মানবজনম
সাধারণ মেয়েলি সলজ্জতা কিংবা অতিরিক্ত আদব লেহাজের বালাই পারুলের কখনোই ছিল না। সে ভীষণ ঠোঁটকাটা, ডাকাবুকো টাইপের মেয়ে। কথায়, আচরণে তেমন কমনীয়তা নেই। বরং বেশ চাঁছাছোলা, অকপট, রুক্ষ্মই। বিশেষ করে গাঁয়ের ছোকছোক করা ছেলেদের কাছেতো অবশ্যই।
কিন্তু আজ এই মুহূর্তে হঠাৎই কোন আবডাল থেকে যেন অন্য এক পারুল দুম করে বের হয়ে এল। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘ঘরের ভিতর আসেন কাকু। বৃষ্টির মধ্যেও বাড়িতে মানুষের ভিড় দেখছেন ? উঠানের মাটিও সব কাদা কইরা ফেলছে। আপনেরা টিনের নিচে আসেন। আমি বসনের চেয়ার দেই।’
পারুলের চোখেমুখে অচেনা সলজ্জ এক ভঙ্গিমা। সে ঘরে গিয়ে রতনের হাতে দুখানা চেয়ার পাঠিয়ে দিলেও নিজে আর এল না। বাইরের খোলা বারান্দায় বসে রইল নয়ন, মনির, হারু মুনসী।
সেদিনের সেই ভয়ংকর ও বিচিত্র নৌকাযাত্রার পর আব্দুল ফকিরের সঙ্গে অন্তত আরও একবার দেখা করতে চাইছিল নয়ন। সে কারণেই এতদূর আসা। কিন্তু তার ভাগ্য খারাপ। সামান্যর জন্য আব্দুল ফকিরের সঙ্গে আজ দেখাটা হলো না।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩তবে বাজারে লোকমুখে শোনা গতরাতের ঘটনাটা এ বাড়ির প্রতিও তাকে কৌতূহলী করে তুলেছে।
পারুল এল দীর্ঘসময় পর। এই সময়ে সে তার চোখেমুখে পানি ছিটিয়েছে। সামান্য পাউডার মেখেছে। এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে খোঁপা বেঁধেছে। এমনকি পরনের শাড়িটাও বদলে নিয়েছে। খানিক আগে তাবারনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন, আহত পারুলের সঙ্গে এই পারুলের কোনো মিল নেই।
যেন তারা আলাদা মনোজগতের ভিন্ন দুই মানুষ।
নয়ন পারুলকে দেখে খানিক অবাক হলেও সেটি প্রকাশ করল না। বরং নরম গলায় বলল, ‘ওনার কোথায় পুড়েছে ?’
পারুল বলতে গিয়েও যেন খানিক সংকোচ করল। তারপর ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ‘গলা থিকা পুরা বুক।’
নয়ন পারুলের সংকোচের কারণটা ধরতে পারল। সে বলল, ‘আমি ডাক্তার। ডাক্তারের কাছে কোনো সংকোচ করবেন না। তবে একটা বিষয়, আপনার বাবাতো বড়ো কবিরাজ। নানান চিকিৎসা পথ্য দেন। এখন বাইরের কোনো ডাক্তার এসে চিকিৎসা দিলে যদি তিনি কিছু মনে করেন ?’
পারুল ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘না না, আব্বা কিছু বলবো না। আমার উপরে সে কোনো কথাই বলবে না।’
নয়ন মৃদু হাসল, ‘আপনার বাবা বুঝি খুব ভালোবাসে লন আপনাকে ?’
পারুল এই কথার জবাব দিল না। তবে লজ্জিত ভঙ্গিতে মৃদু হাসলো। নয়ন বলল, ‘রোগীর এখন কী অবস্থা ? কোনো ব্যবস্থা আপনারা নিয়েছেন ?’
পারুল মাথা দোলালো। সে বলল, ‘আব্বা বইলা গেছিলো ডিমের সাদা অংশ আর মধু মাখতে। ডিম মাখাইছি, কিন্তু মধুতো পাই নাই’।
নয়ন বলল, ‘আমি শুনেছি গরম ঝোল তরকারি পড়ে পুড়েছে, তাই না?’
পারুল উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো।
নয়ন বলল, ‘আপনি ডিম মাখানোর আগে কী পোড়া জায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করে নিয়েছিলেন?’
পারুল মৃদু গলায় বলল, ‘তাবারন খালায় তহন চিক্কুর দিয়া কানতেছিল। আমার মাথা কাজ করতেছিল না। একটু পানি দিয়া ধুইয়া তাড়াতাড়ি ডিম মাখাই দিছি’।
নয়ন বলল, ‘আমি যেহেতু দেখতে পারছি না, সুতরাং বলতেও পারছিনা, রোগীর ক্ষতস্থান কতটা গভীর। তবে একটা কথা, ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে না ফেললে কিন্তু ইনফেকশন হবে’।
পারুল ইনফেকশন কথাটার অর্থ ঠিক বুঝল না। সে যে বোঝে নি সেটি নয়নের বুঝতে সামান্য সময় লাগলো। নয়ন সাথে সাথেই আবার বলল, ‘পচন ধরবে। মধু থাকলে ভালো হতো। মধু পচন ঠেকাতে খুব ভালো কাজ দেয়। তবে এখুনি ভালো করে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে হবে। আর বলুনতো, পোড়া জায়গাটি কি লালচে সাদা হয়ে আছে?’
পারুল সাথে সাথে জবাব দিল না। সে এতোটা খেয়াল করে দেখে নি। ভেতর থেকে এখনো তাবারনের চিৎকার শোন যাচ্ছে।
তবে নুরুন্নাহার এখন খানিকটা থেমেছেন।
পারুল মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমি পরিষ্কার কইরা আসব? ভালো কইরা দেইখাও আসব, কী অবস্থা?’
নয়ন বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই পরিষ্কার করবেন। তবে আমার ধারনা পোড়াটা খারাপভাবেই পুড়েছে। কারণ, একেতো আগুন গরম তরকারি। তারওপর জায়গাটাও পোড়ার জন্য খারাপ। এখানে আশেপাশেতো কোন ওষুধের দোকন দেখলাম না। আমি একটা মলম লিখে দিচ্ছি, কোনভাবে সম্ভব হলে কোথাও থেকে আনিয়ে নেবেন’।
পারুল কেবল ডান দিকে মাথা কাঁত করল। তার কেমন যেন লাগছে। সে বোঝাতে পারবে না। কিন্তু এমন কেন হচ্ছে? তারতো এমন হবার কথা না। সে হঠাৎ কিছু না বলেই টুপ করে ঘরের ভেতরে চলে গেল। কিন্তু ভেতরে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবার ফিরে এলো। তারপর বলল, ‘আপনেরা কিন্তু দুপুরের না খাইয়া যাইবেন না’।
নয়ন বলল, ‘না না। আমরা এখনই চলে যাব। আসলে আপনার বাবার সঙ্গে একটু দেখা করার দরকার ছিল আমার। এ কারণেই আসা। কিন্তু এসে শুনি এই ঘটনা।’
পারুল আরও কী কী বলতে চাইছিল, কিন্তু তার কিছুই বলতে পারল না সে। সব এলোমেলো হয়ে তালগোল পাকিয়ে গেলো।
কিন্তু নয়নরা চলে যাওয়ার পর সেই সারাটা দিন কেমন অদ্ভুত এক আতরের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াতে লাগলো বাতাসে। কেমন একটা ঘোর। একটা স্বপ্ন স্বপ্ন অনুভব। সেই ঘোর যেন আর কাটে না। বারকয়েক নিজের অজান্তেই টিনের গেটের কাছে, রাস্তার ধারে চলে এলো সে। ছেলেটা কি সত্যি সত্যিই চলে গেছে? নাকি এখনো আশেপাশেই কোথাও আছে? কিংবা আবার যদি ফিরে আসে? কিন্তু কেন ফিরে আসবে? এখানে তার কী কাজ? তাহলে সে কেন এসব ভাবছে?
🇧🇩🇧🇩🇧🇩ধুর ছাই, এমন কেন হচ্ছে তার?
বিকেল নাগাদ মানুষের ভিড় কমতে লাগল। ছবিরনও খানিক ধাতস্থ হয়েছে। তাবারন সারা দিন বাদে শান্ত হয়ে ঘুমিয়েছে। নির্ঘুম রাত আর দিনের ছোটাছুটিতে পারুলের শরীরটাও যেন ভেঙে পড়ছিল।
ঘুমাবে বলে ঘর অন্ধকার করে বিছানায় শরীরখানা এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম জেঁকে বসল তার চোখে। কিন্তু সেই ঘুম বেশিক্ষণ থাকলো না। ধড়ফড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠল সে। তারপর অন্ধকার ঘরে দীর্ঘসময় চুপ করে বসে রইল।
আজ সকালে তাদের ঘরের বারান্দায় বসে কথা বলা মানুষটাকে সে মাথা থেকে কিছুতেই তাড়াতে পারছে না। কিছুতেই না।
মানুষটা যেন অবচেতনেই তার মাথায় পুরোপুরি গেঁথে গেছে।
লতার দেখাদেখি একটা শহুরে প্রেমিকের তীব্র আকাঙ্খা তার ছিল। হয়তো আক্ষেপও। হয়তপ সেকারণেই অমন কারো কথাই অবচেতন মনে সারাক্ষণ ভাবছিলও। কোথাও তীব্রভাবেই একটা শহুরে ছেলের অপেক্ষা তার ছিল!
কিন্তু আজ চোখের সামনে পারুল যাকে দেখেছে, সে তার কাছে স্বপ্নেরও বেশি কিছু।
একটা মানুষ এতো সুন্দর করে হাসে, কথা বলে!
পারুল মানুষটাকে কোনভাবেই তার ভাবনা থেকে তাড়াতে পারছে না। ঘুমের মধ্যেও মানুষটাকে স্বপ্নে দেখেছে সে। সেই স্বপ্ন দেখেই ঘুম ভেঙেছে।
সে দেখেছে তাদের পুকুর ঘাটে ওই মানুষটার সাথে সে বসে রয়েছে। মানুষটার পরনে নীল পাঞ্জাবী। আর তার পরনে নীল শাড়ি। আকাশে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়েছে পানিতে। তারা দুজন পানির দিকে তাকিয়ে আছে।
মানুষটা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘পারুল, দেখোতো, পানি কাঁপছে, সঙ্গে চাঁদও কাঁপছে। দৃশ্যটা সুন্দর না?’
পারুলের কাছে দৃশ্যটা আহামরি সুন্দর কিছু বলে মনে হচ্ছিল না। কিন্তু এই মানুষটার পছন্দের বাইরে সে কিছু বলতে চায় না।
ফলে সে মাথা ঝাকিয়ে বলল, ‘খুব সোন্দর’।
মানুষটা পারুলের দিকে তাকিয়ে আবার হাসলো। তারপর বলল, ‘সোন্দর না পারুল, বলো সুন্দর। খুব সুন্দর।'
পারুল অবশ্য তার কথা শুনল না। তার মাথায় গেঁথে আছে মানুষটার হাসি। মানুষ এতো সুন্দর করে হাসে কীভাবে !
সে নিষ্পলক চোখে মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মানুষটা আবারো হাসল। বলল, ‘তোমার সাথে আমার কী কথা ছিল পারুল?'
"কী কথা?'
