Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মানবজনম পর্ব -৪

মানবজনম — পর্ব 4 | মানবজনম
সাদাত হোসাইন

মানবজনম

📖 উপন্যাস ✍️ EarnBD
📄 পর্ব 4 / 6

ফজু ভেবেছিল, আব্দুল ফকিরকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। কিন্তু তার মুখের মৃদু বাঁকা হাসি এবং উত্তর শুনে ঘাবড়ে গেল সে। আব্দুল ফকির বললেন, ‘লক্ষণ তো খারাপ ফজু।’

ফজু অবাক গলায় বলল, ‘কিসের লক্ষণ খারাপ কাকু ?’

‘তোর লক্ষণ।’

‘মানে ?’

‘এই কয়দিন আগেও তোরে দেখছি আলাভোলা এক পোলা। ঠিকমতন গুছাইয়া কথাও বলতে পারতি না। আর এখন দেখি মুখে কথার খই ফোটে। বুদ্ধিমান মানুষও কখন বলদ হয় জানোস ?’

‘কখন ?’

‘যখন তার পকেটে টাকা না থাকে। আর টাকা থাকলে বলদও বুদ্ধিমান হইয়া যায়। তুই তো মাশাল্লাহ কয়েকদিনের মধ্যেই কী সোন্দর গোছাইয়া কথা বলা শিখ্যা গেছস। ঘটনা কী ? গোপন মাত্তা-মুত্তা কিছু পাইছস নাকি ?’

🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷

এ অঞ্চলে মাত্তা বলতে লোকে গুপ্তধন বোঝে। ফজুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধ্বক করে উঠল। সে বলল, ‘মাত্তা পাইলে কি আর এই ঘরে থাকি কাকু ? খাইয়া না-খাইয়া যে কষ্ট করতেছি, এইটা কোনো মানুষ করে ? তাও তো ওই জমিগুলার আশাতেই মুখ বুইজা সব সহ্য করতেছি।’

আব্দুল ফকির অবশ্য এই বিষয়ে আর কথা বললেন না। তিনি ফজুর সঙ্গে অন্যান্য কথা শেষে নৌকায় উঠলেন। আর কিছুক্ষণ বাদেই ফজরের আজান হবে। তার আগেই তাকে ফতেহপুর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে খবরটা দিলেন মসজিদের ইমাম হুজুর নুরুজ্জমান। তিনি খালের ঘাটে ওজু করতে গিয়ে জুলফিকারকে দেখতে পেলেন। সে নাওয়ের গলুইয়ে বসে আব্দুল ফকিরের জন্য ওজুর পানি তুলছিল। এত রাতে নৌকার শব্দ পেয়ে নুরুজ্জামান হুজুর হারিকেন তুলে ধরলেন। আর তখনই জুলফিকারকে দেখতে পেলেন তিনি। ফজরের আজানের সাথে সাথেই মসজিদে এসে হাজির হলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তাকে দেখে নির্দোষভাবেই কথাটা বললেন ইমাম সাহেব, ‘আবারও কাউরে সাপে কাটছে নি খাঁ সাব ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ প্রশ্নটা শুনে একটু অবাক হলেন, ‘কই ? কারে সাপে কাটছে ?’

‘না মানে খালের ঘাটে গেছিলাম অজু করতে। হঠাৎ দেখি একখান নাও। এতো রাইতে নাও দেইখা জিগাইলাম, কে যায় ? কিন্তু কেউ জবাব দিলো না। তারপর দেখি আব্দুল ফইরের সাগরেদ জুলফিকার। ফইরসাবেও মনে হয় নাওয়ের ভিতরে আছিলো। তাই ভাবলাম, ফতেহপুরে আবারও কাউরে সাপে কাটলো নাকি ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বাকিটা সময় আর কথা বললেন না। ভয়ংকর রাগে, ক্রোধে তার শরীর ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন। নামাজ শেষে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন।

কঠিন মুহূর্তে রাগ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে কার্যকরী কিছু নেই।

কিন্তু তার রাগ কমল না। বরং বাড়ল।

এই আশঙ্কাটাই তিনি করেছিলেন।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে ফজু সেই হারানো গয়নার কলসি খুঁজে পেয়েছে। আর পেয়েই কাজে নেমে গেছে সে। এখন বাপ-দাদার হারানো সম্পত্তি ফিরে পেতে চাইছে। আর এজন্য জোট বেঁধেছে আব্দুল ফকিরের সঙ্গে। বিভিন্ন সময়ে আব্দুল ফকিরের সঙ্গে খাঁ বাড়ির নানা সংঘাত হয়েছে। তার বেশির ভাগই এখনো অমীমাংসিত। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ইচ্ছে করেই আর সেসব বাড়ান নি। ক্ষেত্রবিশেষ হয়তো পরাজয়ও মেনে নিয়েছেন।

এটা স্বীকার করতেও দ্বিধা নেই যে, আব্দুল ফকিরের মতো ধূর্ত, ধুরন্ধর মানুষকে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বেশ খানিকটা সমীহই করেন।

ঘটনায় ফজু বা অন্য কেউ থাকলেও সমস্যা ছিল না। সমস্যা হয়েছে আব্দুল ফকির থাকায়। তিনি কঠিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করেন। কিন্তু কখনো ধরা দেন না যে তিনি খেলছেন। এতে প্রতিপক্ষ ভুল করে। আর এই সুযোগে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে ফেলেন তিনি।

বাড়িতে ঢুকতেই নয়নের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল তৈয়ব উদ্দিন খাঁর। ছেলেটার গায়ের রং ময়লা হয়ে গেছে। বেশ খানিকটা শুকিয়েছেও সে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে ঘর থেকে খুব একটা বের হয় নি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নয়নকে নিয়েও চিন্তিত। তিনি চান যত দ্রুত সম্ভব সে ঢাকায় ফিরে যাক। নানাজানের মুখোমুখি পড়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল নয়ন। তারপর বলল, ‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে নানাজান।’

‘নাস্তা পানি কিছু খাইছো ?’ নরম গলায় বললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।

‘নাহ। আমি সকালে তেমন কিছু খাই না।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হাসলেন, ‘শোনো, সকালে খাইতে হইবো রাজার মতন। দুপুরে প্রজার মতন। আর রাইতে খাইতে হইব ফইরের মতন। অল্প। এইগুলান ছোটবেলা থিকা শুইনা আসতেছি। কিন্তু তোমাগো নিয়মের তো কিছু বুঝি না। এখন যাও, নাস্তা করো। রাতে কথা বলবো।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মুখে একটা নরম মায়া মায়া হাসি লেগে আছে। এই মানুষটা যে তাকে ভালোবাসে নয়ন সেটা টের পায়।

🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷

রাতে হারিকেনের আলোয় তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মুখোমুখি বসল নয়ন। বলল, ‘আমাকে ঢাকা যেতে হবে। জরুরি। তার আগে আপনার কাছে কিছু বিষয় জানতে চাই নানাজান।’

‘কী বিষয় ?’

‘কিছু কথা আমার জানা দরকার। কিন্তু আপনার যদি মনে হয় এসব নিয়ে আপনি কথা বলতে চান না, তাহলে নাও বলতে পারেন।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তার কাছে কী জানতে চায় নয়ন!

‘এই যে এত বছর ধরে মা এ বাড়িতে আসে না, এমনকি আমাকে বা বাবাকেও কখনো আসতে দিতে চায় না, কেন ?’

‘এতদিন পর এই প্রশ্ন ?’

‘সব প্রশ্ন কি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ হয় নানাজান ?’

‘তা হয় না। কিন্তু এইটা তো তুমি তোমার মায়রেই জিজ্ঞাস করতে পারতা নানাভাই ?’

‘অনেকবার করেছি। কিন্তু মা এসব নিয়ে কখনোই কথা বলতে চায় না।’

‘কেউ যদি কিছু বলতে না চায়, সেইটা না জানাই ভালো।’

‘নানাজান, আমার মা একা থাকা মানুষ। তাকে আমি এমনকি বাবার সঙ্গেও সেভাবে কথা বলতে দেখি নি। হাসতে দেখি নি। তার সবচেয়ে বড় ভালোবাসার মানুষ ছিলেন আপনি। অথচ সেই আপনার সাথেও তার বছরের পর বছর কোনো যোগাযোগ নেই। বিষয়টা অবাক করার মতো না ? তা ছাড়া মেয়ের জন্য আপনের মায়া হয় না ? দেখতে ইচ্ছা হয় না ?’

‘তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মনে আল্লায় মায়া দয়া দেয় নাই। সে মায়া দয়ার মানুষ না।’

নয়ন হঠাৎ রূঢ় গলায় বলল, ‘আপনি জীবনভর বহু সত্য মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন। এই বিষয়টাও আপনাকে কষ্ট দেয় না ?’

‘সত্য লুকাই রাখনের ক্ষমতা আল্লাহপাক কাউরে দেন নাই। সত্যের দায়িত্ব আল্লাহপাকের নিজের। তিনি একদিন না একদিন সত্য প্রকাশ করেনই।’

‘দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকা সত্য বের হয়ে এলে তা মিথ্যার চেয়েও খারাপ হয় নানাজান।’

‘দুনিয়ার সব মানুষের খারাপ ভালো বোঝার ধরন এক না নানাভাই। একজনের কাছে যা খারাপ, আরেকজনের কাছে তা ভালো। তো কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এইটা সকলে বোঝে না।’ সামান্য চুপ থেকে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘তুমি এইবার গ্রামে আসছ ক্যান ? আছমার মৃত্যুর বিষয়ে কি কিছু সন্দেহ করো ?’

নয়ন সাথে সাথে জবাব দিল না। খানিক চুপ করে কী ভাবল। তারপর বলল, ‘আব্দুল ফকির সম্পর্কে আপনার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না নানাজান। কিন্তু আপনি তার সম্পর্কে একটা কথাও আমাকে বলেন নি। আপনি কি আব্দুল ফকিরকে ভয় পান ? আপনি কি জানেন, আছমা কেন মারা গেছে ?’

‘জানি।’

‘কীভাবে জানেন ? এই কথা তো কেউ জানে না। আছমার মৃত্যুর পর তার লাশ নিয়ে এসেছিলেন বাবা। আমার পরীক্ষার কারণে আমিও আসতে পারি নি। তাহলে আপনি কী করে জানলেন?'

