Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

শূন্যের প্রতিধ্বনি

---


### ১. ঘুম ভাঙার শহর


শহরের আকাশটা আজ তামাটে রঙের। অনিমেষ যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন ঘড়িতে সময় স্থির হয়ে আছে—দুপুর ২টা ১৫ মিনিট। গত তিন দিন ধরে ঘড়িটা আর চলছে না। ব্যাটারি পাল্টানো হয়েছে, তবুও লাভ হয়নি। অনিমেষ আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চেহারাটা তার কাছে কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে। চোখের নিচে কালি, গালের হাড় বেরিয়ে এসেছে।


সে কফি বানাতে রান্নাঘরে গেল। কিন্তু কল ছাড়তেই পানি এল না। পাইপ দিয়ে শুধু একটা শোঁ-শোঁ শব্দ বেরোচ্ছে। জানলার পর্দা সরাতেই অনিমেষের বুকটা ধক করে উঠল। রাস্তাটা একদম জনশূন্য। একটা কাকও কোথাও ডাকছে না।

Ad-1

🇵🇸🇵🇸🇵🇸

### ২. নিখোঁজ মানুষের মিছিল


অনিমেষ নিচে নেমে এল। তার ফ্ল্যাটটা চারতলায়। লিফট কাজ করছে না, তাই সিঁড়ি দিয়েই নামল সে। নিচে নামতেই দেখল দারোয়ান রহমত মিয়ার কেবিনটা খোলা, কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। চায়ের কাপটা টেবিলে রাখা, সেখান থেকে তখনো হালকা ধোঁয়া উড়ছে। যেন কেউ এইমাত্র এখানে ছিল।


"রহমত চাচা?" অনিমেষ ডাক দিল।

আশ্চর্য ব্যাপার, তার নিজের গলার আওয়াজটা যেন চারদিকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল। রাস্তাটা কুয়াশায় ঢাকা নয়, অথচ দৃষ্টি বেশি দূর যাচ্ছে না। ধোঁয়াশার মতো একটা আবরণ সব কিছুকে আড়াল করে রেখেছে।

🇵🇸🇵🇸🇵🇸

সে হাঁটতে শুরু করল। মোড়ের মাথায় শরিফুলের মুদির দোকান। দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক নামানো। ভেতরে জিনিসপত্র সব গোছানো আছে, কিন্তু শরিফুল নেই। অনিমেষ একটা পানির বোতল হাতে নিল। ক্যাশে টাকা রাখার জায়গায় দেখল নোটগুলো সব সাদা কাগজ হয়ে গেছে। কোনো ছাপ নেই, কোনো রং নেই।


### ৩. ল্যাবরেটরির রহস্য


হঠাৎ অনিমেষের মনে পড়ল তার অফিসের কথা। সে কাজ করে 'নিউরো-টেক' নামের এক রিসার্চ ল্যাবে। সেখানে তারা মানুষের স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করছিল। গত সপ্তাহে ল্যাবে একটা বড় বিস্ফোরণ হয়েছিল। তারপর থেকেই অনিমেষের সব কিছু ঝাপসা লাগছে।


সে যখন ল্যাবের সামনে পৌঁছাল, দেখল বিল্ডিংটা অর্ধেক ধসে পড়েছে। ভেতরে ঢুকতেই তার দেখা হলো ডক্টর জামানের সাথে। ডক্টর জামান একটা ভাঙা কম্পিউটারের সামনে বসে পাগলের মতো কী যেন টাইপ করছেন।


"ডক্টর! এসব কী হচ্ছে? মানুষজন কোথায়?" অনিমেষ চিৎকার করে বলল।

ডক্টর জামান মুখ তুললেন। তার চোখে কোনো মণি নেই, শুধু সাদা পর্দা। তিনি শীতল গলায় বললেন, "অনিমেষ, তুমি এখনো বোঝোনি? কেউ কোথাও নেই। আমরা সবাই একটা লুপের ভেতর আটকে গেছি।"

