে মাশাল্লাহ, ভালো। লাখে একজন।’
‘আমার বাপরে নিয়া আজেবাজে কথা কইবি না। সে আছিলো ফেরেস্তার মতন মানুষ। আশপাশের দশগ্রামের মানুষে তারে এককথায় মানতো। শ্রদ্ধা ভক্তি করতো।'
‘আমার বাপরেও করে। দশগ্রামের চাইতেও বেশি করে।’
‘সম্মানে করে না। তার জাদুটোনারে ডরায়া করে।’
‘হ। অন্যের বাপ খারাপ। আর নিজের বাপ ফেরেস্তা। সাধু। তা আমার বাপ আমার কাছে ভালো হইলেই হইবো। তোমার কাছে ভালো হওনের দরকার নাই।’
নুরুন্নাহার হঠাৎ কচুরলতি রেখে উঠে গেলেন। পারুল ভেবেছিল মা বুঝি এখনই ফিরে আসবে। কিন্তু তিনি এলেন না। বরং তার ঘরে গিয়ে অন্ধকারে বসে রইলেন। পারুল মায়ের কাছে গিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আচমকা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ও মা। মাগো।’
নুরুন্নাহারের শরীরটা থেকে থেকে কাঁপছে। পারুল হাত বাড়িয়ে মায়ের মুখটা ঘোরাল। তিনি কাঁদছেন। পারুল বলল, ‘ও মা, কান্দো ক্যান ?’
‘জীবনডা নষ্ট করনের লইগ্যা কান্দি।’
‘মানে কী ?’
‘আমার বাপজান কোনোদিন এই ওঝা-ফইরের লগে আমারে বিয়া দিতে চান নাই। আমি তার কথার অবাধ্য হইছি। বংশের মুখে চুনকালি মাইখ্যা তার লগে ভাইগা আইছি। আইসা দেখি এই মানুষটা একটা আস্তা ইবলিশ শয়তান। আইজ আমি পাগল। আমার কথার কোনো দাম নাই। ক্যান নাই ? আমি কি এইরম আছিলাম ?’
পারুল কথা বলল না। তবে আজকের মতো মাকে এমন সুস্থ বহুদিন দেখে নি সে। বেশির ভাগ সময়ই তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা অসংলগ্ন থাকে। ফলে কেউ তাকে বিশ্বাস করে না। তার কথা শুনতে চায় না। এমনকি পারুল নিজেও।
কিন্তু আজ কি সত্যি সত্যিই মা সুস্থ ?
নাকি এটাও তার অন্য কোনো মানসিক দশা ?
বাবা তো বলেনই, মায়ের ওপর খারাপ জিন ভর করেছে। সে যা বলে, তার কিছুতেই তার নিয়ন্ত্রণ নেই। তাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই জিন। ফলে তার কোনো কথা বিশ্বাস করা যাবে না। বাবার কথা মিথ্যেও নয়। পারুল বিভিন্ন সময়ে মায়ের অসংলগ্ন আচারণ, নানান কাল্পনিক গল্পকথার সাক্ষী।
নুরুন্নাহার যেন পারুলের মনের কথা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, ‘আমারে এইরম কে বানাইছে ? কত অত্যাচার যে সে আমারে করছে! রাইতের পর রাইত ঘুমাইতে দেয় নাই। জিন-ভূতের আছর পড়ছে বইলা চিকিৎসার নামে কী যে কষ্ট দিছে! কত মানুষরে বলছি যে আমার কিছু হয় নাই। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে নাই। সবাই বিশ্বাস করছে তার কথা। সে এতো বড় ফইর, তার কথা কে অবিশ্বাস করব?'
বলে সামান্য থামলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘জিন ছাড়ানির কথা বইলা ঘরের মইধ্যে আটকাইয়া পিটাইতো। নেশাও খাওয়াইতো জোর কইরা। তখন আর হুঁশ থাকতো না। কীসব আজেবাজে জিনিস, আন্ধাকুন্ধা দেখতাম চৌক্ষে... আর খালি দিনরাইত ঘুমাইতাম। তারপর আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙলেও আর ওই নেশার ঘোর, ঝিমানি কাটতো না... লাইগাই থাকত। সব কেমন উল্টাপাল্টা লাগতো।’
নুরুন্নাহার হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
পারুল মায়ের মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। এইসব কথা সে কম-বেশি নানা সময়ে মায়ের কাছে শুনেছে। কিন্তু সে জানে, মায়ের মাথা ঠিক নেই। এ কারণেই নানান আবোল-তাবোল বকেন তিনি। মা মূলত খারাপ এক জিনের আছরে পড়েছেন। বদ জিন। এ থেকে তাকে একমাত্র বাবাই রক্ষা করতে পারেন। আব্দুল ফকির বহুবছর ধরেই সেই চেষ্টা করছেন। নানান মন্ত্র পড়ে বাড়ির চারপাশে খুঁটি পুঁতে সীমানা দিয়ে দেন। কিন্তু মা রাতবিরাতে একা একা সেই সীমানার বাইরে চলে যেতেন। বাবার কোনো কথাই শুনতেন না। এসব কারণেই তার উপর বদজিনের আছর পড়েছে।
গ্রামে আরও অনেকের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। পারুল নিজ চোখেই দেখেছে, তারা এসে তখন বাবাকে নিয়ে যায়। কিন্তু আজ মা এমন করে বললেন যে পারুলের মন খারাপ হয়ে গেল, যেন এর আগে কখনো মায়ের এই কথাগুলো সে এভাবে গুরুত্ব দিয়ে শোনে নি। অনুভব করে নি। নুরুন্নাহার কাঁদছেন। পারুল মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ও মা, তোমারে ওইসব দিয়া অসুস্থ করলে আব্বার লাভ কী ?’