‘অনুমান করেছি।’

‘এত বড় একটা অস্বাভাবিক ঘটনা কি কারও পক্ষে এমনি এমনি অনুমান করা সম্ভব নানাজান ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ জবাব দিলেন না। নয়ন বলল, ‘আমি এই বিষয়টাই আপনার কাছে জানতে চাইছি। আব্দুল ফকির নিশ্চয়ই এর আগেও এমন কাজ করেছে ? আর সেসবও আপনি জানেন। না জানলে এত সহজে আপনার অনুমান করতে পারার কথা না। কিন্তু কিসের ভয়ে আপনি তাকে কিছু বলছেন না ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ধীরে মাথার টুপি খুলে বিছানার পাশে ভাঁজ করে রাখলেন। তারপর এস্কান্দারকে ডেকে পান খেতে চাইলেন। নয়ন নানার দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটাকে তার এত অদ্ভুত লাগছে! এস্কান্দার পান দিয়ে যেতে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সময় নিয়ে সেই পান নিজের হাতেই বানালেন। তারপর নয়নের দিকে তুলে ধরে বললেন, ‘খাইয়া দেখো। মজা পাইবা।’

নয়ন পান নিল না। সে উত্তেজিত গলায় বলল, ‘আপনি কি জানেন নানাজান, আছমার ঘটনায় আমরা কত বড় বিপদ থেকে বেঁচেছি ? সে আমাদের বাসায় কাজ করত। নানিজান তারে চার-পাঁচ বছর আগে আমাদের বাসায় কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। মা রাজি হয় নি। তারপরও মায়ের কাজকর্মে কষ্ট হয় বলে পাঠালেন। সেই মেয়ে কিছুদিন আগে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করল। ঢাকায় এভাবে কোনো কাজের মেয়ে আত্মহত্যা করলেই পুলিশ ধরে নেয় এর পেছনে খারাপ কোনো ঘটনা রয়েছে। ওই বাড়িতে আমি, বাবা দুই দুইজন পুরুষমানুষ থাকি। আছমা পনের-ষোল বছরের মেয়ে। সে যে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে মারা গেছে, পুলিশ যদি এই ঘটনা জানত, তাহলে আমরা কত বড় বিপদে পড়তে পারতাম আপনি জানেন ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ জবাব দিলেন না। নয়ন নানার কাছাকাছি মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে মৃত্যুর সময় মেয়েটা গর্ভবতী ছিল নানাজান। আর এই কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে। আমি যদি আগেভাগেই ঘটনা না জানতাম, তাহলে আমাদের পরিবারের ভেতরই কী ভয়াবহ অবস্থা হতো, আপনি বুঝতে পারছেন ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ পান চিবুচ্ছেন। নয়ন নানার এমন নির্লিপ্ততা দেখে ভারি অবাক হলো। সে বলল, ‘আত্মহত্যা করার কিছুদিন আগে মেয়েটা গ্রামে বেড়াতে এসেছিল। তখন তাকে সাপে কেঁটেছিল। তার সাপের বিষ নামাতে গিয়েছিলেন আব্দুল ফকির। এই কথা সত্য না ?’

‘হুম। সত্য।'

‘আব্দুল ফকির বললেন আছমাকে ভয়ংকর বিষধর কোনো সাপে কেঁটেছে। এই সাপে কাঁটা রোগী সাধারণত বাঁচে না। কিন্তু তিনি রোগীকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে আছমাকে নিয়ে তাকে টানা তিন দিন তিন রাত আলাদা একটা ঘরে থাকতে হবে। সেই ঘরের চারপাশে কলাগাছ পুঁতে ঢোল বাদ্য বাজাতে হবে। ধূপের ঘন ধোঁয়া দিতে হবে। এমন আরও অনেক কিছু। কিন্তু উনি আসলে এই তিন দিন বিষ নামানোর কথা বলে মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছেন। আমার ধারণা, আছমাকে বিষধর কোনো সাপে কাটে নি। কেটেছে নির্বিষ কোনো সাপেই। কিন্তু সে আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার পরিবারের অবস্থাও তখন দিশেহারা। ফলে আব্দুল ফকিরের কথা শোনা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায়ও ছিল না। আর এই সুযোগেই সে আছমাকে ধর্ষণ করেছে। তার আগে চিকিৎসার কথা বলে নেশাদ্রব্য খাইয়েছে। আমার ধারণা এই কাজ সে আগেও করেছে।’

‘এইসব তোমারে কে বলল ? আমি তো এগুলার কিছুই জানি না।’

‘আপনি সবই জানেন নানাজান। এই অঞ্চলে একটা গাছের পাতা পড়লেও সেই সংবাদ সবার আগে আপনার কানে আসে। কী, আসে না ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কথা বললেন না। নয়ন বলল, ‘আছমা মেয়েটাকে খুব স্নেহ করতাম আমি। মাঝেমধ্যে বাসায়ই পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করতাম। সেবার ওই সাপে কাটার ঘটনার পর সে ঢাকায় ফিরতেই তাকে কেমন অসংলগ্ন, অস্বাভাবিক মনে হতে থাকে আমার। আপনি জানেন, আমি ডাক্তার। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কী বলব ? একদিন জিজ্ঞেস করলাম। প্রথমে সে কিছুই বলল না। তারপর হঠাৎ কেঁদে ফেলল। বলল, ভাইজান, আপনে তো ডাক্তার মানুষ, আমারে বাঁচান। আমার তখন ফাইনাল পরীক্ষা। তা ছাড়া দুম করে একটা মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এইসব টেস্ট ফেস্ট করানোরও নানান সমস্যা। ভাবছিলাম পরীক্ষা শেষ হলেই কোনো ক্লিনিকে নিয়ে যাব। কিন্তু তার আগেই...।’

কথা শেষ করার আগেই নয়নের গলার স্বর কেমন ভারী হয়ে উঠল। সে খানিক থেমে বলল, ‘এখনো ওর মুখটা আমার চোখের সামনে ভাসে নানাজান। আমি ঘুমাতে পারি না। আরেকটা কথা, আমরা কিন্তু ভয়াবহ বিপদে পড়ে যেতে পারতাম। প্রথমত, এটা সুইসাইড কেস। পুলিশ জানলে খুব বাজে ট্রিট করত আমাদের। দ্বিতীয়ত, তারপর যদি দেখা যেত যে মেয়েটা প্রেগন্যান্ট, তাহলে কী হতো ভেবেছেন ?’

নয়ন থামলেও তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কথা বললেন না।

‘ওই লোকটা একটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ নানাজান। তার বিষয়ে অনেক খোঁজ-খবর আমি নিয়েছি। আগে ভাবতাম, এইসব বিকৃত মানুষ বোধহয় কেবল গল্প, উপন্যাস, সিনেমাই থাকে। কিন্তু এমন একটা অজপাড়াগাঁয়ে, এমন নিরীহদর্শন একজন মানুষ কীভাবে এমন ভয়াবহ হতে পারে ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এতক্ষণ একটা কথাও বলেন নি। তবে এবার বিড়বিড় করে বললেন, ‘তুমি এইসব নিয়া মাথা ঘামাইয়ো না ভাই। তোমরা শহরের মানুষ মনে করো, গ্রামের মানুষ অতি সহজ সরল। কিচ্ছু বোঝে না। কথাটা ঠিক না। গ্রামের মানুষের মতন জটিল মানুষ দুনিয়ায় নাই। এইজন্যই তোমারে বলি, তুমি যখন তখন যেখানে সেখানে ঘুইরা বেড়াইয়োনা। তোমার নানার এখন আর আগের সেই শক্তিটা নাই যে তোমারে দেইখা রাখব। আর ক্ষতি একটা হইয়া গেলে, সেই ক্ষতিও আর পোষান যায় না।’

‘এখন না হয় আপনার শক্তি নেই। কিন্তু যখন ছিল, তখন আপনি কী করেছেন ? আর চাইলে এখনো সম্ভব নানাজান। কিন্তু আপনি কি তাকে ভয় পান ? আব্দুল ফকিরের এমন ঘটনা কি এর আগে আপনি জানতেন না ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কেশে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি কিছু করি নাই, কথাটা ঠিক না।’

‘কী করেছেন ?’ 🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

‘অনেককিছুই।’ বলে সামান্য থামলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘প্রায় বছর পঁচিশেক আগে উত্তরপাড়ায় একই ঘটনা ঘটছিল। কিন্তু সেই মেয়ের পরিবারও চায় নাই ঘটনা জানাজানি হোক। জানাজানি হইলে মেয়ের বিয়া দিতে অসুবিধা। কিন্তু আমি ঘটনার একটা দফারফা করতে চাইছিলাম। এইরকম ঘটনা সে আরও ঘটাইছে। তো এইজন্য আমি চাইছিলাম তারে চিরতরে বিনাশ কইরা ফেলতে। তখন চর লইয়া দিনেদুপরে মার্ডার হয়। কেউ গ্রাহ্য করে না। তারপরও, মাইয়ার বাপরে অনেক বুঝাই সুঝাইয়া গাঙপার বটতলায় নিয়া বসলাম। সঙ্গে এলাকার কিছু গণ্যমান্য লোক। যাতে পরে কোনো ঝামেলা না হয়। সে সর্বসম্মুখে অভিযোগ করার পর আমি সেই রাইতেই হায়দার আলী আর দলবল নিয়া গেলাম। ঘুটঘইটা আন্ধার রাইত। নামলো বৃষ্টি। হোসনাবাদের একজন খবর দিলো আব্দুল ফইর ঘুমাইছে বাইরের ঘরে। এর চাইতে ভালো সুযোগ আর হয় না।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ থামলেন। নয়ন তাকিয়ে আছে নানার মুখের দিকে। এই প্রথম তার মনে হলো তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মুখে একটা স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। এই ছাপটা সে এর আগে কখনোই দেখে নি। ভারি অবাক হলো নয়ন।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘আব্দুল ফইর ঘুমাই ছিল চৌকির উপর। আমার মনে আছে, আমি স্পষ্ট দেখছি। হায়দার তিন-চারজনরে নিয়া গেল। কেউ পাও চাইপ্যা ধরলো, কেউ মুখ। তারপর সেই অন্ধকারেই হায়দার আলী এক কোপে তার কল্লা নামাই দিলো। সেই কল্লা বস্তায় ভইরা নিয়া আসলাম ফতেহপুর। মাইয়ার বাপরে দিবো। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কী জিনিস, এইটা মাইনষের জানন দরকার!’

যেন গলা শুকিয়ে আসছে এমন ভঙ্গিতে বার দুই ঢোক গিললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তার চোখে ভয়ের ছায়া। নয়ন ভারি অবাক হলো। তার সামনের এই মহীরুহ মানুষটাও যে কোনো কারণে এমন ভয়ার্ত হতে পারেন, এটা তার কস্মিনকালেও মনে হয় নি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ঘোরগ্রস্ত গলায় বললেন, ‘কিন্তু দিনের আলোয় বস্তা থিকা মাথা বাইর কইরা দেখি সেই মাথা আব্দুল ফইরের না, বজলু ব্যাপারীর। অথচ খুন করনের সময় আমি নিজ চৌক্ষে দেখছি ওইটা আব্দুল ফইর।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মুখ ভয়ার্ত, ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। নয়ন বিস্মিত হলেও তা প্রকাশ করল না। সে ডান হাত বাড়িয়ে নানার হাত ধরল। শক্ত পাথরের মতন এই মানুষটার জন্য তার হঠাৎ মায়া হতে লাগল।

সে বলল, ‘নানাজান, আপনার কী ধারণা ? আব্দুল ফকির কোনো জাদুমন্ত্র কিংবা অলৌকিক ক্ষমতার বলে ওই কাণ্ড ঘটিয়েছে ? আপনার চোখে ধুলো দিয়ে নিজের বদলে বজলু ব্যাপারীকে খুন করিয়েছে ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ জবাব দিলেন না।

নয়ন বলল, ‘এই কথা আপনি বিশ্বাস করেন নানাজান ? আসল ঘটনা শোনেন। ওই রাতে বজলু ব্যাপারী গিয়েছিলেন আব্দুল ফকিরের বাড়ি। রাতে আব্দুল ফকিরের সঙ্গে তিনিও ওই বাইরের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় আব্দুল ফকির চলে যান ভেতরের ঘরে। আর বাইরে থাকেন বজলু ব্যাপারী একা। ফলে অন্ধকারে আপনারা আব্দুল ফকির ভেবে খুন করে ফেলেন বজলু ব্যাপারীকে। এইখানে জাদুমন্ত্রের কোনো ব্যাপার নাই নানাজান।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘এই ঘটনা আমি জানি। কিন্তু ঘটনার আড়ালেও ঘটনা থাকে। তুমিই বলো, ওইদিনই... ওই রাইতেই বজলু ব্যাপারী ক্যান ওইখানে যাইবো ? আর আব্দুল ফইরই বা একদম সময়মতন ক্যান ভেতর বাড়ি চইলা যাইবো ? ক্যান ? বিষয় যত সহজ ভাবো, তত সহজ না। দুনিয়ায় সাদা চোখে দেখা যায় না, এমন বহু জিনিস আছে। আব্দুল ফইর লোক সুবিধার না। সে কঠিন মানুষ। তার খারাপ ক্ষমতা আছে।’

নয়ন মৃদু হাসল, ‘এই যুগেও আপনি এসব কথা বিশ্বাস করেন নানাজান ? আর এসব কারণে তাকে ভয়ও পান ?’

