---
শূন্যের ওপারে
১. ধূসর সকালের সংকেত
অনিমেষ যখন চোখ খুলল, দেখল তার ঘরের সিলিংটা চেনা কিন্তু ফ্যানটা ঘুরছে না। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখল আকাশটা আজ অদ্ভুত এক বেগুনি রঙ ধারণ করেছে। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। পায়ের নিচে মেঝের স্পর্শটা কেমন যেন তুলতুলে, যেন সে মাটির ওপর নয়, মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে আঁতকে উঠল। তার চোখের মণি দুটো নেই, সেখানে শুধু দুটো শূন্য গর্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সে নিজের গালে চিমটি কাটল, কোনো ব্যথা অনুভব করল না।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
"আমি কি মারা গেছি?"—নিজের মনেই বিড়বিড় করল অনিমেষ।
### ২. জনশূন্য রাজপথ
অনিমেষ ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় দেখল পাশের ফ্ল্যাটের মকবুল সাহেবের দরজা হা করে খোলা। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজানো, চা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, কিন্তু কেউ নেই। যেন এক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষগুলো স্রেফ হাওয়া হয়ে গেছে।
সে নিচে নেমে রাজপথে পা রাখল। ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এই রাস্তা এখন কবরের মতো শান্ত। সিগন্যালে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কোনো ড্রাইভার নেই। বাসগুলোর ভেতরটা ফাঁকা। অথচ ইঞ্জিনগুলো সচল, নিচু স্বরে গোঁ গোঁ শব্দ করছে।
🇧🇩🇧🇩
হঠাৎ দূরে একটা ছায়াকে নড়তে দেখল সে। কেউ একজন হাত নাড়ছে। অনিমেষ দৌড়ে সেদিকে গেল। দেখল একটা বাচ্চা ছেলে পার্কের বেঞ্চে বসে একা একা ফুটবল খেলছে। কিন্তু ফুটবলের বদলে সে লাথি দিচ্ছে একটা পুরোনো টিনের কৌটাকে।
Ad-1
### ৩. রহস্যময় বালক
"বাবু, তোমার নাম কী? সবাই কোথায়?"—অনিমেষ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি লাথি থামিয়ে অনিমেষের দিকে তাকাল। তার চেহারাটা অদ্ভুতভাবে অনিমেষের ছোটবেলার ছবির মতো। ছেলেটি ফিসফিস করে বলল, "ওরা সবাই জিরো পয়েন্টে চলে গেছে। তুমি দেরি করে ফেলেছ।"
"জিরো পয়েন্ট কী? আর 'ওরা' কারা?"
ছেলেটি কোনো উত্তর না দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন 'স্কাই টাওয়ার'-এর দিকে নির্দেশ করল। মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দে অনিমেষের কানে এল— "স্মৃতি পোড়াও, তবেই পথ পাবে।"
🇧🇩
### ৪. স্কাই টাওয়ারের অভিযান
অনিমেষের হাতে আর সময় নেই। সে স্কাই টাওয়ারের দিকে ছুটতে শুরু করল। পথে সে দেখল তার জীবনের ফেলে আসা নানা স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠছে। রাস্তার মোড়ে দেখল তার মৃত মা দাঁড়িয়ে আছেন। মা তাকে ডাকছেন, "অনি, খাবি আয়!"
অনিমেষের খুব ইচ্ছে হলো মায়ের কাছে যেতে, কিন্তু সে জানত এটা একটা মায়া। সে চোখ বন্ধ করে দৌড়াতে থাকল।
টাওয়ারের নিচে পৌঁছাতেই দেখল বিশাল এক ল্যাবরেটরি। সেখানে ডজনখানেক কম্পিউটার স্ক্রিনে তার নিজের জীবনের ভিডিও চলছে। জন্ম থেকে আজ সকাল পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ড করা আছে সেখানে।
### ৫. ডক্টর জামানের প্রত্যাবর্তন
হঠাৎ ল্যাবের অন্ধকার কোণ থেকে ডক্টর জামান বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা বিশাল সিরিঞ্জ।
"স্বাগতম অনিমেষ। তুমি শেষ পর্যন্ত আসতে পেরেছ। আমরা 'প্রজেক্ট মেমোরি'র শেষ ধাপে আছি।"
অনিমেষ অবাক হয়ে বলল, "এসব কী হচ্ছে ডক্টর? আমি কি কোনো এক্সপেরিমেন্টের ভেতর আছি?"