নুরুন্নাহার চট করে কান্না থামালেন। তারপর কিছু সময় স্তব্ধ বসে রইলেন। তারপর বললেন, ‘এমনিতেই তো তোগো কাছে আমি পাগল। ওইগুলা শোনলে আরও পাগল কইবি। একটা কারণ হইলো ওই তাবারন!’
‘কী!’ পারুল যেন বুঝতে পারল না। সে আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘কার কথা কইলা ?’
‘জানতাম বিশ্বাস করবি না। ভাববি আমি পাগল। কিন্তু ওই তাবারনও কারণ।’
পারুল এবার মোটামুটি নিশ্চিত, মা আবারও আবোলতাবোল বকবেন। তাবারনের কারণে বাবা তাকে এই অবস্থা করবেন ? বিষয়টি যথেষ্টই হাস্যকর। নুরুন্নাহার বললেন, ‘তাবারনের যে পোলা মাইয়া হইবো না, এই খবর জানোস ?’
‘এইটা সবাই জানে। আর এইজন্যই তার দুই দুইবার বিয়াও ভাঙছে।’
‘এইটা কি জানস যে তারে বাঁজা বানাইছে তোর বাপ ?’
‘কী!’ যেন তড়িতাহত হয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল পারুল। ‘তোমার তো দেখি এখনো মাথা খারাপ মা!’
‘কী পদ্ধতি করলে আর বাচ্চা-কাচ্চা হইবো না... পেটে থাকলেও নষ্ট হইয়া যাইবো। এইসবের হাজারটা তরিকা সে জানে। আর ওই তাবারনের বিয়া ভাঙনের জন্য তারে সে বাঁজা বানাইছে। যাতে আজীবন তার এই বাড়িতে থাকন লাগে। তাবারনের বয়স তহন কতো ? তেরো, চৌদ্দ ? ওই বয়সে মাইয়াটার জীবন সে নষ্ট করছে। ক্যান নষ্ট করছে বুঝস না ? বড়ো হইছোস বাতাসে ?’
পারুল কিছু একটা আঁচ করছে। কিন্তু বিষয়টা বিশ্বাস করতে মন সায় দিচ্ছে না তার। নুরুন্নাহার বললেন, ‘তাবারনের ওই নধর শইল। বড় বড় ওলান। ওইগুলান তার খুব পছন্দ...।’
পারুলের হঠাৎ যেন গা গুলিয়ে এল, ‘আল্লাহরস্তে একটু থামো মা। একটা মাইনষের নামে এতো খারাপ কথা কইতে তোমার বাধে না ? খারাপ হোউক, ভালো হোউক, সে তো তোমার স্বামী ? আমার বাপ!’
নুরুন্নাহার হঠাৎ পারুলকে ছিটকে ফেলে দিলেন দূরে। তারাপর উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করতে করতে বললেন, ‘সব নেমকহারাম। সব। নিজের প্যাটে যে মাইয়া ধরছি, সেও। সব ইবলিশ। এই দুনিয়ায় আমি বাঁইচা থাকতে কোনো ইবলিশ রাখবো না। আমার দাও কই ? আমার রামদাও ?’
তিনি দৌড়ে ঘর থেকে বের হলেন। তারপর অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে লাগলেন আব্দুল ফকিরকে। পারুল ছুটে গিয়ে মাকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। নুরুন্নাহার ততক্ষণে হাতের রামদা খানা নাচাতে নাচাতে বললেন, ‘আইছি একা, যাইমু একা, সঙ্গে কেউ যাইবো না, এই দুনিয়া ফানা হইবো জাইনা জানো না...।’
তিনি একের পর এক এলোমেলো গান গাইতে লাগলেন। পারুল নুরুন্নাহারের দিকে এগোল। সে নিশ্চিত, তাকে অন্তত নুরুন্নাহার আঘাত করবেন না। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। নুরুন্নাহার চোখ বন্ধ করে সাঁই করে দা চালাতে লাগলেন।
পারুল হতভম্ব চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
নিজের অজান্তেই বাঁ দিকে খানিকটা ঘুরে গেল সে। কিন্তু তারপরও নিজেকে আঘাত থেকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারল না। তার কাঁধে আড়াআড়ি আঘাত করে দা’টা বেরিয়ে গেল। বীভৎস এক ক্ষত তৈরি হলো সেখানে।
দরদর করে রক্ত বেরোতে লাগল।
পারুল ক্ষতস্থান চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
নুরুন্নাহার তখনো দা খানা ঘোরাচ্ছেন। পারুল চূড়ান্ত অবিশ্বাস নিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি এক পা দুপা করে এগিয়ে আসছেন। তার চোখেমুখে স্পষ্ট হিংস্রতা।
যেন খুনি, উন্মাদিনী।
পারুলের শরীরে একফোঁটা শক্তি নেই যে সরে যাবে। বরং ভয়ে থরথর করে কাঁপছে সে। নুরুন্নাহারকে দেখে মনে হচ্ছে, তার শরীরে কিছু একটা কেউ ভর করেছে। অশুভ দানবীয় কিছু। তিনক হাতছোঁয়া দূরত্বে চলে এসেছেন।
পারুল ভয়াবহ আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
যে-কোনো মুহূর্তে প্রচণ্ড আঘাত পড়বে তার শরীরে।
কিন্তু আঘাতটা পড়ল না। বরং অস্বাভাবিকভাবে নুরুন্নাহারের কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে। তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলছেন, ‘আমারে মাফ কইরা দেন। আমি আর এরম করবো না। আর কোনোদিন করবো না। আমারে মাফ কইরা দ্যান। এই শেষবারের মতন আমারে মাফ কইরা দ্যান।’
নুরুন্নাহারের কণ্ঠে প্রচণ্ড আতঙ্ক। পারুল প্রবল বিষ্ময় নিয়ে চোখ খুলে তাকাল। তার সামনেই থরথর করে কাঁপছেন নুরুন্নাহার। সেখানে আব্দুল ফকির দাঁড়ানো। মোটা একখানা লোহার রড তার হাতে। আব্দুল ফকির ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘পারুল, ঘরে যাও মা।’
বাবার এরকম কণ্ঠ এর আগে কখনো শোনে নি পারুল।
কী ভয়ংকর গা-হিমহিমে শীতল কণ্ঠ!
