মানবজনম
আষাঢ় মাসের রাত।
সন্ধ্যা থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। তবে বৃষ্টি খানিক কমেছে। মৃদু শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়া সামান্য জোরালো হলেই গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা সবেগে ঝরে পড়ছে টিনের চালে।
গাঁয়ের নাম হোসনাবাদ। এখানে এখন গভীর রাত। এই রাতে মানুষ কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমায়। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে ঘুম হয় গভীর। এই গভীর ঘুমের রাতে গাঁয়ের বাড়িতে বাড়িতে চুরি হয়। চোর নিশ্চিন্তে সিঁধ কেটে চুরি করে। তাকে খুব একটা সতর্ক থাকতে হয় না। কারণ সে জানে, এই বর্ষণে গৃহস্থের ঘুম সহজে ভাঙে না।
আব্দুল ফকিরের অবশ্য ঘুমানোর সুযোগ নেই। তিনি কাঁধে ঝোলা নিয়ে হাঁটুসমান ল্যাদল্যাদে কাদার মধ্যে হাঁটছেন। তবে এই কাদাপানিতে হাঁটা তার জন্য মোটেই সহজ কোনো কাজ নয়। বরং ভয়াবহ কঠিন। এর অবশ্য কারণও আছে। তার বাঁ পায়ের পাঁচটা আঙুলই নেই। গোড়া থেকে বিভৎসভাবে কাটা। ফলে তাকে হাঁটতে হচ্ছে খুব সাবধানে। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার আশঙ্কা।
আব্দুল ফকিরের বাঁ পায়ের আঙুল হারানোর ঘটনাটি রহস্যে পরিপূর্ণ। এই রহস্য তিনি কখনোই কারও কাছে খেলাসা করেন নি। ফলে লোকমুখে এই নিয়ে নানান কল্পকাহিনি প্রচলিত হয়েছে। সেসব কাহিনির বেশির ভাগই অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও রহস্যে আবৃত। তিনি দেখতে জীর্ণশীর্ণ, সাদাসিধে মানুষ। থুতনির নিচে সামান্য দাড়ি। গাল ভাঙা। পেশায় ওঝা। সাপের বিষ নামান। জিন-পরির আছর ছাড়ান। অসুখ-বিসুখে লতাপাতার ওষুধ, পানিপড়া দেন। দশগ্রামের মানুষ তাকে এক নামে চেনে।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩আজ এই ঝড়বৃষ্টির রাতে তার সফরসঙ্গী হয়েছে জুলফিকার। জুলফিকারের হাতে হারিকেন। সে খানিক পাগল কিসিমের মানুষ। কথায় কথায় হাসে। খানিক আগে চতুর্থবারের মতো আছাড় খেয়ে পড়েছে সে। তবে এতে খুব একটা বিচলিত মনে হয় নি তাকে। বরং নিজে পড়লেও কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে প্রতিবারই সে তার হাতের হারিকেনখানাকে অক্ষত রাখতে পেরেছে।
কাদাপানিতে গড়াগড়ি খেয়ে উঠতে উঠতে সে হাসিমুখে বলেছে, ‘ও কাকু, এই বাইস্যাকালে তো দেহি হগলই ভাইস্যা যাইবগো কাকু। সামনে কি বড় কোনো বিপদ-আপদের আলামত আছে নি ?’
আব্দুল ফকির এই কথার জবাব দেন নি। মাঝরাতের আরামের ঘুম থেকে উঠে এখন এই কাদাপানি ভাঙতে হচ্ছে বলে প্রচণ্ড বিরক্ত তিনি। ফতেহপুরের চেয়ারম্যান খবির খাঁ তাকে জরুরি তলব করেছেন। খাঁ বাড়ির ডাক এড়ানো সহজ কথা নয়। আব্দুল ফকিরও পারেন নি। তাকে সঙ্গে সঙ্গেই বের হতে হয়েছে। ঘটনাও অবশ্য গুরুতর। খবির খাঁর একমাত্র ভাগ্নে নয়ন এসেছে শহর থেকে। সে সদ্য এমবিবিএস পাশ করেছে। সামনে তার অবিরাম ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততায় ডুবে যাওয়ার আগে খানিক অবসর কাটাতেই গ্রামে এসেছে সে। কিন্তু এসেই পড়েছে মহাবিপদে। তাকে সাপে কেটেছে!
অতীতের কিছু ঘটনায় বাবার বাড়ির সঙ্গে দীর্ঘ এক সম্পর্কহীনতা তৈরি হয়েছিল নয়নের মা কোহিনুর বেগমের। নয়ন যেন সেই সম্পর্কহীনতায় খানিক সম্পর্কের ঢেউ তুলতেই এবার এসেছে। কিন্তু তার সেই আগমন শেষ অবধি আর আনন্দময় হলো না। রাতে বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে সাপের ছোবল খেয়েছে সে।
কুণ্ডুলী পাকানো সাপ ছিল মশারির ওপরে। নয়ন মশারি তুলতে গিয়ে যতক্ষণে সাপটা দেখেছে, ততক্ষণে তার ডানহাতের আঙুলে ছোবল মেরেছে সাপ।
তীব্র আতঙ্কে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল সে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। খাঁ বাড়িভর্তি নানান লোকজন। মুহূর্তেই চারপাশ থেকে ছুটে এল তারা। নয়নের মামা খবির খাঁ। দুহাতে নয়নের কাঁধ চেপে ধরে বললেন, ‘কী হইছেরে নয়ন ? কী হইছে ?’
নয়ন বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেনি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ঘরের বেড়ার চৌকাঠের নিচের ফাঁকা অংশে। তার দৃষ্টিজুড়ে তীব্র ভয়। সে সেই তীব্র ভয় জড়ানো গলায় ফ্যাসফ্যাস করে বলল, ‘সাপ, সাপ। আমাকে সাপে কেটেছে মামা। আমাকে সাপে কেটেছে...।’
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩চারদিকে বর্ষার থইথই পানি। এই পানিতে গৃহস্থের বসতবাড়িতে সাপখোপ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। বরং এসময়ে বাড়ির উঠোনে, ঘরে, খাটের তলায়, এমনকি বিছানায়ও কুণ্ডুলী পাকানো সাপ দেখা যায়। সাপে কাটা মানুষের সংখ্যা এই সময়ে বেড়ে যায়।
খবির খাঁ দলবল নিয়ে সাপের খোঁজে ঘরে-বাইরে তল্লাশি চালালেন। কিন্তু লাভ হলো না। সাপ যেন নিমিষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। টানা বর্ষায় বাড়ির চারধারের ঘাস, লতাগুল্ম তরতর করে বেড়ে উঠেছে। সবুজ ঘন জঙ্গলে ছেয়ে গেছে চারপাশ। তার ওপর বাড়ির ভিটে ছুঁই ছুঁই হয়ে উঠে এসেছে বিলের পানি। এই মেঘলা রাতে সাপটা যদি টুপ করে ওই পানিতে নেমে যায় কিংবা ঘন আগাছায় ঢুকে পড়ে, তবে তাকে খুঁজে পাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
খবির খাঁ অবশ্য সেই আশা ছেড়েও দিয়েছেন। তিনি সাপ খোঁজা বাদ দিয়ে শক্ত করে নয়নের হাতের কব্জি বেঁধে দিলেন। তারপর খবর পাঠালেন আব্দুল ফকিরকে।
আব্দুল ফকিরের কাছে যখন খবর এসেছে, তখন রাত একটা। ফতেহপুর থেকে নৌকায় হোসনাবাদ প্রায় ঘণ্টা তিনেকের পথ। ভরা বর্ষায় বসতভিটায় যে সাপ থাকে, সেই সাপ হয় অতি বিষধর। খবির খাঁর ভাগ্নেকে কী সাপ কেটেছে কে জানে! দ্রুত পৌঁছাতে পারলে ভালো হতো।
কিন্তু এই বর্ষায় নৌকা ছাড়া ফতেহপুর যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
আব্দুল ফকির নৌকায় উঠলেন কিছুক্ষণ বাদে। খবির খাঁ ছইঅলা বড়ো নৌকা পাঠিয়েছেন। নৌকার ভেতরে পরিপাটি বিছানা পাতা। একপাশে মাটির চুলায় রান্নাবান্নার ব্যবস্থাও আছে। খাঁ বাড়ির বাঁধা মাঝি সোহরাব আর মাজেদ এসেছে নাও নিয়ে। তারা দুই ভাই।
আব্দুল ফকিরকে দেখে সোহরাব বলল, ‘ফইরসাব, নাও কি ছাড়ব ?’
আব্দুল ফকির বললেন, ‘আল্লাহ রসুলের নাম নিয়া ছাড়ো। পথে কোথাও থামবা না। বাকি রাইত একটানা নাও বাইবা।’
‘জে।’
‘দেখছো কী শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস বইতাছে ?’
‘জে।’
‘আইজ ঝড়তুফান অইবো। সেই ঝড়তুফানেও নাও তীরে ভিড়াইবা না। কোনো দিক না চাইয়া একটানা নাও বাইবা। কথা পরিষ্কার ?’
মাঝি ভাইদের মধ্যে সোহরাবের বয়স কম। সে গায়েগতরে শক্তিশালী। কিন্তু আব্দুল ফকিরের কথা শুনে যেন খানিক ভড়কে গেল।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩ভীত গলায় বলল, ‘কিছু ইশারা পাইছেন নি ফইর সাব ?’
আব্দুল ফকির জবাব দিলেন না। তিনি নাওয়ের গলুইয়ের কাছে গিয়ে বসলেন। তারপর পানিতে পা ডুবিয়ে যত্ন করে পা ধুলেন। পা ধোওয়া শেষে গম্ভীর মুখে বিছানায় গিয়ে বসলেন। তারপর কাপড়ের পুঁটলি থেকে খানিক ধূপ আর নারকেলের ছোবড়া বের করে জ্বালালেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে চারপাশে ফুঁ দিতে দিতে বললেন, ‘কই মিয়ারা, নাও এহনো ছাড়ো নাই ? নাও ছাড়ো, নাও ছাড়ো।’
সোহরাব লগিতে ধাক্কা দিয়ে নৌকা ছাড়ল। হাওয়ার দমক বাড়ছে। একটানা শোঁ শোঁ শব্দ। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে পথ চলতে নৌকার সামনে বিশেষ পদ্ধতিতে জোড়া হারিকেন বাঁধা হয়েছে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না তাতে খুব একটা লাভ হবে। বরং এই প্রবল হাওয়ার ঝাপটায় যে-কোনো মুহূর্তে হারিকেন ছিটকে পড়বে বিলের পানিতে।
আব্দুল ফকির ছইয়ের ভেতর বেড়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। হারিকেনের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া পড়েছে সোহরাবের শরীর অবধি। দেখে মনে হচ্ছে, ভয়ালদর্শন কোনো অশরীরি অস্তিত্ব! চিমনির ভেতর কম্পমান আলোয় সেই ছায়া যেন ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠছে।
সোহরাবের হঠাৎ কেমন ভয় করতে লাগল। মনে হতে লাগল, এই মুহূর্তে ওই হারিকেনগুলো যদি নিভে যেত! যদি অন্ধকার হয়ে যেত সব! তাহলে বরং ভালোই হতো। এই গা-ছমছমে আলো-আঁধারিতে আব্দুল ফকিরের ওই ভয়ংকর ছায়ার ভেতর আর বসে থাকতে হতো না তাকে।
সোহরাবের ভাবনা শেষ হলো না। তার আগেই প্রবল হাওয়ায় হারিকেন ছিটকে পড়ল পানিতে। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল নৌকা। তবে কেউ কোনো কথা বলল না। যেন সবকিছুই হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
সেই স্তব্ধ স্থিরতায়ও সোহরাব আর মাজেদ এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতর নৌকা বেয়ে চলল।
নৌকা খবির খাঁর বাড়ির ঘাটে পৌঁছাল ফজরের আজানের সময়। তখন কেবল পুবাকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে। সেই আলোয় খবির খাঁকে দেখা গেল। তিনি তার লোকজন নিয়ে ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে, ভাগ্নেকে নিয়ে ভয়ানক দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কেটেছে তার।
আব্দুল ফকির এক পা নামিয়ে শানবাঁধানো ঘাটে রাখলেন। সোহরাব ঘোরগ্রস্ত চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। যেন রাতের ঘটনার ঘোর থেকে এখনো বের হতে পারে নি সে।
খবির খাঁ খানিক এগিয়ে এসে আব্দুল ফকিরের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘ফইরসাব, সালাম...।’
আব্দুল ফকির অবশ্য খবির খাঁর সালামের জবাব দিলেন না। তিনি বরং বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠলেন, ‘খবরদার! নড়িস না, ছোরাব। নড়িস না। যুইতমতন বইস্যা থাক!’
সোহরাব আব্দুল ফকিরের কথার কিছুই বুঝল না। সে তীব্র আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইল। আব্দুল ফকির সামান্য এগিয়ে এসে সোহরাবের পায়ের নিচে, গলুইয়ের ভেতরের ফাঁকা অংশে হঠাৎ বিদ্যুদ্বগে হাত চালালেন।
তারপর নৌকার গলুইয়ের ভেতর থেকে বের করে আনলেন ভয়ালদর্শন এক গোখরা!
সেই গোখরা ফোঁস করে ফণা তুলতে চাইল উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে।
বিস্মিয়ে, আতঙ্কে সকলেই যেন পাথরের মূর্তির মতন জমে গেল!
আব্দুল ফকির অবশ্য কারও দিকে তাকালেন না। তিনি সাপটাকে মুঠোয় চেপে ধরে মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে হিসহিস করে বললেন, ‘কীরে কাল নাগীন, নাওয়ে চইড়া তোর অত দূর পথ যাওন লাগলো ? আমি নিজেই তো আইতেছিলাম, তাইলে এতো তরাস ক্যান তোর ?’
উপস্থিত সবগুলো চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
নড়তে ভুলে গেছে সকলে।
সোহরাবের বুকের ভেতর থেকে যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে হৃৎপিণ্ড। ওই সাপটা তাহলে সারা রাত তার আসনের নিচে কুণ্ডুলি পাকিয়ে বসে ছিল ?