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
ডক্টর হাসলেন। "আসলে তুমি কখনোই এই পৃথিবীতে ছিলে না। তুমি একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে মানুষের স্মৃতি দিয়ে প্রোগ্রাম করা হয়েছে। আজ তোমার হার্ডড্রাইভ ফরম্যাট করা হবে। তাই তোমার চারপাশটা এমন শূন্য হয়ে গেছে।"
### ৬. অস্তিত্বের লড়াই
অনিমেষ বিশ্বাস করতে পারল না। তার শৈশব, তার ভালোবাসা, তার কষ্ট—সব কি স্রেফ কোডিং? সে আর্তনাদ করে উঠল। ল্যাবের স্ক্রিনগুলো একে একে নিভে যেতে শুরু করল। তার চোখের সামনে তার প্রিয় নীলার ছবিটা ঝাপসা হয়ে এল।
"যদি আমি প্রোগ্রাম হই, তবে আমার কেন কষ্ট হচ্ছে?"—অনিমেষ চিৎকার করে বলল।
ডক্টর জামান এগিয়ে এসে বললেন, "কষ্ট হওয়াটাই তোমার শেষ বাগ (Bug)। এটা মুছে দিলেই তুমি নিখুঁত হয়ে যাবে।"
অনিমেষ ডক্টরের হাত থেকে সিরিঞ্জটা কেড়ে নিল। সে বুঝল, তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে এই ল্যাব ধ্বংস করতে হবে। সে একটি বড় সার্ভারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকে আগুনের ফুলকি ছুটে এল।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
### ৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
পুরো ভবনটা কাঁপতে শুরু করল। অনিমেষ দেখল তার শরীরটা আস্তে আস্তে ডিজিটাল ডাস্ট বা ধুলোয় পরিণত হচ্ছে। সে হাসল। সে মারা যাচ্ছে না, বরং সে এই মিথ্যে জগত থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
সে যখন চোখ বন্ধ করল, তখন তার মনে পড়ল সেই ছোটবেলার বৃষ্টির ঘ্রাণ। যদি এটা কোডিংও হয়, তবুও এই অনুভূতিটা তার নিজের।
Ad-2
### ৮. নতুন জগত
অনিমেষ যখন আবার চোখ খুলল, দেখল সে এক বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে শুয়ে আছে। সেখানে কোনো বিল্ডিং নেই, কোনো প্রযুক্তি নেই। শুধু আছে পাখির ডাক আর নীল আকাশ। দূরে এক তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। সে নীলা।
নীলা তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "আমরা এবার সত্যিই স্বাধীন।"
অনিমেষ বুঝতে পারল না সে কোনো নতুন প্রোগ্রামে ঢুকেছে নাকি এটাই আসল জগত। কিন্তু তার এখন আর কিছু জানতে ইচ্ছে করছে না। সে নীলার হাত ধরল।
---
🇧🇩🇧🇩🇧🇩
**উপসংহার:** আকাশ থেকে সাদা সাদা ডেটা পয়েন্টগুলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। অনিমেষ আর নীলা সেই ডিজিটাল বৃষ্টির ভেতরেই হেঁটে চলল এক অসীম অজানার পথে। তাদের পেছনে পড়ে রইল এক ধ্বংস হওয়া কাল্পনিক শহর।
---
Ad-3
0 Comments