'তুমি এই গাঁয়ের ভাষায় নয়, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে। কেবল পুরোপুরি শুদ্ধ করে কথা বলতে পারলেই তোমাকে আমি ঢাকা নিয়ে যাবো।’
পারুল এবারো কোন কথা বলল না।
মানুষটা আবার বলল, ‘কী? পারবে না পুরোপুরি শুদ্ধ করে কথা বলতে?’
পারুল যে শুদ্ধ করে কথা বলার চেষ্টা করে নি তা নয়। কিন্তু সে পারছে না। এই শুদ্ধ করে কথা বলার ব্যাপারটি তার কাছে ভারি কঠিন মনে হচ্ছে।
সে হঠাৎ বলল, ‘আপনেতো ডাক্তার। বড় ডাক্তার। ডাক্তাররাতো সব কিছুই সহজে কইরা দিতে পারে। আপনে আমারে সহজে শুদ্ধ কইরা কথা বলনের ডাক্তারি কোনো ব্যবস্থা করে দেন?'
'সহজে শুদ্ধ করে কথা বলার আবার ডাক্তারি কী ব্যবস্থা? '
'কেন, একটা ঔষুধ দিবেন। শুদ্ধ কথা বলনের ঔষুধ। সেই ঔষুধ টুপ কইরা পানিতে গিল্যা খাবো, আর সঙ্গে সঙ্গেই টপটপ শুদ্ধ কথা বলা শুরু করব। কী নাই এমন ঔষুধ? পারবেন না দিতে?'
মানুষটা পারুলের কথা শুনে হো হো করে হাসতে লাগলো। সেই হাসি আর থামছে না। থামছেই না। পারুলের হঠাৎ ভয় করতে লাগলো। এমন করে কেউ হাসে? দেখে মনে হচ্ছে হাসতে হাসতে মানুষটার হেঁচকি উঠে যাচ্ছে। এখুনি দম আটকে মারা যাবে সে। পারুলের কী ভয়ংকর এক অনুভূতি হতে লাগলো। ভয়ে হাত পা অসাঢ় হয়ে এলো তার। যদি সত্যিই অমন কিছু হয়ে যায় মানুষটার? সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে মানুষটার ওই হাসি থামাতে। কিন্তু পারছে না। তারচেয়েও বড় সমস্যা, মানুষটাকে সে কী বলে ডাকবে?
পারুল বুঝতে পারছে না, কি বলা উচিৎ! মানুষটা তার কী হয়, তাও সে জানে না! আচ্ছা কী সম্বোধনে করবে সে তাকে? নাম ধরে ডাকবে?
পারুল হঠাৎ আবিষ্কার করলো মানুষটার নামই সে জানে না।
হয়তো নামটা সে জানতো কিন্তু এই মুহুর্তে ভুলে গেছে। কিছুতেই আর নামটা মনে করতে পারছে না সে। পারুল প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো।
কিন্তু পারল না।তার কী যে কষ্ট হতে লাগল! কী ভয়ংকর কষ্ট! আচ্ছা, কী নাম মানুষটার?
বাদল? বেলাল? হাসান?
অসংখ্য নাম মনে পড়লেও কেবল ওই মানুষটার নামই কিছুতেই মনে করতে পারল না সে। পারুলের হঠাৎ চিৎকার করে কান্না পেতে লাগল। দম আটকে আসতে লাগল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুম ভেঙে গেলো।
সেই ঘুম ভাঙা গাঢ় বিষণ্ণ সন্ধ্যায় সে এলোচুলে হেটে চলে এলো পুকুরের ঘাটে।
ঘাটে বসে সে আবিষ্কার করল মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে মস্তবড় চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলো পড়েছে পুকুরের পানিতে। পুকুরের পানি সামান্য কাঁপছে। সাথে সাথে কাঁপছে চাঁদটাও। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
পারুল অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে পুকুরের পানিতে কম্পমান সেই চাঁদের দিকে। তার হঠাৎ মনে হতে লাগলো তার ঠিক অন্য পাশেই ঘাটের আরেক প্রান্তে বসে রয়েছে সেই মানুষটা।
সে ঘাড় ঘুরে তাকালেই তাকে দেখতে পাবে।
কিন্তু তার তাকাতে ইচ্ছে করছে না। যদি কোনো কারণে তাকিয়েই দেখে যে মানুষটা ওখানে নেই! তখন কী করবে সে?
পারুল তাকালোও না।
সে তাকিয়ে রইল পুকুরের জল জোছনায়।
সেই জল জোছনায় তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার হঠাৎ মানুষটার নাম পড়ে গেলো।
মানুষটার নাম নয়ন।
পারুল জানে, নয়ন মানে চোখ।
কী আশ্চর্য,
সে তার 'চোখে'র সামনে থেকে 'নয়ন'কে তাড়াতে পারছে না!
পর্ব-১১
ফজরের নামাজ শেষে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হাঁটতে বেরিয়েছেন। তার সঙ্গে এস্কান্দার। এস্কান্দারের হাতে তেল চকচকে বাঁশের লাঠি। এমন লাঠি নিয়ে আজকাল আর কেউ হাঁটে না। তবে এস্কান্দারের অভ্যাস হয়ে গেছে। সে শুনেছে, তার বাবা হায়দার আলী যখন তৈয়ব খাঁর সঙ্গে হাঁটতেন, তখন তার হাতে থাকত তীক্ষ্ণ ফলার ঝকঝকে বর্শা। কিন্তু সেই বর্শার যুগ আর এখন নেই।
এই নিয়ে এস্কান্দারের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও আছে। সুযোগ পেলে সে সেই হতাশার কথা তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে বলেও। আজ যেমন বলল, ‘দাদাজান, দিনকাল ভালো না। একখান বন্দুক দরকার। আজকাল বাঁশের লাঠি লইয়া হাঁটলে মানুষ হাসে।’
‘বাঁশের লাঠির কী দরকার ? কোনোকিছুরই দরকার নাই।’
‘কী বলেন দাদাজান!’ আঁতকে ওঠা কণ্ঠে বলল এস্কান্দার।
‘ঘটনা শোনেন নাই ? উত্তর কান্দির খোনকার বাড়িতে সেইদিন ডাকাতি হইছে। খুন-খারাবির ঘটনাও ঘটছে। এই খবর পেপার পত্রিকায়ও আসছে।’
‘আমার বাড়িতেও ডাকাইত পড়ব এইরকম কোনো ঘোষণা আসছে নি ? আগে তো ডাকাইতরা উড়া চিঠি পাঠাইয়া ডাকাতি করত। তোরেও সেইরকম কিছু পাঠাইছে নি যে এইজন্য তোর বন্দুক লাগবে ?’
এস্কান্দার থতমত খাওয়া গলায় বলল, ‘না না দাদাজান। আপনের বাড়িতে ডাকাইত পড়বো, এমন সাহস কার ? তারপরও দাদাজান, একখান বন্দুক লগে থাকলে বল পাই।’
‘তোর বাপ হয়দার আলী খালি হাতে গন্ডায় গন্ডায় মানুষ মারছে। তুই তার পোলা। তোর সাহস-শক্তির জন্য বন্দুক লাগব ? আর তুই বন্দুক চালাইতে পারবি ?’
এস্কান্দারের চোখে যেন আশার আলো জ্বলে উঠল। সে বলল, ‘আমি চালানি শিখ্যা ফেলব দাদাজান। টিগার টানলেই তো গুল্লি বাইরায়।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সামান্য হাসলেন। বেশ কিছুক্ষণ আর কথা বললেন না। তারপর আচমকা বললেন,
‘বন্দুক থাকলে গুলি সকলেই করতে পারে। এইটা কঠিন কোনো বিষয় না। কঠিন বিষয় হইল বন্দুক হাতে থাকা সত্ত্বেও গুলি না করতে পারা। বন্দুকের গুলি আর হাতের কাঁচা পয়সা, এই দুই জিনিস থাকলে খালি খরচ করতে মন চায়। হাত নিশপিশ করে। এইজন্য গুলিভর্তি বন্দুক হাতে লইয়াও গুলি না করতে পারাটাই আসল বন্দুক চালানি। এইটা শেখন দরকার সবার আগে।’
তৈয়ব উদ্দিনের খাঁর এমন গভীর কথাবার্তা খুব একটা বোঝে না এস্কান্দার। কিন্তু তার যে একখানা পুরোনো বন্দুক আছে, সেই বন্দুকটার প্রতি খুব লোভ তার।
‘তোর বন্দুক ক্যান দরকার সেইটা আগে বল।’
এস্কান্দার মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘শামুকের বিলে কি শামুকভাঙা পাখি আইছে নি ? ওই পাখি তো শীতকালে আসনের কথা।’
এস্কান্দারের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। খাঁ সাহেব তার মনের কথা জানলেন কী করে ?
এই লোক কি মন পড়তে পারেন নাকি ?