‘আমার বয়স তো কম হয় নাই নানাভাই। কমও দেখি নাই জীবনে। এইজন্য বলতেছি, এইসব জিনিস অবিশ্বাস কইরো না। এই জীবনে জাদুটোনা, কুফরি-কালাম, বাণ মাইরা মানুষ খুন করাও কম দেখি নাই।’

‘বাণ মেরে খুন করার বিষয়টা কী ?’

‘এগুলা নানাভাবে হয়। আব্দুল ফইরের মতো কুফরি কালাম বা জাদুটোনা জানা কারও থিকা যদি তুমি তাবিজ লেইখা আনো, আর সেই তাবিজ যদি তার কথামতো ব্যবহার করো, তাইলেই ঘটনা শ্যাষ।’

‘কী ঘটনা ?’

‘ধরো সে ওই তাবিজ কোনো গাছের ডালে ঝুলাই রাখতে বলল, দেখবা সাত দিনের মধ্যে সেই গাছ শুকাইয়া মরব। আর সঙ্গে তুমি যার নাম কইরা তাবিজ আনছো সেও মরব।’

নয়ন হঠাৎ হাসল, ‘ধরেন, আমি যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামে তাবিজ করে এরকম গাছে ঝুলিয়ে রাখি, তাহলে সেও কি সাত দিনের মধ্যে মারা যাবে ? নাকি দূরের দেশ বলে সময় বেশি লাগবে ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নয়নের কথা শুনে বেশ আহত হলেন। ছেলেটি তার বিশ্বাস নিয়ে তামাশা করছে। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘সবকিছু নিয়া তামাশা করা ভালো না। আব্দুল ফইররে যে আমি ওই একবারই মারনের চেষ্টা করছি, তা কিন্তু না। এরপর আরও আরেকবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পারি নাই। সেইবারও অল্পের জন্য রক্ষা পাইছে। তবে রামদায়ের কোপে তার পায়ের পাতার অর্ধেক নাই হইয়া গেছে। এই যে সে বারবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থিকা রক্ষা পায়, এইগুলান কোনো স্বাভাবিক ঘটনা না নানাভাই। আমি ফরিদপুরের বড় পীর সাবের কাছেও গেছিলাম। উনিও আমারে বলছেন, আমি যেন আর আব্দুল ফইরের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা না করি। সেই থিকা বাদ দিছি।’

‘হুম।’ বলে গম্ভীর হয়ে রইল নয়ন। তারপর বলল, ‘আপনি কি আমাকে আর কিছু বলতে চান নানাজান ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে চোখ তুলে তাকালেন।

নয়ন হাসল, ‘আমি কিন্তু আব্দুল ফকিরকে এত সহজে ছাড়ছি না নানাজান। আমি আবার আসব। আর আপনার কাছে আমার আরও অনেক কিছু জানার আছে।’

‘দুনিয়ার সবকিছু জানতে হয় না নয়ন। কিছু জিনিস না জাননই ভালো। একটা কথা মনে রাখবা, যত কম জানবা তত আনন্দে থাকবা। কম জাননের চাইতে আনন্দ কিছুতে নাই। বেশি জানায় কষ্ট বেশি। বিপদ বেশি। মহাবিপদ! '

🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷🇦🇷

নয়ন কিছু একটা বলতে গিয়েও আবার থেমে গেল।

তার হঠাৎ মনে হলো, তৈয়ব উদ্দিন খাঁর শেষ কথাটা মিথ্যে না।

কম জানা আসলেই আনন্দের। বেশি জানা বিপজ্জনক!

পারুলের সঙ্গে নয়নের দ্বিতীয়বার দেখা হলো কাকতালীয়ভাবে। নয়ন ঢাকা ফিরে যাবে। ফতেহপুর থেকে সরাসরি ঢাকায় যাওয়ার উপায়টা বেশ কঠিন। ট্রলারে কয়েক ঘণ্টার যাত্রা শেষে পৌঁছাতে হয় রায়গঞ্জে। সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকা। কিন্তু নয়নের ভাগ্য খারাপ। সে রায়গঞ্জ পৌঁছে দেখে লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এখন উপায় ?

মনির অবশ্য আবার ফতেহপুর ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। কিন্তু নয়নের তাতে সায় নেই। এই এতটা পথ ট্রলারের ইঞ্জিনের বিদঘুটে শব্দ সয়ে আবার যাওয়া-আসা করতে চায় না সে। তারচেয়ে বরং এখানেই কোথাও রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পর থাকার যে ব্যবস্থা হলো তা তথৈবচ। লম্বা স্কুলঘরের মতো একখানা ঘর। তাতে পাশাপাশি প্রায় আট-দশখানা সরু চৌকি। সেখান থেকে দুখানা চৌকি ভাড়া করল তারা। কিন্তু ছারপোকার যন্ত্রণায় রাত কাটল প্রায় নির্ঘুম।

তখন সকাল দশটার মতো বাজে। নয়ন রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছে। চারপাশে তুমুল কোলাহল। বন্দরে ছোট-বড় নানান জলযান এসে ভিড়ছে। তাতে হরেক রকম পণ্য আসছে-যাচ্ছে। মুটেরা মালামাল মাথায় করে ছুটছে। তিন চাকার ভ্যান গাড়ি ঘটাং ঘটাং শব্দে বেল বাজিয়ে সাই করে চলে যাচ্ছে গা ঘেঁষে। এই মুহূর্তে একটা মেয়েলি কণ্ঠ তাকে ডাকল, ‘এই, এইই।’

নয়ন প্রথমে খেয়াল করে নি। কারণ মেয়েটা তাকে নাম ধরে ডাকছিল না। কিন্তু রাস্তা পার হয়ে এপারে চলে এল মেয়েটি। তারপর নয়নের সামনে এসে বলল, ‘আপনে কি কানে কম শোনেন ? কতক্ষণ ধরে ডাকতেছি ?’

নয়নের খানিক সময় লাগল মেয়েটিকে চিনতে। আব্দুল ফকিরের মেয়ে পারুল! সে হেসে বলল, ‘সরি। আপনি তো আমার নাম ধরে ডাকেন নি। এইজন্য বুঝতে পারি নি।’

‘আপনি এইখানে কী করেন ?’

নয়ন ঘটনা খুলে বলল। শুনে হেসে কুটিকুটি হলো পারুল। বলল, ‘দেইখেন আইজও আবার লঞ্চ মিস কইরেন না। আমরা এইখানে ক্যান আসছি জানেন ?’

‘ক্যান ?’

‘তাবারন খালারে ডাক্তার দেখাইতে। তার অবস্থা তো ভালো না। পোড়া জায়গায় ঘা হইছে।’

‘জায়গাটা আপনারা ঠিকমতো পরিষ্কার করেন নি, তাই না ? আর আমি যে কিছু মলম কিনে এনে দিতে বলেছিলাম, দিয়েছিলেন ?’

‘কীভাবে দিব ? আব্বায়, জুলফিকার ভাই—কেউ তো বাড়িতে ছিল না। আর ওই দিকে তো ওষুধের দোকানপাটও নাই। তাই এইখানে আসছি। আমার বান্ধবী লতা এইখানে তার নানাবাড়ি থাইকা কলেজে পড়ে। তার কাছেই উঠছি। ডাক্তার বলছে দিন কয়েক থাকতে। ওষুধপত্র দিছে। আর বলছে কয়টা দিন থাইকা ভালো-মন্দ দেখাই যাইতে। একবার চইলা গেলে তো আর সহজে আসতে পারবো না। এইজন্য থাইকাই গেলাম।’

পারুলের কথায় একধরনের সরলতা আছে। বিষয়টা নয়নকে মুগ্ধ করল। সে বলল, ‘বাহ, আপনি তো খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বাচ্চাদের মতো।’

পারুল লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি তো শুদ্ধ কইরা কথা বলতে পারি না। আপনের তো শুদ্ধ কথা পছন্দ।’

‘কে বলল আমার শুদ্ধ কথা পছন্দ ?’

পারুল থতমত খেয়ে গেলো। সে যে নয়নকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে, সেই স্বপ্নে নয় তাকে এই কথা বলেছে- তাতো আর তাকে বলা যায় না! পারুল নিজেকে সামলে নিলো। বলল, 'শহরের মানুষেরা তো শুদ্ধ কথাই পছন্দ করবে।’

‘তাহলে গ্রামের মানুষেরও তো তাদের গ্রামীণ কথাটাই পছন্দ করার কথা ?’

‘আমার শুদ্ধ কথা বলনের খুব শখ। টাউনে যাওনেরও।’

‘সময় হলে তুমিও শহরে যাবে পারুল। অনেক সময় আছে।’

পারুল প্রথমে তার কানকে বিশ্বাস করতে পারে নি যে নয়ন তাকে হঠাৎ তুমি করে বলে ফেলেছে। সেদিন রাতে স্বপ্নের ভেতরও নয়ন তাকে তুমি করে ডেকেছিল। আনন্দে পারুলের মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কী করবে এখন সে ?

আচ্ছা, নয়ন তাকে হুট করে তুমি করে বলে ফেলল কেন ?

এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই তো ? নাকি হঠাৎ ভুলে বলে ফেলেছে ?

পারুল বলল, ‘আপনে আজই চইলা যাবেন ?’

‘হ্যাঁ।’

‘আবার কবে আসবেন ?’

‘এখন তো বলতে পারছি না। তবে আসব। এই জায়গাটা আমার ভীষণ ভালো লেগে গেছে। মানুষগুলোও। ফলে আবার আসতেই হবে।’

‘আপনে কিন্তু আসবেনই। আপনের সাথে আমার অনেক কথা আছে।’

‘কী কথা ?’ অবাক গলায় বলল নয়ন।

‘সেইটা আবার আসলে বলবো। আপনেগো লঞ্চ কখন ছাড়বো ?’

নয়ন সময়টা বলল। পারুল যেমন এসেছিল তেমনই চলে গেল। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো বিকেলে লঞ্চঘাট পৌঁছাতেই পন্টুনে ওঠার সিঁড়ির কাছে পারুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল নয়ন। তার সঙ্গে লতা। পারুলের হাতে একগাদা কাগজ। সে নয়নকে দেখেই বলল, ‘আপনের জন্য সেই কখন থিকা দাঁড়াই আছি। আর আপনে এতক্ষণে আসলেন ?’

নয়ন হাসল।

পারুল বলল, ‘গ্রামগঞ্জের ডাক্তার কী না কী বোঝে, এইজন্য তার দেওয়া সব ওষুধপাতি আর কাগজপত্র আপনেরে দেখানোর জন্য নিয়া আসছি।’

নয়ন সব দেখে বলল, ‘ঠিকই আছে। উনি ভালো ডাক্তার। আশা করি আর সমস্যা হবে না।’

পারুল কী ভেবে খানিক চুপ করে রইল। তারপর লতাকে দেখিয়ে বলল, ‘আমার বান্ধবীর একজন মানুষ আছে, তার নাম আশিক। সেও কিন্তু ঢাকা থাকে।’

নয়ন মৃদু হেসে বলল, ‘তাই নাকি ?’

লতা জবাব দিল না। লজ্জায় আরক্ত হয়ে গেল। তবে পারুল স্বভাবসুলভ প্রগলভ হয়ে উঠল। বলল, ‘আশিক ভাই মাঝেমধ্যেই ঢাকা থিকা এই লঞ্চে কইরা আসে। সারা দিন থাকে। তারপর আবার সন্ধ্যাবেলা চইলা যায়। লতা বলছে তারা নাকি আগেই লুকাইয়া বিয়া কইরা ফালাইবো। দুইজনের নাকি আলাদা থাকতে কষ্ট হয়।’

লতা লজ্জায় গুটিয়ে যাওয়া ভঙ্গিতে পারুলকে আলতো আঘাত করল। পারুল বলল, ‘আপনে রাইতে লঞ্চে কী খাইবেন ?’