পারুলের হঠাৎ মনে হলো, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকে এর আগে কখনো দেখে নি সে। এ যেন অচেনা অজানা অন্য কোনো মানুষ। ভয়ানক কেউ। এই মানুষটি তার এতোদিনকার চেনা জানা, কন্যা স্নেহে বিগলিত, বিভাসিত পিতা আব্দুল ফকির নন। এ অন্য কেউ।
এই মানুষের নির্দেশ অমান্য করার ক্ষমতা তার নেই।
গভীর রাত অবধি নুরুন্নাহারের ঘর থেকে হাড় হিম করা চিৎকার শোনা গেল। কিন্তু পারুল ঘর থেকে বের হতে পারল না। তার ঘরের দরজা বাইরে থেকে শেকল টেনে আটকে দেওয়া হয়েছে। পারুল চিৎকার করে ডাকল।
কিন্তু কেউ সাড়া দিল না।
আব্দুল ফকির পারুলের ঘরে এলেন মাঝরাতেরও পর। ততক্ষণে নুরুন্নাহার শান্ত, চুপচাপ। কিন্তু পারুলের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরে ঝরে দুর্বল হয়ে পড়েছে শরীর। ব্যথায় জ্বরও চলে এসেছে।
আব্দুল ফকির বেশ কিছুক্ষণ মেয়ের রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর জুলফিকারকে বললেন নৌকা বের করতে।
নৌকার পাটাতনে মৃত মানুষের মতো পড়ে রইল পারুল।
পারুলের মনে হলো সে জ্ঞান হারাচ্ছে। কিন্তু জ্ঞান হারানোর আগে সে হঠাৎই শুনতে পেল, আব্দুল ফকির কাঁদছেন। তার দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন তিনি। তার শরীর কাঁপছে কান্নার দমকে। পারুলের খুব ইচ্ছে করছিল বাবার গাল ছুঁয়ে দিতে। চোখ মুছিয়ে দিতে।
কিন্তু সে তার কিছুই করতে পারল না।
তার আগেই আব্দুল ফকিরের চোখের জল টুপটাপ ঝরে পড়তে লাগল তার চোখে, গালে, কপালে।
যেন আব্দুল ফকির না পারলেও তার কান্নার ওই জলই পারুলকে স্পর্শ করতে লাগল পরম পিতৃস্নেহে।
পর্ব- ২৪ [মানবজনম — সাদাত হোসাইন]
রাহাতকে নিয়ে নয়নের বাসায় এসেছে হেমা।
রাহাত বসে আছে বাইরের ঘরে। হেমা নয়নের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘তুমি সিওর যে তুমিই নয়ন ?’
নয়ন হাসল, ‘কনফিউশান হচ্ছে ?’
‘না, ডিল্যুশন হচ্ছে।’
‘কেন ? আমি কি খুব শুকিয়ে গেছি ? '
'কেন? নিজেকে আয়নায় দেখো না? কিংবা কেউ কিছু বলেনি তোমাকে?'
নয়ন জবাব দিলো না। মৃদু হাসল, 'তুমিও কিন্তু শুকিয়েছ।’
হেমাও হাসল, ‘মেয়েরা শুকালে সেটা ফ্যাশন। একটু শুকানোর জন্য কতকিছু করে মেয়েরা!’
‘এটা তেমন শুকানো না। রোগা হয়ে গেছ।’
‘ওই একই হলো।’
বলে চুপ করে রইল হেমা। নয়নও। যেন কথা ফুরিয়ে গেল তাদের। এতক্ষণ যে কথাটুকু হলো, তাও যেন কেবল বলার জন্যই বলা। দেয়ালঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দের সঙ্গে যেন এই শব্দের কোনো তফাত নেই। আলাদা অর্থ নেই। খানিক বাদে হেমা বলল, ‘আমাদের আর কোনো কথা নেই, তাই না ?’
‘কেন থাকবে না ?’
‘কী কথা থাকবে ?’
‘কথা কি নির্দিষ্ট করে হয় ?’
‘সেই অনির্দিষ্ট অফুরন্ত কথার দিন কি আর আমাদের আছে ? এখন তো দুটো কথার পরই সব ফুরিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও আর কোনো কথা খুঁজে পাই না আমরা!’
‘ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস হচ্ছে ?’ প্রসঙ্গ পাল্টাল নয়ন।
‘খুব হচ্ছে।’ হাসল হেমা।
‘হাসলে যে ?’
‘ইউনিভার্সিটির ক্লাসের কথা জিজ্ঞেস করলে তো তাই!’
‘কেন ? ক্লাসের কথা জিজ্ঞেস করা যাবে না ?’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘যাবে না কেন ? নিশ্চয়ই যাবে। আসলে গত পাঁচ বছরে আর কখনো এই প্রশ্নটা করো নি তো, তাই হয়তো আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছি।’
‘তুমি কেমন করে যেন কথা বলছ!’
‘একদম তাই। অথচ আমি এখানে আসার সময়ও কিন্তু ভাবি নি যে এমন করে কথা বলব। কিন্তু এরপর কিছু একটা হয়েছে আমার। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছি না।’
‘নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কেন ?’