শামুকের বিলে বারো মাস পাখি থাকে। শীতের দিকে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে শামুকভাঙা। বর্ষায় লাল শাপলার বিল ধবধবে সাদা বকে ছেয়ে যায়। তবে শামুকভাঙাও কিছু থাকে। একখানা বন্দুক হলে বেশ হতো। বন্দুক হাতে কাঁধভর্তি শিকার করা পাখি শেকলের মতো ঝুলিয়ে হাঁটার খুব শখ তার।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হাসলেন, ‘আরে গাধা, মানুষ মারনের বন্দুক আর পক্ষি মারনের বন্দুক এক না। পক্ষি মারনের বন্দুক আলাদা।’
এস্কান্দার আর কথা বলল না।
সে বুঝতে পারছে, তার আশার বেলুনটা নিরাশার আলপিনে বিদ্ধ হয়েছে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আবার হাঁটা দিলেন। তার চোখ মাটিতে নিবদ্ধ। মৃত সলিমুদ্দি দফাদারের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। এ বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না। সলিমুদ্দির বৃদ্ধ স্ত্রী একমাত্র পুত্রের সঙ্গে শহরে থাকেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ দীর্ঘসময় তাদের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সামনের বিস্তৃত উঠান ঢেকে গেছে ঘন দূর্বাঘাসে। সাথে বর্ষার জল-হাওয়া পেয়ে কিলবিল করে বেড়ে উঠেছে জংলি লতাপাতা। কিছু লতা সাপের মতন একেবেঁকে টিনের বেড়ার গা বেয়ে মাঝামাঝি অবধি উঠে গেছে।
সবুজকে বলা হয় প্রাণের স্পন্দন।
অথচ এই বাড়ি, বাড়ির উঠান, ঘরের বেড়া অবধি এই যে এত গাঢ় সবুজ, তার সকলই যেন প্রাণহীনতার গল্প বলছে। বলছে, এই বসতি শূন্য। এখানে মানুষের প্রাণ নেই, শব্দ নেই, কোলাহল নেই।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
এই শূন্যতাকে বড়ো ভয় পান তিনি।
তার এই দীর্ঘ জীবনে এমন কত দৃশ্য, কত ঘটনা যে তিনি দেখেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
যৌবনের ভরভরন্ত, বেপরোয়া, প্রমত্ত মানুষকে প্রৌঢ়ত্বে গিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেছেন। সামান্য অনুগ্রহ ভিক্ষার জন্য কত উদ্ধত শির নতজানু হতে দেখেছেন।
যে বাড়ির দহলিজ ঘরে রোজ শ’য়ে শ’য়ে মানুষের আনাগোনা হতো, সালিশ বসত, সেই বাড়ির ভিটেয় লাউ, শিম, ঝিঙের মাচা বসতে দেখেছেন। দেখেছেন ঘুঘু-টিয়ের বাসাও।
যে বাড়ির চুলায় রোজ মণকে মণ ভাত, আস্ত খাসি, আইড়-বোয়াল রান্না হতো, সেই বাড়িতেও দিনের পর দিন আগুনশূন্য চুলা তিনি দেখেছেন।
এই হলো জীবন। মানবজীবন।
এ কারণেই তার ভয়।
সবচেয়ে বড়ো ভয় নিজের দুই পুত্রকে নিয়ে।
বড় ছেলে খবির খাঁ তাও যতটুকু চোখ-কান খোলা রেখে চলে। বাবার পরিচয়ের ছায়ায় চেয়ারম্যান অবধি হয়েছে সে। কিন্তু ছোটপুত্র দবির খাঁ এসবের ধার ধারে না। সে বাড়িঘরে থাকে না। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। ছয় মাস-এক বছরে হঠাৎ হঠাৎ আসে। এসে ধান-পাট-গাছপালা বিক্রি করে টাকা নিয়ে আবার উধাও হয়ে যায়। বিয়েশাদিও করে নি সে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁর ধারণা, ছেলেদের দিয়ে তার বংশরক্ষা হবে না। এ কারণে তিনি খুব করে চাইছিলেন, খবির খাঁর যেন পুত্রসন্তান হয়। আল্লাহ তার চাওয়া পূরণ করেছেন। খবির খাঁর দুটি পুত্রসন্তান হয়েছে। বড়জনের নাম মবিন। সে মধ্যপ্রাচ্যে থাকে। ছোটজন মনির। সমস্যা হচ্ছে, এই দুই নাতিকে নিয়েও তিনি যারপরনাই হতাশ। আল্লাহ এদের গায়ে শক্তি দিলেও মাথায় বোধবুদ্ধি কিছু দেন নি।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সুদূরপ্রসারী চিন্তার মানুষ। কিন্তু তার সেই চিন্তা বোঝার ক্ষমতা তার আশপাশের মানুষের খুব একটা নেই। ফলে তিনি যেদিন বড় নাতি মবিনকে কুয়েত পাঠানোর কথা বললেন, সেদিন খবির খাঁ ভীষণ অবাক হয়েছিলেন।
কিন্তু বাবার প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো প্রশ্ন করার সাহস তার হয় নি।
এই সময়ে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আরও একটি কাজ করলেন। তিনি তার ছোট নাতি মনিরের নামে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলালেন মাদারীপুর শহরে। সমস্যা হচ্ছে, সেই অ্যাকাউন্ট দেখভাল করাটা মনিরের জন্য বেশ দুরূহ হয়ে উঠল। এমনিতেই মাছ ধরা ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তার আগ্রহ নেই। তারওপর ব্যাংকের মতন এমন জটিল বিষয়াদি সে কী করে সামলাবে ? এই নিয়ে সকলেই সন্দিগ্ধ ছিল। কিন্তু গত চার বছরে মবিন কুয়েত থেকে যত টাকা পাঠিয়েছে, তার হিসেবনিকেশ, খোঁজখবর রাখতে গিয়ে মনির বেশ চোখা হয়ে উঠেছে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সম্ভবত এটিই চেয়েছিলেন।
নিজেকে সব সময় গুরুত্বহীন, অযোগ্য মনে করা মনির এতে যেন খানিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। সে এখন একা একাই ব্যাংকের সব কাজকর্ম করে। তারপর আবার নিয়মিত সেসব তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে বুঝিয়ে দেয়। এই সময়ে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তাকে তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি যা চাইছিলেন তেমনটাই হচ্ছে। আবার কখনো কখনো মনে হয়, তার এই এত এত পরিকল্পনা, শ্রম সকলই ভেস্তে যাচ্ছে।
রোদ উঠছে। গাছগাছালির ফাঁকে ভোরের আলোর আনাগোনা টের পাওয়া যাচ্ছে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এস্কান্দারকে বললেন, ‘চল, বাড়ির দিকে যাই।’
এস্কান্দার বলল, ‘আপনে বলছিলেন ফজু ব্যাপারীর বাড়ির পিছের সুপারি বাগান দেখতে যাইবেন ?’
‘ওহ, তাই তো! চল, চল, বাগানটা দেইখাই যাই।’
বাগান দেখতে দেখতেই তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কেন যেন খানিক চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তিনি হঠাৎ বললেন, ‘সলিমুদ্দি দফাদারের বাড়িখান দেখছোস ?’
‘দেখলাম তো দাদাজান। আহারে, কী বাড়ির কী ছুরৎ হইছে!’
‘এইটাই দুনিয়ার রীতি। কথায় আছে না, নদীর এই পাড় ভাঙলে, ওই পাড় গড়ে ? আইজ যে আমির, কাইল সে ফকির ?’
‘জে।’
‘এইটা একটা গোল চক্করের মতন। ঘুইরা ফিইরা এই চক্কর চলতেই থাকে। ওই সলিমুদ্দি দফাদারের দাদা, পরদাদারা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো বংশ আছিল। মাঝখানে মাত্র দুই-তিন পুরুষের মধ্যেই সেই বংশের এহন নামনিশানাও নাই। এই যে বজলু ব্যাপারী, তার পোলার নাম জানি কী ? ফজু না ? ফজলু ব্যাপারী ?’
‘জে দাদাজান’।
‘বজলু ব্যাপারীর বাপের দাদার আছিলো বিশাল ব্যবসায়িত। বালামি চাউলের নাওয়ে কইরা দ্যাশ বিদ্যাশ থিকা জিনিসপত্র লইয়া সওদা কইরা বেড়াইতো। তহন তো গাঁও গেরামের কারও হাতে নগদ টাকা পয়সা কিছু থাকতো না। কারও কাছে দুই একখান আধলি আছে মানেই সে বড়োলোক। সেই সময়ে সে দ্যাশ বিদ্যাশে সওদা কইরা বহুত কাঁচা পয়সার মালিক হইছিল। বাহারি জিনিসপত্রও কিনতো। একবার শুনছিলাম কোন এক বন্দরে পানির দরে বহু সোনা গয়না কিনছিল। সেই গয়না লইয়া বাড়িও আসছিল। কিন্তু গয়না থাকে নাই।’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘থাকে নাই ক্যান দাদাজান ?’ কৌতূহলী গলায় বলল এস্কান্দার।
‘বাজানের কাছে শুনছিলাম, সে মিথ্যা বলছিল। ওই গয়না নাকি সে কিন্যা আনে নাই। এক জমিদারের বিরাট বজরা ডুবছিল। যাত্রীরা কেউ বাঁচে নাই। পরের দিন সে নাও নিয়া গিয়া দেখে সব লাশ ভাইস্যা উঠছে। জমিদারবাড়ির সব মেয়েমানুষের শইলভর্তি, বাক্সভর্তি আছিলো সোনার গয়না। সে নাকি তাগো লাশের শইলেরতন সেইসব গয়না খুইলা খুইলা আনছিল। শোনা কথা। বাজানে ছোট থাকতে আমারে কইছিলো।'
‘তারপর ? সেই গয়নার কী হইছে ?’
‘তার বউ আছিলো তিনজন। গয়নার ভাগ নিয়া সেই তিন সতিনের মইধ্যে লাগলো ঝগড়া। চুলাচুলি পর্যন্ত। সে শ্যাষম্যাশ সিদ্ধান্ত দিলো যে বড় বউ পাইবো সবচেয়ে বেশি। তারপর মেজো বউ। আর সবচাইতে কম পাইবো ছোট বউ। তার সামনে বইসা কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করে নাই। কিন্তু দিন দুই বাদে সে গঞ্জ থিকা আইসা দেখে তার বাড়ির উঠানে বড় দুই বউর লাশ। ছোটজন তাদের খাবারে বিষ দিয়া মারছে।’
‘তাইলে ছোটজনেই সব পাইছে ?’
‘না।’
‘তাইলে ?’
‘এই ঘটনার পর ছোট বউরে আর খুঁইজা পাওয়া গেলো না। তারে পাওয়া গেলো তিন দিন পর। তার লাশও গাঙের পানিতে ভাইসা উঠলো।’
‘তারে কে মারল ?’ বিস্মিত কণ্ঠে বলল এস্কান্দার।
‘কেউ মারে নাই। বড় দুইজনরে রাগের মাথায় খুন কইরা শেষে নিজেও গাঙের পানিতে ডুইব্যা মরছে।’
‘আর গয়না ? গয়নার কী হইছে ?’
‘এইটাই রহস্য। সেই গয়না আর কেউ কোনোদিন খুঁইজ্যা পায় নাই।’
‘কেউ পায় নাই ? তাইলে গেলো কই ?’
‘সেইটাও কেউ জানে না। তয় অনেকেই নাকি বলছিলো যে ছোট বউ সেই গয়না কোনো কলসিতে ভইরা তারপর সেই কলসি গলায় বাইন্ধা নদীতে ঝাঁপ দিয়া মরছিলো। কিন্তু তার লাশ পাওয়া গেলেও ওই কলসি আর পাওয়া যায় নাই। আল্লাহর খেলা বোঝা বড়ো দায়। সেই ঘটনার পর থিকাই শুরু হয় ব্যাপারি সাবের পতন। এক ঝড়ে মালামালসহ তার নাও ডোবল। তারপর শুরু হইলো ব্যবসায় একের পর এক লোকসান। তিন দিনের কালাজ্বরে তিনিও মারা গেলেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেই অতো বড় বংশটা একদম পথের ফকির হইয়া গেলো।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন। তাকে সত্যি সত্যিই দুঃখিত মনে হচ্ছে। তিনি নিজে এইসব ঘটনা মনে করেই নানাভাবে চিন্তিত। একটা চক্র যেন ঘুরছে। সেই চক্র কাউকে তুলে দিচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা প্রাপ্তির শীর্ষে। আবার কাউকে মুহূর্তেই মিশিয়ে দিচ্ছে ধুলোতে। এটাই তার ভয়।
ফজু ব্যাপারীর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি হঠাৎই গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘ফজলু, ও ফজু, বাড়ি আছো নি ?’
এস্কান্দার আজ তৈয়ব উদ্দিন খাঁর আচার-আচরণে যথেষ্টই অবাক হচ্ছে। তিনি এত কথা সাধারণত বলেন না। তারওপর এখন আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে গলা চড়িয়ে কাউকে ডাকছেন! সে বলল, ‘আমি ডাকি দাদাজান ?’
‘দেখ তো বাড়িতে কেউ আছে নি ? ওদের ভিটার মাটি তো সব বৃষ্টিতে ধুইয়া আমার জমিনে নাইমা যাইতেছে। ডাক ফজুরে।’
এস্কান্দার হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল। ফজুর ঘরের দরজা হাট করে খোলা। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। তবে খানিক বাদে খালের ঢাল বেয়ে তাকে উঠে আসতে দেখা গেল। তার সঙ্গে অল্পবয়স্ক দুটি ছেলে।
এস্কান্দার বলল, ‘ও ফজু, বাড়িঘর ফাঁকা, দুয়ার খোলা, আর তুমি বাড়ি নাই ? কতক্ষণ ধইরা গলা ফাটাইয়া ডাকতেছি ?’
‘আমাগো যে বাড়িঘর তা খোলা থাকলেই কী, আর না থাকলেই কী ? ঘরে কি কিছু আছে নি যে মাইনষে নিব ?’