নয়ন এই বিষয়টা ভাবে নি। তার ঢাকায় পৌঁছাতে ভোর হয়ে যাবে। অবশ্য এ নিয়ে অত ভাবনারও কিছু নেই। সে বলল, ‘ও আমি ম্যানেজ করে নেব।’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

পারুল হঠাৎ তার হাতের ব্যাগ থেকে একখানা টিফিন ক্যারিয়ার বের করে বলল, ‘লঞ্চের খাওন ভালো না। কী না কী দেয়। শেষে পেট খারাপ হইবো। এই বাটির মইধ্যে মুরগির মাংস আর ভাত আছে। আমি নিজে রানছি। ভালো না হইলেও কিন্তু পরের বার আইসা বলতে হইবো যে ভালো হইছে।’

নয়ন এবার খুব বিব্রত বোধ করছে। তবে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পারুল বলল, ‘এই নেন পানির বোতল। লঞ্চের পানিও খাইবেন না। এইটা টিউবওয়েলের পানি। এইটাই খাইবেন।’

‘পারুল... এসব কেন করতে গেলে তুমি ?’ নয়ন বিব্রত ভঙ্গিতে বলল।

পারুল জবাব না দিলেও কেমন সংকুচিত হয়ে গেল নয়ন। ‘তোমার এই টিফিন ক্যারিয়ার আমি ফেরত দেব কী করে ? তা ছাড়া এগুলো বয়ে নিতে আমার কষ্টই হবে।’

পারুল চট করে বলল, ‘আপন মানুষের কষ্ট কষ্ট মনে হয় না। আর বাটি ফেরত দিতে চাইলে আমার জন্য ঢাকা থিকা কিছু নিয়া আইসেন।’

‘তোমার সাথে তো আমার আর নাও দেখা হতে পারে পারুল ?’

পারুল কী বলতে গিয়ে আচমকা থমকে গেল। তার চোখ ছলছলে। সে কি কেঁদে ফেলবে ? বিষয়টা নয়নের চোখ এড়াল না। তার সামনে দাঁড়ানো এই সহজ-সরল, প্রগলভ, গ্রামীণ মেয়েটাকে দেখে হঠাৎ মায়া লেগে গেল তার। সে সামান্য ঝুঁকে আলতো করে পারুলের মাথায় হাত রেখে বলল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা, আমি নিচ্ছি। তুমি ভালো থেকো। আর সন্ধে হয়ে এসেছে। তোমরা বাড়ি যাও। আমাদেরও উঠতে হবে।’

পারুল যেন কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু পারল না। নয়ন সিঁড়ি বেয়ে লঞ্চে উঠে গেল। পারুল দাঁড়িয়েই রইল। লতা বার কয়েক তাকে তাড়া দিল। কিন্তু লাভ হলো না। বরং সামান্য সরে গিয়ে একটা ল্যাম্পপোষ্টের নিচে গিয়ে দাঁড়াল সে। ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে চারধারে। নয়নকে লঞ্চে তুলে দিয়ে চলে গেল মনির। নয়ন একা দাঁড়িয়ে রইল লঞ্চের রেলিংয়ে।

সন্ধ্যা যেন আকাশ থেকে ঝপ করে মন খারাপের একটা চাদর নামিয়ে ঢেকে দিল পৃথিবী।

বহু চেষ্টা করেও সেই চাদরটা সরাতে পারল না নয়ন।

পুরোপুরি অন্ধকার নামতেই বিকট শব্দে ভেঁপু বাজাল লঞ্চ। তারপর ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। কিন্তু পন্টুনের বাঁ পাশে ল্যাম্পপোস্টটার নিচে চোখ পড়তেই থমকে গেল সে।

পারুল এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে!

লঞ্চ দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার আগ অবধি সে দাঁড়িয়েই রইল। মেয়েটার জন্য হঠাৎ অদ্ভুত এক মায়া হতে লাগল নয়নের।

কিন্তু নয়নের ধারণা সেই মায়া স্পর্শ করার ক্ষমতা পারুলের নেই।

পারুল বাড়ি ফিরল পরদিন।

কিন্তু সে যেন অন্য এক মানুষ। শান্ত, চুপচাপ। খাওয়া নেই, ঘুম নেই। কারও সঙ্গে ঠিকঠাক কথা নেই। বিষয়টা যে আব্দুল ফকিরের চোখে পড়ে নি, তা নয়। কিন্তু তিনি আজকাল ভীষণ ব্যস্ত। দিন কয়েক বাদে লতাও এল রায়গঞ্জ থেকে। এবং স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই সে ছুটে এল পারুলদের বাড়িতে। কিন্তু পারুল তাকে দেখে কোনো উচ্ছ্বাস দেখাল না। মৃদু হাসল কেবল। তারপর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পুকুরের স্থির পানির দিকে। বিষয়টাতে ভীষণ অবাক হলো লতা। বলল, ‘কিরে, কী হয়েছে তোর ?’

পারুল জবাব দিল না। লতা বলল, ‘ওনার জন্য মন খারাপ ? কিন্তু মন খারাপে কি কিছু হইবো ? এক কাজ করলে কেমন হয় ?’

পারুল তাকাল। লতা বলল, ‘তোর না শুদ্ধ কথা বলার খুব শখ ? আয় তোরে আমি শিখাই।’

পারুলের চোখেমুখে স্পষ্ট আগ্রহ ফুটে উঠল। কিন্তু তার গাল ভেজা। চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর দাগ। লতা হঠাৎ পারুলকে জড়িয়ে ধরল। তারপর রসিকতার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোরে আমি দুনিয়ার সবকিছু আইনা দিবোরে পারুল। তাও তুই আমার জন্য একবার একটু এমনে কইরা কান। কান না পারুল ?’

কিন্তু পারুল এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। লতা খানিক বিব্রত হলো। সে আদুরে গলায় বলল, ‘অনেক কষ্ট হইতেছে ?’

পারুল জবাব দিল না। লতা তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘তোর ক্যান কষ্ট হয়, আমারে বল তো ? সে কি তোরে কিছু বলছে ?’

পারুল বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আচ্ছা, প্রথম প্রথম তোরও কি এমন লাগতো ?’

‘কেমন ?’

🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

‘এই যে বুকের মইধ্যে কেমন খাঁখাঁ করে। সব সময় মনে হয় খালি খালি লাগে। গলায় কেমন জানি ব্যথা। কিছু খাইতে ইচ্ছা করে না। ঘুমাইতে ইচ্ছা করে না।’

লতা হাসল, ‘হুম। লাগছেই তো।’

‘আচ্ছা, উনি কি টের পাইতেছেন যে ওনার জইন্য আমার এমন লাগতেছে ?’

‘তোর জইন্যওতো কত ছেলে এমনে কান্দে। কষ্ট পায়। বাড়ির সামনে দিন-রাইত ঘুরঘুর করে। কই তাদের কষ্ট তুই টের পাস ?’

পারুল মাথা নাড়ল। পায় না।

লতা বলল, ‘এইটাই দুনিয়া।’

‘তার মানে তার কিচ্ছু হয় না ? আমারটাও সে টের পায় না ?'

'না'।

কিন্তু সে যে ওইদিন আমার মাথায় কী সুন্দর কইরা হাত বুলাই দিলো ? সেইটা কি এমনে এমনেই করছে ?’

লতা হঠাৎ ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলল, ‘না, না। এমনে এমনে করে নাই।’

‘তাইলে ?’ উদগ্রীব হয়ে উঠল পারুল।

‘তোরে দেইখা তার আপন ছোটো বইন মনে হইছে। হা হা হা। এই জইন্য তোর মাথায় হাত বুলাই দিছে। হি হি হি। বড়ভাই বিদায় নেওয়ার সময় যেমনে ছোট ভাই-বইনের মাথায় দোয়া কইরা হাত বুলাই দেয় ওইরকম। হা হা হা।’

লতা হাসছে। হাসতে হাসতে তার শরীর কাঁপছে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে তার হাসি থামাতে পারছে না। কিন্তু পারুল চট করে উঠে পড়ল। তার ভয়ানক মন খারাপ হয়েছে। সে হেঁটে চলে গেল বাড়ির ভেতরে। লতাও তার পেছন পেছন ছুটল।

কিন্তু পারুল আর ফিরেও তাকাল না।

তাবারন অসুস্থ বলে ঘরে আলো দেওয়া হয় নি। পারুল আলো জ্বেলে তাবারনের ঘরের দিকে গেল। তাকে সন্ধ্যার ওষুধ দিতে হবে। কিন্তু দরজার কাছে গিয়েই থমকে গেল সে। নুরুন্নাহার দাঁড়িয়ে আছেন তাবারনের ঘরের দরজার সামনে।

তার হাতে মস্ত রামদা।

নুরুন্নাহার দরজার আঙটা খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু উচ্চতার কারণে নাগাল পাচ্ছে না। পারুল চিৎকার করে ডাকল, ‘মা!’

নুরুন্নাহার খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘সেই তখন থিকা আঙটার শিকলটা খোলার চেষ্টা করতেছি। পারতেছিই না। একটু খুইলা দে তো মা।’

‘শিকল খুইলা তুমি কী করবা ?’

‘তাবারনের দুই রানের মাঝখানে এই দাও দিয়া ফারবো। ফইরসাবে যেন আর ওইখানে যাইতে না পারে।’

‘মা। দাও ফেলাও। এখনই দাও ফেলাও।’

‘ফেলবো না। তাবারনের ঠ্যাং ফারবো। তারপর তার বড়ো বড়ো ওলানগুলান কাটবো। ফইরসাবের মজা শ্যাষ করবো। হি হি হি।’

পারুল মরিয়া ভঙ্গিতে বলল, ‘তুমি দাও ফেলাও। এক্ষনই ফালাও মা। আর তোমার ঘরের দুয়ার খুলছে কেডা ?’

‘রতন।’

‘রতন ?’ কপাল কুঁচকে তাকাল পারুল।

‘হুম। ওর ধারে পানি চাইছিলাম। সে পানি দিতে গেছিলো। এই ফাঁকে তারে ভিতরে আটকাইয়া থুইয়া আমি বাইর হইয়া আসছি।’

‘তুমি আল্লাহরস্তে দাওটা ফেলাও মা। দাও ফেলাইয়া চুপচাপ তোমার ঘরে যাও।’

‘তোর শরম করে না ?’

‘কিসের শরম ?’

‘তোর বাপে এইরকম বিরাট বড় কুজাত। তোর মায়রে পাগল বানাইছে। তারপর অন্য মাগি লইয়া ফূর্তি করে। তোর শরম করে না ওই ব্যাটারে বাপ কইতে ? আমি আগে এই মাগিরে শ্যাষ করবো। তারপর দেখবো তোর বাপের কেমন লাগে। তুই চাস না ?’ বলেই অকস্মাৎ বিকট শব্দে হেসে উঠলেন নুরুন্নাহার। তারপর বললেন, ‘তুই কেডা ? তোরে তো আমি চিনি না। তোর কথা আমি শুনবো ক্যান ? আয়, তুই ধারে আয়। তোরেও একখান কোপ দেই। তুইও দেহি আব্দুল ফইরের পক্ষে কথা কস! ফইরসাবের আপন, কাছের সব মানুষ আমার শত্রু। তুইও। আয়, ধারে আয় ছেমড়ি। ধারে আয়।’

লতা এসে দাঁড়িয়েছে পারুলের পিছনে। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হতভম্ব। পারুল কঠিন গলায় বলল, ‘দাওখান দেও বলতেছি মা। এক্ষণ দেও। না হইলে কিন্তু...’