‘এই যে তুমি আমাকে নিতে পারছ না।’
নয়ন চুপ করে গেল।
হেমা বলল, ‘যখন খুব কাছের দুজন মানুষ পরস্পরের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কেবল কেমন আছ, কী করছ, কী খেয়েছ, পড়াশোনা কেমন চলছে—এই ধরনের প্রশ্নোত্তর করতে থাকে, তখন কী ধরে নিতে হবে জানো ?’
নয়ন তাকাল।
‘তখন ধরে নিতে হবে এরা আর কাছের মানুষ নেই। কিন্তু এখনো আগের সেই কাছের মানুষের ভাবনা থেকে বের হতে পারে নি। কিংবা কাছের নেই জেনেও কাছের মানুষের ভান ধরে আছে।’
‘আমরা আর কাছের মানুষ নেই ?’
‘আমার তো মনে হয় না।’
‘কেন ?’
‘আমার এসেই তোমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। বলতে ইচ্ছে করছিল, তুমি কি জানো, আমি তোমাকে কী অসম্ভব ভালোবাসি ? তোমাকে না দেখতে দেখতে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। আমি তোমার কণ্ঠস্বর ভুলে গেছি। তুমি কি আজ সারা দিন আমার সামনে বসে থাকবে ? আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখবে ?’
‘বলো নি কেন ?’
‘কেমন একটা দ্বিধা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল ব্যাপারটাতে তুমি বিরক্ত হবে। আসলে, কেউ যখন তার প্রিয়তম মানুষটাকে অধিকারের কথা, স্পর্শের কথা, তেষ্টার কথা বলতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগে, তখন বুঝে নিতে হবে, সেখানে আর যা-ই থাকুক ভালোবাসাটা আর নেই।’
‘তুমি আজ সবকিছু এমন জটিল করে বলছ কেন ?’
‘ওই যে, হয়তো ভেতর থেকে আসছে বলে!’ বলে হাসল হেমা।
‘তোমাকে কি আমি একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি ?’
হেমা নিজের বুকে হাত রেখে অভিবাদনের ভঙ্গিতে বলল, ‘ইটস মাই অনার ইওর এক্সিলেন্সি।’
নয়ন হঠাৎ হাত বাড়িয়ে হেমার হাত ধরল। তারপর বলল, ‘আমার সঙ্গে এমন করে কথা বোলো না প্লিজ। আমার আর ভালো লাগছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আমার। '
'নয়ন'।
'আমার আজকাল কেবল মরে যেতে ইচ্ছে হয়। ভীষণ মরে যেতে ইচ্ছে হয় হেমা।’
নয়নের গলায় কিছু একটা ছিল। হেমা তার হাতের মুঠোয় থাকা নয়নের হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর বলল, ‘এমন করে বলো না প্লিজ।'
নয়ন কথা বলল না। হেমা বলল, 'আর বলব না।’
‘মানুষ হিসেবে আমি খুব দুর্বল, তাই না ?’ ক্লান্ত কণ্ঠে বলল নয়ন।
‘সাহসী আর দুর্বলের বিষয়টা আমি ঠিক বুঝি না।' বলল হেমা।
'কেন?'
'যে মানুষটা হাসতে হাসতে কাউকে খুন করে ফেলতে পারে, তাকে আমরা বলি সাহসী। আর যে খুন দেখে কেঁদে ফেলে তাকে আমরা বলি দুর্বল। কী অদ্ভুত না ?’
‘অদ্ভুত কেন ?’
‘কারণ হওয়ার কথা তো উল্টো। যে খুব সহজে মানুষ খুন করতে পারে তারই তো বরং দুর্বল হওয়ার কথা। বোধের দিক থেকে দুর্বল। মানবিক অনুভূতির দিক থেকে দুর্বল।তাই না ?’
নয়নের হঠাৎ মনে হলো, এই ক’মাসেই কেমন বদলে গেছে হেমা। বড় হয়ে গেছে অনেক।
প্রত্যয়ী, প্রতিভাত।
যেন নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের ভারও বইতে পারবে সে।
নয়ন বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি আমার ভেতরে একটা ভয়ংকর গোপন কথা এতদিন আটকে রেখেছিলাম। অনেক চেষ্টা করেও কথাটা বলতে পারি নি। আমি কি কথাটা তোমাকে বলব ?’
‘তোমার যদি মনে হয় কথাটা আমাকে বললে তোমার ভালো লাগবে, তাহলে অবশ্যই বলবে। আর ভালো না লাগলে বলবে না।’
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, কথাটা শোনার পর তোমার প্রতিক্রিয়া কী হবে।’
‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কথাটাও শোনার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছি আমি। তুমি বলো।’
‘কথাটা শোনার পর তুমি আমার হাতটা ছেড়ে দেবে না তো ?’
‘দেব না।’
‘কাঁদবে না তো ?’
‘না।’
নয়ন বার দুই দম নিল। তারপর চোখ বন্ধ করল। তারপর হেমাকে বলল, ‘তুমি কি তোমার মুখটা আরেকটু কাছে আনবে আমার ? আমি চাই না, আমার এই গোপন কথাটা আর কেউ শুনুক।’
হেমা এগিয়ে এল। নয়ন তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি। ভালোবাসি। আমি তোমাকে ভালোবাসি হেমা। এই জীবনে এমন করে এর আগে তা কখনো অনুভব করিনি যে আমি তোমাকে এতোটা ভালোবাসি । আমার আজকাল মনে হয়, তোমাকে ছাড়া আমি কখনো থাকতে পারব না। একমুহূর্তও না।’
হেমা তার কথা রাখতে পারল না।
সে নয়নের হাত ধরে বসে আছে। কিন্তু তার চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে।
তার এত এত প্রস্তুতির কিছুই কাজে লাগল না।
নয়ন তাকে ভেঙেচুরে এলোমেলো করে দিয়েছে।
সে হাপুস নয়নে কাঁদছে।
নয়ন হাসিমুখে তার সেই কান্না দেখছে!