সে ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে রইল।
আব্দুল ফকির সাপের গলাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে রক্ত হিম করা কণ্ঠে বললেন, ‘খা রে খা, বক্ষিলারে খা।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩খবির খাঁর বাবা তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অশীতিপর বৃদ্ধ। তবে এই বয়সেও যথেষ্ট শক্তপোক্ত মানুষ তিনি। নানান কঠিন নিয়মকানুন মেনে চলেন। রোজ রাত আটটায় ঘুমাতে যান। ঘুম থেকে উঠে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়েন। তারপর গ্রামে হাঁটতে বেরোন। আজ অবশ্য লোকজনের কোলাহলে তার ঘুম ভেঙে গেছে আগেভাগেই। ঘুম ভেঙে শোনেন, নয়নকে সাপে কেটেছে! নয়ন তার নাতি। সে এতোবছর পর গ্রানে এসেছে! এই আসা এক মৃতপ্রায় সম্পর্ককে পুনর্জন্ম দেয়ার মতো ব্যাপার। অথচ তার সঙ্গে ঘটল এমন ভয়ংকর ঘটনা! তৈয়ব উদ্দীন খাঁর দিশেহারা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তা হলেন না। কিংবা তার আচরেণে তা প্রকাশ পেলো না। কোনো হুলস্থুল, চিৎকার, চেচামেচি, কান্নাকাটি কিছুই না। বরং দীর্ঘসময় তিনি চুপচাপ বসে রইলেন। সম্ভবত নিজেকে সামলে নিতে এই সময়টুকু তার দরকার ছিলো।
উঠানের পশ্চিম দিকের ঘরে মৃতের মতো পড়ে আছে নয়ন। সেখানে গেলেন তিনি। সামান্য শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে নয়নের। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সাহসী মানুষ। কিন্তু নাতিকে এই অবস্থায় দেখে তার সেই সাহসী মনও যেন টলে উঠল। নয়নের ডান হাতের আঙুলে ছোবল মেরেছে সাপ। সেই হাত দড়ি দিয়ে ঘরের উঁচু আড়ার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাতের কব্জি ও বাহুতেও বাঁধ। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নাতির সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না।
দীর্ঘ উঠান পাড়ি দিয়ে তিনি নিজের ঘরে ফিরলেন।
সেই থেকে চুপচাপ বসে আছেন। তার মাথাজুড়ে অসংখ্য এলোমেলো ভাবনা। এই ভাবনার কোনো কূলকিনারা নেই। তৈয়ব উদ্দীন খাঁ রাশভারী মানুষ। কারও সঙ্গে প্রয়োজন অতিরিক্ত কথাবার্তা বলেন না। দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবন তিনি কাটিয়েছেন। প্রথম যৌবনে অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলেন। সেই স্ত্রী পরপর দুই পুত্রসন্তান জন্ম দিয়ে গত হয়েছিলেন। সেই পুত্র সন্তানদের একজন এখন ফতেহপুরের চেয়ারম্যান। নাম খবির খাঁ। আর অন্যজন ঘরসংসার ত্যাগ করে বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার নাম দবির খাঁ।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশুপুত্রদের কথা বিবেচনা করেই তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আর দীর্ঘদিন বিয়ে করেন নি। সৎ মা এসে তাদের কতটা দেখভাল করবে, এ নিয়ে তিনি যথেষ্টই সন্দিহান ছিলেন। ফলে ছেলেদের বড় করতে বছরের পর বছর একাকী নিঃসঙ্গ জীবন তিনি কটিয়েছেন।
তবে বড় ছেলে খবির খাঁর বয়স যখন কুড়ি, তখন দ্বিতীয় বিয়ে করলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তার এই দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম আমোদি বেগম। আমোদি বেগম দরিদ্র ঘরের মেয়ে হলেও দেখতে রূপবতী ছিলেন। গায়ের রঙ দুধে আলতা।টিকালো নাক। গভীর চোখ। পাতলা ঠোঁট। বয়সও ছিল কম। সৎ পুত্র খবির খাঁর চেয়ে মাত্র বছর দুয়েকের বড় ছিলেন তিনি।
দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এক কন্যাসন্তানের পিতা হলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তিনি সেই কন্যার নাম রাখলেন কোহিনূর। কোহিনূর হলো জগৎবিখ্যাত হিরা। তিনি সেই হিরার নামেই মেয়ের নাম রাখলেন। এর অবশ্য কারণও ছিলো। কোহিনুর দেখতে হয়েছে অপূর্ব রূপবতী। তার দিকে একনজরে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ঘোর লেগে যায়।
অতি মন্দ মেনে নেওয়ার চেয়ে অতি ভালো মেনে নিতে মানুষের সমস্যা হয় বেশি। সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। মানুষ তীব্র অসুন্দরকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভয় পায় তীব্র সৌন্দর্যকে। তার ভেতর এক ধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করে। মনে হতে থাকে, এই নিখুঁত সৌন্দর্যের আড়ালে বুঝি ভয়াবহ কোনো অনাবিষ্কৃত কদর্যতা লুকিয়ে আছে। এই কারণে মানুষ তীব্র সৌন্দর্য সহসা সহ্য করতে পারে না। সন্দিগ্ধ বা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। মনে নানাবিধ ভয় ও সংশয় জাগে।
কে জানে, অতি সুন্দর কিছুকে মানুষ একারণেই ‘ভয়ংকর সুন্দর’ বলে অভিধিত করে কিনা! হয়তো তীব্র ওই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য কিংবা ‘ভয়’কে সে অস্বীকার করতে পারে না বলেই তাকে বলে 'ভয়ংকর সুন্দর! '
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩কোহিনুরের সৌন্দর্য সেই ভয়ংকর সৌন্দর্যের উদাহরণ। যা দেখে তার চারপাশের মানুষের অস্বস্তি হতে থাকে। তারা সন্দিগ্ধ ও ভীত বোধ করে। মনে হয়, এই সৌন্দর্য স্বাভাবিক তো!
কোহিনূর যত বড় হতে থাকে, তত এই অস্বস্তিও বাড়তে থাকে। লোকে তাকে সহজভাবে নিতে পারে না। আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে কথা বলে। নানান ফিসফাস করে। তবে এতে তার রূপের যেমন ভূমিকা আছে, তেমনি ভূমিকা আছে তার আচরণেরও।
কোহিনুর তার বাবা ছাড়া কারও সঙ্গে মিশত না।
কথা বলত না। বাড়ির উঠোনে, আশপাশে সারাক্ষণ একা একা ঘুরে বেড়াত। মাঝেমধ্যে আপনমনে নিজের সাথে নিজে কথা বলত।
সে শান্তশিষ্ট, ধীরস্থির স্বভাবের অতি স্বাভাবিক এক শিশু। কিন্তু তার সেই স্বাভাবিকত্বে হঠাৎ হঠাৎ প্রবল অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করা যেত। এবং সেগুলো ভীতিকর।
কিছু কিছু ঘটনা তৈয়ব উদ্দিন খাঁর এখনো মনে আছে।
কোহিনুরের তখন বছর তিনেক বয়স। সে বসে ছিল উঠানের পাশে কাঁঠালগাছের ছায়ায়। তার সামনে খেজুরপাতায় বানানো অনেকগুলো চরকি। চরকিগুলো বানিয়ে দিয়েছে খাঁ বাড়ির অতি পুরাতন গৃহকর্মী মমিনের মা। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
কোহিনুর খেজুরকাঁটার মাথায় আলতো করে চরকি বিঁধিয়ে ঘোরানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু পারছিলো না। মমিনের মা প্রবল আগ্রহ নিয়ে বার দুয়েক তাকে সাহায্য করতেও এগিয়ে এল। কিন্তু লাভ হলো না। কোহিনুর তাকে গম্ভীর মুখে সরিয়ে দিয়ে আবারও মনোযোগী হয়ে পড়ল কাজে। কিন্তু তাতে ফলাফলের কোনো হেরফের হলো না। বরং তার সুন্দর মুখখানা ক্রমশ মলিন হতে লাগল। চোখের দৃষ্টি হতে লাগল কঠিন। এবং তার সেই কঠিন দৃষ্টিতেও টলমল করে জেগে উঠতে লাগল অশ্রু।
মমিনের মা আরও একবার এগিয়ে এল। কোহিনুর আবারও সরে গেল। কিন্তু মমিনের মা যেন এবার নাছোড়বান্দা। সে কোহিনুরের সামনে গিয়ে তার মুখোমুখি বসল। তারপর খানিক ঝুঁকে কোহিনুরের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আদুরে কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘আমার কাছে দেও গো মা। দ্যাহো, আমি কী সোন্দর কইরা গাঁইত্থা দেই। দেও, দেও।’
কোহিনুর মমিনের মায়ের দিকে ফিরেও তাকাল না। সে বরং পিছু সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মমিনের মা তাকে এক হাতে জাপটে ধরে আরেক হাতে চরকিখানা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।। একবার, দুইবার, তিনবার। প্রতিবারই কোহিনূর হাত সরিয়ে নিল।
কিন্তু চতুর্থবার ঘটল ভয়াবহ ঘটনা।
মমিনের মা হাত বাড়াতেই কোহিনুরের হাতখানা যেন সাপের মতন ছোবল মারল তার চোখে। সে তীব্র চিৎকারে চোখ চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার হাতের ফাঁক গলে দরদর করে বেরিয়ে আসতে লাগল তাজা রক্ত।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বসে ছিলেন ঘরের দাওয়ায়। তিনি হতভম্ব চোখে কোহিনুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ছুটে এলেন মমিনের মায়ের কাছে। সে তখন জবাই করা মুরগির মতন তড়পাচ্ছে। তার কান ফাটানো চিৎকারে চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে এল।
মমিনের মায়ের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কোহিনুরের কাঁটার আঘাত তার চোখে লাগে নি। লেগেছে চোখের সামান্য নিচে। পুরো বিষয়টাই ভয়ানক। তবে এই ভয়ানক ব্যাপারেও তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যতটা আতঙ্কিত হন নি, তারচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়েছেন অন্য কারণে। এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরও কোহিনুর একটুও বিচলিত হয় নি। বরং সে একমনে খেজুরকাঁটায় গেঁথে চরকিখানাকে ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার হাতের সেই কাঁটায় লেগে রয়েছে রক্ত। রক্ত মেখে যাচ্ছে চরকিতেও। কিন্তু তাতে যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই তার!
এই ঘটনার পর থেকে কোহিনুর সম্পর্কে সকলেরই যেন বেশ খানিকটা আড়ষ্টতা কাজ করতে শুরু করলো। সঙ্গে আরও নানান বিষয়। যা সময়ের সাথে সাথে তাকে তার চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে লাগল। কোহিনুর অবশ্য এতে খুশিই হলো।
সে আরও বেশি একা থাকার সুযোগ পেয়ে গেল। বয়স যত বাড়তে লাগল, ততই যেন আরও বেশি অন্তর্মুখি, আরও বেশি রূপবতী হয়ে উঠতে লাগল সে। এই নিয়ে চারপাশের ফিসফিসানিও বাড়তে লাগল। বিভিন্ন ঘটনা-অঘটনে সেসব ফিসফিসানি ক্রমাগত ডালপালা ছড়াতে থাকল।
একবার এক মাঝরাতে সে একা একা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গভীর ঘুমে অচেতন খাঁ বাড়ির কেউই কিছু টের পেল না। ঘটনা জানাজানি হলো ফজরের আজানের পর। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নামাজ পড়তে উঠে দেখেন কোহিনূর নেই! তিনি দিশেহারার মতো চারদিকে লোক পাঠালেন। পুকুরের পানিতে জাল ফেলা হলো। দিক্বিদিক লোক ছুটতে লাগল।
কোহিনুরকে অবশ্য পাওয়া গেল খাঁ বাড়ির জামে মসজিদের সামনে স্তূপ করে রাখা শুকনো খড়ের গাদার ভেতর। সেখানে সে বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছিল।
এই ঘটনার পর তাকে নিয়ে আরও বেশি সত্য-মিথ্যা গল্প ছড়াতে লাগল। সেইসব গল্পে হাজার বছর ধরে চলে আসা গ্রামীণ সংস্কারে রূপবতী মেয়েদের নানান দুর্ভাগ্যের কথা যেমন আসতে লাগল, তেমনি আসতে লাগল অতিপ্রাকৃত নানান অশুভ শক্তির কথাও।
চাঁদের গায়ে যেমন সামান্য দাগ পড়লেই সেটি কলঙ্ক হয়ে যায়, তেমনি রূপবতী মেয়েদেরও সামান্যতেই কলঙ্কের অভাব হয় না।
এইসব ফিসফিসানি অবশ্য তৈয়ব উদ্দিন খাঁর কান অবধি খুব একটা পৌঁছায় না। লোকে তাকে ভয় করে। সমীহ করে। ফলে তার অতি আদরের কন্যাকে নিয়ে এসব কথা তাকে বলার সাহস কারও নেই।
সেবার অবশ্য কথাটা তুললেন স্বয়ং আমোদি বেগম। তিনি বললেন, ‘ঘটনা শুনছেন ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ঘটনা শুনতে চাইলেন না। তার ধারণা, আমোদি বেগম তরল হাসি ঠাট্টা করা নির্বোধ ধরনের মেয়েছেলে। যার বেশির ভাগ কথারই কোনো অর্থ নেই। ফলে তিনি এতে কোনো আগ্রহ খুঁজে পান না।
‘হুম।’ গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।
‘আপনের মাইয়ারে নাকি বজলু ব্যাপারীর বাড়ির আমড়াগাছে দেখা গেছে!’
ঝট করে মুখ তুললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ, ‘কী ?’
আমোদি বেগম দাঁত বের করে হাসলেন। তারপর হাসতে হাসতেই বললেন, ‘মিছা কথা বললাম। মিছা কথায় ইছা বল, সাথে সাথে দিছে ফল।’
যেন দারুণ কোনো হাসির কথা বলেছেন, এমন ভঙ্গিতে শরীর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলেন তিনি। তারপর অতি কষ্টে হাসি চেপে বললেন, ‘আপনে তো আর আমার কথা শোনার জন্য মুখ তুইলা তাকাইবেন না, এইজন্য মাইয়ার নামে মিছা কথা বললাম। দেখলেন, মিছা কথায় সাথে সাথে ফল দিছে। আপনে মুখ তুইলা তাকাইছেন।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ গম্ভীর মুখে বললেন, ‘যা বলতে আসছ বলো।’
‘বজলু ব্যাপারীর ছোট পোলা ফজু আসছিল। এইটুক পোলা। বছর পাঁচ বয়স। কী পাকনা পাকনা কথাই না জানে গো আল্লাহ! সেই পোলা বলে, তার বাপে নাকি গত রাইতে তাদের আমড়াগাছের ডালে আমাগো কোহিনুররে বইসা থাকতে দেখছে। আমার মাইয়া কি আমড়াগাছের পেতনী নি, কন? কোহিনূররে ওইভাবে বইসা থাকতে দেইখাই নাকি বজলু ব্যাপারি দিছে চিৎকার। শুইনা তার বউ পোলা মাইয়াও ছুইটা আসছে। আর তারপর নাকি তারাও দেখছে কোহিনূররে! কী ঘটনা কন! এরপর ভয়ের চোটে পুরা বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড ঘইটা গেছে।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আমোদি বেগমের দিকে তাকিয়ে মেঘের মতো থমথমে, স্থির, শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘এই কথা বজলু বলছে ?’
আমোদি বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। এই তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে তিনি ভয় পান। বাঘের মতন ভয়। এই তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ভয়ংকর!
পরদিন ভোরে বজলু ব্যাপারীর বাড়ির পেছনের জঙ্গল কাটা শুরু হলো। শুরু হলো আশপাশের সকল গাছপালা কাটাও। বজলু ব্যাপারীর বাড়ির ভিটায় যে বিশাল আমড়াগাছ ছিল, সেই আমড়াগাছও কাটা হলো। আমড়াগাছের সাথে বসতভিটার আম, জাম, কাঠাল, নারকেলসহ আর সব গাছও কেটে ফেলা হলো। দু-দিনের মাথায় বজলু ব্যাপারীর বাড়িখানা দেখে মনে হলো সদ্য কামানো চকচকে একখানা ন্যাড়া মাথা। সেই মাথার মাঝখানে একগোছা চুলের মতন কেবল বিসদৃশ্যভাবে জেগে আছে একখানা ঘর।
বজলু ব্যাপারী অবশ্য গাছ কাটার আগেই ছুটে এসেছিল। হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলো তৈয়ব উদ্দিন খাঁর কাছে। কিন্তু তা্তে লাভ হয়নি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মন গলেনি। তিনি নির্বিকার মুখে বলেছিলেন, ‘তোর তো উপকারই করলামরে বজু। আমার মাইয়া রাইত-বিরাইতে তোর বাড়ির গাছে পাও ঝুলাইয়া বইসা থাকে। সেই জিনিস দেইখা তোর বউ পোলা মাইয়া ডরায়। তাগো দাঁতে খিল লাইগা যায়। এইটা কোনো কথা ? আমি থাকতে এই গ্রামে আমার মাইয়ার জন্য কারও এমন অসুবিধা হইতে পারে না। তাই সিদ্ধান্ত নিছি, তোর বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনো গাছপালা থাকব না।’
‘খাঁ সাব...।’
‘শোন, চিন্তার কিছু নাই। গাছপালা না থাকলে গাছপালার ডালও থাকব না। আর ডাল না থাকলে আমার মাইয়াও রাইত-বিরাইত গিয়া সেই ডালে পাও ঝুলাইয়া বইসা থাকতে পারব না। পারবো?'