নুরুন্নাহার হঠাৎ ভয়ানক চেঁচিয়ে উঠলেন। তার সেই চিৎকারে গা হিম হয়ে এল লতা আর পারুলের। কোনো মানুষের গলা থেকে এমন বীভৎস, লোমহর্ষক চিৎকার বের হতে পারে তা অবিশ্বাস্য।

তিনি সেই বিকট চিৎকারের ভেতর থেকেই বললেন, ‘ফেলবো না দাও। দেখি তুই কী করস ? আইজ আমি কাজ শ্যাষ না কইরা যাবো না। দে, দরজাখান খুইলা দে। এক্ষণ খুইলা দে। এক কোপে ঘটনা শ্যাষ করব। এক কোপে'।

🇵🇸🇧🇩🇵🇸🇧🇩

বলেই সজোরে কোপ বসালেন দরজার গায়ে। চৌকাঠসহ পুরো ঘর কেঁপে উঠল। পারুল এবার ঠান্ডা কঠিন গলায় বলল, ‘মা, এই শ্যাষবার বলতেছি, দাওখান ফেলাও। ফেলাইয়া চুপচাপ তোমার ঘরে যাও। শ্যাষবার বলতেছি।’

নুরুন্নাহার সশব্দে দ্বিতীয় কোপ বসালেন দরজার গায়ে। তারপর মাথা ঘুরিয়ে বললেন, ‘না ফালাইলে কী করবি তুই ? কী করবি ?’

পারুল হঠাৎ তার হাতের হারিকেনখানা কাত করল। তারপর হারিকেনের কেরোসিন ঢালতে লাগল নিজের গায়ে। নুরুন্নাহার আচমকা চুপ করে গেলেন। পারুলের জামার সামনের দিকটা কেরোসিনে ভিজে জবজব করছে। সে ঠান্ডা চোখে নুরুন্নাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যদি এক্ষণ দাওখান ফেলাইয়া তোমার ঘরে না যাও, তাইলে আমি আমার গায়ে আগুন দিবো। তোমার সামনে বইসা পুইড়া মরবো।’

লতা রুদ্ধশ্বাস আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কী ঘটবে! তবে নুরুন্নাহার হঠাৎ মাটিতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লেন।

তারপর কাঁদতে লাগলেন উচ্চস্বরে হাউমাউ করে । 🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

বিজ্ঞাপন

সেই রাতে পারুল সারা রাত মায়ের ঘরের সামনে বসে রইল। আব্দুল ফকির রাতে বাড়ি ফিরলেন না। নুরুন্নাহার বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে একটানা কেঁদে চললেন।

সেই কান্না শুনতে শুনতেই পারুলের আচমকা মনে হলো, একটা মানুষ একজীবনে তার চোখে কতোটুকু জল জমা রাখতে পারে!

কতটুকু অশ্রু ঝরলে চোখের জল শেষ হয় মানুষের!

হেমার ধারণা, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে মন খারাপ দূর হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুতেই ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার বাবা-মায়ের বিষয়টা নিয়ে আর মন খারাপও করে থাকতে ভালো লাগছে না। চারপাশে এত এত সমস্যা যে কোনটা রেখে কোনটা সামলাবে তাও বুঝতে পারছে না সে।

সেদিন বাবার কথা শুনে তার জন্য যেমন খারাপ লেগেছে, তেমনি মায়ের কথাগুলোও শুনতে চায় সে।

তা ছাড়া, বাবার এই ডিভোর্সের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে যে অন্য কোনো অনুঘটকও আছে সে বিষয়েও নিশ্চিত সে। এই ব্যাপারটাও তার জানা দরকার।

কে সেই অনুঘটক ?

আজকাল কতকিছুই যে হচ্ছে!

কিছুদিন আগে হেমার খুব কাছের এক বান্ধবীর বাবার গোপন বিয়ের কথা জানাজানি হয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার সেই গোপন স্ত্রীর বয়স প্রায় হেমাদের কাছাকাছি। এই নিয়ে ভয়ংকর সব কাণ্ডকারখানা করল হেমার বান্ধবী। বিষয়টাকে তখন বাড়াবাড়িই মনে হয়েছিল হেমার।

কিন্তু এখন তার বাবাও যদি অমন কিছুই করে থাকে, তাহলে কী করবে সে ?

হেমার হঠাৎ মনে হলো, বাবা-মা তার সন্তানদের কাছে কেবল বাবা-মা হয়েই থাকেন। তাদের যে আলাদা করে একজন নারী বা পুরুষ সত্তাও রয়েছে, সেটি তাদের সন্তানরা যেন কখনোই ভাবতে, অনুভব করতে কিংবা বুঝতে চায় না।

ফলে অন্যের বাবা-মায়ের ডিভোর্স, বিয়ে, পরকীয়া, এমনকি অস্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কের ঘটনাকেও তারা যতটা সহজে নিতে পারে, নিজের বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে তা কিছুতেই পারে না।

বাবা বাসা ছেড়ে গেছেন প্রায় কুড়ি দিন। তার ফোনও বন্ধ। কোথায় আছেন সে বিষয়েও হেমার স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এরমধ্যে অবশ্য মায়ের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু লাভ হয় নি। রেণু সাড়া দেন নি।

এই সমস্যার সমাধান কী ?

হেমা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বারান্দার বাইরে ছায়ামূর্তির মতন দাঁড়িয়ে আছে ডালপালা ছড়ানো বিশাল এক সজনেগাছ। ঢাকার মতো বৃক্ষহীন শহরে এতবড় সজনেগাছ বিরল। দোতলার বারান্দা অবধি উঠে গিয়ে ডালপালা মেলে দিয়েছে গাছটা। হঠাৎ তাকালে কেবল সবুজ আর সবুজ চোখে পড়ে। কিন্তু এই অন্ধকারে ওই সবুজও স্বস্তি দিতে পারল না হেমাকে।

প্রচণ্ড গরম পড়েছে। গাছের পাতাও নড়ছে না কোথাও। চারপাশ স্থির, স্তব্ধ। হেমা সেই স্থির, স্তব্ধ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে রইল। সে ঘুমাতে গেল শেষরাতে। ঘুমের ভেতর এলোমেলো নানান স্বপ্ন দেখল। তার ঘুম ভাঙল ভোরে। আর ঘুম ভেঙেই মন ভালো হয়ে গেল তার।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে সজনের সবুজ পাতাগুলো আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। আর একটানা ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টি।

হেমার ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পছন্দ নয়। তার পছন্দ আকাশ অন্ধকার করে নেমে আসা একটানা অবিরাম তুমুল বর্ষণ।

সেই বর্ষণে রাস্তাঘাট শূন্য হয়ে যাবে। লোকজন ঘর থেকে বের হবে না। রাস্তায় হাঁটুজল জমে যাবে। সেই জলের ভেতর খইয়ের মতোন ফুটতে থাকবে বড় বড় অজস্র বৃষ্টির ফোঁটা। জানালার বাইরে তাকালেই মনে হবে আজ কেবল বৃষ্টির দিন। আজ জগৎ সংসারের সকল কিছুরই ছুটি। অফুরন্ত অবসর। আর বৃষ্টিতে বুঁদ হয়ে থাকার সময়।

হেমা হঠাৎ লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল। তার মনে হলো, আজই সেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দিন। সে দৌড়ে চলে গেল বারান্দায়। সেখানে মেঝেতে পানি জমেছে। সে খুব আলতো করে সেই পানিতে আঙুলের ডগা ছোঁয়াল।

ইশ, কী ঠান্ডা!

অদ্ভুত গা শিরশিরে অনুভব।

হেমা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়াল। বৃষ্টির প্রবল ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে সে। শীত শীত লাগছে। কিন্তু হেমা নড়ল না। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েই রইল।

তার যে কী ভালো লাগছে!

মনে হচ্ছে, একজোড়া পাখা যদি তার থাকত! তাহলে এখন এই বৃষ্টির ভেতর পাখির মতন ডানা মেলে উড়ে যেতে পারত সে। তারপর চলে যেতে পারত নদী কিংবা মাঠের কাছে। পাহাড় কিংবা শান্ত পুকুরের কাছে। কিংবা ধানখেতের ভেতর ঝাঁক বেঁধে হেঁটে চলা হাঁসেদের কাছে। সে উড়ে উড়ে এইসব বৃষ্টি দেখত। সবরকমের বৃষ্টি।

হেমা হঠাৎ আবিষ্কার করল, সে যা যা ভাবছে, ঠিক তা-ই যেন তার বন্ধ চোখের পাতার ভেতর সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে ভেসে যাচ্ছে।

সত্যিই যেন বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় পাখনা ভাসিয়ে প্রবল বর্ষণে উড়ে যাচ্ছে সে।

ভীষণ শব্দে বজ্রপাত হলো কোথাও। হেমা আচমকা চোখ মেলে তাকাল। বারান্দার ঠিক নিচেই সরু রাস্তা। রাস্তায় একটা খোলা ভ্যানের ওপর বসে আছে রাহাত। তার চারপাশে ভ্যানভর্তি অসংখ্য কদম ফুল। রাহাতের চোখে সানগ্লাস।

এই বৃষ্টির মধ্যে সে সানগ্লাস পরেছে কেন কে জানে!

রাহাত মুখ তুলে তাকিয়ে আছে হেমার দিকে। হেমার অকস্মাৎ মন খারাপ হয়ে গেল। নয়ন কখনোই তার জন্য এমন কিছু করে নি। করবেও না কোনোদিন।

ব্যাপারটাকে পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা করল সে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহাতকে ডাকল। বলল, ‘রাহাত, আমার কাছে ক্যামেরা নেই। ক্যামেরা থাকলে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা ছবিটা তোলা হয়ে যেত।’

‘হতো না।’ নিচ থেকে চিৎকার করে বলল রাহাত। ‘এই দৃশ্যের সঙ্গে কালো সানগ্লাস পরা কারও ক্যাবলাকান্ত চেহারা যায় না।’

‘তুই কি এইসব কদমফুল নিয়ে এখন বাসায় উঠবি ?’

‘না।’

‘তাহলে ?’

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

‘তুই নেমে আসবি। তোকে কদমফুলের মাঝখানে বসিয়ে আমি ভ্যান চালিয়ে ঢাকা শহর ঘুরব।’

সিদ্ধান্ত নিতে হেমার মুহূর্তকালও লাগল না। সে বাসা থেকে বেরুলো তার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায়। রাস্তায় লোকজন নেই বলে হেমার তেমন অস্বস্তি লাগছে না। সে বলল, ‘তুই সানগ্লাস পরে আছিস কেন ?’

‘বৃষ্টির এই ছাটে কতক্ষণ তোর বারান্দার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে পারতাম বল?’

‘বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে তোকে কে বলল, তুই ফোন করলেই পারতি ?’

‘তোর ফোন অফ।’

হেমার হঠাৎ মনে হলো, ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না বলে ফোনে চার্জ দেওয়া হয় নি। সে বলল, ‘কিন্তু এই পাগলামি মাথায় উঠল কখন ?’

‘ভোররাতে যখন বৃষ্টি শুরু হলো, তখনই। বোঝাই যাচ্ছিল এ সহজে থামার বৃষ্টি না।’

‘এত ফুল কোথায় পেলি তুই ? কই পেলি ?’