পর্ব- ২৫ [মানবজনম — সাদাত হোসাইন]
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে উঠান পেরিয়ে নিজের ঘরে এসে বসলেন। সেদিনের অসুস্থতার পর আর লাঠি ছাড়া হাঁটতে সাহস করেন নি। তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন আমোদি বেগম। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘কেমন আছো তুমি ?’
‘বাতের বেদনা ছাড়া ভালো আছি।’
‘আর কোনো অসুবিধা আছে ?’
‘আছে।’
‘কী অসুবিধা ?’
‘বাতের বেদনা।’
‘সেইটা তো বললাই।’
‘আসল ঘটনা তো বলি নাই।’
‘আসল কী ঘটনা ?’
‘আপনে যে আমারে আগে প্রত্যেকদিন পিটাইতেন, মনে আছে ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কপাল কুঁচকে তাকালেন। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
তিনি আমোদি বেগমের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছেন।
আমোদি বেগম বললেন, ‘যেই হাসি দেইখা আপনের আমারে পছন্দ হইছিলো। জোর কইরা বিয়া করছিলেন। সেই হাসি দেখলেই পরে আপনের গা জ্বলত। হাসলেই মারতেন। কিন্তু আমার আছিলো হাসি রোগ। না হাইসা এক মুহূর্ত থাকতে পারতাম না। এমনকি ওই হাসির কারণে আপনে যখন আমারে পিটাইতেন, আমি তখনো হাসতাম। হি হি হি।’
‘এই ঘটনার সঙ্গে বাতের বেদনার কী সম্পর্ক ?’
'সম্পর্ক আছে। গভীর সম্পর্ক। '
'কী গভীর সম্পর্ক? '
‘সেই পিটানিতে শইলে যে ব্যথা জমা হইছিলো, তা তো তখন শইল ছাইড়া যায় নাই। জুয়ান শইলে সেই ব্যথা এতোদিন লুকাই আছিলো। এখন এই বুড়া বয়সে আইসা তারা আবার জাইগা উঠছে। ক্ষণে ক্ষণে শইলের নানান জায়গায় ব্যথা এহন বাড়ে। আপনে যদি এহনও আবার একটু আগের মতন পিটাইতেন, তাইলে মনে হয় বাতের ব্যথাটা যাইতো। কথায় আছে না, ব্যথায় ব্যথা নাশ? একটু পিটাইবেন? লাঠি আইনা দিবো?'
আমোদি বেগমের সাহস দেখে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন!
এমন আমোদি বেগমকে এর আগে কখনো দেখেন নি তিনি।
তারপরও যতটা সম্ভব নিজেকে সংযত রাখলেন। বললেন, ‘তোমারে এইখানে ডাকার পিছনে বিশেষ কারণ আছে।'
'জানি।'
'কী জানো?'
'আমারে এইখানে ডাকনের পিছে বিশেষ কারণ আছে'।
'কীভাবে জানো?'
'যেইভাবে আমার বাতের বেদনার কারণ জানি, যেইভাবে আপনেরে জানি, সেইভাবে।'
'অতিরিক্ত হেয়ালি করবা না। হেয়ালি আমার পছন্দ না। আমি ঠাট্টা তামাশার লোক না। আমার সাথে ঠাট্টা তামাশা করবা না। তোমারে আমি এমনে এমনেই পিটাইতাম না। তোমার এই ঠাট্টা তামাশার স্বভাবের কারণেই পিটাইতাম। হালের গরু আর ঘরের বউ, এই দুই জিনিস পাইচনের উপরে না রাখলে এরা সোজা হয় না।'
'জে, আচ্ছা।'
'তোমারে এখন যা জিজ্ঞাস করবো, সোজাসুজি উত্তর দিবা। কোনো ব্যাঁকাত্যাড়া উত্তর দিবা না? কথা কিলিয়ার?'
'জে, কিলিয়ার'।
'সেইদিন যে তোমারে ফজুর বউ সালেহারে খবর দিয়া আনতে বলছিলাম, মনে আছে ?’
‘জে, আছে।’
‘তোমারে দেখতে বলছিলাম তার গায়ে সোনার কোনো গয়না আছে কি না, মনে আছে?'
'জে আছে। '
'দেখছিলা তুমি ?’
‘জে। দেখছিলাম।’
‘তার শইলে সেদিন কোনো গয়না আছিলো ?’
‘জে আছিলো।’
‘সেই কথা তুমি আমারে বলো নাই কেন? আমার কাছে মিথ্যা কথা কেন বলছিলা যে তার শইলে কোনো গয়না তুমি দেখো নাই?'
আমোদি বেগম কথা বললেন না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, 'ওই কথা তুমি ইচ্ছা কইরা আমার কাছে লুকাইছিলা ?’
‘জে, ইচ্ছা কইরা লুকাইছিলাম।’
‘সালেহারে যখন আমি আমার ঘরে ডাকছি, তখন তুমি তার বাঁজুর গয়নাখান খুইলা লুকাইয়া তারপর আমার সামনে আসতে বলছিলা ?’
‘জে।’
‘ফজু যে এক কলসি গয়না পাইছে আর সেইটা যে আমি সন্দেহ করতেছি, এই কথাও তুমিই সালেহারে জানাইছিলা ?’
‘জে।’
‘সেই গয়নার খোঁজে ফজুর বাড়িতে যে আমি রাইতের আন্ধারে লোকজন পাঠাবো এই কথাও তুমি শুইনা ফেলছিলা ?’
‘জে।'
'কীভাবে শুনছিলা? কে বলছিলো তোমারে?'