বজলু কী বলবে ভেবে পেলো না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, 'ঝামেলা এড়ানো সহজ। আর যেই জিনিস সহজে এড়ানো যায়, সেই জিনিস কঠিন করার মানুষ আমি না।’
বজলু ব্যাপারী কান্নাকাটি করল, হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইল, কিন্তু তাতে লাভ কিছু হলো না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এককথার মানুষ। তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ায়, এমন সাধ্য এ অঞলে কারো নেই।
বজলু ব্যাপারীর বাড়ির আমড়াগাছের ডালের ঘটনা যে পুরোপুরি মিথ্যে, তা কিন্তু না। তার বাড়ির বিশাল আমড়াগাছের ডাল কাটতে গিয়ে দেখা গেল সেই ডালে আজদাহা এক মনুষ্য আকৃতির ঘুড়ি আটকে আছে। ঘুড়ির রং কটকটা হলুদ। আবছা অন্ধকারে সেই ঘুড়ি দেখেই সম্ভবত ভয় পেয়ে গিয়েছিল বজলু ব্যাপারি। সে সেই কথা স্বীকারও করল।
কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তাতেও নিরস্ত হলেন না। তিনি বজলু ব্যাপারীর ভিটেবাড়ির সব গাছপালা কেটে ফাঁকা করে ফেললেন।
এই ঘটনার পর কোহিনুরকে নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাবলি একদম বন্ধ হয়ে গেল। যেন এ গাঁয়ে সে নিষিদ্ধ এক নাম। তার বিষয়ে কিছু উচ্চারণ করাও ভয়ানক অশনিসংকেত। এতে অবশ্য সমস্যা কমার পরিবর্তে বাড়ল আরও। কোহিনূর হয়ে পড়ল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, অগম্য এক মানুষ। রহস্যময়ও।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কেমন তন্দ্রার মতো লেগেছিল। আর তাতেই চোখের সামনে যেন ছবির মতন স্পষ্ট হয়ে ভেসে বেড়াতে লাগলো বহু বহু বছর আগের সেই ঘটনাগুলো।
কত বছর আগের ঘটনা এসব ?
ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ, নাকি আরও বেশি ? তিনি সময়টা ঠিকঠাক মনে করতে পারলেন না।
পুবাকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। খানিক বাদেই ফজরের আজান হবে। তাকে এখনই নামাজের জন্য তৈরি হতে হবে। কিন্তু আজ শরীরটা যেন সায় দিচ্ছে না। অথচ রোজ সবার আগে ঘুম থেকে উঠে মসজিদে যান তিনি। নামাজ শেষে খানিক হাঁটাহাঁটি করেন। এ সময়ে তার সঙ্গে থাকে এস্কান্দার। এস্কান্দার এ বাড়িতেই মানুষ। তার বাবা হায়দার আলী ছিলেন খাঁ বাড়ির বান্ধা লাঠিয়াল। সেকালে চর দখলের ভয়াবহ লড়াই হতো। সেই লড়াইয়ে খাঁ বাড়ির আসল শক্তি ছিল হায়দার। সে একাই এক শ লোকের সামনে পর্বত হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারত। এস্কান্দারও বিশাল শরীরের দশাসই মানুষ। লোক তাকেও ভয় পায়। কিন্তু তারপরও তৈয়ব উদ্দিন খাঁ প্রায়ই বলেন, ‘বাপের স্বাস্থ্য শরীলের কিছুই পাইলি না এস্কান্দার। কী পাহাড়ের মতন শরীল আছিল তোর বাপের! আহারে, অল্পবয়সে ঘাট-বমিতে মারা গেল। বাপ বাঁইচা থাকলে বুঝতি, কী বাপ আছিল তোর! কিন্তু বাপের মতো তো কিছুই পাইলি নারে ছ্যামড়া। না বল, না সাহস।’
এস্কান্দার কথা বলে না। চুপ করে থাকে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে বৃদ্ধ এই লোকটিকে সে ভয় পায়। ভালোওবাসে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য জানেন, এস্কান্দার তাকে পিতা জ্ঞান করে। প্রয়োজনে সে তার জন্য জীবনও দিয়ে দিতে পারবে।
ভোরের আলোর আভাস দেখা দিতেই এস্কান্দার দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। আজও এল। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আজ আর মসজিদে গেলেন না। তিনি অজু করে জায়নামাজ হাতে গেলেন নয়নের ঘরে। তারপর হারিকেনের মৃদু আলোয় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। নয়নের মাথাভর্তি চুল। ধবধবা ফর্সা গায়ের রং। ছিপছিপে লম্বা শরীর। যেন হুবহু মায়ের মতো হয়েছে সে। কোহিনুরের অবিকল প্রতিরূপ।
আচ্ছা, কোহিনুরকে কত বছর দেখেন না তিনি ? তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মনে মনে হিসাব করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তিনি নয়নের পাশেই জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। তারপর আল্লাহর কাছে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন।
আব্দুল ফকির ঘরে ঢুকলেন তারও খানিক পর। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মাথা তুলে তাকালেন। দেখলেন তাকে। তবে কথা বললেন না। ঘরের মাঝখানে পুরোনো আমলের উঁচু খাট। খাটের পেছনের দিকের রেলিং ঘেঁষে বাড়ির বউ-ঝিয়েরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তারা সকলেই ভয়মিশ্রিত কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে আব্দুল ফকিরের দিকে।
নয়নের ডান হাতের আঙুলে সাপে কাটার চিহ্ন। সেই চিহ্ন দেখে খানিক থম মেরে বসে রইলেন আব্দুল ফকির। তারপর হঠাৎ চোখ বন্ধ করে মৃগী রোগীর মতন কাঁপতে লাগলেন। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগলেন। জুলফিকার পেছন থেকে তার মাথা চেপে ধরলো। আব্দুল ফকির হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘কালনাগিনী দংশন করেছে গো, কাল নাগিনী...। এই রুগি ঘর থেইকা বাইর কইরা উঠানো নামাও। ক্যালা গাছ পোঁতো উঠানের মধ্যিখানে। এক্ষুণি, এক্ষুণি।’
খাঁ বাড়ির উঠানে হুলস্থুল লেগে গেল। আশপাশের গ্রাম থেকে আব্দুল ফকিরের কয়েকজন সাগরেদও চলে এলো। তারা নানান জিনিসপত্র জোগাড় করল। উঠানের মাঝখানে ছোট্ট পুকুর কাটল। সেই পুকুরের চারধারে কলাগাছ পুঁতে দেওয়া হলো। বড় বড় ঢোল বাদ্যের ব্যবস্থা করা হলো। এসবই আব্দুল ফকিরের বিষ নামানোর বন্দোবস্ত।
সব আয়োজন শেষে শুরু হবে বিষ নামানোর পালা। ঢোলের তালে তালে মন্ত্র পড়বেন আব্দুল ফকির আর জুলফিকার। সেই মন্ত্রের জোরে রোগীর শরীর থেকে বিষ নেমে যাবে। নেমে যাওয়া বিষ শুষে নেবে কলাগাছ। আর তার প্রভাবে ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়বে সতেজ কলাপাতাগুলো। তারপর একসময় মরে যাবে। আর জেগে উঠবে রোগী।
এ যেন জীবনের বিনিময়ে জীবন। বৃক্ষজনমের বিনিময়ে মানবজনম!
আব্দুল ফকির আয়োজন করে ঢোলের ওপর প্রথম শব্দটা করলেন। সেই শব্দ তরঙ্গে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। মানুষ জমে বিশাল ভিড় হয়েছে। তাদের মধ্যে নানান উৎকণ্ঠা, কৌতূহল।
ছেলেটা বাঁচবে তো ?
রুদ্ধশ্বাস শত শত চোখের সামনে আব্দুল ফকির ঢোলে দ্বিতীয় আঘাতটি করলেন। তারপর খানিক অপেক্ষায় রইলেন বাদ্যের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার। প্রথম তিনবার ঢোলে বাড়ি দিতে হয় ধীরে, বিরতি নিয়ে। তারপর মন্ত্র শুরু করামাত্র বাদ্য বাজাতে হয় দ্রুতলয়ে।
আব্দুল ফকির তৃতীয় আঘাতের জন্য কেবল হাত উঁচু করেছেন, এখনই তার হাতখানা নিচে নেমে আসবে, মুহূর্তেরও ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে। কিন্তু তা আর হলো না। তার হাত ভেসে রইল শূন্যে, স্থির। আর তার চোখ আটকে গেল উঠানের মাঝখানে বিষের ঘোরে অচেতন নয়নের খাটিয়ার ওপর।
নয়ন কি মুহূর্তের জন্য নড়ে উঠেছে ?
মৃতের মতন পড়ে থাকা মানুষটা কি আব্দুল ফকিরের এই দুটিমাত্র ঢাকের শব্দেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসতে শুরু করেছে ?
উপস্থিত সকলেই বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। নয়ন যেন তাদের সবাইকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিল। সে ধীরে ধীরে জেগে উঠল ভয়াল মৃত্যুর ওপার থেকে! তারপর কুঞ্চিত কপালে আধখোলা চোখে চারপাশটা দেখতে লাগল।
কী হচ্ছে এখানে ? এত লোকজন কেন চারপাশে ?
তার চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি, বীতশ্রদ্ধ, হতভম্ব ভাব। যেন কোনো গভীর কিন্তু অপরিপূর্ণ নিদ্রা থেকে জেগে উঠেছে সে। আব্দুল ফকিরের এই ঢোলের শব্দ যেন তার সেই গভীর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা আব্দুল ফকিরের। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিপুল বিস্তৃতির এই যুগেও তিনি যে তার ওঝা বিদ্যায় এমন অসাধ্য সাধন করে ফেললেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
এই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী গাঁয়ের শত শত মানুষ। তারা নিঃসন্দেহে আজকের এই ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে থাকবে। আর তা আব্দুল ফকিরের জন্য বয়ে আনবে আরও বেশি যশ, খ্যাতি, সম্মান ও প্রতিপত্তি। ফলে তার এখন আনন্দে আটখান হয়ে উল্লাসনৃত্যই করার কথা। কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে, তিনি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন নয়নের দিকে। রোগীকে এভাবে সম্ভাব্য মৃত্যুর ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করেও তারচোখেমুখে কোথাও কোনো উচ্ছ্বাস নেই। প্রাপ্তির ছটা নেই। বরং প্রবল দ্বিধামিশ্রিত বিস্ময় নিয়ে তিনি বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন নয়নের দিকে।
যেন এই দীর্ঘ জীবনে এমন ভয়ানক, অবিশ্বাস্য, অস্বাভাবিক ঘটনা আর কখনো ঘটে নি!
নানাবাড়িতে দিন তিনেক থেকেই ঢাকায় ফিরে যাবে বলে কথা দিয়ে এলেও নয়ন থেকে গেল দীর্ঘসময়। ফতেহপুরে এখনো মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক তেমন সুবিধাজনক নয়। তারওপর ইলেক্ট্রিকের পিলার বসলেও কী এক জটিলতায় তাতে আর তার বসে নি। ফলে সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনখানা ব্যবহার অযোগ্য হয়েই পড়ে রইল। তবে এরমধ্যেই দূরের গঞ্জে গিয়ে একবার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে এসেছে নয়ন। মাকে জানিয়েছে, তার ফিরতে আরও বেশ কিছুদিন দেরি হবে।
সাপে কাটার ঘটনা থেকে সেরে উঠে নয়ন যেন গাঁয়ের অনাস্বাদিত জীবনের স্বাদ শুষে নিতে লাগল। বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা, নৌকায় চড়ে বিলের শাপলা তোলা, মাছ ধরা, কলাগাছের ভেলায় ঘুরে বেড়ানো—এমন সকল আনন্দই উপভোগ করতে লাগল সে।
সেদিন রঘু বয়াতিকে দিয়ে নানাবাড়িতে গানের আসরও বসাতে চাইল। কিন্তু এই কথা শুনে বাড়ির সকলেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। যেন নয়ন খুব ভয়ংকর কিছু বলেছে। এসব অঞ্চলে গৃহস্থবাড়ির উঠানে রাতভর গান-বাজনার আয়োজন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তাহলে? সবাই হঠাৎ এমন ভয় পেয়ে চুপসে গেলো কেন? 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
এই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া গেলো। সমস্যা হচ্ছে, তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এসব পছন্দ করেন না। তিনি গল্প-কবিতা, গানবাজনা, নাচ কিছুই সহ্য করতে পারেন না। এই নিয়ে এ বাড়িতে ভয়ানক এক ইতিহাসও আছে।
সেই ইতিহাসের মূল চরিত্র কিংবা কেন্দ্রবিন্দুও নয়নের মা কোহিনুর।
কোহিনুরকে নিয়ে তখন ভীষণ দুশ্চিন্তা সকলের। তৈয়ব উদ্দিন খাঁও মেয়ের নানাবিধ অস্বাভাবিক আচার-আচরণে সন্ত্রস্ত, শঙ্কিত। সে কারণেই কি না কে জানে, খাঁ বাড়ির ইতিহাসে প্রথম মেয়ে হিসেবে কোহিনুরকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন তিনি। তবে এজন্য কোহিনূরকে চোখের আড়ালও করতে হয়েছিল তাকে।
ফতেহপুরে তখনো তেমন স্কুল-মাদ্রাসা নেই। তা ছাড়া কোহিনুরকে নিয়ে গাঁয়ের মানুষের ভেতরও নানান অস্বস্তি, ফিসফিসানি, ভয়। এর প্রভাব তার ওপরও পড়ছিল। ফলে অনেক চিন্তাভাবনা করেই কোহিনূরকে তার নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ভর্তি করানো হলো সেখানকার এক স্কুলে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ভেবেছিলেন, নানাবাড়ির ভিন্ন পরিবেশে থেকে পড়াশোনা করতে গিয়েও যদি কোহিনুরের অস্বাভাবিকত্ব কিছুটা কমে!