Ad-2

🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

### ৪. সত্যের মুখোমুখি


ডক্টর জামান বোঝাতে লাগলেন যে, বিস্ফোরণের সময় একটি 'সাব-অ্যাটমিক রিয়ালিটি' তৈরি হয়েছে। শহরের সবাই এখন সেই সমান্তরাল মহাবিশ্বে চলে গেছে। কিন্তু অনিমেষের মস্তিষ্ক সেই বিস্ফোরণের ধাক্কায় এই দুই জগতের মাঝখানে আটকে গেছে।


"তাহলে উপায়?" অনিমেষের গলা শুকিয়ে এল।

"উপায় একটাই," ডক্টর বললেন, "তোমাকে তোমার নিজের স্মৃতিগুলো ধ্বংস করতে হবে। তবেই তুমি মূল পৃথিবীতে ফিরতে পারবে। কিন্তু যদি ভুল করো, তবে চিরকাল এই শূন্যতার ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে থেকে যাবে।"


### ৫. স্মৃতির দহন


অনিমেষের চোখের সামনে তার ছোটবেলার দৃশ্য ভেসে উঠল। মায়ের হাতের রান্না, বাবার কড়া শাসন, তার প্রেমিকা নীলার সাথে কাটানো বিকেলগুলো। এই সব স্মৃতি তাকে এই মায়াবী জগতে আটকে রাখছে। সে দেখল নীলা রাস্তার ওপার থেকে তাকে ডাকছে।


"অনিমেষ, এসো! আমরা এখান থেকে চলে যাই!" নীলা হাত বাড়াল।

অনিমেষ এক পা বাড়াল, কিন্তু তখনই ডক্টর জামানের কথা মনে পড়ল। এই নীলা আসলে সত্যি নয়, এটি একটি মায়া। সে চোখ বন্ধ করল। চিৎকার করে বলল, "এসব মিথ্যে! আমি জানি তুমি নেই!"


মুহূর্তের মধ্যে নীল রঙের আকাশটা কালো হয়ে গেল। চারপাশের বিল্ডিংগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। অনিমেষ অনুভব করল সে এক গভীর গহ্বরে পড়ে যাচ্ছে।

🇵🇸🇵🇸🇵🇸

Ad-3

### ৬. প্রত্যাবর্তন


অজস্র আলোর ঝিলিক তার চোখের ওপর দিয়ে চলে গেল। কানে এক বিকট শব্দ। হঠাৎ সব শান্ত হয়ে গেল।

অনিমেষ চোখ খুলল। নাকে ওষুধের কড়া গন্ধ। সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। পাশে অনেকগুলো মেশিন বিড়বিড় শব্দ করছে। নার্স এসে তার কপালে হাত রাখল।


"আপনি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন? ডাক্তার ডাকছি!" নার্স দৌড়ে গেল।

অনিমেষ জানলার বাইরে তাকাল। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে, ট্রাফিক জ্যামের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রোদ এসে পড়েছে তার চাদরের ওপর। সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সব তবে স্বপ্ন ছিল?


কিন্তু হঠাৎ তার নজর গেল পাশের টিপয়ের ওপর থাকা গ্লাসের দিকে। গ্লাসের ভেতরে পানি নেই, কিন্তু গ্লাস থেকে শোঁ-শোঁ শব্দ বেরোচ্ছে। ঠিক যেমনটি সে সেই জনশূন্য শহরে শুনেছিল। সে নিজের হাতের তালু দেখল—সেখানে কোনো রেখা নেই, একদম সাদা কাগজের মতো মসৃণ।


অনিমেষের বুকটা আবার কেঁপে উঠল। সে কি আসলেও ফিরে এসেছে, নাকি এটা মায়ার আরও এক গভীর স্তর?

Ad-4

---

🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸🇵🇸

**গল্পের সমাপ্তি:** অনিমেষ যখন বুঝতে পারল সে এখনো সেই গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে আছে, তখন চারপাশ থেকে আবার সেই অদ্ভুত বাঁশির সুর ভেসে এল। ডক্টর জামানের কথাটি তার কানে বাজতে লাগল— *"শূন্যতার ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে থেকে যাবে।"*


--- 

Post a Comment

0 Comments