রাহাত হাসল। তবে জবাব দিল না। হেমাকে নিয়ে তার এই পাগলামি নতুন কিছু না। সে হেমার ক্লাসমেট। নয়নের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও রাহাত জানে। কিন্তু তারপরও নিজেকে সংবরণ করতে পারে না সে। কেউ কিছু বললে বরং উদাস গলায় জবাব দেয়, ‘ভালোবাসতে ভালো লাগে বলেই আমি ভালোবাসি। কিন্তু কই, বিনিময়ে ভালোবাসা পাই না বলে তো কখনো খারাপ লাগে না! হ্যাঁ, একটা শূন্যতাবোধ হয় তা ঠিক। তবে জীবনে ওই শূন্যতাবোধেরও দরকার আছে।’

রাহাত জানে, হেমার প্রতি তার এই শর্তহীন সমর্পণ নিয়ে প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে মানুষ নানা কথা বলে। বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও করে। তবে এসব নিয়ে সে মোটেও ভাবিত নয়। হেমাও না। তার কাছে বিষয়টা বরং অন্যরকম। রাহাতকে এখন আর তার আলাদা কেউ বলে মনে হয় না। মনে হয় সে তার ঘরেরই কেউ। কিংবা ওই চিরচেনা সজনে গাছটার মতন। সে জানে, সকাল-সন্ধ্যা, দুপুর-রাত্রি সারাক্ষণ সে ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়েই থাকবে। কোথাও যাবে না। ফলে তাকে নিয়ে আলাদা করে ভাবারও কিছু নেই। রাহাতও যেন অবচেতনেই অমন হয়ে উঠেছে।

‘আমরা এখন কোথায় যাব ?’ বলল রাহাত।

‘চল, ক্রিসেন্ট লেকটার ধারে চল। ওখানে খানিক বসি।’

‘নয়ন ভাই এখনো গ্রাম থেকে আসেন নি ?’

‘উঁহু।’

রাহাত হাসল, ‘গ্রামে গিয়ে বিয়ে টিয়ে করে ফেলেছেন নাকি ?’

‘দাওয়াত তো পাই নি।’

‘কীভাবে পাবি ? ওখান থেকে কি কার্ড পাঠানোর ব্যবস্থা আছে ?’

‘টেলিপ্যাথি বলে একটা ব্যাপার আছে না ? বিয়ে করলে ওভাবেই ঠিকঠাক দাওয়াত পেয়ে যাব।’

‘বাহ! তারপর ?’

‘শাড়ি পরে তোকে নিয়ে গিয়ে বিয়ে খেয়ে আসব।’

‘কষ্ট হবে না ?’

‘হবে তো। বোরহানিতে ঝাল কম হলে কষ্ট হবে। রোস্টে মিষ্টি বেশি হলে কষ্ট হবে। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে ওর বউটা যদি আমার চেয়েও সুন্দরী হয়, তাহলে।’

রাহাত হা হা করে হাসল, ‘মেয়েরা সব সময় তারচেয়ে সুন্দরী কোনো মেয়ে দেখলেই জেলাস হয়ে যায় কেন বল তো ?’

‘ছেলেরা হয় না ?’

‘না।’ 🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

বিজ্ঞাপন

‘কে বলল তোকে ?’

‘বলতে হবে কেন ? তোর সামনে তো একটা জলজ্যান্ত প্রমাণ বসে আছে।’

‘তুই ? তুই আবার জেলাস হবি কেন ?’

‘এই যে নয়ন ভাই দেখতে এত সুন্দর। তারওপর এত কিছু করেও তোর একটু কনসান্ট্রেশন অবধি কখনো পেলাম না। অথচ উনি কিছু না করেই পুরোপুরি তোকে পেয়ে গেল। এসব জেলাস হওয়ার জন্য যথেষ্ট না ?’

হেমা হঠাৎ চোখ টিপে দুষ্টুমিমাখা গলায় বলল, ‘কনসেন্ট্রেশন না দিলে এই বৃষ্টিতে এমন এক কথায় তোর জন্য ঘর ছাড়লাম ?’

রাহাতও হাসল, ‘ঘর ছেড়েছিস বলছিস ?’

‘এত সন্দেহ থাকলে কি ভালোবাসা যায়রে পাগল ? ভালোবাসতে হলে সবার আগে খুনি হতে হয়। সন্দেহ খুনি। নির্দয়ভাবে সন্দেহগুলোকে খুন করে ফেলতে হয়। সন্দেহদের খুন না করতে পারলে ভালোবাসা যায় না।’

কথাটা যেন খচ করে বুকে গাঁথল রাহাতের। আসলেইতো, ভালোবাসলে সবার আগে খুনী হতে হয়। সন্দেহ, দ্বিধা, সংশয়গুলোকে খুন করতে হয়। এগুলো থাকলে আসলেই ভালোবাসা যায় না!

সে বললো, 'তো আর কী কী করলে ভালোবাসা যায় না ?’

‘কষ্ট না হলে।’

‘কষ্ট কেন হয় ?’

‘স্পর্শ করতে না জানলে।’

রাহাত হঠাৎ হাত বাড়িয়ে হেমার হাত স্পর্শ করে বলল, ‘এই যে স্পর্শ করলাম। ভালোবাসা হয়ে গেল ?’

হেমা হাসল, ‘ভালোবাসার স্পর্শ যদি এতই সহজ হতো, তাহলে ভালোবাসার জন্য মানুষ এমন ব্যাকুল হতো না।’

‘তাহলে সেই স্পর্শটা কেমন ? আমায় শেখা। দেখি, গুরুমারা বিদ্যা কাজে লাগানো যায় কিনা! তোর কাছ থেকে শতারপর সুযোগ বুঝে তোকেই ছুঁয়ে দেব।’

‘এই ছোঁয়ার কোনো সূত্র নেই। ধর কেউ একজন তোকে দিনরাত পাগলের মতো ভালোবাসছে, তোকে একটু খুশি করবার জন্য এমন কিছু নেই যা করছে না। কিন্তু দেখবি সেসব কিছুই তোকে স্পর্শ করছে না। অথচ কেউ একজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডান হাতে নাক পরিষ্কার করে প্যান্টে মুছছে, আঙুলে কান খুচছে। ওই দৃশ্য দেখেও তোর হঠাৎ মনে হবে, ইশ, কী সুন্দর করেই না মানুষটা নাক ঝাড়ল ? আহাহা। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভালোলাগা হু হু করে বয়ে যাবে। এর কি কোনো সূত্র হয় বল ?’

রাহাত হেমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

হেমা বলল, ‘অমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছিস কেন ? নাকি এখনই বলবি, তুই এত সুন্দর করে কথা বলিস কী করে হেমা ?’ বলে হাসল সে। তারপর বলল, ‘আর এইটাই হলো ওই সূত্র, বুঝেছিস গবুচন্দ্র ? অথচ বোটানীর ওই মেয়েটা, কী যেন নাম ? শিউলী না ? সে যে রাত দিন তোর জন্য কতকিছু করে, সেসব কিছুই তোর ভালো লাগে না। স্পর্শ করে না। আর আমি ডান হাতে নাক ঝাড়লেও মনে হয়, আহা, কী সুন্দর! এই হলো সেই সূত্র বুঝলি ?’

রাহাত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল, ‘তোর কী হয়েছে বলত ?’

‘কী হবে ?’

‘কিছু একটা তো নিশ্চয়ই হয়েছে। ইউ আর নট নরমাল।’

‘মেয়েদের মন বোঝার চেষ্টা করে লাভ নেই বৎস। স্বয়ং ঈশ্বরও এই চেষ্টায় ব্যর্থ।’

‘নয়ন ভাইও বোঝেন নি ?’

‘সে এসব অযথা চেষ্টায় নেই। উল্টো তাকেই আমি বোঝার চেষ্টা করেছি।’

‘পেরেছিস ?’

‘কখনো কখনো মনে হতো পেরেছি। আবার মনে হয় একদমই না। তবে ইদানীং পুরোপুরিই অচেনা মনে হয় ।’

‘দ্যাখ, অন্য কারও প্রেমে ট্রেমে পড়েছেন কি না ?’

‘আমার ঘর ভাঙতে চাইছিস ?’

‘নাহ। সামান্য ফাটল ধরলেও সেটি জুড়ে দিতে চাইছি।’

‘কীভাবে ?’

‘চল। নয়ন ভাইকে গিয়ে নিয়ে আসি। গ্রামের নামটা যেন কী বললি ? আমরা সেখানে গিয়ে হাজির হব। উনি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখবেন তার মাথার কাছে তুই দাঁড়িয়ে আছিস।’

হেমা খুব চেষ্টা করছিল মন খারাপ না করতে। কিন্তু পারল না।

আজ শেষরাতে সে বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন দেখেছে। নয়নকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটা অদ্ভুতও।

গ্রামের একটা উঠোন বিয়ের লাল, নীল, হলুদ রঙের অসংখ্য কাগজে সাজানো। বাড়িভর্তি নানান লোকজন। তাদের কাউকেই হেমা চেনে না। সে গিয়েছে ঢাকা থেকে। বাড়িতে ঢুকে উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখে নয়নের বিয়ে হচ্ছে। যে মেয়েটার পাশে নয়ন বসে আছে, সেই মেয়েটাকে যেন আগে কোথাও দেখেছে হেমা। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে করতে পারছে না। সে উঠানে ঢুকতেই নয়ন তাকে দেখল। কিন্তু হেমা এখন কী করবে ? সে কি চিৎকার করে কাঁদবে ? সবাইকে বলবে নয়ন আর তার সম্পর্কের কথা ? কিন্তু হেমা তেমন কিছুই করল না। বরং ঘুরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নয়ন তাকে ডাকল। তারপর ছুটে এসে হেমার কাঁধ চেপে ধরে বলল, ‘কই যাচ্ছ ?’

হেমা জবাব দিল না। তার কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। এই অনুভূতির নাম সে জানে না।

তবে সে জানে, জগতে অভিমানী মানুষের কষ্টের মতো তীব্র আর কিছু নেই।

নয়ন বলল, ‘সেই কখন থেকে সবাই অপেক্ষা করছে, তুমি এলেই বিয়ে পড়ানো হবে। আর তুমি কিনা এসেই চলে যাচ্ছ ?’

হেমা ঝট করে মুখ তুলে তাকাল। এটা কী বলল নয়ন! তবে কি নয়নের সাথে তারই বিয়ে?

নয়ন অবশ্য তাকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, ‘তুমি এই বিয়ের সাক্ষী। অথচ তুমিই কিনা এলে এত দেরি করে!’

হেমা কিছু বলল না। সে দিশেহারা ভঙ্গিতে নয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। নয়ন হাসছে। আচ্ছা, নয়নের হাসিতে কি অন্য কিছু আছে ? বিষয়টা কি এমন যে এই পুরো ব্যাপারটিই তার সাজানো ? স্টেজে বউ সেজে বসে থাকা মেয়েটাকে স্রেফ মজা করার উদ্দেশ্যেই এখানে রাখা হয়েছে ? আসলে নয়নের সঙ্গে তারই বিয়ে হবে। হয়তো হেমাকে একটু চমকে দিতেই এতোকিছু করেছে নয়ন।

কিন্তু বাকি ঘটনা আর দেখা হলো না হেমার।

ভয়াবহ মানসিক চাপ নিয়ে তার ঘুম ভাঙল। বুকের বাঁ পাশে কেমন চিনচিনে ব্যথা।

এরপর অবশ্য চোখ মেলে আকাশ কালো বৃষ্টি দেখে তার মন ভালো হয়ে গেল। উধাও হয়ে গেল সেই চিনচিনে ব্যথাটাও।

কিন্তু এই মুহূর্তে আবার কেন মন খারাপ হয়ে গেল তার!

সেই ব্যথাটাও যেন ফিরে আসতে লাগল। কান্না পেতে লাগল খুব।

এই বৃষ্টিতে তো কাঁদাই যায়!

আচ্ছা রাহাত তার সামনে বসে আছে, কিন্তু এমন ঝরঝর মুখর বাদর দিনে, এমন তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে যদি সে কাঁদে, তবে কি রাহাত তা বুঝতে পারবে ?