তা কমলো কিনা বোঝা গেলো না। তবে সেখানে ক্লাস এইট অবধি পড়েছিল কোহিনূর। তারপর অদ্ভুত এক কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।
স্কুলের হেডমাস্টার অমল বাবু কোহিনুরকে ভীষণ পছন্দ করতেন। তিনি একবার তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে দীর্ঘ এক পত্র লিখলেন। পত্রের প্রথমাংশে লিখলেন—
‘শ্রদ্ধাভাজনেষু,
আপনার কন্যা কোহিনূর কেবল রূপেই নয়, গুণেও সমান গুণান্বিতা। তাহার হস্তাক্ষর মুক্তার ন্যায় জ্বলজ্বলে। ছড়া ও কবিতায় তাহার পারঙ্গমতা আমাকে বিস্মিত করিয়াছে। তাহার ছন্দ ও মাত্রাজ্ঞান প্রকৃতিপ্রদত্ত। এর মধ্যেই সে এক আচনক কাণ্ড ঘটাইয়াছে। আমি নিজ উদ্যোগে তাহার একখানা ছড়া ফরিদপুর জেলার স্বনামধন্য এক পত্রিকায় পাঠাইয়াছিলাম। সেই ছড়া তাহার ছবিসমেত ছাপা হইয়াছে। আমি নিজে কুড়িখানা পত্রিকা খরিদ করিয়া আনিয়াছি। ফরিদপুর শহরে নানা সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হয়, আলোচনাসভা হয়। আমার পরিকল্পনা রহিয়াছে আমি তাহাকে উপর্যুক্ত সাহিত্যসভাগুলোতেও লইয়া যাইব...।’
এরপর পত্রে আরও দীর্ঘ বিবরণ ছিল। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সময় নিয়ে সেসব পাঠ করলেন। পত্রের শেষে এসে বেশ বড়সড় ধাক্কা খেলেন তিনি। সেখানে অমল বাবু ফুটনোট দিয়ে লিখেছেন—
পুনশ্চ : ভাবিয়াছিলাম আপনার নিকট প্রকাশ করিব না। কিন্তু কেমন অস্বস্তি হইতেছিল। তাই না বলিয়া পারিলাম না। আমি ইতিমধ্যেই দুইবার কোহিনুরকে লইয়া ফরিদপুর গিয়াছিলাম। তাহাকে সাহিত্য সভায় অনেকের সহিত পরিচয় করাইয়া দিয়াছিলাম। যদিও সে কাহারো সহিত কোনোরূপ বাক্যালাপ করে নাই। আশ্চর্য ব্যাপার হইল, সে স্কুলেও কাহারো সহিত কোনোরূপ কথাবার্তা বলে না। শিক্ষকদের সহিতও না। তবে সে আমাকে অত্যধিক পছন্দ করে। আমিও তাহাকে আমার কন্যাসম স্নেহ করি। আপনি জানিয়া ব্যথিত হইবেন যে তাহার বয়সী আমার একমাত্র কন্যা অপলা জলে ডুবিয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছে। কোহিনুরকে দেখিলেই আমার অপলার কথা স্মরণ হয়। তখন আমি আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারি না। মনে হয়, সে-ই আমার অপলা। কোহিনুর আমাকে লইয়াও একখানা ছড়া লিখিয়াছে। সেই ছড়াতে সে আমাকে পিতা বলিয়ে সম্বোধন করিয়াছে। তাহার সেই ছড়াখানা দেখিয়া তৎক্ষণাৎ আমার চক্ষু জলে সিক্ত হইয়া গিয়াছে। কী আচানক কাণ্ড, এই যে এখন সেই ছড়ার কথা আপনাকে লিখিতে গিয়াও আমার চক্ষু আবারও জলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে!’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কেন যেন এই ঘটনা সহ্য করতে পারলেন না। তার ভেতরে প্রবল রাগ আর অস্থিরতা তৈরি হলো। এর কারণ হতে পারে দুটি।
এক. তার অনুমতি ছাড়াই কোহিনুরকে দুই দুইবার ফরিদপুর নিয়ে যাওয়া। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার জগতে একচ্ছত্র অধিপতি। সেখানে তার অনুমতি ছাড়া গাছের পাতাটি অবধি নড়ে না। অথচ কোহিনূর, যে কিনা তার প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা, তাকে কোনো অনুমতি ছাড়াই অতদূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গান-কবিতার জন্য! এ ভয়াবহ ধৃষ্টতা। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ধৃষ্টতা সহ্য করার মতো মানুষ নন। তার ঠান্ডা চোখের সামান্য দৃষ্টিতেই দশ গ্রামের মানুষ থরথর করে কাঁপে! অথচ, সেই তার কন্যাকেই কিনা সামান্য এক স্কুল মাস্টার কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই অতদূর শহরে নিয়ে গিয়েছিল!
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩এ নিঃসন্দেহে ভয়াবহ এক অন্যায়।
দুই. অমলবাবুর প্রতি কোহিনুরের আসক্তি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ পাথরের মতো নিরেট কঠিন মানুষ। সহসা কারো প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা, মমতা অনুভব করেন না। কিংবা করলেও তা কখনো প্রকাশ করেন না। নিজের ভেতর রেখে দেন। কিন্তু তার সেই পাথুরে অনুভূতির পৃথিবীতে কোহিনূর যেন আবির্ভূত হয়েছে শীতল সর্বপ্লাবী মায়াময় এক ঝর্ণা হিসেবে। যার স্পর্শে, দর্শনে, অনুভবে তিনি ভেজা মাটির মতো নরম হয়ে যান। ভালোবাসার তৃষ্ণা অনুভব করেন। অথচ, সেই মেয়েই কিনা কোথাকার কোন শিক্ষককে পিতা জ্ঞান করে! তাকে ভালোবেসে কবিতা অবধিও লিখে ফেলেছে! এমনকি তার সঙ্গে অতদূর ফরিদপুর শহরে পর্যন্ত গিয়েছে!
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ খামখেয়ালি, রাগী, একগুঁয়ে স্বেচ্ছাচারী মানুষ। কারো কথা তিনি শোনেন না। কারো কথায় চলেন না। বরং তার কথায় সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। ফলে বিষয়টা তিনি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারলেন না। সেই দিনই লোক পাঠিয়ে কোহিনুরকে বাড়ি নিয়ে এলেন। এবং তার লেখাপড়াও বন্ধ করে দিলেন।
কোহিনুর অবশ্য কোনো প্রতিবাদ করে নি। সে আবার একা একা তার জগতে ঢুকে গেল। তবে দিন যত যেতে থাকল, তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ততই আবিষ্কার করতে লাগলেন তার এই খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো। কোহিনুর যেন আগের সেই কোহিনুর আর নেই। সে আগে পৃথিবীতে একজন মাত্র মানুষের প্রতিই ভালোবাসা অনুভব করতো, তার সঙ্গেই সখ্য ছিল, অন্য কারো সাথেই কথা অবধি বলতো না সে। আর কোহিনুরের সেই একমাত্র প্রিয় মানুষটি ছিল তার বাবা। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। কিন্তু এই নতুন কোহিনূরের কাছে তিনিও যেন হয়ে রইলেন আর দশজন মানুষের মতোই সাধারণ ও দূরের মানুষ।
'কন্যাতেষ্টা'য় ব্যকুল তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কোহিনুরের এই আচরণ ও দূরত্ব মেনে নিতে পারছিলেন না। আবার তার কঠিন স্বভাবের কারণেই কন্যার প্রতি যে ব্যাকুলতা তিনি অনুভব করেন কিংবা যে অসহায়ত্ব তাকে সারাক্ষণ বিচলিত করে রাখে, তাও কারও কাছেই প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
ফলে প্রবল ব্যাক্তিত্ববান, রাশভারী তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যেন ক্রমশ ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছিলেন। দংশিত হচ্ছিলেন অবর্ণনীয় যন্ত্রণায়। আর এসব কারণেই কি না কে জানে, প্রায়ই তিনি হুটহাট রেগে যেতে লাগলেন। এই অভ্যাসটি তার ছিলো না। বরং তার গাম্ভীর্য, স্বল্প কথন ও রাশভারি শীতল আচরণেই চারপাশ সারাক্ষণ তটস্থ থাকত।
খাঁ বাড়িতে তখন ফসল ওঠার মৌসুম। সেই মৌসুমে প্রতিবছর বয়াতি ডেকে রাতভর গান-বাজনার আয়োজন করা হতো। জমি থেকে তোলা নতুন ধান স্তূপ করে রাখা হতো বাড়ির বিশাল উঠানজুড়ে। হারিকেন কিংবা কুপির আলোয় সেই ধান রাতভর মাড়াই করা হতো। মহিলারা সার বেঁধে প্রকাণ্ড কুলায় ধান ঝাড়ত। বয়াতিরা গান গাইত ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত। চারদিকে কী অদ্ভুত সুন্দর উৎসব উৎসব ভাব! গাঁওয়ের লোকেরা সেই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিতো। খাঁ বাড়ির উঠান ভরে উঠতো কানায় কানায়। বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ের কাছে হ্যাজাক জ্বালিয়ে মাটি খুঁড়ে বিশাল চুলা তৈরি করা হতো। সেই চুলায় আজদাহা সব পাতিলে রান্না করা হতো চাল ডাল মাংসের খিচুড়ি। সঙ্গে গামলা ভর্তি চালতার আচার বাটি ভর্তি পেঁয়াজ মরিচ। সেই খাবারের ঘ্রাণ ছিলো নেশার মতোন। আর স্বাদ যেন অমৃত। লোকেরা গান শুনতে শুনতেই গাছ থেকে কলাপাতা ছিড়ে নিয়ে লাইন ধরে খাবার সংগ্রহ করতে দাঁড়াতো। তারপর জিভ পুড়ে গেলেও ওই আগুনগরম খাবারের নলা তুলে দিতে থাকতো মুখে। ঝালে গরমে চোখে জল চলে এলেও রসনা তৃপ্ত করে আস্বাদন করতো খাবারের প্রতিটি কণা। চেটেপুটে খাওয়া শেষে কলাপাতাটাকে দেখে মনে হতো সদ্য গাছ থেকে ছিড়ে আনা হয়েছে। চকচকে, ঝকঝকে। যেন কোথাও খাবারের দাগ, চিহ্ন পর্যন্ত নেই। সে কী আনন্দ, সে কী অভাবনীয় উদযাপন!
এ যেন কেবল খাঁ বাড়ির অনুষ্ঠান নয়, সেই অনুষ্ঠান, আয়োজন হয়ে উঠত সকলের।
কিন্তু সেবার তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হঠাৎই সেই গানের দলকে বললেন, 'তোমাদের গান গাইতে হবে না। আসছই যখন, তখন তোমাদের যা মজুরি তার ডাবল নিয়া বিদায় হও।'
বলেই বয়াতির দলকে তিনি বিদায় করে দিলেন। সকলে ভেবেছিল দিন দুই বাদেই হয়তো আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাতৈয়ব উদ্দিন খাঁ-ই হয়তো বলবেন, বয়াতির দলকে খবর দিতে। গান বাজনার আয়োজন করতে। কিন্তু তা আর হলো না।
খাঁ বাড়ির বহু বছরের পুরোনো একটি প্রথা সেইদিনই চিরতরে লুপ্ত হয়ে গেল।
এতবছর পর নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া সেই পুরাতন প্রথা যেন নয়ন আবার চালু করতে চাইলো। সে রঘু বয়াতিকে খবর দিয়ে খবির খাঁর স্ত্রী, তার বড় মামির কাছে গেল। বলল, ‘মামি, আজ ভরা পূর্ণিমা। বহুদিন পরে মেঘ-বৃষ্টিও নেই। রঘু বয়াতিকে খবর দিয়েছি। বয়াতির দলে লোক মোট আটজন। তাদের খাবার ব্যবস্থা করতে হবে, পারবেন না ?’
নাজমা বেগম যেন ধাক্কা মতো খেলেন। তার নুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো। তিনি কাঁচুমাচু মুখে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগলেন। তার ছোট ছেলে মনির তখন নদী থেকে এসেছে। তার কাঁধে জল। নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল সে।তিনি তাকে বললেন, ‘এ কী যন্ত্রণার মধ্যে আমি পড়লামরে মনির?'
'কেন? কী হইছে মা?' মনির জিগ্যেস করলা।
'বল তো ? এই বাড়িতে ওই বুড়োর হুকুম ছাড়া কিছু হয়? গাছের পাতাটি পর্যন্ত নড়ে না। আর ও কিনা রঘু বয়াতিরে নিয়ে আসতেছে গানবাজনার জন্য। ও মনির, আমি এসবের কিছু জানি নারে। তুই তোর বাপরে খবর দে। সে এসে যা একটা ব্যবস্থা করুক। আমি এইসবের মধ্যে নাই।'
মনির সহজ সরল নির্বিবাদী মানুষ। সে খবির খাঁর কাছে গিয়ে বলল, ‘আব্বা, এই ঘটনা দাদাজান শুনলে তো বাড়িতে ভূমিকম্প ঘইটা যাইবো। সবাইর পিঠের ছাল তুইলা ফেলবেন দাদাজান।’
মনির ভুল কিছু বলে নি। সব শুনে খবির খাঁও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তার বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। এই গাঁয়ের চেয়ারম্যানও তিনি। তারপরও বাবার সামনে দাঁড়ালে তার হাত পা কাঁপে, বুক ধরফর করে। গলা শুকিয়ে আসে। ঠিকমতো গুছিয়ে কথাও বলতে পারেন না। গুলিয়ে ফেলেন।
অশীতিপর বৃদ্ধ তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে তিনি বাঘের মতো ভয় পান। শুধু তিনিই না, এখনো তার সামনে দশগ্রামের লোক থরহরি কম্প হয়।।
সেখানে খাঁ বাড়িতে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া গানবাজনার আসর আবার শুরু করার কথা কিছুতেই বাবাকে বলতে পারবেন না তিনি। এ সম্ভবও নয়।
তারচেয়ে বরং নয়নকে যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে থামানো যায়।
হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন খবির খাঁ। দহলিজ ঘরের সামনে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বসে আছেন। কবুতরদের ধান খাওয়াচ্ছেনব তিনি। তার সঙ্গে এস্কান্দার। সে ধানের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে পাশে। সমস্যা হচ্ছে এখন কিছুতেই বাবার মুখোমুখি হতে চান না খবির খাঁ। আগে নয়নের সঙ্গে কথা বলতে চান। তারপর যা বলার বলবেন।
কিন্তু বাবার দৃষ্টি এড়িয়ে ভেতরবাড়িতে ঢুকবেন কী করে ? দহলিজ ঘরের ডান পাশে যে সরু রাস্তাটা আছে, সেখান দিয়েই সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকতে উদ্যত হলেন তিনি। তবে তাতে শেষ রক্ষা হলো না তার। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অকস্মাৎ ডাকলেন, ‘খবির!’
তার স্বভাবসুলভ বাজখাঁই কণ্ঠস্বর শুনে খবির খাঁ থমকে গেলেন। তারপর গুটিগুটি পায়ে বাবার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এত অস্থির হওনের কিছু নাই।’
‘জে আব্বা!’
‘নয়ন গান-বাজনা করতে চাইলে করুক। রঘু বয়াতিরে আনতে চাইলে আনুক।’
খবির খাঁ বাবার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তবে সেটি প্রকাশ করলেন না। বরং মৃদু গলায় বললেন, ‘জে আব্বা।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আর কথা বললেন না। মাগরিবের আজান অবধি কবুতরকে ধান খাওয়ালেন তিনি। আর এই পুরোটা সময়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইলেন ষাট ছুঁইছুঁই খবির খাঁ। তার বড় পুত্র। ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। কিন্তু একবারের জন্যও তিনি তার বাবাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারলেন না যে তিনি কি চলে যাবেন, নাকি দাঁড়িয়েই থাকবেন বাবার পাশে!
দহলিজ ঘরের সামনে, বাড়িতে ঢোকার টিনের কাছে তখন অদ্ভুত এক দৃশ্য। সেই দৃশ্য কেউই খেয়াল করলো না। সেখানে এক রূপবতী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখভর্তি মায়া, কৌতূহল। কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে এই গাঁয়ের কেউ! বরং মনে হচ্ছে, সে শহর থেকে এসেছে। কিন্তু এই সন্ধ্যাবেলা কীভাবে একা একা এতোদূরের এই অঁজপাড়াগাঁয়ে চলে এসেছে সে? কী তার পরিচয়? কেন এসেছে সে?
তরুণীকে দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে না এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া নিয়ে সে বিন্দুমাতবিচলিত বা চিন্তিত।
বরং তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়।
সে অসীম মুগ্ধতা নিয়ে ওই অশীতিপর রাগী, গম্ভীর, শীতল চোখের প্রৌঢ় মানুষটি এবং তার ষাট ছুঁই ছুঁই বয়সের বড় পুত্রের অদ্ভুত সম্পর্কের রসায়ন দেখে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছে!