‘বড় খাঁ সাব আসছেন। তোমার লগে যেন কী কথা বলবেন।’
ফজু হঠাৎই তটস্থ হয়ে উঠল। প্রথম কিছুক্ষণ দিশেহারার মতো ছোটাছুটি করতে লাগল সে। যেন বুঝতে পারছে না কী করবে! তারপর দৌড়ে ঘরে ঢুকল। ঘর থেকে একখানা চেয়ার এনে উঠানের ছোট আমগাছটার ছায়ায় রাখল। তারপর গলা চড়িয়ে সালেহাকে ডাকতে লাগল। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ভেবেছিলেন তিনি আর বাড়িতে ঢুকবেন না। কিন্তু ফজুর অনুরোধে তাকে বাড়িতে ঢুকতেই হলো। কথাও হলো কিছু। কিন্তু তিনি উঠতে যেতেই ফজু বলল, ‘বেয়ান বেলা অনেক হাঁটছেন। এক গেলাস লেবুর শরবত খাইয়া যান, দাদাজান।’
সালেহা ফুলতোলা গ্লাসে লেবুর শরবত নিয়ে এল। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সাধারণত বাড়ির বাইরে কোথাও কিছু খান না। কিন্তু সালেহার হাতে শরবতের গ্লাস দেখে তার হঠাৎ প্রবল তেষ্টা জেগে উঠল। তিনি ঢকঢক করে এক নিশ্বাসে পুরো গ্লাস শরবত শেষ করলেন। তারপর সালেহাকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘আরেক গ্লাস দেও তো।’
কিন্তু দ্বিতীয় গ্লাস শরবত খেতে গিয়ে আচমকা স্থির হয়ে গেলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তার চোখ আটকে গেল সালেহার বাহুতে।
🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩সেখানে বাহুর মাংস কামড়ে ধরে বসে আছে একখানা বাজু।
সোনার বাজুবন্ধ!
তৈয়ব খাঁর অভিজ্ঞ চোখ সেই বাজুতে চুম্বকের মতন আটকে রইল। তিনি যেন শরবতে পরের ঢোক দিতে ভুলে গেছেন।
সালেহার বাহুতে এই বাজুবন্ধ কোথা থেকে এল ?
এই গয়নার নকশা তার চেনা।
এই নকশা চিনতে তার ভুল হওয়ার কথা না!
মেজো খালার ফোন পেয়ে হেমা একটু অবাকই হলো। এর কারণও আছে। খালাদের সঙ্গে তার খুব একটা যোগাযোগ নেই। আজ ফোন করেই খালা কড়া গলায় বললেন, ‘এত বড় ধাড়ি মেয়ে হয়েছিস, খোঁজখবর কিছু রাখিস ?’
‘কী হয়েছে খালা ?’
‘আবার জিজ্ঞেস করছিস কী হয়েছে ? তোর বাবা কী করেছে কিচ্ছু জানিস না ?’
‘কী করেছে ?’
‘জানিস না ? নাকি বাপের চরিত্র সম্পর্কে খারাপ কিছু শুনতে চাস না ?’
হেমা এবার বিরক্ত হলো, ‘যা বলার স্পষ্ট করে বলো খালা। এত পেঁচিয়ে কথা বলছ কেন ?’
‘আমি প্যাঁচাই না ? প্যাঁচাই আমি ?’ তিরিক্ষি গলায় বললেন তিনি। হেমা অবশ্য এবার আর কথা বলল না। সে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে। মেজো খালার স্বর যেন আরও খানিক তীক্ষ্ণ হলো। বললেন, ‘যা আর প্যাঁচাব না। এখন সৎ মা ঘরে এলে তার গলা জড়িয়ে ধরে সহজ সহজ কথা শুনবি। গল্প আহ্লাদ করবি। সে সব প্যাঁচ খুলে দিবে। ধাড়ি মেয়ে হয়েছ আর বাপ যে কোথায় কোন নষ্টামি করে বেড়ায় সে খেয়াল নেই!’
রাগে হেমার গা চিড়বিড় করছে। খালাদের সঙ্গে এমনিতে তাদের খুব একটা যোগাযোগ না থাকলেও এরকম হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে রাজ্যের অভিযোগ করবে। একারণে পারতপক্ষে সে এড়িয়েই চলে। কিন্তু মেজো খালা স্পষ্ট করে কিছু কেন বলছেন না ?
‘বাপ যে তলে তলে বছরখানেক আগেই আরেকটা বিয়ে করেছে, সে খবর রাখিস ?’ খানিক বিরতি দিয়ে আবার শুরু করলেন খালা। ‘রাখিস না। আমরা আর কে ? আমরা এতদিনও কিছু ছিলাম না। আর এখন তো আরও থাকলাম না। এখন নতুন মা হয়েছে, নতুন খালাও হবে। তারা খুব আদর আহ্লাদ করবে।’
হেমা কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। আর যাই হোক, অন্তত এমন কিছু নিয়ে খালা অযথা অভিযোগ করবেন না।
কিন্তু ঘটনা কি আসলেই সত্যি ?
বাবা কি সত্যি সত্যিই বিয়ে করেছেন ?
হেমা ফোন কেটে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল। তার বাবা-মায়ের সম্পর্কটা শীতল, একটা স্পষ্ট দূরত্বের সীমারেখা তাদের মাঝখানে, এটা সে সেই শৈশব থেকেই দেখে এসেছে। এতে বাবার চেয়ে মায়ের ভূমিকাই বেশি বলেও মনে হয়েছে তার।
কিন্তু তাই বলে কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলবেন বাবা ?
বাবাকে সব সময়েই বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল মানুষ বলেই মনে হয় হেমার। এমনকি মায়ের সঙ্গে যে শীতল সম্পর্ক সেটিও মূলত তিনিই সব সময়ে উষ্ণ করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মা-ই তাতে কখনো খুব একটা সাড়া দেন নি।
তার মা রেণু কলেজে পড়ান।
গম্ভীর, স্বল্পভাষী মানুষ। ফলে সহসা কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় না তার। কিন্তু বাবা আহমেদ আসলাম পুরোপুরি উল্টো। গল্প, আড্ডার মধ্যমণি তিনি। ভালো গান করেন। সেন্স অফ হিউমার ভালো। দেখতে সুদর্শন। চট করে মানুষের মনে ঢুকে যাওয়ার সহজাত ক্ষমতা তার রয়েছে। তাই আর সবার মতো হেমারও যেন বাবার সঙ্গেই সম্পর্কটা সহজ। সেখানে অকপটে সবকিছু বলা যায়। ক্লাসের মজার কোনো ঘটনা। কোনো বান্ধবীর পালিয়ে বিয়ে করা। কিংবা নয়ন বা রাহাতের সঙ্গে তার সম্পর্কের এটা-সেটা। আবার দর্শন, কলা, রাজনীতির মতন গুরুতর বিষয় নিয়েও দীর্ঘ আলাপ করা যায়।
রেণু কলেজ থেকে ফিরলেন সন্ধ্যাবেলা। হেমার হঠাৎ মনে হলো আজ মার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবে সে। কিন্তু কেমন একটা আড়ষ্টতাও কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে। ফলে হুট করে গিয়ে কিছু বলতে পারল না। বরং ওই দ্বিধাটা আরও প্রবল হয়ে উঠতে লাগল।
বাবা এমন একটা কাজ করতে পারে এটা তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
তারচেয়ে বাবাকে আগে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করতে চায় সে।
আজকাল ইলেক্ট্রিসিটি খুব যাচ্ছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই দপ করে আলো নিভে যায়। আজও গিয়েছে। হেমা চুপচাপ বসে ছিল বারান্দায়। এই মুহূর্তে কাঁধে কারও হাতের স্পর্শে চমকে উঠল সে। মুখ ফিরিয়ে দেখে বাবা। কিন্তু বাবার মুখটা অমন মলিন কেন ?
আসলাম সাহেব বললেন, ‘একটু আসবি আমার সাথে ?’
হেমা উঠে দাঁড়াল। তারপর বাবার পেছন পেছন তার ঘরে ঢুকল। আসলাম সাহেব বেশ খানিকক্ষণ শান্ত হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, ‘একটা বিষয় তোকে আগেই জানানো উচিত ছিল। কিন্তু অনেক সময় হয় না এমন ? যে... কারও সঙ্গেই কিছু বলতে ইচ্ছে করে না ?’
হেমা কথা বলল না।
আসলাম সাহেব বললেন, ‘তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস। আমার ধারণা তোর বয়সের আর দশটা মেয়ের চেয়ে তোর বোঝাবুঝিও যথেষ্ট পরিণত। তারপরও বিষয়গুলো নিয়ে তোর সাথে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারি নি আমি।’
‘তুমি কি বিয়ে করেছো ?’ হেমা শান্ত, স্বাভাবিক গলায় বলল।
আসলাম সাহেব যেন সামান্য সময়ের জন্য থমকালেন। তারপর হঠাৎ হেসে উঠলেন, ‘আমি বিয়ে না করলে তুই কোত্থেকে এলি ?’
হেমা হাসল না। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি ঠাট্টা করছি না বাবা। সত্যিটা জানতে চাইছি।’
‘আরও অনেকেই আমাকে ফোন টোন করে জানতে চাইছে। সমস্যা হচ্ছে, আমার বিয়ের খবরটা আমি ছাড়া আর সকলেই জানে।’
এইটুকু সামান্য কথা। অথচ হেমার বুক থেকে যেন পাথর-ভার নেমে গেল। আসলাম সাহেব অবশ্য এরপরই গম্ভীর হয়ে গেলেন। খানিকটা এলোমেলো পায়চারি করে আবার এসে বসলেন। তারপর বললেন, ‘কিন্তু আমি এখন যেটি বলব সেটিও কম কষ্টকর কিছু না।’ বলে আবারও থামলেন তিনি। তারপর ধীর গলায় বললেন, ‘উই আর গোইং টু বি ডিভোর্সড। এমন না যে সিদ্ধান্তটা হঠাৎ। এটা তোর মা আর আমার দীর্ঘদিনের ভাবনা, প্রস্তুতির ফলাফল। আর একটা কথা, আশা করি তুই আমাকে চিনিস। আমি এমনি এমনি দুম করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ না।’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘তুমি কি অন্য কোনো রিলেশনে ইনভলভড বাবা ?’ প্রশ্নটা সরাসরিই করল হেমা।
আসলাম সাহেব ম্লান হাসলেন, ‘এই বয়সে কি অন্য কোনো সম্পর্কে ইনভলভড না হলে মানুষ ডিভোর্স নেয় না ?’
‘নাহ।’ শান্ত গলায় কথাটা বলল হেমা। তারপর বেশ খানিক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘নেয় না বাবা। তোমার বয়স এখন কত ? অলমোস্ট ফিফটি, না ?’
‘হুম।’
‘এই বয়স থেকেই পুরুষ তার স্ত্রী-সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে শুরু করে। যদি না এর চেয়ে বেশি কোনো নির্ভরতার সন্ধান সে পায়! সেরকম কিছু না পেলে মানুষ কেন এতবছরের সম্পর্কটা ভাঙবে বলো ?’
‘নির্ভরতাটা কিসের ?’
‘ভালোবাসা, যত্নের।’
‘এটা একেকজনের কাছে একেক রকমের। মানুষ এই যে বেঁচে থাকে, এই বেঁচে থাকার পুরোটা সময়জুড়ে সে কী চায় জানিস ?’
‘কী ?’
‘শান্তি। আনন্দ।’
‘তুমি আর মার সঙ্গে থাকতে আনন্দ পাচ্ছ না ?’