নাকি সেই কান্না এই বৃষ্টির জলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে ? আচ্ছা, পৃথিবীর সব জলের রঙই কি এক? নাকি আলাদা?

তার কান্নার জল কি বৃষ্টির এই জল থেকে আলাদা নয়? নিশ্চয়ই আলাদা।

তাহলে সব জলের রঙ কেন একই হবে?

কেন জল মিশে যাবে জলে?

নয়ন বসে আছে বাসার ছাদে। মোহাম্মদপুর পেরিয়ে আরও অনেকটা ভেতরের দিকে তাদের এই নতুন বাড়ি।

এখানে এখনো আকাশ চুরি হয় নি।

চারপাশে মাথা-উঁচু ভবনের বালাই নেই। বিকেল হলেই নরম রোদের সাথে ফুরফুরে হাওয়ার সখ্য টের পাওয়া যায়।

নয়নের সামনে পুরোনো কয়েকটি ডায়েরি।

এগুলোকে অবশ্য ডায়েরি না বলে রুলটানা খাতা বলাই ভালো। খাতাভর্তি কত কী যে লেখা! তবে সেইসব লেখার বেশির ভাগই পড়া যায় না। বহু আগে নিউজপ্রিন্ট কাগজে ঝরনা কলমে লেখা হয়েছিল বলে কালি লেপ্টে গিয়েছে। তা ছাড়া যিনি লিখেছিলেন, তিনিও যেন ইচ্ছে করেই হিজিবিজি করে রেখেছিলেন। যাতে অন্য কেউ সহজে পড়তে না পারে।

এই লেখা লিখেছেন নয়নের মা কোহিনুর বানু। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নয়ন কখনো তার মাকে কিছু লিখতে দেখে নি। এমনকি বাজারের ফর্দও না। কিন্তু সে জানে, এই খাতাগুলো মায়ের। লেখাগুলোও। এগুলো নয়নের হাতে এসেছে বহু আগে। ছাদের চিলেকোঠার ঘরে কিছু পুরোনো ট্রাঙ্ক বাক্স রাখা ছিল। সেখানে পুরোনো অনেক বই, খাতা-পত্তর রাখা ছিল। নয়ন সেখানে কী খুঁজতে গিয়েই এগুলো পেয়েছিল। প্রথম দেখায় অবশ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয় নি। পাতার পর পাতা যেন দুর্বোধ্য আঁকিবুকি। কোনো ডাক্তারকেও এমন দুর্বোধ্য অক্ষরে প্রেসক্রিপশন লিখতে দেখে নি সে। ফলে প্রথম লেখাটা বুঝতেই ঢের সময় লেগে গিয়েছিল। এবং তখনো সে বুঝতে পারে নি, লেখাগুলো আসলে কার। কোথাও কোহিনুরের নাম ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে পাতা যত উল্টেছে, ততই বিষ্ময়াভিভূত হয়েছে নয়ন।

আবিষ্কার করেছে আশ্চর্য সব ঘটনা।

খাতার বেশির ভাগই ছোট ছোট গল্প বা কবিতা। তবে গল্পগুলোকে আত্মকথা বলেই মনে হয়েছে তার। কারও সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতেন না বলেই হয়তো নিজের ভাবনাগুলোকে এভাবে লুকিয়ে লিখে রাখতেন কোহিনুর। সমস্যা হচ্ছে লেখাগুলোতে কোনো দিন, তারিখ, সময় উল্লেখ করা নেই। নয়ন একবার ভেবেছিল মাকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু মাকে সে যতটা চেনে, তাতে আর সাহস করে নি।

অনেকগুলো সাপ যেমন একসাথে থাকলে কিলবিল করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকে, খাতার লেখাগুলোও অনেকটা তেমনই। তবে প্রথম প্রথম পড়তে যতটা বেগ পেতে হয়েছিল, পরে আর ততটা হয় নি। বরং লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন চরিত্র, স্থান, নানান বাক্য, শব্দের ধরন বুঝে ফেলার কারণে বিষয়গুলো তুলনামূলক সহজ হয়ে আসতে লাগল।

🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

রোজ ঘুমানোর আগে দরজা-জানালা বন্ধ করে খাতাগুলো নিয়ে বসত সে। কিছু কিছু বিষয় পড়ে কখনো কখনো একটা অপরাধবোধ যে কাজ করে নি তা নয়, কিন্তু মায়ের রহস্যময় শৈশব জানার কৌতূহলটাও দমাতে পারে নি নয়ন। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

গত কুড়ি-পঁচিশ বছরে কোহিনুর ফতেহপুর না গেলেও নয়নের বাবা ফখরুল আলমকে কালেভদ্রে যেতে হয়েছে। তা ছাড়া আমোদি বেগম, কোহিনুরের ছোটো চাচা আইয়ুব উদ্দিন খাঁ কিংবা ফতেহপুর থেকে ঢাকায় আসা কিছু মানুষের সঙ্গে মিহি সূতোর মতন প্রায় অদৃশ্য একটা যোগাযোগ তাদের ছিল। তবে মোটাদাগে তা ওই না-থাকার মতনই। এদের কাছেই নানান সময়ে ফতেহপুরের গল্প শুনেছে নয়ন। শুনেছে তার মায়ের গল্পও। তবে সেইসব গল্পে কোহিনুরের শৈশব নিয়ে সব সময়ই যেন একটা রাখঢাকের ব্যাপার ছিল।

তবে আছমার কাছ থেকে মায়ের সম্পর্কে অদ্ভুত সব তথ্য পেয়েছিল নয়ন। সে দীর্ঘদিন এ বাসায় কাজ করত বলে নয়নের সঙ্গে একটা দারুণ বোঝাপড়াও তৈরি হয়ে গিয়েছিল তার। নয়ন যখন আছমাকে পড়াত, তখন প্রায়ই সে তার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসত। সেইসব গল্পে অবধারিতভাবেই আসত তার গ্রাম আর ভূতপ্রেতের নানান কেচ্ছাকাহিনি।

এই আছমার কাছেই প্রথম আব্দুল ফকিরের কথা শুনেছিল নয়ন।

মানুষটার নানান অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে আছমা যেন ভয়ে জড়সড় হয়ে যেত। নয়ন অবশ্য হাসতে হাসতে বলত, ‘তোকে এত কিছু শেখানোর পরও তুই বিশ্বাস করিস যে আব্দুল ফকির নামের ওই ওঝা মৃত মানুষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে তুলতে পারে ?’

আছমা গলায় জোর দিয়ে বলত, ‘সাপে কাটা মানুষ তার কাছে নিলেই সুস্থ। সে ঢোলবাদ্য বাজাইয়া বিষ নামায়। একবার একজনরে মরা ভাইবা কবরও দিয়া দিছিলো। সে গিয়া বললো, লাশ উঠান। মুর্দা এখনো কবরের মইধ্যে জিন্দা আছে। শুইনা সবাই তো অবাক। লাশ উঠানো হইলো কবর খুঁইড়া। ওরে আল্লাহ, সে সেই লাশ জিন্দা বানাইলো! শুধুই কি লাশ ? জিন-পরি, ভূত সব বশ করতে জানে সে। আপনে বিশ্বাস যান না ?’

‘জিন ভূতে ধরলে মানুষ কী করে ?’

আছমা ঠিক তখনই মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলেছিল। সে বলল, ‘ক্যান ? আপনের মায়রে দেখেন না ? শোনেন নাই কিছু তার কথা ?’

‘মায়ের আবার কী কথা ?’

‘তার লগেও তো জিন আছে। আমাগো গ্রামের সবাই তারে ছোটোবেলায় ডরাইতো। এখনো মুরুব্বিরা তারে নিয়া কত কেচ্ছা-কাহিনি বলে! সে নাকি ছোটোবেলায় রাইত বিরাইতে আমগাছ, জামগাছে উইঠা বইসা থাকতো।’

আছমার কথা শুনে হঠাৎ থমকে গিয়েছিল নয়ন। আর আছমাও যেন মুখ ফসকে কথাটা বলে ভয়ে চুপসে গেল।

সেইদিন তার মুখ থেকে আর কিছুই বের করা গেল না। বরং কান্নাকাটি করে নয়নের হাতে-পায়ে ধরে মাফ চাইল সে। অনুরোধ করল, নয়ন যেন এইসব কথা তার মাকে না বলে।

তা নয়ন বললও না।

তবে এরপর প্রায়ই নানান কৌশলে মায়ের কথা জানতে চাইত সে। ততদিনে আছমার কাছে একটা আস্থার জায়গাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল তার। ফলে ধীরে ধীরে অনেক কথাই বলতে লাগল সে। আর সেসব হেসে উড়িয়েও দিতে পারল না নয়ন।

মায়ের মধ্যে যে একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে, তা সে জানে। তবে তাতে অস্বাভাবিকতা খোঁজার কিছু নেই। তিনি ছেলেবেলা থেকেই গম্ভীর, অন্তর্মুখী। একা থাকতে পছন্দ করেন। ঘর থেকে বের হতে চান না। এটা তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা।

সব মানুষের ব্যক্তিত্ব, আচরণ এক হবে না, সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু নানার সঙ্গে মায়ের এই সুদীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার কারণ কোনোভাবেই জানতে পারে নি নয়ন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মেয়েকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। কোহিনুরও বাবাকে। তাহলে তাদের এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা বা সম্পর্কহীনতার কারণ কী ?

সেই কারণগুলো কি এই খাতায় লেখা রয়েছে ?

খাতার প্রথম দিকের লেখাগুলো সংক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন। ফলে কোনো ঘটনাই স্পষ্ট বোঝা যায় নি। তবে ধীরে ধীরে লেখাগুলোয় একটা ধারাবাহিকতা চলে এসেছে। প্রথম পৃষ্ঠায় বিচ্ছিন্নভাবে লেখা, ‘গাছ পছন্দ। পানি পছন্দ। আর যাহা পছন্দ, তা হইলো অন্ধকার।’

এরপর তিনি লিখেছেন, ‘আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। লিখতে ভালো লাগে।’

প্রথম দিককার লেখায় কিছু অসঙ্গতি থাকলেও ধীরে ধীরে তা কেটে গেছে। নয়ন বরং অনেকক্ষেত্রে বিস্মিতই হয়েছে। তার মনে হয়েছে, লেখালেখির বিশেষ ক্ষমতা নিয়েই তার মা জন্মেছিলেন। কিন্তু তিনি জন্মেছিলেন ভুল সময়ে, জায়গায়, ভুল পরিবেশে।

এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘রাবেয়া চুরি করেছে। কিন্তু সবাই দোষ দিল আনোয়ারার। স্যার আনোয়ারাকে অনেক মেরেছে। আনোয়ারার কান্নার সময় রাবেয়া আবার তারে চোখ টিপ মারছে। রাবেয়ার চোখ কলম দিয়া ফুটা করতে ইচ্ছা হয়।’

এর পরের পৃষ্ঠার দ্বিতীয় প্যারায় লেখা, ‘একটুর জন্য রাবেয়ার চোখ ফুটা হয় নাই। গাল ফুটা হয়েছে।’

এই অংশটা পড়ে নয়ন শিউরে উঠেছিল।

তার মায়ের বয়স তখন কত হবে ? কোন ক্লাসের ছাত্রী সে ? ওই বয়সেই এমন ভয়ানক ছিলেন তিনি ? সঙ্গে আরও একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল নয়নের। শিশুবয়সে কোহিনুর ঠিক একইভাবেই খেঁজুরকাঁটায় এক গৃহপরিচারীকার চোখ গেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। নয়ন ঘটনাটি শুনেছিল তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা এক দূরসম্পর্কের মামার কাছে। তার ধারণা শিশুকাল থেকেই কোহিনুরের ভেতর অস্বাভাবিক এবং একইসঙ্গে অতিপ্রাকৃত নানান বৈশিষ্ট্য দেখা যেত।