দেখে মনে হচ্ছে ছোট্ট এক শিশু তার রাগী, বাজখাঁই মেজাজের পিতার সামনে বড় কোনো অপরাধ করে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! দৃশ্যটা কী ভীষণ সুন্দর!
আচ্ছা, কী ঘটনা এদের? কী হয়েছে?
রাতভর গানের আসর হলো। আসরে আলো ছড়াল ঢাকা থেকে আসা সেই অচেনা তরুণী। তরুণীর নাম হেমা। তাকে এই বাড়ির কেউ চেনে না। কিন্তু এ নিয়ে তাকে মোটেই ভাবিত মনে হলো না। বরং সে সন্ধ্যায় দহলিজ ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে বলল, ‘নয়নের কাছে আপনার এত এত গল্প শুনেছি যে আপনাকে আমার আর অপরিচিত লাগছে না। বরং প্রথমবারের মতো হলেও আপনাকে দেখেই মনে হলো আমি যেন আপনাকে অনেক বছর ধরে চিনি। আপনি ফতেহপুরের বিখ্যাত তৈয়ব উদ্দিন খাঁ, তাই না ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সরু চোখে তাকালেন। তরুণী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তিনি তাকে সেই সুযোগ দিলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘শহর থিকা আসছ ? ঢাকা ?’
‘জি।’
‘অনেকদূর জার্নি কইরা এই গাঁও গেরামে আসছ। যাও, বাড়ির ভিতরে যাও।’
এস্কান্দার ও খবির খাঁ ভারি অবাক হলো। তবে কিছু বলল না। তরুণী যেহেতু নয়নের প্রসঙ্গ তুলেছে, তার মানে সে তার পূর্বপরিচিত। কিন্তু এই সময়ে এখানে সে এল কী করে ?
মাগরিবের আজান হচ্ছে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ উঠে দাঁড়ালেন। হাতের পাত্রখানা এস্কান্দারের হাতে তুলে দিতে দিতে খবির খাঁকে বললেন, ‘এরে ভিতরবাড়িতে নিয়া যা। আর নয়ন কই ? নয়নরে খবর দে।’
নয়নকে খবর দেওয়া হলো। হেমা উঠানের বাঁ পাশে লিচুগাছতলায় চেয়ারে বসেছিল। নয়নকে দেখে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসল। তারপর দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল, ‘এ কী অবস্থা তোমার ? এ কদিনেই তো দেখি সোনা পুড়ে খাঁটি হয়ে গেছে। নাকি খাঁক ? ঘটনা কী ?’
নয়ন জবাব দিল না। হেমার এমন বহু পাগলামির সাক্ষী সে। কিন্তু তারপরও তার আজকের এই উপস্থিতি ভীষণভাবে চমকে দিয়েছে।
নয়ন বলল, ‘তুমি আমাকে চমকে দিয়েছ হেমা।’
‘তাই ?’
‘হুম।’
‘আমার তো ধারণা তুমি সহজে চমকাও না।’
‘সহজে তো চমকাই নি।’
‘তাহলে ?’
‘কঠিনে চমকেছি।’
হেমা হাসল, ‘কঠিন কী ?’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘এতটা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসা। আমার সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছে না।’
হেমা হেয়ালির ভঙ্গিতে বলল, ‘মনেরে আজ কহো যে, ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে। আমার না, কবিগুরুর কথা।’
‘কী করে এলে ?’
হেমা চকিতে একবার চারপাশটায় দৃষ্টি বোলাল। তারপর বলল, ‘আমার ইউনিভার্সিটির একটা ফিল্ডওয়ার্ক ছিল ফরিদপুরের ওইদিকে। সেখানেই এসেছিলাম। তারপর হঠাৎই মনে হলো, তোমাকে চমকে দিই।’ বলে ভুরু নাচিয়ে হাসল সে।
‘নানাজানের সাথে দেখা হয়েছে ?’
‘হু। হয়েছে।’
‘আচ্ছা।’ বলে সামান্য চুপ করে রইল নয়ন। সে খানিক চিন্তিত। হেমার এভাবে এখানে চলে আসাটা মোটেই ঠিক হয় নি। সে নিজে এতকাল পরে ফতেহপুর এসেছে। এ বাড়ির সঙ্গে মায়ের আড়াল হয়ে যাওয়া সম্পর্কটাও যেন তাতে খানিক জোড়া লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু হেমার এমন অভাবিত আগমন তাতে বিরূপ কোনো প্রভাব ফেলবে কি না কে জানে! এখানকার কারোই বিষয়টা সহজভাবে নেওয়ার কথা না।
কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সাথে হেমার দেখা হয়েছে জেনে নয়ন বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠল। বলল, ‘নানাজান কিছু বলেছেন ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী বলেছেন ?’
দহলিজ ঘরের সামনে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সঙ্গে তার দেখা হওয়ার ঘটনা খুলে বলল হেমা। নয়ন খানিক অবাক হলেও কিছু বলল না।
রাতে বহুকাল পর খাঁ বাড়িতে গানের আসর বসল। সেই আসর সকলের জন্য উন্মুক্ত। খাঁ বাড়ির বিশাল মাঠের মতন বিস্তৃত উঠান লোকে লোকারণ্য। তবে শ্রোতারা যেন খানিক গুটিয়েই আছে। প্রতিটি গানের শেষে রঘু বয়াতির দলকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে অভিনন্দিত করতে সাহস পাচ্ছে না তারা। উঠানের পুবপাশেই তৈয়ব উদ্দিন খাঁর ঘর। অতিরিক্ত কোলাহলে তিনি না আবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। যদিও তিনি নিজ মুখেই এই আসরের অনুমতি দিয়েছেন। এই ঘটনায় সকলেই যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত।
তবে সেই আনন্দের আবডালে চাপা আশঙ্কাও রয়েছে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য ঘর থেকে বের হন নি। খবির খাঁ শেষ মুহূর্তে আরও একবার বাবার ঘরে গিয়েছিলেন। আসলেই তিনি গানের অনুমতি দিচ্ছেন কি না সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য আগের মতোই গম্ভীর গলায় বলেছেন, ‘একবার তো বললাম গান হোউক। এই ছোট্ট বিষয় নিয়া এত কথা বলনের তো কিছু দেখি না।’
সেই থেকে গানের আসর চলছে। এতবছর পর খাঁ বাড়িতে গান করতে পেরে রঘু বয়াতিও ভারি খুশি। সে বিরামহীন গান করে চলেছে। যেন ভুলেই গিয়েছে যে তার আর সেই আগের বয়স নেই। একনাগাড়ে সাত-আটখানা গান গেয়ে রঘু বয়াতি অনেকটাই দমে গেল। গান শুরু করল তার দোহার আমজাদ মিয়া। কিন্তু আমজাদ মিয়ার গানে শ্রোতারা তেমন খুশি নয়। আসর কেমন ঝিমিয়ে পড়ল। শ্রোতরাও ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই হেমা উঠে দাঁড়াল। অনেকগুলো হারিকেনের জ্বলজ্বলে আলোর মাঝখানে তাকে দেখতে লাগছে অপূর্ব রূপবতী এক কিশোরী।
সে তার গাঢ় হলুদ ওড়নাখানা কোমরে গুঁজে দিতে দিতে আমজাদ মিয়াকে বলল, ‘আমি লোকগান খুব বেশি শুনি নি, তবে আমার খুব প্রিয় একটি গান আছে—আনন্দ আইলো গো বালির বিনন্দিত মন, বালির ঘরে উদয় অইছে পূর্ণিমায়া চাঁন। আপনি এই গানটিতে বাজাতে পারবেন ?’
আমজাদ মিয়া গলা শক্ত করে বলল, ‘পারব না ক্যান ? অবশ্যই পারব।’
আমজাদ মিয়া বাজনা শুরু করল। সেই বাজনার তালে তালে সুর তুলল হেমা। নয়ন অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। হেমার গানের গলা ভালো, তা সে জানে। কিন্তু এই অচেনা অজানা অজপাড়াগাঁয়ে হেমার মতো আপাদমস্তক শহুরে এক তরুণী যে এই অপ্রচলিত গানে নিজেকে এমন নিবেদিত করে দেবে, তা কে ভেবেছিল। এ যেন অন্য কিছু! সে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। হেমা যেন অনাবিষ্কৃত নতুন কোনো মানুষ।
হেমার গান শেষ হলো। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। হেমাও না। রঘু বয়াতি কেবল পাশ থেকে উঠে এসে কাঁপা গলায় বলল, ‘মা জননীরে তো চিনলাম না। আপনের নাম কী গো মা ?’
হেমা মৃদু হাসল, ‘হেমা।’
‘আগে তো আপনেরে কোনোদিন দেখি নাই ? খাঁ বাড়ির কুটুম নাকি গো মা ?’
হেমা মাথা নাড়াল। রঘু বয়াতি বলল, ‘আরেকখান গান ধরবেন নি মা ?’
হেমা সলজ্জ গলায় বলল, ‘আমি তো এই গান ছাড়া আর পারি না। একবার ট্রেন স্টেশনে এক ভবঘুরে বাউল দলের কাছে গানটা শুনেছিলাম। কথা আর সুর এমন অদ্ভুত ছিল যে মাথায় গেঁথে গেল। তারপর বহু খুঁজে বের করলাম। আর তো জানি না!’
রঘু বয়াতি বলল, ‘আপনে অন্য যেই গান পারেন, তা-ই গান। আপনের গানের গলা ভালো।’
হেমা খানিক কী ভাবল। তারপর বলল, ‘রবীন্দ্রসংগীত গাই ? কিন্তু...’
হেমা কথা শেষ করতে পারল না। রঘু বয়াতি বলল, ‘গান মা, আপনের যেইটা ভালো লাগে সেইটাই গান।’
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩হেমা চোখ বন্ধ করে বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। আকাশের চাঁদ আর চারপাশের হারিকেনের নরম আলো মিলেমিশে তার ফর্সা মুখখানাকে অপরূপ মায়াময় এক বিভায় ভরিয়ে রাখল।
হেমা খুব ধীরে, দুহাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে বুকের কাছে জড়ো করে গাইল, ‘আজ জোছনারাতে সবাই গেছে বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে...।’
উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে গানবাজনা বলতে যা বোঝায়, তা মূলত রঘু বয়াতির গ্রামীণ লোকগান। তাতে বাজনা-বাদ্য যেমন আছে, তেমনি আছে দোহারদের শারীরিক নানান কসরতও। তারা যেন অকস্মাৎ বাদ্য-বাজনাহীন এই গানের তালটা ঠিক ধরতে পারছে না। কিন্তু হেমার গলায় কিছু একটা ছিল। চাঁদের আবছা আলোয় তার খালি গলায় গাওয়া গান বিষণ্ন সুর হয়ে উপস্থিত দর্শকদের বুকের ভেতর এক অচিনপুরের গভীর বিষাদ ছড়িয়ে দিতে লাগল।
হেমা থামতেই রঘু বয়াতি আবার গান ধরল। দর্শকশ্রোতারা আবার মেতে উঠল পরিচিত কণ্ঠ আর বাদ্যের তালে। কিন্তু এই সুযোগে সকলের অগোচরে হেমা বেরিয়ে এল বাইরে।
অপার্থিব মায়াময় এক জোছনায় ছেয়ে আছে চারপাশ। সেই জোছনা গাছের পাতার ফাঁক গলে পড়ছে মাটিতে। এঁকে দিচ্ছে নানান রকম নকশা। সে সেই জোছনার নকশার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে ঢুকে গেল বাড়ির দক্ষিণ দিকের বাগানের ভেতর।
গত ক’দিনে বৃষ্টি না হওয়ায় মাটির স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা ভাবটা এখন আর নেই। বরং অনেকটাই খটখটে শুকনো। হেমা যেখানে এসে দাঁড়াল, সেখানে দীর্ঘকায় এক চাম্বুলগাছ সটান দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেই দিগন্ত প্রসারিত ফসলের মাঠ। সেখানে ভরা বর্ষার থইথই জল। সেই জল তিরতির করে কাঁপছে। জোছনার আলোয় কম্পমান সেই জলের ঢেউগুলো দেখে মনে হচ্ছে শিল্পীর কল্পনার তুলিতে আঁকা অবাক কোনো নকশা!
হেমা সেই জলের ঢেউয়ের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। বিস্তৃত জলরাশির বুকে অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেই ঢেউয়ের মাথায় চিকচিক করে জ্বলছে জোছনা। সেই জল আর জোছনায় ডুবে গিয়ে হেমা দীর্ঘকায় চাম্বুল গাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘসময়। স্থির, অবিচল। তারপর হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল, তার গাল বেয়ে নেমে আসছে উষ্ণ জলের ধারা।
কাঁদছে সে। কিন্তু কেন কাঁদছে ?
কী এমন দুঃখ তার ?
যে দুঃখের কথা সে কাউকে বলতে পারছে না ?
অচেনা অজানা এক গাঁয়ের বিস্তৃত জলরাশির কাছে দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত অপার্থিব জল আর জোছনার কাছে এসে তাকে কেন এমন করে কাঁদতে হচ্ছে ?
কী এমন দুঃখ সে সযত্নে পুষে রেখেছে বুকের গহিন কোণে ?
কে জানে, হয়তো মানুষের গভীর দুঃখগুলো এমনই। সে তার পুরোটা জীবনজুড়েও জানে না, কার কাছে সে তার সেই দুঃখের কথা কইবে। কার কাছে সঁপে দিবে এই লুকানো একান্ত অনন্ত দুঃখগাথা!
নয়ন যে কখন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, টেরই পায় নি হেমা। কাছেই কোথাও ডানা ঝাপটে উড়ে গেল নাম-না-জানা নিশাচর কোনো পাখি। তার শব্দে ঘুরে তাকাল হেমা।
নয়নকে হঠাৎ দেখে কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল সে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তুমি এখানে ? গান শেষ ?’
নয়ন জবাব দিল না। স্থির তাকিয়ে রইল হেমার চোখে। হেমা খানিকটা সামনে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘চলো ভেতরে যাই। সবাই কী ভাববে!’
‘কিছুই ভাববে না।’ বলে হাসল নয়ন।
‘কিছু ভাববে না ?’ অবাক গলায় বলল হেমা।
‘উঁহু।’
‘কেন ?’
নয়ন খানিক সময় নিয়ে কী ভাবল। তারপর বলল, ‘নানাজান আমার মাকে অসম্ভব পছন্দ করেন। পৃথিবীতে আর কোনো বাবা তার মেয়েকে এতটা ভালোবাসেন কি না আমার জানা নেই। তবে নানাজান হলেন সেই মানুষ, যিনি সারাক্ষণ তার চারপাশের মানুষের ওপর রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ প্রকাশ করেন। কিন্তু কখনোই ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন না। এই ধরনের মানুষের বাইরের দিকটা হয় শুকনো, খটখটে, কঠিন। সবাই কেবল সেটাই দেখে। কিন্তু তাদের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা মমতাটা কেউ দেখতে পায় না।’
‘এটা কেন বলছ ?’
‘মা তো বহুবছর এখানে আসে না। নানাজানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও নেই। তাই এতকাল পর আমাকে কাছে পেয়ে নানাজান কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। না হলে এ বাড়িতে গানবাজনা করে সেই সাধ্য কার ? তারপর ধরো, এই যে তুমি... একটা অচেনা অজানা মেয়ে এভাবে এখানে এলে, অথচ কেউ কিছু বলল না। বিষয়টা ভাবতে পারো ? এই ঘটনায় যদি আমি না হয়ে অন্য কেউ যুক্ত থাকত, তাহলে এতক্ষণে এবাড়িতে তুলকালাম ঘটে যেতো!’