‘আমি একা না। সেও পাচ্ছে না। আমরা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছি না।’
হেমা খানিক চুপ করে থেকে বলল, ‘কিন্তু... ঠিক ডিভোর্স নেওয়ার মতো এমন তিক্ততা তোমাদের কত দিন থেকে বাবা ?’
‘এমন অনেকবারই হয়েছে। আবার ফিরেও এসেছি। কিন্তু এবার আর সুযোগ নেই।’
হেমা হঠাৎ তার ঠোঁটের কোনায় মৃদু একটুকরো শ্লেষাত্মক হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘কেন ? তুমি কি এরচেয়ে শন্তিপূর্ণ কাউকে পেয়ে গেছ ?’
হেমার ওই হাসিটুকুতে কী ছিল কে জানে! আসলাম সাহেব যেন খানিক অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। হেমা বলল, ‘আমি এখন বড় হয়েছি বাবা। মার থেকেও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি। তুমি বিষয়টা আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারতে। এটা তো জানো, তোমার প্রতি সব সময়ই আমার আলাদা একটা সমীহ কাজ করে। মনে হয়, জগতের কোনো সমস্যাই তোমার কাছে সমস্যা না। তুমি সব সমাধান করে দিতে পারো। আর...।’
‘আর এই সামান্য সমস্যাটা আমি কেন মেটাতে পারলাম না, তাই তো ?’
হেমা প্রশ্নবোধক চোখে তাকাল।
আসলাম সাহেব জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তিনি সেই অন্ধকারের বুকের ভেতর যেন সেঁধিয়ে যেতে লাগলেন। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘আমি কখনো কাউকে বুঝতে দেই নি যে আমার বুকের ভেতর কী চলে। সবাই ভাবে আমি আলোঝলমলে হাসিখুশি একজন মানুষ। কিন্তু এই মানুষটার ভেতর প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ একজন মানুষ বাস করে। সে বছরের পর বছর একা চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এই দীর্ঘ জীবনে এমন কখনো হয় নি যে আমি দেরি করে ঘরে ফিরে দেখেছি যে তোর মা আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমি কোনোদিন কোনো অভিযোগ করি নি। কারণ এই একজন মানুষের কাছে সারাটা জীবন আমি সংকোচে, জড়তায়, অপরাধবোধে কুঁকড়ে থেকেছি।’
হেমা ভারি অবাক হলো। মায়ের কাছে কিসের অপরাধবোধে কুঁকড়ে থাকেন বাবা ? কেন সংকুচিত হয়ে থাকবেন ? কী এমন করেছেন তিনি ?
সে বাবার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর তার কাঁধে আলতো হাত রেখে বলল, ‘কী এমন হয়েছে বাবা যা আমি জানি না ?’
‘বাবা-মায়ের অনেক গল্প থাকে, যা ছেলেমেয়েদের জানতে নেই। কারণ, সন্তানের কাছে বাবা-মা ঠিক আর দশজন সাধারণ নারী-পুরুষের মতো না।’
‘কিন্তু আমি শুনতে চাই বাবা। নাহলে কখনো স্বস্তি পাব না। প্লিজ বাবা।’ মরিয়া ভঙ্গিতে বলল হেমা।
খানিক সময় নিলেও বলতে শুরু করলেন আসলাম সাহেব। ‘তুই তো জানিসই, তোর নানা আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন...।’
‘হুম।’
‘তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না বলেই কি না জানি না, তিনি আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। প্রচণ্ড একগুঁয়ে মানুষ ছিলেন তিনি। পরিবারে তার কথাই শেষ কথা। সেই সূত্রেই এই বিয়ে। কিন্তু এর ভেতরে একটা অস্বাভাবিক গল্পও রয়েছে। এই গল্পটা একজন বাবার পক্ষে তার সন্তানকে শোনানো খুব কঠিন।’
আসলাম সাহেব চোখ থেকে চশমা খুলে শার্টের হাতায় মুছে নিলেন। তারপর বললেন, ‘তোর মায়ের সঙ্গে আমার বিয়ের যখন সবকিছু ঠিকঠাক, তখন, একদম শেষ মুহূর্তে এসে সে আমাকে হঠাৎ একটা চিঠি লিখল, এই বিয়ে সে করতে পারবে না। কারণ তার অলরেডি বিয়ে হয়ে গেছে।’
হেমা ঝট করে বাবার দিকে তাকাল। এটা কী বলল বাবা!
‘রেণুর বয়স তখন বেশি না। ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। সদ্য ইউনিভার্সিটি পাশ করা একটা ছেলে তখন রেণুকে পড়াত। সেই সূত্রেই প্রেম। ছেলেটা তখনো চাকরিবাকরি কিছু পায় নি। অল্পবয়সের সম্পর্ক। রেণু দুম করে লুকিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে বিয়ে করে ফেলেছিল। কিন্তু এই ঘটনা বাসায় কেউ জানত না। এমনকি ছেলেটা তখনো রোজ বাসায় এসে তাকে পড়িয়ে যায়। ওদিকে একদম শেষ মুহূর্তে এসে সে আমাকে এই ঘটনা জানাল। তখন বিয়ের মাত্র দুদিন বাকি। সবকিছুর আয়োজন হয়ে গেছে। ওই অবস্থায় কী করব আমি ?’
আসলাম সাহেব সামান্য থামলেন। তারপর বললেন, ‘রেণু আমাকে বিয়েটা ভেঙে দিতে বলল। এবং এও বলল যে আমি যেন বিয়ে ভাঙার আসল কারণটা না বলি। আমার তখন দিশেহারা অবস্থা। কাল বাদে পরশু বিয়ে, সব আয়োজন শেষ, গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজন সব ঢাকায় চলে এসেছে। রীতিমতো পাগলের মতো হয়ে গেলাম আমি। অথচ কাউকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। বিয়ের আগের দিন আমি উদ্ভ্রান্তের মতন রেণুদের বাসায় গেলাম। মনে হচ্ছিল, এই সমস্যার একমাত্র সমাধান রেণুর বাবা-ই। আমি তার কাছে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। রেণুর চিঠিটা তাকে দেখালাম। ভেবেছিলাম ঘটনা শুনে তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করবেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি তেমন কিছুই করলেন না। বরং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তার এক ল’ইয়ার বন্ধুকে ফোন দিয়ে বাড়িতে আনালেন। আনালেন ওই ছেলেটাকেও। তারপর রেণুকে ডেকে দ্রুত ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে বললেন। কিন্তু রেণু রাজি হচ্ছিল না। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে। আর ঠিক তখনই রেণুর গালে ভয়াবহ চড় বসালেন তিনি। রেণু ছিটকে পড়ল মেঝেতে। তারপর বাবা যেন উন্মাদ হয়ে গেলেন। এতক্ষণ চেপে রাখা সব রাগ, ক্রোধ যেন উগড়ে দিতে লাগলেন রেণুর ওপর। তাকে কেউ থামাতে পারছিল না। সবার সামনে মরার মতন মেঝেতে পড়ে রইল রেণু।’
🇧🇩🇧🇩🇧🇩আসলাম সাহেব জগ থেকে ঢেলে ঢকঢক করে পানি খেলেন। তারপর বললেন, ‘সেখানে ওই মুহূর্তেই ডিভোর্সের সব ফর্মালিটিজ হয়ে গেল। কিন্তু এরপরও আরও কিছু প্রসিডিওর থাকে। ডিভোর্সের পর নির্দিষ্ট একটা সময়ের আগে আবার বিয়ে হতে পারে না। কিন্তু রেণুর বাবা বললেন, বিয়ের অনুষ্ঠান যেমন হওয়ার কথা ছিল, তেমনই হবে। পরদিনই। কিন্তু বিয়ে হবে আরও পরে। কী অদ্ভুত ব্যাপার। পৃথিবীতে এমন ঘটনা আর ঘটেছে কি না জানি না।’
হেমা কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। পুরো ঘটনাই তার কাছে অতি কল্পিত কোনো গল্প মনে হচ্ছে। এমন কি হতে পারে যে বাবা এই সম্পর্কটা ভাঙার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে এই গল্প তৈরি করেছে ?
‘আগে বিয়ে হয়ে পরে অনুষ্ঠান হওয়ার ঘটনা অহরহই ঘটে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটল উল্টো। পরদিন জাঁকজমক করেই আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে গেল। সবাই জানল, আগেই ঘরোয়াভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলা হয়েছে। বিয়ের পর রেণু থেকে গেল তাদের বাড়িতেই। আমি চলে এলাম। তারপর আমাদের সত্যিকারের বিয়ে হলো আরও বেশ কয়েক মাস পর। আসল বিয়ে হলো সব সমস্যা সমাধান হওয়ার পর। ওই সময়টায় রেণুকে দীর্ঘদিন আর ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয় নি। আমিও যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে—কিছুই ঠিকঠাক বুঝতে পারছিলাম না। ফলে রেণুর বাবা যা বলতেন, অন্ধের মতো তা-ই করতাম।’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আসলাম সাহেব। তরপর বললেন, ‘এরপর পঁচিশ বছর। এই পঁচিশ বছরে আমি এমন কিছুই নেই যা করি নি। কিন্তু একমুহূর্তের জন্যও রেণুকে সেসব স্পর্শ করে নি।’
হেমা ফ্যালফ্যালে চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
আসলাম সাহেব সামান্য থেমে আবার বললেন, ‘প্রথম দিন থেকেই সে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করেছে। আমি তখন ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই চেষ্টাটাও করেছি আমি। কিন্তু তার সেই বীভৎস অভিজ্ঞতা আর যন্ত্রণাকাতর অনুভূতিটা আমি মুছে দিতে পারি নি। ফলে তার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার জীবনটাও নষ্ট করেছি।’
আসলাম সাহেবের গলা ভারী হয়ে এল। তিনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলালেন। তারপর ভেজা গলায় বললেন, ‘এই একটা জীবন আমি এমন একটা মানুষের সঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছি যে আমাকে প্রতিমুহূর্তে কেবল ঘৃণা আর উপেক্ষা করেছে। আর তার প্রতি আমার অনুভূতিটাকে সে দেখেছে জগতের সবচেয়ে সস্তা জিনিস হিসেবে। যতবার তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, ততবার সে প্রবল ঘৃণায় আমাকে ছুড়ে ফেলেছে। অনেকেই বলছিল বাচ্চাকাচ্চা হলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভাবনা থেকেই রেণুর প্রবল অনিচ্ছাতেই তোর জন্ম। কিন্তু লাভ হয় নি। আমাদের ওই দূরত্বটা তাতেও এতটুকু ঘোচে নি। বাবা হিসেবে এসব বলা হয়তো আমার ঠিক হয় নি। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না।’
আসলাম সাহেব চশমা খুলে চোখ মুছলেন। হেমা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার হঠাৎ মায়ের সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, একটা মানুষ একই বুকের ভেতর কী করে কারও জন্য এমন তীব্র ভালোবাসা যত্ন করে পুষে রাখে। আবার সেই বুকেই কারও জন্য পুষে রাখে এমন অনলবর্ষী ঘৃণা!
আসলাম সাহেব হয়তো ভেবেছিলেন হেমা তাকে কিছু বলবে। কিন্তু সে কিছুই বলল না। বরং বসে রইল চুপচাপ। আচ্ছা, হেমাও কি তবে তাকে অপরাধী ভাবছে ? তিনি হঠাৎ উঠে ত্রস্ত পায়ে হেমার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হেমা তাকে ডাকল, ‘বাবা!’