'কেউ বলে নাই। খবির আর এস্কান্দার আলোচনা করতেছিলো, আমি আড়ালে দাঁড়াইয়া শুইন্যা ফালাইছিলাম।’
‘তারপর তুমি গিয়া ফজুরে সতর্ক কইরা দিয়া আসছো ?’
‘জে। ঠিক ধরেছেন।'
'হুম'। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।
আমোদি বেগম খানিক চুপ করে থেকে বললেন, 'তবে তাতে আপনের ক্ষতি কিছু হয় নাই। সে সেয়ানা আছে। সে আগে থিকাই ওই জিনিস ঘরে রাখে নাই।’
‘তুমি কি বুঝতে পারতেছো যে তুমি কত বড় অন্যায় করছো ?’
‘না, বুঝতে পারতেছি না।’
প্রচণ্ড রাগে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর লাঠি ধরা হাতখানা কাঁপছে। কিন্তু তিনি যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘ক্যান বোঝো নাই যে তুমি একটা অন্যায় করছো ?’
‘অন্যায়তো আপনেও করছেন। ফজু যদি কিছু পাইয়াও থাকে, সেইটা তার জিনিস। সেই জিনিস আপনে তার কাছ থিকা চুরি করবেন ক্যান ?’
‘আমারে তোমার চোর মনে হয় ?’
‘আমার সবাইরেই চোর মনে হয়।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যেন নিজের উপর সামান্য নিয়ন্ত্রণ হারালেন। তিনি ধমকের গলায় বললেন, ‘হেঁয়ালি করবা না আমোদি বেগম। আমি হেঁয়ালি করনের লোক না। আমারে তোমার চোর মনে হয় ?’
‘জে, হয়।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার এই দীর্ঘ জীবনে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি আর কখনো হন নি।
তিনি হতভম্ব চোখে আমোদি বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘসময়। আমোদি বেগমের মতো একজন অথর্ব, মূর্খ, মেরুদণ্ডহীন মহিলা যে তাকে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে, তার সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিস্কম্প কণ্ঠে এসব কথা বলতে পারে, এ তিনি ঘুণাক্ষরেও কখনো চিন্তা করতে পারেন নি। এই জীবনে তিনি সাধারণ একজন গৃহকর্মীর চেয়ে বেশি কিছু কখনো আমোদি বেগমকে ভাবেননি। ‘
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ থমথমে কণ্ঠে বললেন, 'তোমার নিজেরে তোমার কী মনে হয় ?’
‘আমার নিজেরেও আমার চোর মনে হয়। আপনার চাইতেও বড় চোর।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এবার থতমত খেয়ে গেলেন। এই প্রথম কারও সামনে কী বলতে হবে তা যেন তিনি খুঁজে পেলেন না।
খানিক চুপ থেকে বললেন, ‘তোমার নিজেরেও তোমার চোর মনে হয় ?’
'জে'।
'ক্যান?'
‘এইটা কী কথা জিগাইলেন ? চুরি করি দেইখ্যাই চোর মনে হয়।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এবার সতর্ক হয়ে উঠলেন। এই মহিলাকে আর বিশ্বাস করা যায় না। আমোদি বেগম ছোটো ঘর থেকে আনা খাঁ বাড়ির বউ। এই এত বছরে এই বাড়ি থেকে কী কী জিনিস সে চুরি করেছে কে জানে!
তিনি তার ভেতরের দুশ্চিন্তা চেপে রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী কী চুরি করছো তুমি ?’
আমোদি বেগম হাসলেন, ‘ডরাইয়েন না। আমি আপনের কোনো ধনসম্পদ চুরি করি নাই।' 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
'তাইলে কী চুরি করছ?"
"চুরি করছি আমার নিজের দুঃখ, কষ্ট। এইগুলান গোপনে গোপনে চুরি কইরা নিজের কাছে রাইখ্যা দিছি। যাতে কেউ কোনোদিন না দেখতে পারে।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হতভম্ব ভঙ্গিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। সহজ-সরল, নির্বিরোধী আমোদি বেগমের আড়ালের এই মানুষটি এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল ?
তিনি ঠোঁট চেপে বললেন, ‘কথা পেঁচাবা না আমোদি বেগম । যা বলার স্পষ্ট কইরা বলো।’
‘আপনের মনে আছে? আপনে যে প্রত্যেক রাইতে ওইটুক কোহিনুরের সামনেই আমারে রোজ মারতেন, কিন্তু আমি কানতাম না? কারণ আমি তখন আমার ব্যথা, অপমান আর কান্দনও চুরি করতাম। আপনে মারতেন আর আমি হাসতাম। ক্যান হাসতাম জানেন ? যাতে কোহিনুর না বোঝে। ওই মাইরের দাগও আমি চুরি করছি। আপনে যে আমার সঙ্গে খাঁ বাড়ির ঝি চাকরের মতন ব্যবহার করতেন, এইগুলাও আমি কোনোদিন কাউরে বুঝতে দেই নাই। এইসব চুরি কইরা গোপনে লুকাই নিজের ভিতর লুকাই রাখতাম। বছরের পর বছর রাখছি।’
বলে সামান্য থামলেন আমোদি বেগম। তারপর বললেন, ‘আমার চাইতে বড় চোর আর কে আছে দুনিয়ায়, আপনেই কন ? আমি জীবনভর চুরি করছি। দুঃখ চুরি। অপমান চুরি। কষ্ট, বেদনা চুরি। আপনেরে চোর বলছি বইলা দুঃখ পাইয়েন না, খাঁ সাব। দুনিয়ায় আসলে সবাই--ই চোর। একেকজন একেকরকম চোর।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন।
এ কোন আমোদী বেগম তার সামনে দাঁড়িয়ে ?