বলে সামান্য থামল নয়ন। তারপর মৃদু হেসে বলল, ‘সুতরাং এখানে আমরা রাত পার করে দিলেও কেউ কিছু বলবে না।’
‘আমি তো বলার কথা কিছু বলি নি নয়ন।’
‘তাহলে ?’
‘বলেছি ভাবার কথা।'
'মানে?'
'মানে, বলা না হয় আটকানো যায়, কিন্তু ভাবনা ? ভাবনা আটকানোর কি কোনো উপায় আছে ?’
নয়ন হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল, ‘কী হয়েছে তোমার ?’
‘কী হবে ?’ পাল্টা প্রশ্ন করল হেমা।
‘সেটাই তো জানতে চাইছি।’
‘এই যে এমন হুট করে গ্রামে চলে এলাম, তাই ?’
‘উহুঁ। এমন করে আসাটা তোমার জন্য অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা গরমিল...’
হেমা হাসল, ‘গরমিল ? তুমি গরমিল টের পাও ?’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘হু, পাই।’
‘কীভাবে পাও ?’
‘না পেলে গানের আসর ছেড়ে তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসতাম?’
‘এটা তো খুব সামান্য ঘটনা। স্বাভাবিক, সহজ। আমাকে হঠাৎ দেখতে না পেলে তুমি তো খুঁজবেই। এই সহজ গরমিল সকলেই টের পায়। কিন্তু জটিল আর অদৃশ্য গরমিলগুলো সবাই টের পায় না।’
‘তুমি পাও ?’
নয়নের পাল্টা প্রশ্নে সাথে সাথেই জবাব দিল না হেমা। সে দীর্ঘসময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যেন স্তব্ধ সময়। কাছে কোথাও শুকনো পাতায় সরসর শব্দ তুলে নেমে গেল নিশাচর কোনো প্রাণী। জলের ভেতর টুপ করে শব্দ তুলল কোনো মাছ। সেই শব্দের উৎস হতে অজস্র ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে লাগল জলে। তারপর আবার মিলিয়ে গেল। হেমা সেই মিলিয়ে যাওয়া ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে খুব নরম কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, পাই।’
‘কী পাও ?’
‘জটিল অদৃশ্য গরমিল।’
‘কেমন সেটা ?’
হেমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ পাল্টাল, ‘তুমি কি আপাতত আর ঢাকায় ফিরবে না ?’
‘ঢাকায় ফিরব না কেন ?’
‘জানি না। তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি এখানে এমনি এমনি আসো নি। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছ। এবং সেজন্য তুমি এখানে দীর্ঘসময় থেকে যাবে।’
নয়ন যেন এই কথায় খানিক চমকাল। বলল, ‘এমন কেন মনে হচ্ছে ?’
‘হয়তো আমার বোঝার ভুল বলে।’ বলল হেমা। ‘তবে... আমি দীর্ঘদিন থেকেই টের পাচ্ছিলাম, ভেতরে ভেতরে কিছু একটা চলছে তোমার। প্রথম প্রথম ভাবতাম, তুমি নিজ থেকেই আমাকে বলবে। কিন্তু বললে না। এরপর জিজ্ঞেস করলাম, তাও বললে না। এড়িয়ে গেলে। তখন বুঝলাম, তুমি বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও না। এ কারণে পরে আর ইচ্ছে করেই ঘাঁটাই নি।’
ফুরফুরে হাওয়ায় কাঁধের ওপরের চুলগুলো এসে বারবার মুখ ঢেকে দিচ্ছিল হেমার। সে খানিক থেমে আলগোছে মুখের ওপর থেকে চুলগুলো সরাল। তারপর বলল, ‘প্রত্যেকটা মানুষের নিজের খুব একার আলাদা একটা জগৎ থাকে। সেই জগতে সে ছাড়া আর কারোই কোন প্রবেশাধিকার থাকে না। আমি তাই তোমার সেই জগতে অনধিকার প্রবেশ করতে চাই নি।’
বলে দুপা সামনে এগিয়ে জলের কিনারে দাঁড়াল সে। তারপর বলল, ‘কিন্তু তোমার ফাইনাল পরীক্ষার আগ থেকেই তুমি হঠাৎ অস্থির হয়ে যাচ্ছিলে। তোমাকে আগে কখনো ওভাবে রাগতে দেখি নি আমি। কিন্তু সেই তুমি হুটহাট রেগে যেতে থাকলে। যার তার সঙ্গে, যখন তখন দুর্ব্যবহার করতে শুরু করলে। আর কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে সব সময়। ফোনে কথা বলার সময়ও কেবল একা আমিই বলে যেতাম। প্রথম প্রথম বুঝতে পারতাম না যে তুমি আমার কথা শুনছ না। পরে বুঝলাম যে তুমি কেবল ফোন কানে চেপে ধরে বসে থাকো। কিন্তু কিছুই শোনো না। কারণ তুমি তখন অন্যকিছু ভাবতে। আর সেই অন্যকিছুতে তুমি এতটাই ডুবে থাকতে যে চারপাশের আর কিছু তোমার চোখে পড়ত না। তখন তোমার জন্য কী যে অস্থির লাগত আমার। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কারণ তুমি প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে এত বেশি দূরে চলে গিয়েছিলে যে আমার একার পক্ষে ওই দূরত্ব ডিঙানো কিছুতেই সম্ভব ছিল না।’ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল হেমা। ‘আর তারপর আমাদের সম্পর্কটাই যেন কেমন হয়ে গেল। সংকুচিত হয়ে গেল পরস্পরের জায়গাগুলোও।’
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩হেমার কাঁধের উপর দিয়ে নয়ন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের বিস্তৃত জলরাশিতে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে এই পৃথিবীর কোথাও আছে। বরং মনে হচ্ছে সে এখনো ডুবে আছে অন্যকোনো জগতে।
ঘুরল হেমা। তারপর বলল, ‘আসলে কী জানো, আমরা আমাদের পাশাপাশি ছিলাম কেবল, কিন্তু কখনোই কাছাকাছি ছিলাম না। অথচ সম্পর্কে পাশাপাশি থাকার চাইতেও ওই কাছাকাছি থাকাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি ।’
এই কথায় চোখ তুলে তাকাল নয়ন। তবে কথা বলল না। হেমাই বলল, ‘কিন্তু পাশাপাশি থাকা তোমার আমার মধ্যে বিশাল এক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। জানোতো, যে-কোনো সম্পর্কেই অদৃশ্য ওই দূরত্বটাই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা সারাক্ষণ ঘুণপোকার মতো তোমাকে কাটছে। আমি সারাক্ষণ সেটি জানতে চাইতাম। বুঝতে চাইতাম। কিন্তু তুমি কিছুতেই আমাকে বলতে না। বরং আমাদের মাঝখানে ক্রমশ শক্তিশালী অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি করে দিলে তুমি। আর আমার একার পক্ষে ওই দেয়াল টপকানোর সাধ্য ছিল না।’
হেমা থামলেও কথা বলল না নয়ন। তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছিল তাদের। হেমা নয়নের কাঁধ ছুঁয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছ নয়ন ?’
নয়ন ধীরে মাথা নাড়াল, ‘শুনছি।’
‘আমি তোমায় বিরক্ত করছি না তো ?’
নয়ন আবারও মাথা নাড়ল, ‘না।’
হেমা এক পা এগিয়ে এসে নয়নের গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘জগতের প্রতিটি মানুষই তার বুকের ভেতর একান্ত নিজস্ব কিছু কষ্ট বয়ে বেড়ায়। সেই কষ্ট সে আর কারও কাছেই বলতে চায় না। কিংবা পারে না। কারণ সে জানে, তার ওই কষ্ট বুঝবার ক্ষমতা সে ছাড়া আর কারও নেই। আর কেউ তার ওই অনুভূতি ছুঁতেও পারবে না। হয়তো এ কারণেই হাজার মানুষের ভিড়েও মানুষ আসলে দিন শেষে একাই। তাই না ?’
নয়নের কী হলো কে জানে! সে আচমকা হেমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর কাঁদতে লাগল শিশুর মতোন। হেমা মুহূর্তকাল স্থবির দাঁড়িয়ে রইল। তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকা এই মানুষটাকে সে এর আগে কখনো দেখে নি। তার সঙ্গে পরিচয়ের দীর্ঘ ছয় বছরেও না।
কী এমন গোপন দুঃখ এই মানুষটার ? কী হয়েছে তার ?
হেমা জানে না। তবে সে দুহাতে শক্ত করে নয়নকে তার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখল।
আচ্ছা, ক্রন্দনরত এই মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে সে নিজেও কি কাঁদছে ?
কেন কাঁদছে?
হেমা চলে গেল পরদিন ভোরেই। তারপরের নিস্তরঙ্গ বেশ কিছু দিন শেষে আবার খানিক তরঙ্গায়িত হলো নয়নের সময়। সেদিন বিলকুড়ানির হাট। ফতেহপুর থেকে যন্ত্রচালিত নৌকায় ঘণ্টা দুয়েকের পথ। আর সকল এলাকা থেকে বিলকুড়ানি বেশ উন্নত। সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি চলে এসেছে। বাজারে দোকানপাট, ব্যবসাবাণিজ্য বেড়েছে। ফলে দূরদুরান্ত থেকে আসা নানা রকমের ক্রেতা-বিক্রেতায় সারাক্ষণই সরগরম হয়ে থাকে হাট। খবির খাঁর ছোট ছেলে মনিরকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে সে। নয়ন শুনেছে এখানে ফোনের নেটওয়ার্কও অল্পবিস্তর পাওয়া যায়। তা ছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া ফোনের চাজের্রও ব্যবস্থা করা যাবে।
তা হলোও। মায়ের সঙ্গে কথাও হলো। কোহিনুর বানু ফোন ধরেই বললেন, ‘তুই কবে আসবি ?’
‘তা তো জানি না মা।’
‘জানি না মানে কী ?’
নয়ন জবাব দিল না। কোহিনুর বানুই বললেন, ‘তুই আমাকে বল তো তুই কী চাইছিস ?’
‘আমি তো কিছু চাইছি না মা।’
‘না চাইলে তুই আমাকে না বলেই ফতেহপুর গেলি কেন ? তারপর আবার গিয়েই জানালি যে দিন দুয়েকের মধ্যে ফিরে আসবি। অথচ তারপর থেকে তোর সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই। কয়েকদিন পরপর এখান সেখান থেকে ফোন দিয়েই আবার উধাও হয়ে যাস। ঘটনা কী ?’
‘ফতেহপুরে যে ফোনের নেটওয়ার্ক নেই, ইলেক্ট্রিসিটি নেই, এটা তুমি জানো না ?’
‘তুই আসবি কবে সেটা বল ?’
‘জানি না মা।’ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল নয়ন। ‘আমার গ্রাম খুব ভালো লেগে গেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, খারাপ না-লাগা অবধি আমি এখানেই থেকে যাব।’
কোহিনুর বানু কিছু একটা বলছিলেন। কিন্তু নয়ন সেটা শুনল কি না বোঝা গেল না। কারণ তার চোখ আটকে গেছে বড়সড় এক জটলায়। জটলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আব্দুল ফকির। তার হাতে ফণা তোলা এক সাপ। আরেকটা সাপ গলায় ঝুলছে। দৃশ্যটা ভয়ানক। তবে সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখার জন্যই নয়ন উৎসুক হয়ে পড়ল। সে তড়িঘড়ি করে মাকে বলল, ‘মা, এখন রাখি। পরে কথা বলব।’
কোহিনুর বানুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিল সে। তারপর ছুটল। আব্দুল ফকির ততক্ষণে বসে পড়েছেন। তার গলায় এবার দুটো সাপই ঝুলছে। তবে সাপগুলো এখন আর ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করছে না। বরং অনেকটা নিস্তেজ হয়ে দড়ির মতোন ঝুলে আছে। সামনে কতকগুলো কাঠের বাক্স। নানান রকমের ভেষজ ওষুধও। বাক্সগুলো সম্ভবত সাপের।
জুলফিকার উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে সুর করে কথা বলছে, ‘মুসলমান ভাইদের উদ্দেশে আমার সালাম, হিন্দু ভাইদের উদ্দেশে নমস্কার। আপনেগো সামনে আইজ যিনি উপস্থিত হইছেন, তারে আপনেরা সকলেই এক নামে চেনেন। তিনি হইলেন কালনাগিনীর যম, নাগনাগিনীর ভ্রম, স্বীয় পায়ে সর্প অর্পণ, সাতশ সর্প মন্ত্রে কর্তন, নাগিনীর চোখ তাহার দর্পণ, তিনি মানব বীর। বলেন, কে তিনি ? বলেন, বলেন, বলেন... কে তিনি ? তিনি... ?’
‘তিনি আব্দুল ফইর, তিনি আব্দুল ফইর’। উপস্থিত জনতা সমস্বরে জবাব দিল। সঙ্গে তুমুল করতালির শব্দে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠল। আব্দুল ফকিরের পাশেই তেরো-চৌদ্দ বছরের শীর্ণকায় এক কিশোর জড়সড় ভঙ্গিতে বসে ছিল। জনতার করতালির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার পায়ে নর্তকীদের মতন ঘুঙুর বাঁধা। সে সেই ঘুঙুরে শব্দ তুলে কোমর থেকে একখানা বাঁশি বের করল। এই বাঁশির নাম বীণ। আব্দুল ফকির ইশারা করতেই সে সেই বীণ বাজাতে লাগল। বিস্ময়কর দম তার। কিশোরের গলার শিরাগুলো বীভৎস ভঙ্গিতে টানটান হয়ে ফুলে উঠলেও তার বীণের সম্মোহনী সুরে সকলে বুঁদ হয়ে রইল।
আব্দুল ফকির নিস্তেজ গোখরা সাপ দুটোকে তার গলা থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখলেন। তারপর বাম হাতখানাকে মুঠো করে সাপের মুখের কাছে নিয়ে গেলেন। তার দুই হাতের সবগুলো আঙুলজুড়েই বড় বড় আংটি। তিনি সেই আংটি দিয়ে বার কয়েক দ্রুতগতিতে সাপের মুখে মৃদু আঘাত করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন সাপগুলো আবার ফুঁসে উঠল।
ছেলেটি হঠাৎ অর্ধনমিত হয়ে কুর্ণিশ করার ভঙ্গিতে সাপগুলোর সামনে শরীর বাঁকিয়ে নাচতে লাগল। নাচের সাথে সাথে সে তার বাঁশি ধরা হাতখানাকেও ছন্দের তালে তালে দোলাতে থাকল। উপস্থিত জনতা যেন সেই সুর আর ছন্দে বুঁদ হয়ে রইল।
নয়ন আর মনিরও তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। তারা হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল, ওই নিস্তেজ সাপ দুটোও এবার ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। শুধু যে দাঁড়িয়েছে, তা-ই না। বরং ওই বাঁশির সুরে সুরে যেন ক্রমশ আরও উঁচুতে উঠছে তারা। কিশোর ছেলেটির বাঁশির সুর আর ছন্দে সাপ দুটিও যেন মোহনীয় ভঙ্গিতে নাচছে।
মনির হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, ‘দেখছেন ভাইজান ? এই হইলো আব্দুল ফইর! সাপখোপ তারে আজরাইলের মতন ভয় পায়। সে যা কয়, তা-ই শোনে। সে যদি আন্ধার রাইতেও রাস্তা দিয়া হাঁইটা যায়, আশপাশে সাপখোপ থাকলে যে যেইদিকে পারে পলাই যায়। দেখছেন, কেমনে মাজা দুলাইয়া নাচতেছে। কী আচানক কাণ্ড, দেখছেন ভাইজান!’