আসলাম সাহেব আচমকা হেমাকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট শিশুর মতন কেঁদে উঠলেন। হেমা কিছু বলল না। তবে বাবাকে দীর্ঘসময় জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে।
সেই রাতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন আসলাম সাহেব। রেণুও গুম হয়ে রইলেন নিজের ভেতর। হেমার সঙ্গে তাই আর কথা হলো না তার। খাবার টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ একা একা বসে রইল হেমা। কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছে করল না। রাতে ঘুমাতে গিয়েও প্রবল অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল।
শেষরাতের দিকে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন দেখল।
ছোট্ট ফুটফুটে এক শিশুকে রাখা হয়েছে করাতকলে। শিশুটির মাথার কাছ দিয়ে শিস কেটে চলে যাচ্ছে সুতীক্ষ্ণ করাত। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই কাঠের মতন চিরে ফালি ফালি হয়ে যাবে তার শরীর। ফলে প্রবল আতঙ্কে নিজের শরীরটাকে গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সে।
কিন্তু পারছে না।
বরং করাতখানা ক্রমশই এগিয়ে আসছে তার দিকে। এখন কী করবে সে ?
ভয়ংকর আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গেল হেমার। বাকি রাত আর ঘুমাতে পারল না। এমন স্বপ্ন কেন দেখল সে ? সে কি তবে নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত এক সন্তান ভাবছে ?
যাকে তার মা চায় নি ?
আর বাবাও চেয়েছিলেন বিশেষ এক উদ্দেশ্যে?
অথচ তার জন্যে তাকে কেউ চায় নি।
না বাবা। না মা।
হেমার নিজেকে বড্ড অনাহুত মনে হলো। অনভিপ্রেত মনে হতে লাগল।
কী এক আশ্চর্য শূন্যতা তার বুকের ভেতর তীব্র হাহাকারে হুহু করা হাওয়ার মাতম বইয়ে দিতে থাকল।
পর্ব- ১৩ [মানবজনম — সাদাত হোসাইন]
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ উঠানের মাঝখানে বসে আছেন।
তার পায়ের কাছে বসে আছে এস্কান্দার। এস্কান্দারের হাতে পুরোনো একখানা বন্দুক। সে সেই বন্দুকে তেল মালিশ করছে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য অন্য চিন্তায় মশগুল। তিনি সকালের ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। ফজু ব্যাপারীর বউ সালেহার বাহুতে ওই গয়না কী করে এল! ফজু কি তবে সেই হারানো সম্পদের খোঁজ পেয়ে গেছে ?
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ নানান দৈব, অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা, ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা করেন। এসবে তার বিশ্বাস প্রবল। ফলে আজ সকালে পরপর ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনাই তাকে ভাবিয়ে তুলেছে।
দফাদার বাড়ির ওই পরিত্যক্ত জীর্ণ ঘর আর সালেহার হাতের মহামূল্যবান বাজুবন্ধ কি তাকে বিশেষ কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে ?
ফতেহপুরের এই বিশাল খাঁ বংশের শৌর্যবীর্যের কি তবে হাতবদল হতে যাচ্ছে ?
এ অঞ্চলে একসময় ব্যাপারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তারপর কিছু সময়ের জন্য চলেছে দফাদারদের।
তারপর থেকেই খাঁ বংশ।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার এই আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে নানান কিছু দেখেছেন, শুনেছেন। সেসব অভিজ্ঞতা থেকেই তার মনে হয়, এই জগতের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। মানুষ সেই নিয়ম সহসা বুঝতে পারে না। ফলে সকলেই যখন বলে যে 'জগতের কোনো কিছুই অবিনশ্বর নয়', তখন তিনি বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখেন। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
তার মতে কোনোকিছুই পুরোপুরি নশ্বরও নয়।
সবই একটা চক্রের মতন।
ফলে সবকিছুই একটা সূত্র ধরে বারবার ঘুরেফিরে আসে। হয়তো বেশ পাল্টায়। কিন্তু আসে। আসল বিষয় হচ্ছে সময়। সে একটা চক্র মেনে সময়ের ব্যবধানে একই জিনিস বারবার ঘটায়। ফলে কোনো কিছুই পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
ফজু ব্যাপারী কি সত্যি সত্যিই তার পূর্বপুরুষের হারিয়ে যাওয়া সেই অমূল্য সম্পদের খোঁজ পেয়ে গেছে ?
যদি তা-ই হয়, তাহলে ফজু কেন আবার তার স্ত্রীকে দিয়ে ওভাবে সেই গয়না জনসম্মুখে প্রদর্শন করাবে ?
তার তো না জানার কথা নয় যে বছরের পর বছর ধরে ওই গয়নার জন্য কত কত লোভাতুর চোখ অপেক্ষায়।
নাকি হুট করে অমন দামি গয়না পেয়ে কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়ে গিয়েছিল সালেহার ?
আসল ঘটনা জানার জন্য ভীষণ উৎসুক হয়ে উঠলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।
তিনি তার স্ত্রী আমোদি বেগমকে ডাকলেন। আমোদি বেগম বাতের ব্যথায় কাতর। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘তোমার শইলের অবস্থা কী ?’
‘এহন আর ভালো মন্দ কী!’
‘শইলের এহন আর তহন নাই। এক শ’ বছর বয়সেও শইল ভালো থাকলে মনে হয় বয়স হইছে চল্লিশ। আবার চল্লিশ বছর বয়সেও শইল ভালো না থাকলে মনে হয় এক শ।’
‘সবাই তো আর আপনের মতোন না। একেকজনের শইল স্বাস্থ্য একেকরকম।’
‘শইলের নাম মহাশয়, যাহা সহায় তাহাই সয়। আগে তো সহাইতে জানতে হইব। যাই হোউক, এইসব জাইনা তোমার লাভ নাই। স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব স্বামীর খোঁজখবর নেওয়া। ভালোমন্দ জানা। সেই দায়িত্বও তো তুমি কোনোদিন পালন করো নাই।’
‘আপনে রাখেন দুইন্যার মাইনষের খোঁজ। আপনের খোঁজ কে রাখবো ?’
‘এই বয়সেও যে তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু হইবো না, সেইটা তো আমি বুঝি নাই। বয়সের সাথে সাথে বুদ্ধিটাও দরকার।’
আমোদি বেগম এবার আর জবাব দিলেন না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার আচার-আচরণে বিরক্ত। বহুদিন ধরেই আমোদি বেগমের সংস্পর্শ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন তিনি। এমনকি বিয়ের পরও জৈবিক চাহিদা ছাড়া আমোদি বেগমের আর কোনো গুরুত্ব তিনি অনুভব করেন নি।
‘পুরুষমানুষ হইলো বাইর, আর মহল হইলো মহিলা। এইজন্য পুরুষ যতই দুনিয়া শাসন করুক, তার মহল শাসন করার জন্য একজন মহিলা থাকতে হয়। এই বয়সে আইসা এইসব জিনিস আর তোমারে শিখাইয়া কোনো লাভ নাই। যার হয়, তার নয়-তেই হয়, আর যার হয় না তার নব্বুইতেও হয় না। শোনো...।’
বলে কেশে গলা পরিষ্কার করলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তারপর বললেন, ‘এইসব ফাও প্যাচালে কাজ নাই। তোমারে জরুরি কাজে ডাকছি। ফজুর বউ সালেহারে একদিন কোনো এক ছুঁতায় এই বাড়িতে ডাইকা আনবা। তারপর খুব খেয়াল কইরা দেখবা যে সে কী কী গয়না পরছে। বিষয়টা খুব সাবধান।’
আমোদি বেগম বেশির ভাগ সময়ই তৈয়ব উদ্দিন খাঁর কথাবার্তা বোঝেন না। এবারও বুঝলেন না। সালেহা কী গয়না পরে, তা দিয়ে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কী করবেন ?
‘এখন যাও। আর যত তাড়াতাড়ি পারো, সালেহারে খবর দিয়া আনাও। পারলে আইজকাই।’
সালেহাকে খবর দেওয়া হলো সেদিন বিকেলেই।
তবে শরীর খারাপের অজুহাতে সে এল পরদিন ভোরে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সেদিন আর ফজরের নামাজের পর হাঁটতে বের হলেন না। অপেক্ষায় রইলেন প্রবল ঔৎসুক্য নিয়ে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই উঠান পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকল সালেহা।
আমোদি বেগমের সাথে দীর্ঘ কথোপকথন হলো তার।
কথা শেষ করে সে এল তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তার চিরাচরিত গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে সালেহার সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা বললেন। এমনকি সালেহার যে সন্তান-সন্ততি হচ্ছে না, এই নিয়েও নানান চেষ্টাচরিত্রের কথা বললেন। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পরও তিনি নিশ্চিত হতে পারলেন না যে সালেহার শরীরে সস্তা কিছু তাবিজ কবজ ছাড়া আর কিছু রয়েছে কি না।
আমোদি বেগমও একই কথা জানালেন।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বিভ্রান্ত বোধ করছেন।
তবে তার মন বলছে ঘটনা কিছু একটা ঘটেছে।
জীবনভর ব্যাপারীদের ওপর কম অনাচার তিনি করেন নি।
এ কারণে এই বৃদ্ধ বয়সে এসে প্রায়শই ভয় হয়, প্রকৃতি বুঝি তার চক্র অনুযায়ীই তাকে তার সেই অনাচারের প্রতিফল ফিরিয়ে দেবে।
ঘটনাচক্রে বজলু ব্যাপারীকে খুন করলেও এই নিয়ে কখনো কোনো অনুতাপ তিনি অনুভব করেন নি। বরং পরবর্তীকালে নানা উপায়ে ব্যাপারীদের জমিজমা দখল, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করেছেন। ফলে ধীরে ধীরে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করে তারা।
ফজুর আর দুই ভাইও শহরে থাকে। গাঁয়ে খুব একটা আসে না। আর ও বাড়িতে এখন যে কটা গৃহস্থ রয়েছে তাদের অবস্থাও হতদরিদ্র।
চিন্তিত তৈয়ব উদ্দিন খাঁ রাতে বড়পুত্র খবির খাঁকে ডাকলেন। বললেন, ‘সব মিলাইয়া আমাগো জমিন কয় বিঘা চাষে আছে ?’
‘চাষে তো বেশি নাই বাজান।'
‘ক্যান ?’
‘বন্যার পানি উঠছে বেশির ভাগ জমিতেই। তা ছাড়া অনেক জমি বহুদিন থিকাই আর চাষে নাই। এইজন্য পরিমাণটা এখনই বলা একটু কঠিন বাজান। আমারে একটু সময় দেন। খোঁজখবর নিয়া হিসাব নিকাশ কইরা জানাই ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আচমকা চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তারপর আপন মনে বিড়বিড় করে কীসব হিসাব কষতে লাগলেন। তার কপাল কুঞ্চিত। ঠোঁট নড়ছে। দীর্ঘ সময় পর তিনি চোখ মেলে তাকালেন। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে একের পর এক জমির হিসেব দিতে লাগলেন খবির খাঁকে।
কোথায় কতখানি জমিতে কী চাষ হচ্ছে, কত বিঘা জমি বন্যার পানিতে ডুবে আছে, কোন চর অনাবাদি রয়েছে। কোন জমিতে শুধু গাছ লাগানো রয়েছে, কোথায় কে বর্গা চাষ করছে, জমি দেখভাল করার বিনিময়ে কোন কোন পরিবারকে বসতবাড়ি করতে দিয়েছিলেন তিনি তার পুরো হিসাব একের পর এক দিতে থাকলেন। সবার শেষে দিলেন যারা ঠিকঠাক ফসলের ভাগ বুঝিয়ে দিচ্ছে না এবং জমি দেখভাল করার বিনিময়ে বসতবাড়ির সুবিধা নিয়েও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না তাদের তালিকা।
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে তিনি থামলেও খবির খাঁ কোনো কথা বললেন না। ঘরজুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা। খবির খাঁর বুকের ভেতরটা কাঁপছে। মনে হচ্ছে, আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সামনে বসে যেভাবে ভয়ে কাঁপতেন, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসত, আজ এই ষাট বছর বয়সে এসেও তার সামান্যও হেরফের হয় নি।
‘মোঘল আমলের কথা কিছু জানোস ?’