তিনি শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘বাহ, আমার ঘরে তোমার মতন এতোবড় একজন জ্ঞানী মানুষ থাকতে আমি এতোদিনেও টের পাই নাই ? এইটা কেমন কথা ? তয় একখান কথা তুমি ভুল বলছো।’
‘কী কথা ?’
‘তৈয়ব খাঁ চুরি করনের মানুষ না। সে ডাকাতি করনের মানুষ। কিন্তু তুমি ঘরের ইন্দুর হইয়া ঘরের বেড়া কাটতেছো। এইটা তুমি ঠিক করো নাই। এখন বলো, এই কাজখান তুমি ক্যান করলা ?’
আমোদি বেগম হঠাৎ হেসে ফেললেন, ‘মাইর খাইতে। অনেক দিন তো মারেন না। শইলডাও বাতের ব্যথায় কাতর। বললাম না, ব্যথায় নাকি ব্যথা কমে? এইজন্য ভাবলাম, একটু মাইর খাইয়া যদি সুস্থ হইতে পারি। কখন মারবেন ? এখন ? লাঠি আরেকখান আইনা দিব?'
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বুঝতে পারছেন না তিনি কী করবেন। তার লাঠি ধরা হাতখানা থরথর করে কাঁপছে। তবে তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘তুমি যাও আমোদি বেগম। এক্ষুণি আমার চোখের সামনে থেকে যাও।’
আমোদি বেগম কিছু বললেন না। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আবার তাকে ডাকলেন, ‘তুমি ফজুর উপকার করতে গিয়া আসলে তার ক্ষতিই কইরা ফালাইলা।’
‘কী ক্ষতি ?’
‘আমি এতোদিন পুরাপুরি নিশ্চিত আছিলাম না যে ফজু ওই গয়না আসলেই পাইছে কি না। কেবল সন্দেহ করতেছিলাম। কিন্তু আইজ তুমি আমারে সেইটা নিশ্চিত করলা।’
‘আপনে যেইটা একবার সন্দেহ করছেন সেইটার শ্যাষ না দেইখা ছাড়বেন ?’
‘হুম।’ গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। ‘কিন্তু তুমি যে এমনে এমনে সব স্বীকার কইরা নিলা তোমার ডর লাগে নাই ?’
‘মরা মাইনষের আবার ডর ভয় কিসের ? ডর ভয় থাকে জীবিত মাইনষের।’
‘তুমি মরা মানুষ ? ভালোই তো কথা শিখছো। তা ফজু কিন্তু মরা মানুষ না। সে জ্যাতা মানুষ। তার নিশ্চয়ই ডর ভয় আছে ? কী কও ?’
‘আমি তো ডরের কিছু দেখি না।’
‘ক্যান ?’ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন তৈয়ব খাঁ।
‘আপনে ওই গয়না আপনের হাতে পাওনের আগ পর্যন্ত তো তারে একটা ফুলের টোক্কাও দিবেন না। দিবেন ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কথা বললেন না।
আমোদি বেগম বললেন, ‘আপনের নিজের জন্যই এখন তারে বাঁচাই রাখন দরকার। সে বাঁইচা না থাকলে আপনেরে গয়নার খোঁজ দিব কে ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘ক্যামনে খোঁজ বাইর করতে হয় সেইটা আমি জানি।’
আমোদি বেগম মৃদু হাসলেন, ‘ওই গয়নার খবর কিন্তু এখন আব্দুল ফইরও জানে। আর সে কিন্তু ফজু না। সেইটা তো আপনে জানেন ? জানেন না ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যেন আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আব্দুল ফইরও জানে ?’
‘সন্দেহ করে। আর সে যখন একবার সন্দেহ করছে, তখন আপনের কি মনে হয় এর শ্যাষ না দেইখ্যা সে ছাড়ব ? আরেকখান কথা, গয়নার কথা জানাজানি হইলে কিন্তু সমস্যা। শুনছি, এইসব মালামালের আসল মালিক নাকি হয় সরকার ? ফজু কিন্তু এইসবও জানে।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ থমকে গেলেন।
তার ধারণা ছিল, আশপাশের সব খবরই তিনি সবার আগে রাখেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, না। সময় পাল্টে গেছে। তার আগেই অনেক কথা অন্যদের কানে আটকে যায়।
এটা কি কোনো কিছুর পূর্বাভাস ?
তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে আমোদি বেগমকে চলে যেতে বললেন।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল এস্কান্দার।
সে আমোদি বেগমের শাস্তি দেখার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তার সেই ইচ্ছে পূরণ হলো না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সঙ্গে এমন অবিশ্বাস্য কথোপকথনের পরও আমোদি বেগমের কোনো শাস্তি হলো না।
তবে খানিক বাদে খবির খাঁ আর মনিরকে ডাকা হলো।
এস্কান্দার ভেবেছিল, তাদের সঙ্গে এই বিষয়ে কোনো কথা হবে। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘শুনছি ভূমি অফিস থিকা শিগগিরই শামুক ভাঙ্গার বিলের বেয়াল্লিশ বিঘা জমির বিষয়ে নোটিশ আসবো। ওই জমির দলিলপত্র, রেকর্ড, মিউটেশন, খাজনার কাগজপত্রের বিষয়ে জানতে চাইবো। দক্ষিণ খালের বিঘা কুড়ি জমিনেরও ওই একই অবস্থা। ঘটনা শুরু হইয়া গেছে। তয় এইগুলা আলামত মাত্র। আসল ঘটনা এখনো শুরু হয় নাই। মূল ঘটনা শুরু হইবো আরও পরে।’
জানালার বাইরে দুটো বেড়াল খুনসুটি করছে। ঘাসের মধ্যে কিছু একটা খুঁজে পেয়ে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তারা। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন সবার আগে কী করা দরকার, সেইটা ভাবতে হইবো।’
‘বাজান, এই বিষয়ে সেইদিনই তো কথা হইলো। জমির কাগজপত্র বাইর কইরা জমা দিতে হইবো।’
‘অতো সময় তো হাতে নাই।’ বলে হঠাৎ মনিরের দিকে তাকালেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তারপর বললেন, ‘তুই বল, এই অবস্থায় কম সময়ে পরিস্থিতি সামলানোর সবচাইতে ভালো উপায় কী ?’