নয়ন কথা বলল না। মনিরই আবার বলল, ‘দেখলেন না, সেইদিন আপনেরে কেমনে বাঁচাই তুলল সে ? আপনে মরা মানুষ, সেই মানুষটারে কেমনে ঢোলে দুইডা বাড়ি দিয়া জ্যাতা বানাই দিল। কী আচানক কাণ্ড!’
নয়ন এবারও কথা বলল না। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আব্দুল ফকিরের দিকে। আব্দুল ফকির হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনেরা এইখানে আসছেন সাপের খেলা দেখতে। ভালো কথা। এই যে বাক্সগুলান দেখতেছেন, এইগুলানের সবকয়টা সাপে ভর্তি। নানান জাতের বিষধর সব সাপ। আইজ সবই আপনাগো দেখাবো। কিন্তু তার আগে একখান কথা।’
‘কী কথা ?’ ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন বলল।
‘এই যে বাইস্যাকাল, সকলের বাড়িঘরে পানি উঠতেছে, খালবিল, নদীনালা, মাঠঘাট সব ডুইবা যাইতেছে...এতে যে মহাবিপদ আইতেছে ঘরে ঘরে, সেই খেয়াল আছে ?’
আব্দুল ফকিরের কথা বলার ভঙ্গিতে বিশেষ কিছু একটা আছে। শরীরজুড়ে শিরশিরে অস্বস্তিকর এক অনুভব হয়। কিন্তু কথা শেষ না হওয়া অবধি চলে যাওয়া যায় না। বরং সম্মোহিতের মতন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। নয়ন আর মনিরও দাঁড়িয়ে রইল।
আব্দুল ফকির বললেন, ‘সাপ এই পানিতে যাইবো কই ? পানিতে তো আর থাকতে পারবো না। এইজন্য তাদের এহন যাওনের জায়গা একটাই। বলেন কই ?’
‘কই ?’ লম্বামতো লোকটা জিজ্ঞেস করল।
‘আপনের ঘরের মাঁচা।’ প্রশ্নকর্তার উদ্দেশে ভয়ানক গলায় কথাটা বললেন আব্দুল ফকির। লোকটা মুহূর্তেই চমকে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে শুকনো মুখে ঢোক গিলতে গিলতে বলল, ‘কী বলেন ফইর সাব। আমার ঘরের মাঁচা ?’
আব্দুল ফকির যেন ইচ্ছে করেই লোকটাকে ভয় দেখালেন। ফলে সঙ্গে সঙ্গেই আবার তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘খালি আপনের একলার না। এই সাপের এখন যাওনের জায়গা হইলো গৃহস্থবাড়ির ঘর। গৃহস্থবাড়ির লোকজনের ঘরের চোকির তলা। ধান-চাউলের গোলা। ওইদিন হুনলাম কেরামতগঞ্জের ইউনুস মুন্সির পোলারে সাপে কামড়াইছে। সে ঘুমাই আছিলো বিছানায়, আচুক্কা দেখে পিঠের নিচে ঠান্ডা ঠান্ডা কী জানি লাগে। হাত দিয়া দেখে সাপ। ততক্ষণে দিছে কামড়। আমারে খবর দিছে দুফইর বেলা। যাইতে যাইতে সন্ধ্যা। বাঁচান বড় মুশকিল আছিলো। তয় শ্বাস যতক্ষণ থাকে, আল্লাহ রসুলের দোয়ায় আব্দুল ফইর ততক্ষণ পর্যন্ত সাপে কাটা রুগিরে যমের হাতে ছাড়ে না। এই কথা তো আপনেরা সকলে জানেন। কি জানেন না ?’
প্রশ্নটা করেই দম নেওয়ার জন্য খানিক থামলেন আব্দুল ফকির। লোকজন আবারও সমস্বরের চিৎকার করল। পাশ থেকে জুলফিকার বলল, ‘খালি দম থাকলেই বাঁচাইতে পারেন কাকু ? দম না থাকলে বাঁচাইতে পারেন না ?’
জুলফিকারের এই প্রশ্নে উপস্থিত জনতা যেন আচমকা থম মেরে গেল। আব্দুল ফকির সম্পর্কে তারা নানান কথা শুনেছে। কেউ কেউ প্রত্যক্ষও করেছে। সেসব কথার বেশির ভাগই অবিশ্বাস্য কিংবা ভয়ংকর। নিষিদ্ধ রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে ভরপুর। কিন্তু মৃত মানুষকে প্রাণদানের মতো বিষয়ে একমত হওয়া ঠিক হবে কি না এ বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তা ছাড়া ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও বিষয়টা সাঙ্ঘর্ষিক। ফলে কেউ কোনো কথা বলল না। বরং পুরো পরিবেশটাই হঠাৎ যেন গা-ছমছমে হয়ে উঠল। সকলেই জুলফিকারের মুখে পরের কথাটি শোনার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল।
‘শুনেন মিয়ারা।’ জুলফিকার বলতে শুরু করল। ‘আব্দুল কাকু নিজে তার ঘটনা বলতে চান না। শরমিন্দা হন। তয় আমার মুখে শুনেন। আপনেরা তো সকলে ফতেহপুরের খাঁ বাড়ি চেনেন। কি চেনেন না ?’
‘হুম।’ মৃদু শব্দ উঠলেও সকলেই অপেক্ষা করছে পরের ঘটনা শোনার জন্য। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘সেই বাড়ির তৈয়ব উদ্দিন খাঁরে চেনে না এমন মানুষ এই দ্যাশে আছে ? নাই। সেই দিন ঝড়বৃষ্টির রাইত। হঠাৎ খাঁ বাড়ির তন খবর আইলো তৈয়ব খাঁর নাতি সাপের কামড়ে মারা গ্যাছে। নাতি বিরাট ডাক্তার। থাকে ঢাকার শহর। গ্রামে আইছে বুড়া নানারে দ্যাখতে। আইসা দিনের বেলা সাপের কামড় খাইছে। কী করব, কী করব... কোন ডাক্তারের কাছে নিব... এইসব ভাবতে ভাবতই হইছে রাইত। ততক্ষণে রুগি তো মইরা শ্যাষ। শ্বাস-প্রশ্বাসও বন্ধ। মরা লাশ আর কী! সবাই কান্নাকাটি করতেছে। সেই সময় তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার বড় পোলা খবির খাঁরে ডাইকা বলল, ডাক্তার ফাক্তার বাদ দে। আমার নাতিরে যদি কেউ বাঁচাইতে পারে, তয় পারব একমাত্র আব্দুল ফইর। যা অহনই তারে আনতে লোক পাঠা। অহনই। লোক আসলো মাঝ রাইতে। আমরা গেলাম পরদিন বেয়ান বেলা। সাপে কাটা রোগী এতোক্ষণ বাঁচে ? আপনেরাই কন, বাঁচে ?’
তুমুল উত্তেজনায় রুদ্ধশ্বাস তাকিয়ে থাকা মানুষগুলো এবার যেন দম ছাড়ার ফুরসত পেল। তারা সমস্বরে বলল, ‘না, বাঁচনের কথা না।’
জুলফিকার ম্লান গলায় বলল, ‘বাঁচেও নাই। আহারে লাল টুকটুক্কা গায়ের রং পোলাটার। সাপের বিষে নীল হইয়া গেছে। মরা মানুষটা পইড়া আছে বিছানায়। সবাই চিক্কুর দিয়া কানতেছে। কেউ কেউ কোরআন শরিফ, দোয়াদরুদ পড়তেছে। কিন্তু উপরে আল্লাহ, আর নিচে ইল্লাহ... আব্দুল ফইর। সে গিয়া রুগিরে একপলক দেইখাই বললেন, রুগিরে উঠানে নামাও। ক্যালাগাছ পোঁতো। ক্যালাগাছের শরীলে যাবে রুগির বিষ, আর সেই বিষে ক্যালাগাছ মরব। রুগি মরব না। এই রুগিরে আমি ছাড়বো না। যত বড় সাপের বিষই হোউক, এই রুগিরে আমি ছাড়বো না।’
জুলফিকার সামান্য থেমে গলা পরিষ্কার করে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘আব্দুল ফইর সেই রুগিরেও যমের হাতে ছাড়েন নাই। ঢোলে দুইটা বাড়ি দিয়া মন্তর পড়ছেন। সাথে সাথে রুগি লাফ দিয়া উইঠ্যা খাড়াইছে। কী মিয়ারা, কথা সত্য, না মিথ্যা ? সেইদিনের ঘটনা দেখছেন এমুন কেউ কি নাই এইহানে ? কথা কন না ক্যান মিয়ারা ? নাই কেউ এইহানে ?’
ভিড়ের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। সেইদিন খাঁ বাড়িতে ছিল, নিজের চোখে সেই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে, এমন দুজন লোক ভিড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল। তারা নিজের চোখে কী দেখেছে সেই ঘটনা বর্ণনা করল। উপস্থিত শ্রোতারা ঘটনা শুনে বিস্ময়াভিভূত চোখে আব্দুল ফকিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা, ভয়, বিস্ময়।
হইচই খানিক কমলে আব্দুল ফকির মৃদু গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘যাই হোউক। এইসব কথা এতো বলনের কিছু নাই। এইবার আসি আসল কথায়। আমার বয়স হইছে। এহন আর আগের মতন যহন তহন হাঁটাচলা, দৌড়ঝাপ করতে পারি না। সাপের বিষ নামাইতেও সব জায়গায় যাইতে পারি না। আপনেরা শুনছেন কি না জানি না, এইবার এহন পর্যন্ত আমাদের এই অঞ্চলে ঊনপঞ্চাশজনরে সাপে কাটছে। সবখানে তো আমি যাইতে পারি নাই। তাই মারাই গেছে বেশি। তো বলেন, আপনেগো কামড়াইলে কী দশা হইবো ?’
এই প্রশ্নে সকলেই আবার থম মেরে গেল। আসলেই, ফকির তো আর সব জায়গায় যেতে পারবেন না। তাহলে ?
আব্দুল ফকির সময় নিয়ে বললেন, ‘এহন আল্লায় আমারে একটা ক্ষমতা দিছে, মানুষের উপকার করার ক্ষমতা। জানের মালিক আল্লাহ। আমি উছিলা মাত্র। এহন সেই দায়িত্ব যদি আমি ঠিকঠাক পালন করতে না পারি তাইলে আমার আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করন লাগব না ? লাগব। আমি হইমু পাপী। এইটা আমি হইতে চাই না। এইজন্য আমি আল্লাহর নামে আপনেগো কিছু সাহাইয্য করতে চাই।’
সকলে উৎসুক চোখে আব্দুল ফকিরের দিকে তাকিয়ে আছে। ফকির দু কদম বাঁ পাশে সরে গেলেন। তারপর মাটি থেকে একখানা কাচের বয়াম হাতে নিয়ে চোখের কাছে ধরলেন। বললেন, ‘এই ওষুধ আপনেগো জইন্য। এর ভিতরে যে গাছ-গাছড়ার ছালবাকল দেখতে পাইতেছেন, এগুলা সাধারণ কোনো জিনিস না। এইগুলান সাপের যম। আমার মন্ত্র পড়া। বাড়ির চাইরপাশে এই ছালবাকল পুঁইতা রাখবেন, ছিটাই দিবেন। শুধু তা-ই না। ঘুমানোর বিছানা-বালিশ, চোকির তলা, ধানের গোলা, টিনের চালে এগুলা যত্ন কইরা রাখবেন। দেখবেন, এক টুকরা ছাল যেইহানে থাকবো, সেইহানে সাপ তো দূরের কথা, সাপের গন্ধও আইবো না।’
আব্দুল ফকির কথা শেষ করতে না করতেই দর্শকদের মধ্যে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। ফকির শান্ত গলায় বললেন, ‘তাড়াহুড়ার কিছু নাই। আপনেরা সবাই-ই পাইবেন। ওই যে দেহেন, ওই বস্তা ভরা ছালবাকল আনা হইছে আপনেগো জইন্য। জুলফিকার আর রতন মিল্যা এগুলা আপনেগো দিবো। আপনেরা যে যা পারেন কিছু টাকা-পয়সা হাদিয়া দিয়া যাবেন।’
বলেই জটলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তবে শেষ মুহূর্তে কী মনে করে আবার থামলেন। তারপর বললেন, ‘আরেকখান কথা। অনেকসময়ই ফইরের ফিহিরে কাজ না হইলে ফইরের দোষ হয়। সবাই বলে ফইরসাবে কোনো কামের না। কিন্তু কেউ হিসাব কইরা দেহে না, ফইরে যা কইছিল তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হইছিল কি না। ঠিক কি না ?’
‘জে ফইরসাব।’
‘শোনেন মিয়ারা, এই ছালবাকলা ছিটাইবেন ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই। পরেও না, আগেও না। অজু কইরা পাক পবিত্র ধোয়া কাপুড়ে। আর তখন প্যাট থাকব খালি। এক গ্লাস পানিও খাওন যাইব না। মনে রাইখেন এই সবকয়টা জিনিস খেয়াল রাখন কিন্তু জরুরি। সামান্য এদিক সেদিক হইলেও কিন্তু কাজ হইবো না। কথাটা মনে রাইখেন।’
বলেই জটলা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তারপরের কয়েক মিনিটে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। তারা আব্দুল ফকিরের সেই আশ্চর্য ক্ষমতাধর বৃক্ষের ছালবাকল সংগ্রহের জন্য উঠেপড়ে লাগল। মাত্র কয়েক মুহূর্তেই কাচের বয়াম ও বস্তাখানা ফাঁকা হয়ে গেল। আর পরিপূর্ণ হয়ে উঠল জুলফিকারের হাতের টাকার থলেখানা।
নয়ন আর মনিরও জটলা ছেড়ে বেড়িয়ে এল। এখান থেকে সামান্য হেঁটে গেলেই বড় খাল। যদিও বর্ষার থইথই পানিতে সেই খাল এখন বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। খালের পাড়ে অসংখ্য নৌকা বাঁধা। বিভিন্ন জায়গা থেকে নানান পণ্য নিয়ে এখানে সওদা করতে এসেছে দূরদূরান্তের মানুষ। মনির সেখানে উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভাইজান, দেখলেন কারবার ? একদম জাদুর মতন ঘটনা। একবার চিন্তা কইরা দেহেন তো, সেইদিন সে আপনেরে চোক্ষের পলকে কেমনে মরা মানুষেরতন জ্যাতা মানুষ বানাই দিল ? কী আশ্চর্য ঘটনা!’