বাবার এমন প্রসঙ্গ বদলানোয় খবির খাঁ আরও ভড়কে গেলেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘জমিদারি আমলের কথা তো না জাননের কথা না ?’
‘জে বাজান।’ মিনমিনে কণ্ঠে বললেন খবির খাঁ।
‘মোঘল সম্রাটরা যখন দেখতেন যে দূরের কোনো জমিদার ঠিকঠাক মতন খাজনা দেয় না, তখন তারা কী করতেন জানস ? প্রথমে ঘটনা বোঝার জন্য খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতেন। এরপর বাহক পাঠাইতেন খাজনার বিষয়ে সতর্ক করতে। তারপরও কাজ না হইলে ফৌজ পাঠাইতেন ধইরা নেওনের জন্য। ক্যান জানোস ?’
খবির খাঁ উত্তর দিলেন না।
‘সব সময় কিন্তু আসল ঘটনা খাজনার টাকা না। অনেক জায়গার খাজনার টাকাই তেমন আহামরি কিছু ছিল না, তারপরও পাঠাইতেন। পাঠাইতেন এইটা বোঝানোর জন্য যে মোঘলদের রাজত্বে বসবাস কইরাও তাদের ক্ষমতা অগ্রাহ্য করার মতন দুর্বল তারা হন নাই। এই কাজ ইংরেজরাও করছে। খাজনা আদায়ের চাইতেও এইটা বোঝানো যে শক্তি কিন্তু কমে নাই। একবার যদি জনগণ বুইঝা যায় যে শাসকের শক্তি কম, কমজোর, দুর্বল, তাইলে কিন্তু আর তাদের সামলানো যায় না। এইগুলা খেয়াল রাখন খুব জরুরি। যখনই দেখবি তোর অধস্তন লোকজন তোর কথা মানতেছে না, ভয় পাইতেছে না, তখনই বুঝবি, তোর শক্তি নিয়া তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হইতেছ। কথা বুঝছস ?’
খবির খাঁ ঢোক গিলে বললেন, ‘জে বাজান।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এবার সামান্য গলা চড়ালেন, ‘তুই কিছুই বুঝস নাই। আশপাশে চোউখ কান খোলা রাখস না ক্যান ? এই খাঁ বংশ এমনে এমনে এতো বড় বংশ হয় নাই। আর চোউখ কান খোলা না রাখলে এমন থাকবোও না। অনেকেই ওঁত পাইতা আছে, তারা তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মরণের অপেক্ষায় আছে। আমি যেই চোউখটা বুজব অমনে তারা পিলপিল কইরা পিঁপড়ার মতন দল বাইন্ধা বাইর হইবো। সবকিছু খুইঁট্টা খাইবো। এইটা টের পাস ?’
খবির খাঁ চুপ।
‘চাইরপাশে আমি নানান ফিসফিসানি শুনতেছি। এইটা তোরও শোননের দরকার আছে। এই ফিসফিসানি শোনন শিখতে হইবো।’
‘আপনেরে কেউ কিছু বলছে বাজান ?’ বিড়বিড় করে বললেন খবির খাঁ।
‘হ। বলছে।’
‘কেডা কী কইছে বাজান ?’
‘বাতাসে বলছে, গাছের পাতায় বলছে।’
খবির খাঁ হতভম্ব চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এসব কী বলছেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ!
🇧🇩🇧🇩🇧🇩‘আমি যেই পথ দিয়া প্রত্যেকদিন হাঁইটা যাই, সেই পথও কইছে। এরা সবাই কথা কয়। মানুষ যা দেখে না, এরা তাও দেখে। এইজন্য এদের কথা শোনন, জানন খুব দরকার।’
খবির খাঁ তার এই জীবনে বেশির ভাগ সময়ই বাবার কথা বুঝতে পারেন নি। আজও পারলেন না। তৈয়ব খাঁ বললেন, ‘শোন, যারা যারা জমিজমার হিসাব ঠিকঠাক দেয় না, তাদের সবার সঙ্গে কথা বল। ধমক-ধামক দে। এখনই কঠিন হইতে হবে। লাগলে দুই চাইরটা লাশ ফালাইতে হইব।’
বাবার শেষ কথাটায় যেন আঁতকে উঠলেন খবির খাঁ। তিনি মিনমিন করে বললেন, ‘এখন আর সেই আগের যুগ নাই বাজান। আগে এই এলাকায় দশটা মার্ডার করলেও সেই খবর থানা-পুলিশ পর্যন্ত যাইত না। আর গেলেও এই দুর্গম অঞ্চলে পুলিশ সহজে আসতে চাইত না। কিন্তু এখন ওইরকম কিছু হইলে সাথে সাথেই থানা-পুলিশ হাজির।’
‘সবকিছুরই উপায় আছে। মানুষরে ডর দেখাইতে হইবো। ডর না দেখাইলে মানুষরে শাসন করা যায় না। জনগণ মনে করে যে তারা দয়ালু শাসক পছন্দ করে। আসলে ঘটনাতো তা না। শাসক দয়ালু হলে সেইটারে সবাই তার দুর্বলতা ভাবে। আর দুর্বল শাসকের অধীনে কেউ থাকতে চায় না। বিদ্রোহ হয়।’
খবির খাঁ বুঝতে পারছেন না তিনি কী বলবেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘যুগ যে বদলাইছে, সেইটা তো ভালো বুঝছস, কিন্তু যুগ বদলানোর সাথে সাথে যে নিজেদেরও বদলাইতে হইবো, সেইটা বুঝস না ক্যান!’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩
বিজ্ঞাপন
‘বাজান, আমারে একটু খুইলা বলবেন, আপনে কী টের পাইছেন ?’
‘এখনো ঠিক জানি না। তয় তলে তলে যে আশপাশেই কিছু একটা ঘটতেছে সেইটা আমার মনে কামড় দিছে। শোন, এই যে এতো এতো জমিজমা, এর বেশির ভাগেরই কিন্তু আসল কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ নাই। চর দখল করা হইছিলো, কাগজপত্র করা হয় নাই। অনেকের জমিন নানানভাবে দখল করা হইছে, মুখে মুখে কেনা হইছে, অদলবদল হইছে, নানান কিছিমের বিষয়আশয়। তখন তো গায়ের জোরই আসল জোর। কিন্তু ওই যে কইলি—সময় বদলাইছে। এখন এইসব জমিনের পুরানা কোনো ওয়ারিশ যদি মামলা মোকদ্দমা করে, তখন কী করবি ? তখন তো ওই কোটকাছারিতেই যাইতে হইবো। হইবো না ?’
‘আমাগো বিরুদ্ধে কে মামলা করবো বাজান ? আর মামলা চালাইতেওতো পয়সাপাতির দরকার। এই অঞ্চলে কার ওইরকম পয়সাপাতি আছে ? কে আছে যে কোর্টে গিয়া মামলা মোকদ্দমা করব ? তারপর আবার দিনের পর দিন সেই মামলা চালাইবো ? জেলা শহরে গিয়া এইসব করার সামর্থ্য, বুদ্ধি কার আছে ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ শান্ত গলায় বললেন, ‘যদি কারও হয় তখন তুই কী করবি ?’
খবির খাঁ খানিক থতমত খেয়ে গেলেন। আসলেই তো, এই কথা তো তিনি ভাবেন নি।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘আগের দিন আর নাই। জমিজমা থাকলেও নগদ পয়সাপাতিও তেমন আসে না। বড় বংশের নানাদিকে খরচাপাতি থাকে। দিন শেষে যেমন আয়, তেমন ব্যয়। এখন কোনো কারণে যদি হঠাৎ বড় অঙ্কের নগদ টাকা-পয়সার দরকার হয়, কোন বিপদ-আপদ আসে, মামলা-মোকাদ্দমা চালাইতে হয়, তখন কী করবি ? টাকা পাবি কই ? তখন কি জমিন বেইচা জমিনের মামলা চালাইবি ? এইরকম করলে কয়দিন চলবি ? বহু জমিদার, তালুকদার এমনে কইরা পথের ফকির হইছে। এই জীবনে কম তো আর দেখি নাই।’
খবির খাঁর আচমকা মনে হলো, এই সহজ বিষয়গুলো এতদিনেও কেন তার ভাবনায় আসে নি! নিজেকে বোকাবোকা লাগছে তার। একই সঙ্গে ভীতও। এই খাঁ বংশ বড় কোনো বিপদে পড়লে সেই বিপদ থেকে টেনে তোলার সামর্থ্য তার নেই। নেই তার সন্তানদেরও।
আচ্ছা, তৈয়ব খাঁ যদি এখন হঠাৎ মারা যান, তাহলে কী করবেন তিনি ? কীভাবে সামলাবেন সব ?
এতদিন মনে হতো, বৃদ্ধ তৈয়ব খাঁর উপস্থিতি বুঝি তার জন্য এমন কোনো গুরুতর বিষয় না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই মানুষটা আসলে আকাশের মতন বিস্তৃত এক বিশাল বটবৃক্ষ, যে মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকলে কিছুই টের পাওয়া যায় না। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু যেই মুহূর্তে ওই ছায়াটা সরে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে নিজেকে মনে হবে শূন্য, অসহায়।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ চিন্তিত গলায় বললেন, ‘আব্দুল ফইর নাকি দিন কয় আগে মাদারীপুর টাউনে গেছিলো ? সে নাকি সেইখানে ভূমি অফিসেও গেছিলো ?’
‘সে ভূমি অফিসে গেলে আমাগো কী সমস্যা ?’
‘সমস্যা নাই ?’
‘না। তার সঙ্গে আমাগো জমিজমাসংক্রান্ত কোনো সম্পর্ক নাই। সে সারা জীবন খাইছে ফইরালি কইরা। আর ওই বসতবাড়ির জায়গাটুক ছাড়া আর কোনো জায়গা জমিও নাই তার। তাইলে সে ভূমি অফিসে গেলে আমাগো কী সমস্যা ?’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন,
‘যার মাথায় চুল আছে, সে যদি পকেটে চিরুনি লইয়া ঘোরে তাইলে সেইটা স্বাভাবিক ঘটনা। সমস্যার কিছু না। কিন্তু যার মাথাজুইড়া টাক, চুল নাই এক গোছা, সে যদি পকেটে চিরুনি লইয়া ঘোরে তাইলে সেইটা সমস্যা। বিরাট সমস্যা। অস্বাভাবিক ঘটনা। যার জমিন নাই, সে ভূমি অফিসে কী করে ?’
খবির খাঁ এবার হকচকিয়ে গেলেন। আসলেই তো, আব্দুল ফকিরের ভূমি অফিসে কী কাজ ?
অবশ্য তার ভূমি অফিসে যাওয়ার সঙ্গে বাবার উদ্বেগের কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না। কথাটা সংকোচে বললেনও, ‘বাজান, ফইরসাবের লগে আমাগো জমিজমার কি কোনো সম্পর্ক আছে ?’