তবে নয়ন সেসব বিশ্বাস করে নি।

সে তখন শিশু-মনস্তত্ত্ব নিয়ে কিছু পড়াশোনার চেষ্টা করেছিল।

ইন্টারনেটে এসব বিষয়ে নানাবিধ গবেষণাপত্র, প্রবন্ধ রয়েছে। সেসব থেকে নয়ন যা বুঝেছে—শিশুর নৃশংস আচরণ নানাভাবেই প্রকাশ পায়। তবে এটি মূলত শুরু হয় গৃহপালিত পশু, পরিবারের সদস্য কিংবা গৃহকর্মীদের ওপর নৃশংসতা দিয়ে। তারা বেড়াল, কুকুর বা মুরগির বাচ্চার পা ভেঙে দেয়। কিংবা এদের দেখলেই ঢিল ছুড়ে মারে। বড়রা গৃহকর্মীদের সাথে খারাপ আচরণ করলে তা থেকেও শিশু নৃশংসতা শেখে। এমনকি কোনো পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে যদি মারমুখী সম্পর্ক থাকে, তবে তার প্রভাবও পড়তে থাকে শিশুর মধ্যে। শুধু তা-ই না, সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে যদি বাবা-মা নিয়মিত তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন, তবে সেক্ষেত্রেও শিশুর আচরণে নানান অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়।

খাতায় এরপরও এমন অনেক সংক্ষিপ্ত লেখা রয়েছে। যেমন, ‘স্যার যখন মারলেন, তখন অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু কাঁদি নাই।’

অর্থাৎ রাবেয়াকে আঘাত করার কারণে শিক্ষক কোহিনুরকে শাস্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কাঁদেন নি।

এরপর লেখা, ‘সবাই আমাকে ভয় পায়। আমি একলা বসি। কেউ কাছে বসে না।’

সম্ভবত রাবেয়াকে ওভাবে আঘাত করার কারণেই ক্লাসের বাকিরা তাকে ভয় পেতে শুরু করে।

এরপর একটা জায়গায় কোহিনুর লিখেছেন যে তিনি দুই লাইনের একখানা কবিতা লিখেছিলেন এবং সেটি দেখে অমলবাবু খুব প্রশংসা করেছেন। সম্ভবত এরপরই অমলবাবুর সঙ্গে তার নিয়মিত কথাবার্তা শুরু হয়। কারণ, এখান থেকেই কোহিনুরের লেখা গোছানো এবং শুদ্ধ হতে শুরু করে।

তিনি লিখেছেন, ‘এখন কেউ আমার সাথে কথা বলে না। আনোয়ারাও না। আমিও বলি না।’

এরপরের লেখাগুলো টানা এবং ধারাবাহিক। নিয়মিত কবিতা এবং ছড়াও রয়েছে। অমলবাবুকে নিয়ে সুদীর্ঘ ভাবনা এসব জায়গাজুড়ে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁর কথাও রয়েছে। তবে সেইসব কথায় একটা অস্পষ্ট ক্ষোভ যেমন প্রতিভাত হয়েছে, তেমনি মা আমোদি বেগমের প্রতি প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্ট করুণা কিংবা সহানুভূতি।

এরপর অমলবাবুর মাধ্যমে লেখালেখির মতো তুমুল আগ্রহদায়ী একটা বিষয়ের সঙ্গে যে তিনি পরিচিত হতে পেরেছেন সেটিও লেখা হয়েছে।

এই অংশটিতে এসে যেন কোহিনুরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে নয়ন। তিনি একজায়গায় লিখেছেন, ‘মানুষের সাথে কথা বলার চাইতে এই খাতায় লিখে রাখা ভালো। তাহলে ভুল বোঝার সুযোগ থাকে না।’

এর বিশদ ব্যাখ্যাও লেখা রয়েছে।

একরাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল কোহিনুরের। তিনি দেখেছেন বাড়ির পেছনের শুকনো বিলে ধবধবে সাদা কাঁশফুল ফুটেছে। সেখানে প্রবল আনন্দ নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎই এক সদ্যোজাত শিশুর চিৎকার শুনতে পেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরও শিশুটির ওই কান্না তার কানে লেগে রইল। বিষয়টিকে গ্রাহ্য না করে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তার মনে হলো, শিশুটি সত্যি সত্যিই ওই কাঁশবনে কাঁদছে। এবং তার সেই কান্নার শব্দ জেগে জেগেও শুনতে পাচ্ছেন তিনি। ফলে পাশে ঘুমিয়ে থাকা ছোটখালাকে ঘুম থেকে ডেকে ঘটনা খুলে বললেন। বললেন, এখনই তাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের কাঁশবনে যাওয়ার কথা। মাঝরাতে হঠাৎ গভীর ঘুম ভেঙে ওঠা ছোট খালা আচমকা ভড়কে গেলেন। তা ছাড়া কোহিনুরের পূর্বের নানান অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ভয় পেয়ে চিৎকার জুড়ে দিলেন। ফলে ওই গভীর রাতেই বাড়ির সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল।

ছোট খালা ওইটুকু ঘটনাকেই সকলের কাছে নানান রংচঃ মাখিয়ে বললেন। এবং কোহিনুরের সঙ্গে আর ঘুমাতে রাজি হলেন না। এরপর একরাতে একা ঘরে কোহিনুর আবারও সেই স্বপ্ন দেখলেন। কিন্তু এবার আর ঘুম ভেঙে কাউকে ডাকলেন না তিনি।

বরং একা একাই দরজার খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

বাড়ির পেছনের বিল শুকিয়ে শুকনো হয়ে আছে। সেখানে সাদা কাশফুল ফুটেছে। আবছা অন্ধকারে শুভ্র কাঁশফুলগুলোকে দেখে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কোহিনুর।

তখন শেষরাত। ফজরের আজানও হয়ে গিয়েছে।

তবে কোহিনুরের তা খেয়াল নেই। পাশের বাড়ির বয়স্ক এক লোক অজু করতে উঠেছিলেন। তিনি কাঁশবনের মাঝখানে একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলেন। চারপাশের লোকজন ছুটে এল। সকলেরই ধারণা হলো কোহিনুরের ওপর আবারও জিন ভর করেছে। ওঝা এনে তার চিকিৎসা শুরু হলো।

হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হলো উঠানে।

মুখের কাছে ধূপ জ্বালানো হলো। ধূপের ভেতরে পুড়তে দেওয়া হলো শুকনো মরিচ। তারপর ঝাড়ু দিয়ে ক্রমাগত পেটানো হতে লাগল তাকে। কোহিনুরের চোখ-মুখ-নাক দিয়ে তখন পানি ঝরছে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু কেউ তা গ্রাহ্য করল না। ওঝা বিড়বিড় করে টানা মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোহিনুর মৃত মানুষের মতন সংজ্ঞাহীন পড়ে রইল।

তাকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করলেন তার শিক্ষক অমলবাবু।

তিনি খবর পেয়ে স্কুল থেকে ছুটে এলেন। কোহিনুরের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে তাকে উঠান থেকে ঘরে নিয়ে গেলেন। কোহিনুর হঠাৎ স্যারকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে করে কাঁদল। কিন্তু এরপরও টানা এক মাস তাকে আর ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হলো না। সে স্কুলে গেল প্রায় মাসখানেক পরে। কিন্তু ততদিনে তার ওই ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

স্কুলে অমল বাবু ছাড়া আর কেউ তার সঙ্গে কথা বলত না। মিশত না। বরং প্রবল ভয়ে এড়িয়ে চলতে লাগল। কেবল ওই অমলবাবুই তাকে আগলে রাখতেন।

নয়ন স্পষ্টই বুঝতে পারছিল, তার মা গ্রামের আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভয়ডরহীন নির্বিকার। তার কল্পনার জগতটাও ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। কিন্তু সেসব বলতে গেলেই লোকে তাকে সন্দেহ কিংবা ভয়ের চোখে দেখত। ফলে ক্রমশই একা, বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকলেন তিনি। আর তখন থেকেই তার কথা, ভাবনা বিনিময়ের জায়গা হয়ে উঠতে লাগল এইসব খাতা।

নয়ন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাতার পর পাতা পড়েছে। কোহিনুরের ভাবনার জগতটাকে একটি চমৎকার সৃষ্টিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন অমলবাবু। তারা পরস্পরের অনুভূতিকে গভীর সংবেদনশীলতায় স্পর্শ করতে পারছিলেন।

কিন্তু বিষয়টি তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মেনে নিতে পারেন নি।

কন্যাস্নেহে কাতর তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অমলবাবু আর কোহিনুরের সম্পর্কের এই গভীরতায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। ফলে কোহিনুরের পড়াশোনাও বন্ধ করে দিলেন তিনি। এবং এর কিছুদিন বাদে তড়িঘড়ি করে তাকে বিয়েও দিয়ে দিলেন।

কিন্তু বিয়ের আগের দিন, গভীর রাতে, অমলবাবুর কাছ থেকে একখানা জরুরি বার্তা এসেছিল ফতেহপুরের খাঁ বাড়িতে। সেই বার্তায় অমলবাবুর গুরুতর দুর্ঘটনার সংবাদ ছিল। মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়। শেষবারের মতন তার প্রিয় ছাত্রী কোহিনুরকে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তাতে সাড়া দেন নি। বরং অস্বাভাবিক আড়ম্বরহীনতায়, খানিক লুকোছাপার মধ্য দিয়েই পরদিন সকালে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর একমাত্র কন্যা কোহিনুরের বিয়ে হয়ে গেল অচেনা অজানা ফখরুল আলমের সঙ্গে।

ফখরুল আলম ফতেহপুরে বেড়াতে এসেছিলেন ফুফুর বাড়িতে। তখন কেবল ছোটখাটো একখানা সরকারি চাকুরি হয়েছে তার। আচার-আচরণে নিরীহ নির্বিবাদী মানুষ ফখরুল আলম। তার বাবা-মা নেই। খাঁ বাড়ির সঙ্গে সম্বন্ধ করার মতো বংশগৌরবও নেই। মানুষ হয়েছেন বড় বোনের কাছে। নিজেকে নিয়ে সব সময় সংকোচে ভোগা ফখরুল আলম কারও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা অবধি বলতে পারেন না।

সেই ফখরুল আলমের সঙ্গেই একদিনের মধ্যে নিজের কন্যার বিয়ে ঠিক করলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।

বিয়ের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কোহিনুরকে ঢাকা পাঠানোরও ব্যবস্থা করলেন। সঙ্গে পর্যাপ্ত অর্থকড়ি দিয়ে পাঠালেন তার ছোটভাই আইযুব উদ্দিন খাঁকে। আইয়ুব খাঁ ঢাকায় এসে দিন দশেক থাকলেন। এই সময়ে কোহিনুরের জন্য ভালো বাসা ভাড়া করে দিলেন তিনি। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিলেন। যাওয়ার আগে ফখরুল আলমের কাছে প্রচুর নগদ অর্থও রেখে গেলেন।

🇧🇩🇧🇩🇧🇩

এসবই তৈয়ব উদ্দিন খাঁর নির্দেশ।

কোনোকিছু নিয়েই যেন সমস্যা না হয় কোহিনুরের। তা হয়ও নি। তবে ফতেহপুর থেকে কোহিনুরের সেই শেষ বিদায়। বিদায় তার পিতা তৈয়ব উদ্দিন খাঁর চোখের সামনে থেকেও। এরপর আর কখনো মুখোমুখি দেখা হয় নি দুজনের।

ফতেহপুরের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মাত্র এক দিনের মধ্যে তার কন্যাকে অমন আড়ম্বরহীন বিয়ে দিয়ে কেন ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন ?

Post a Comment

0 Comments