নয়ন তাকিয়ে আছে বিস্তৃত জলের ওপর ভেসে থাকা ধানডগার দিকে। মৃদু ঢেউয়ে ধানের ডগাগুলো তিরতির করে কাঁপছে। দেখে মনে হচ্ছে তাদের এই কম্পনেরও বুঝি নির্দিষ্ট কোনো ছন্দ আছে। তারা একইসঙ্গে ডগা নুইয়ে প্রায় জল ছুঁইছুঁই হয়ে যাচ্ছে। আবার পরক্ষণেই সাঁই করে দলবেঁধে উঠে যাচ্ছে। কী যে অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য! নয়ন সেদিকে আনমনা ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
মনিরের মাছ নিয়ে বিপুল আগ্রহ। সে বলল, ‘এই যে পানি দেখছেন ভাইজান, এই পানিতে কিন্তু বড় মাছ নাই। আছে ছোট মাছ। পানির রং দেখলেই বইলা দেয়া যায়, কোন পানিতে কী মাছ আছে। আপনে তো দাদাজানের সাথে সেইভাবে কথাই বলেন না। দাদাজান আপনেরে যেই পছন্দ করে, আমারে যদি তার অর্ধেকও করত তাইলে দেখতেন তার মাছ ধরনের সব কায়দাকানুন আমি শিখ্যা ফালাইতাম। সে জোয়ানকালে যে কত মাছ ধরছে! আব্বার কাছে শুনছি, দাও-বটি দিয়া কোপাইয়া নাকি আইড়-বোয়াল ধরত! কিন্তু তারে তো আমি বাঘের মতন ভয় পাই। ভাইজান, আপনে কিন্তু দাদাজানের কাছেরতন মাছ ধরনের কিছু কায়দাকানুন জাইনা আমারে বলবেন।’
নয়ন কথা বলল না। সে খালপাড়ের উঁচু ঢিবি ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে মনির। ছেলেটা ভারি সহজ সরল। খানিক বোকাসোকাও যেন। ফলে তার বেশির ভাগ কথারই কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না। নয়নও দিল না। তারা দু-চারখানা নৌকা পার হতেই হঠাৎ আব্দুল ফকিরকে দেখতে পেল। তিনি একখানা ছইওয়ালা নৌকার গলুইয়ে ধ্যানের ভঙ্গিতে বসে আছেন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শক্ত-সামর্থ্য দুই যুবক। নয়ন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তবে সঙ্গে সঙ্গেই আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। মনির অবশ্য পেছন থেকে তার বাহু চেপে ধরে ফিসফিসে গলায় বলল, ‘ফইরসাব ভারে বইছে।’
‘ভার কী ?’
‘ভার মানে হইলো গিয়া...।’ মনির যেন সঠিক শব্দটা খুঁজে পাচ্ছিল না। তবে বেশ কিছুক্ষণ পর সে বলল, ‘ধ্যান আছে না ? ধ্যান ?’
‘হুম।’
‘ফইর সাব ধ্যানে বসছে। ধ্যানে বসলে ওনার সঙ্গে জিন-পরিদের কন্টাক হয়।’
‘এই দিনের বেলাতে এত মানুষের ভিড়েও জিন-পরি আসবে ?’
‘ওনার কাছে আসবে। উনি যেইখানে বলবেন সেইখানেই আসবে। ওইগুলার মাধ্যমেই তো উনি অনেক আগাম খবরাখবর জানতে পারেন।’
‘ওহ!’ বলে তাকিয়ে রইল নয়ন। আব্দুল ফকির মুদিত চোখে নৌকার গলুইয়ে স্থির বসে আছেন। তার গলায় এখনো একজোড়া ভয়ালদর্শন সাপ ঝুলে আছে। নৌকার সামনে আবারও কৌতূহলী মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক দুজন নৌকা থেকে নেমে এসে দুপাশে হাত প্রসারিত করে খানিকটা জায়গা নিয়ে দাঁড়াল। যেন আসন্ন ভিড় থেকে আব্দুল ফকিরকে রক্ষা করার আগাম প্রস্তুতি। স্কুল-মাঠে ততক্ষণে ওষুধ বিক্রি শেষ হয়েছে। ফলে জুলফিকার আর কিশোর ছেলেটিও চলে এসেছে।
সন্ধ্যা নামতে খুব একটা বাকি নেই। পশ্চিমাকাশে অস্তগামী সূর্যের লাল আভায় রঙিন হয়ে ওঠা মেঘ দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে নয়ন ডাকল, ‘মনির ?’
‘জে ভাইজান।’
‘ফকির সাহেব এখন কী করবেন ?’
‘মানুষ এখন ওনার কাছ থেকে নানান অসুখ-বিসুখের দাওয়াই, পানিপড়া নিবে। ভবিষ্যতের বিপদ-আপদ, বালামুসিবত সম্পর্কে জানতে চাইবে। কারও মাইয়ার বিয়া হয় না, পোলা ঘুমের মইধ্যে বিছানায় মোতে, কারও ছেলেসন্তান হয় না, এইসব দাওয়াই চাইবো।’
‘আচ্ছা।’ বলে ধ্যানমগ্ন আব্দুল ফকিরের দিকে তাকাল নয়ন। তার পাশে জুলফিকার দাঁড়িয়ে। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই আব্দুল ফকির চোখ মেলে তাকালেন। এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই এত এত মানুষের ভিড় থেকেও তিনি চোখ মেলে সোজা দূরের এই উঁচু ঢিবির ওপরে দাঁড়ানো নয়নের দিকেই তাকালেন। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় কাছে ডাকলেন। তার মুখে হাসি। নয়ন কিছু সময়ের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না, সত্যি সত্যিই কি আব্দুল ফকির তাকে ডাকছেন ? নাকি অন্য কাউকে ?
মনির অবশ্য চাপা উচ্ছ্বাস আর কিছুটা ভয় মিশ্রিত গলায় বলল, ‘ভাইজান, ফইরসাবে আপনেরে ডাকে।’
‘আমাকে কেন ডাকবে ?’
‘চলেন গিয়া শুনি। আপনেরে সে বাঁচাইলো, কিন্তু সেইদিন আপনের সঙ্গে তো তার কোনো কথাবার্তাই হইল না। সে আপনের এত বড় একটা উপকার করলো আর আপনে তার সাথে কথা বলবেন না ?’
‘তা অবশ্য ঠিক বলেছিস মনির।’ বিড়বিড় করে বলল নয়ন।
‘লন, লন। গিয়া দেখি উনি কী কয় ? আরেকখান কথা, ফইরসাবেও কিন্তু জানে কোথায় কোন মাছ বেশি থাকে। এইটা উনি পানির মধ্যে তাকাইলেই úষ্ট দেখতে পায়। আপনে কিন্তু এই সুযোগে একটু কায়দাটা জাইনা লইবেন ভাইজান।’
নয়ন কথা বলল না। সে তাকিয়ে আছে নিচে খালের দিকে নেমে যাওয়া ঢালের দিকে। জুলফিকার ওই ঢাল ধরেই উঠে আসছে। সে কাছে এসে যতটা সম্ভব নরম গলায় বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। আপনে ফতেহপুর খাঁয়গো বাড়ির নাতি না ? তৈয়ব উদ্দিন খাঁর নাতি নয়ন ?’
নয়ন মাথা ঝাঁকাল, ‘জি।’
‘কী ভাগ্য দেখেন।’ বিগলিত স্বরে বলল জুলফিকার। ‘আপনের সাথে আপনের নানাজানের বাড়িত বইসা কথা বলনের সুযোগ হইলো না। কিন্তু এই এত দূরের পথে আইসা হইয়া গেল। দেখেন কপাল। এইজন্যই কয়, ভাইগ্যে থাকলে জুইট্যা যায়, না থাকলে খুইট্যা খায়।’
নয়ন কথা বলল না। সে তীক্ষ্ণ চোখে জুলফিকারের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। জুলফিকার বলল, ‘ফইরসাব আপনের সাথে একটু কথা বলতে চান। তার এক পায়ে সমস্যা, আঙুল নাই। বহু আগে কাটা পড়ছিল। এইজন্য ঢাল বাইয়া উইঠা আসতে পারে নাই। না হইলে সে নিজেই আসতো আপনের কাছে।’
নয়ন যেন এবার কিছুটা বিব্রত হলো। বলল, ‘না না, ঠিক আছে। আমিই আসছি।’ বলে মনিরের হাত ধরে সতর্কভঙ্গিতে ঢাল বেয়ে নামল সে। এতক্ষণে মানুষের শোরগোল, ভিড় আরও বেড়েছে। সকলেই আব্দুল ফকিরের সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু আব্দুল ফকির ততক্ষণে নৌকার ছইয়ের ভেতরে ঢুকে গেছেন। নয়ন আর মনিরকে নিয়ে নৌকায় উঠল জুলফিকার। বিশাল বড় নৌকা। ভেতরে সাপের বিষ নামানো থেকে শুরু করে নানান জিনিসপত্র। আব্দুল ফকির নয়নকে দেখে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, ‘আপনে এখন কেমন আছেন, বাজান ?’
নয়ন মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘জি ভালো আছি।’
‘আপনের কথা বহু শুনছি। আপনে খাঁ বাড়ির নাতি। বিরাট বড় ডাক্তার। এই অঞ্চলে অবশ্য এখন দূরদূরান্ত থেইকা অনেক ডাক্তারই আসেন। কিন্তু আমাগো নিজেগো তো কোনো ডাক্তার আছিল না। আপনে হইলেন গিয়া আমাগো নিজেগো ডাক্তার। এইজন্য আপনের কথা শুইনাই পরানডা জুড়াই গেছিলো বাজান।’ বলে সামান্য থামলেন আব্দুল ফকির। তারপর বাটা থেকে একখানা পান মুখে পুরতে পুরতে বললেন, ‘আপনেরে দেখনের বহু শখ আছিল। সেই শখও মিটল। কিন্তু তহন তো আপনে আর আপনে আছিলেন না। যমে মানুষে টানাটানি। এইজন্য আপনের সাথে তখন আর কথাবার্তা হইলো না। আল্লাহর কী কুদরত, আইজ এইহানে আপনের সাথে কথা বলনের সুযোগ আল্লাহতালা কইরা দিলেন।’
আব্দুল ফকির কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই আচমকা হাত বাড়িয়ে নয়নের হাতখানায় মুঠোয় চেপে ধরলেন। তারপর বললেন, ‘তা বাজান, আপনেরা কি এইখানে ফতেহপুর থেইক্যা নিজেগো নাও লইয়া আইছেন ? না খ্যাপের নাওয়ে আইছেন ?’ আব্দুল ফকিরের হাত শক্ত, খসখসে। সেই হাতের স্পর্শে নয়নের সারা শরীর কেমন শিরশির করে উঠল। একটা অচেনা, অদ্ভুত অনুভূতি।
সে আলতো করে হাত ছাড়িয়ে নিল। ছইয়ের বাইরে দাঁড়ানো মনির সেখান থেকেই জবাব দিল। বলল, ‘আমরা বাড়িতে কাউরে বইলা আসি নাই। হাটবার তো ফতেহপুর থিকা অনেক মানুষ ট্রলার ভাড়া কইর্যা এইখানে আসে। আমরা তাদের সাথে আসছি।’
মনিরের কথা শুনে আব্দুল ফকির যেন স্বস্তি পেলেন। তিনি নয়নের দিকে তাকিয়ে হাসমিুখে বললেন, ‘তাইলে আর চিন্তা কী ? আমাগো নাও তো ফতেহপুরের উপর দিয়াই হোসনাবাদ যাইব। আমাগো সঙ্গেই চলেন। আপনেগো ফতেহপুর নামাই দিয়া যাব।’
নয়ন কিছু বলার আগেই মনির গলা চড়িয়ে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল, ‘তাইলে তো খুবই ভালো হয় ফইরসাব। খুবই ভালো হয়।’
জুলফিকার বাইরে থেকে মাথা নিচু করে ছইয়ের ভেতর উঁকি দিল। তারপর বলল, ‘নাও তো ছাইড়্যাই দিছি কাকু, লোকজনের যে ভিড় বাড়ছিল, সামলানোই দায় হইয়া গেছিল।’
আব্দুল ফকির মৃদু হাসলেন। তারপর নয়নকে বললেন, ‘বাজান, নাও তো ছাইড়াই দিছে, আপনের অসুবিধা নাই তো ?’
নয়নের কেমন অস্বস্তিকর এক অনুভূতি হচ্ছিল। তারপরও সে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘না না, অসুবিধার কী আছে!’
নাও ততক্ষণে বিলকুড়ানির হাট ছাড়িয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে। ফুরফুরে হাওয়ায় বড় পাল তুলে দেওয়া হয়েছে। তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। নৌকার দুইপাশে ধবধবে সাদা কবুতরের মতন শাপলা ফুল ফুটে আছে। নয়নের পাশেই ছইয়ের গায়ে খোপ কেটে একখানা ছোট জানালাও বসানো হয়েছে। সেই জানালায় তাকিয়ে নয়ন বলল, ‘আমি কি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারি ?’
আব্দুল ফকির আবারও বিগলিত হাসলেন। তারপর বললেন, ‘জে বাজান, জে। মনে করেন এইটা আপনের নিজের নাও। আপনের যা মন চায় করতে পারেন।’
নয়ন আর কিছু বলল না। সে উঠে নৌকার গলুইয়ে এসে দাঁড়াল। ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। আজ কি অমাবস্যা ? নয়ন এইসব চাঁদ-তারার হিসাব জানে না। তবে তার কেন যেন মনে হলো আজ অমাবস্যাই। নৌকার ছাদে সেই দুই যুবক আর জুলফিকারের সঙ্গে বসে আছে মনির। তাদের মধ্যে তুমুল আড্ডা জমে উঠেছে।
নয়ন আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে কী ভাবছিল। তার কি মন ভার ? কিংবা অজানা কোনো আশঙ্কায় ক্রমশ জবুথবু হয়ে যাচ্ছে সে ? নয়ন জানে না। তবে তার ভাবনাগুলো আজকাল যেন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। ছুঁতে গেলেই হঠাৎ মিইয়ে যায়।
নয়ন মাথা নিচু করে গলুইয়ের ভেতর ঢুকতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে ধাক্কাটা খেল সে। ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসা অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল তার গা ঘেঁষে। সে ঘুরতে যেতেই হঠাৎ তার শরীরের ধাক্কায় অন্ধকারে নৌকার পাটাতনে সশব্দে ছিটকে পড়ল সে।
চট করে কিছু বুঝতে না পেরে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল নয়ন। তবে সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিল সে। পকেট থেকে মোবাইল ফোনখানা বের করে আলো জ্বালাল। তারপর তটস্থ ভঙ্গিতে গিয়ে আব্দুল ফকিরকে ধরল। তিনি অবশ্য স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উঠে বসলেন। তারপর বললেন, ‘বাম পায়ে তেমন বল পাই না। হাত-পায়ের আসল বল থাকে আঙুলে। আঙুল না থাকলে বলও থাকে না। তারওপর বয়সও হইছে। সারা জীবন দৌড় ঝাঁপ কইরা বুড়া বয়সে আইসা শরীর হইছে পলকা কাঠির লাহান। হালকা হাওয়া বইলেও লড়েচড়ে।’
‘আপনার পায়ে আঙুল নেই ?’
‘ডাইন পায়ে আছে, বাম পায়ে নাই।’ বলে মাথার ওপরে জ্বলতে থাকা হারিকেনের আলো খানিক বাড়ালেন আব্দুল ফকির। তারপর নিজের বাঁ পায়ের নাগড়া জুতোখানা খুলে ফেললেন। নয়ন এতক্ষণে খেয়াল করল, বাঁ পায়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নেই তার। পায়ের পাতার সামনের দিকটা যেন বীভৎস ভঙ্গিতে ওঁত পেতে থাকা কোনো প্রাণী। এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে শিকারের ওপর।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩নিজে ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও এই অদ্ভুত রহস্যময় আলোয় আব্দুল ফকিরের পায়ের ওই ভয়ংকর আদল দেখে নয়নের কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। সেই অস্বস্তির ভেতর কি কিছুটা ভয়ও ?
খানিক ভাবল সে। হতে পারে এমন গা-ছমছমে পরিবেশ এর জন্য দায়ী। এখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। জনমানবহীন এক বিলের মাঝখানে অমাবস্যার মতো ঘুটঘুটে অন্ধকারে হারিকেনের আলোয় সে নৌকায় বসে রয়েছে ভয়ঙ্কর এক সাপুড়ের সাথে।
সেই নৌকাভর্তি কিলবিল করছে জ্যান্ত সব সাপ। এমন পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
সে যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল, ‘কী হয়েছিল আপনার পায়ে ?’
0 Comments