‘খালি চোখে দেখলে নাই। তয় আমার মন বলতেছে কিছু একটা ঘটতেছে। বিষয়টা পরিষ্কার হইতে একটু সময় লাগবে। তার আগে সব জমিজমার কাগজপত্র ঠিক কর। যেগুলার কাগজপত্র নাই, সেগুলার কাগজপত্র বাইর করার ব্যবস্থা কর। আলতাফ আর গেসু আমিনরে খবর দে। তারা এইসব ভালো বুঝবে। তাদের সাথে কথা বল।’
খবির খাঁর এই প্রথম মনে হলো, তারা বড় ধরনের কোনো ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছেন। এই ঝামেলার সবচেয়ে বড় অংশ হলো যেসব জমির আসল কাগজপত্র নেই, সেসব কাগজপত্র বের করা। সমস্যা হচ্ছে, স্বল্প সময়ে এটা করা প্রায় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো উপায় ধরতে হবে। কিন্তু ফতেহবাদে তাদের যত প্রভাবই থাকুক না কেন, ফরিদপুর বা মাদারীপুর শহরে এই প্রভাব খাটিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়।
তাহলে উপায় ?
অনেক ভেবে বাবাকে কিছু কথা বললেন তিনি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সেসব শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘তাও ভালো যে এই জিনিস তোর মাথায় ঢুকছে। তয় সবচেয়ে সহজ জিনিসটাই তো ঢোকে নাই।’
‘কী ?’
‘দুনিয়াতে একটা জিনিসের ক্ষমতা সবখানেই আছে। আর সেইটা হইলো পয়সা। পয়সা থাকলে সব সম্ভব।’
খবির খাঁ মিনমিন করে বললেন, ‘কিন্তু বাজান, এ তো বহুত টাকা-পয়সার ব্যাপার। এতো নগদ টাকা কই পাবো ?’
‘হুম।’ গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ।
‘তারপর ধরেন, কেউ যদি এখন মামলা মোকদ্দমাও কইরা বসে, তখন তো আরও টাকা-পয়সা লাগবে। তখন জমিজমা বেচন ছাড়া তো আর কোনো উপায় থাকবে না।’
খবির খাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অবশ্য উত্তর দিলেন না। তিনি মনিরকে ডেকে বললেন, ‘এই মাসে মাদারীপুর গেছিলি ?’
‘না, দাদাজান। আর তিন দিন বাদে যাওনের ডেট।’
‘মবিন এই মাসে এখনো টাকা পাঠায় নাই ?’
‘পাঠাইছে, তয় ব্যাংকে জমা হইতে সময় লাগবো। এইজন্যই তিন দিন বাদে যাওনের ডেট।’
‘তিন দিন বাদে না। কাইল থেইকা আগামী তিন দিন প্রত্যেকদিন টাউনে যাবি। ভূমি অফিস আর কোর্টে ঘোরাঘুরি করবি। দেখবি ওইখানে লোকজন কে কীভাবে কী কাজ করে। চোউখ-কান খোলা রাখবি। জয়নুদ্দিন তহশিলদার নামে একজন আছে, আমার পরিচিত। তারে গিয়া আমার কথা বলবি। আর তিন দিন বাদে ব্যাংকের সব টাকার হিসাব আমারে দিবি।’
‘কী হইছে দাদাজান ? কোনো সমস্যা ?’
‘হুম। এতোদিনে এই নগদ টাকার প্রয়োজন সামনে আসছে। এরপর তোর আরও অনেক কাজ আছে। আগে এইগুলা শ্যাষ কর।’
তৈয়ব উদ্দিন খাঁর হঠাৎ এমন আচরণের বিশেষ কিছুই বুঝল না মনির। তবে গুরুতর কিছু একটা যে ঘটছে, সেটি সেও আন্দাজ করতে পারছে।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘এখন যা।’
মনির অবাক ভঙ্গিতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। তবে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছেন খবির খাঁ। আজ এতবছর পর যেন তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করতে পারলেন, কেন তার বাবা মবিনকে কুয়েত পাঠিয়েছিলেন! এই নিয়ে বাবার ওপর মনে মনে খানিক রুষ্টই হয়েছিলেন তিনি। নিজেদের এত ধনসম্পদ থাকতে মবিন কেন বিদেশে গিয়ে অন্যের জন্য গায়ে খাটবে ? অনেকবার সেকথা বাবাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও শেষ অবধি আর সাহস করে উঠতে পারেন নি। আজ এতবছর পরে মানুষটার সেদিনের সেই সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য খবির খাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। আজকের এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ভেবেই কি তাহলে তিনি সেসময় মবিনকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন ?
আরও একটা বিষয়ে সেসময় দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন খবির খাঁ। মনিরের বুদ্ধিসুদ্ধি খানিক কম। অথচ তৈয়ব উদ্দিন খাঁ কিনা তাকেই দিলেন বিদেশ থেকে পাঠানো মবিনের সব টাকা-পয়সার হিসেব রাখার দায়িত্ব! এমনকি শহরে গিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে নানাবিধ জটিল বিষয় দেখভাল করার দায়িত্বও দিলেন তাকে। মনির অবশ্য প্রথমে একদমই রাজি হচ্ছিল না। এসব সামলানোর মতো বোধ-বুদ্ধি তার নেই। এটা সে নিজে যেমন জানে, তেমনি জানে অন্যরাও। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হাল ছাড়েন নি। তিনি একপ্রকার জোর করেই তার কাঁধে এসব চাপিয়ে দিলেন। বারবার ভুল করার পরও অব্যাহতি দিলেন না। বরং আরও বেশি বেশি কাজের দায়িত্ব দিতে থাকলেন। এসবই কি তবে তার সুদূরপ্রসারী চিন্তার অংশ ছিল ?
তিনি কি তবে মনিরকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভবিষ্যতের কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত করে নিতে চাইছিলেন ?
কথাগুলো ভাবতেই খবির খাঁর সারা শরীর যেন কাঁটা দিয়ে উঠল।
তার মনে হলো, তার সামনে বসে থাকা অশীতিপর এই মানুষটির দৃশ্যমান ওই চোখজোড়া ছাড়াও হয়তো লুকিয়ে থাকা আরও একখানা চোখ কোথাও রয়ে গেছে।
সেই চোখে তিনি এমন সব বিষয় দেখে বেড়ান যা অন্যরা দেখাতো দূরের কথা, চিন্তাও করতে পারে না।
তার মানে, খাঁ বাড়ির দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যের আকাশে অদৃশ্য কোনো ভয়াল কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আর সেই মেঘ ডেকে আনছে ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী কোনো অশুভ, অশনি শক্তি!
মধ্যরাতের অন্ধকারে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ফতেহপুর। তবে এই সময়েও ফজু ব্যাপারীর ঘরের কেরোসিনের কুপিখানা মৃদু আলোয় জ্বলছে। কুপির চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে ফজু ব্যাপারী, তার স্ত্রী সালেহা আর আব্দুল ফকির। জুলফিকারসহ আরও দুজন যুবক বাইরের অন্ধকারে বসে চারপাশে নজর রাখছে।
আব্দুল ফকির গভীর মনোযোগে নানান কাগজপত্র দেখছেন। ফজু অবশ্য এসবের তেমন কিছুই বোঝে না। সে হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, ‘ফইর কাকু, কী মনে হয়, কাগজপত্র যা দেখলেন, তাতে কি আমাগো কোনো আশা আছে ?’
‘এখনো বেশি কিছু দেখতে পারি নাই। ভূমি অফিসে খালি দালাল আর দালাল। সবারই খালি পয়সা খাওনের ধান্দা। তয় আমারে অনেকেই চেনে। এইজন্য আলাদা একটু সুবিধা আছে। আবার অসুবিধাও আছে!’
‘অসুবিধা কী ?’
‘অসুবিধা হইলো, আমি যে মাদারীপুর ভূমি অফিসে যাই, এই কথা খাঁ বাড়িতে পৌঁছাইতে কতক্ষণ ?’
‘আপনে গেলে তাগো কী সমস্যা ? আপনের সাথে তো তাগো জমিজমার কোনো বিবাদ নাই। এইজন্যই তো আপনেরে পাঠাইছি। আমরা গেলে তো আগেই ধইরা ফালাইবো।’
‘হুম। এইটা ভালো হইছে। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁরে তো চেনোস না। সে...।’
ফজু যেন হঠাৎ জ্বলে উঠল, ‘তারে আমি চিনতেই চাই। আপনে কি সব ভুইলা গেছেন ? আমি কিন্তু ভুলি নাই। এতোদিন ভোলার ভান ধইরা সুযোগের অপেক্ষায় আছিলাম।’
আব্দুল ফকির ঠোঁটে আঙুল চেপে ফজুকে গলা নামাতে ইশারা করলেন। তারপর বললেন, ‘এই এলাকায় যার যা জমি আছিলো, প্রায় সবই তো তৈয়ব খাঁ হয় নামমাত্র দামে কিন্যা নিছে, নাইলে ডর দেহাইয়া নিছে। কিন্তু তোর বাপও ছিল ত্যাড়া। তারে কোনোভাবেই বশ করতে পারে নাই। সে জমি বেচলোও না। কোনো ভয়ভীতিতেও নত হইল না। তারপর তো ঘটনাচক্রে আমার বাড়ির ওই ঘটনা। সেই রাইতেও তোর বাপে আমার কাছে এই জমিজমা নিয়া কথা বলতেই গেছিল। কিন্তু আল্লায় তার জানের বিনিময়ে আমার জান ভিক্ষা দিয়া গেল।’
ফজু এই কথায় বেশ খানিক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘শুধু বাপজানের ক্যান, আমাগো ব্যাপারী বংশের বহুজনের জমিই তো খাঁয়েরা জোর কইরা দখল করছে। করে নাই ?’
‘হুম, করছে। এখন আমরা যদি অর্ধেক জমিও উদ্ধার করতে পারি, তাইলেও খাঁয় গো ভিত নইড়া যাইব।’
ফজুর চোখজোড়া হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘আপনে আপনের কাজ করেন কাকু। টাকা-পয়সা নিয়া আপনে চিন্তা করবেন না। মামলা মোকাদ্দমা যা লাগুক, টাকার ব্যবস্থা আমরা করবো। আপনে খালি আমাগো জমিনগুলা উদ্ধার কইরা দিবেন।’
আব্দুল ফকির খানিক কী ভাবলেন। তারপর চিন্তিত গলায় বললেন, ‘আচ্ছা ফজু, একখান কথা ?’
‘কী ?’
‘হঠাৎ এতো বছর পর এইসবের পিছে লাগছোস ক্যা, আমারে বল তো ? আর মামলা-মোকাদ্দমার এতো টাকা-পয়সাই-বা কই পাইবি ?
‘আমরা বংশের সবাই মিলে সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দিবো। যে যেইখানে আছে সবাই। আমার দুই ভাইও আছে। আপনে টাকা নিয়া চিন্তা করবেন না।’
🇧🇩🇧🇩‘তুই সত্য কইরা বল তো, আমার কাছে কি কিছু গোপন করতেছস তুই ?’
ফজু জিভ কেটে বলল, ‘তওবা তওবা। কী কন কাকু ? আমাগো মাথার উপরে আপনে ছাড়া আর কে আছে! আপনে এখন আমাগো ডাক্তার। ডাক্তারের কাছে যদি রুগি কিছু গোপন করে, তাইলে সেই রুগির রোগ কখনো ভালো হয় কাকু ?’
0 Comments