মনির এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সে এবার গলাখাঁকরি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল। তারপর হাত দুখানা আড়াআড়ি ভাঁজ করে পেটের ওপর রাখল, যেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সঙ্গে প্রথম কোনো গুরুতর বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছে সে। সাহস সঞ্চয় করছে।
‘দাদাজান’, বলতে শুরু করল মনির। ‘কাগজপত্রের এইসব ঝামেলা মিটাইতে অনেক সময় লাগবো। তারপর পয়সাপাতির বিষয় আছে। দৌড়ঝাঁপও করতে হইবো। এখন দেখতে হইব শটকাট কোনো উপায় আছে কি না।’
‘কী মনে হয়, আছে কোনো উপায় ?’
‘আছে। তয় সেইটা একদিকে যেমন সহজ, তেমনি আবার কঠিনও।’
খবির খাঁ চিন্তিত গলায় বললেন, ‘কী ?’
‘যে-কোনো উপায়েই হোউক, ফজু ব্যাপারীর গয়নার কলসি আমাগো হাতে পাইতেই হইবো। একবার যদি ওইটা তার হাতছাড়া হয়, তাইলেই তার সব শ্যাষ। এই যে এতো সাহস, বুদ্ধি, চেষ্টা সব শ্যাষ। আমাগো তখন আর কিছু করা লাগবো না। সে তো এখন ওই গয়নার জোরেই সব করতেছে।’
কথাটা সহজ হলেও খবির খাঁ পুত্রের কথায় যুগপৎ মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছেন। তবে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি কেবল মৃদু স্বরে বললেন, ‘হুম। কিন্তু ঘটনা এখন আর অতো সহজ নাই। আব্দুল ফইরও গয়নার কথা সন্দেহ করছে। ফলে ওইটা হজম করা আর সহজ হইবো না।’
‘দাদাজান, ফইরসাবে কিন্তু এখনো নিশ্চিত না যে ফজুকাকুর কাছে আসলে কী আছে। সে কেবল সন্দেহ করতেছে। তার পুরাপুরি নিশ্চিত হইতে আরও সময় লাগবো। যেমনেই হোউক তার আগেই জিনিস হাতে পাইতে হইবো।’
‘কিন্তু কেমনে ?’
‘দেখি কী করন যায়। তয় দাদাজান, আমার ক্যান জানি মনে হয় ওই কলসি আমি দেখছি!’
‘কী কস ?’
সেদিন ফজু ব্যাপারীর বাড়ির পাশের খালে মাছ ধরতে যাওয়ার ঘটনা সবিস্তারে খুলে বলল মনির। তারপর বলল, ‘সেই দিন তো আর বুঝি নাই যে ওই কলসিই সেই কলসি! সে ঘাস কাইট্টা কলসির উপরে রাখতেছিল। আমি তো বুঝি নাই। ভাবছি, পানি নিতে আসছে।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য মনিরের কথা শুনছেন বলে মনে হলো না। তিনি তাকিয়ে আছেন বাইরে।
সেখানে গোয়ালঘরের ভাঙাচোরা কাঠের কাঠামোর পাশের ফাঁকা জায়গায় গালিচার মতো বিছিয়ে আছে সবুজ বুনো ঘাস-লতাপাতা। খানিক আগের খুনসুটিতে মত্ত বেড়াল দুটি এখন একটা ইঁদুরের বাচ্চাকে ধাওয়া করছে। বাচ্চাটা ফুড়ুৎ করে ঘাসের ভেতর থাকা গর্তে ঢুকে পড়ল। কিন্তু বেড়াল দুটো ঘটনাটা কিছুতেই বুঝতে পারল না। তারা বাচ্চাটাকে এদিক-সেদিক খুঁজতে লাগল। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থেকে হঠাৎ খবির খাঁকে বললেন, ‘ওইদিন রাইতে গয়নার কলসখান ফজুর বাড়ির কই কই খোঁজা হইছিল ?’
খবির খাঁ তল্লাশির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বিড়বিড় করে বললেন, ‘বড় গাধা তো দেখি আমি। ফজু ওই জিনিস তার নিজের বাড়িতে ক্যান রাখবো ? রাখবো অন্যখানে। আমি হইলেও তা-ই করতাম।’
‘আপনে হইলে কই রাখতেন দাদাজান ?’
‘সেইটা ভাবতে হইবো। তয় ওই জিনিস লইয়া সে গ্রামের বাইরে যায় নাই।’ বলে চুপ করে গেলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তারপর দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর হঠাৎ বললেন, ‘আমার ধারণা আমি আন্দাজ করতে পারতেছি ফজু ওই জিনিস কই রাখছে!’
খবির খাঁ আর মনির বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তৈয়ব উদ্দিন খাঁর দিকে। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তাদের দিকে তাকালেন না।
তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন পরত্যাক্ত গোয়াল ঘরের ভাঙা কাঠের কাঠামো পেচিয়ে থাকা সবুজ ঘন ঘাস লতাপাতায় ছাঁওয়া অগম্য ওই জায়গাটুকুর দিকে!
এরকম অগম্য, পরিত্যক্ত, আকর্ষণহীন জায়গা তিনি আর কোথায় দেখেছিলেন? যেখানে জংলি লতাপাতা, সাপখোপ, বিছের ভয়ে কেউ কখনো যায় না?
0 Comments