Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মানবজনম-পর্ব ২

মানবজনম — পর্ব 2 | মানবজনম
সাদাত হোসাইন

মানবজনম

📖 উপন্যাস ✍️ EarnBD
📄 পর্ব 2 / 6

‘আপনে তো ডাক্তার। আপনেই বলেন।’ ঠান্ডা গলায় বললেন আব্দুল ফকির।

‘হুম। দেখে মনে হচ্ছে কেটে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু চেষ্টা সফল হয় নি। তবে মারাত্মক জখম অবস্থায় পায়ে পচন ধরেছিল। আর ভালো চিকিৎসাও হয় নি। ফলে ক্ষত কোনোভাবে সারলেও এই বীভৎস অবস্থা আর এড়ানো যায় নি!’

আব্দুল ফকির বেশ খানিক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর হঠাৎ শব্দ করে হাসলেন।

নয়নের মনে হলো, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ সহজ এই মানুষটির ভেতর ধরতে না পারা অতিপ্রাকৃত ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে আছে। যা তার চারপাশজুড়ে প্রবল অস্বস্তি কিংবা ভয় তৈরি করে রাখে। হয়তো এ কারণেই নিরীহদর্শন এই হাসিতেও নয়নের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

আব্দুল ফকিরের পানখাওয়া এবড়োখেবড়ো কুচকুচে কালো দাঁত, লকলকে কৃষ্ণাভ জিভ আর জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শিউরে উঠল সে। বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে এল।

যেন লোকটার হাসি শেষ হতে না হতেই সত্যি সত্যিই ভয়ংকর অতিপ্রাকৃত কোনো ঘটনা ঘটবে!

আব্দুল ফকির হঠাৎ নয়নের কাছে সরে এলেন। তারপর ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, ‘ঠিক ধরছেন বাজান, একদম ঠিক। এই পাওখান একজন কোপ দিয়া কাইট্টা ফালাইছিল। সে চাইছিল রাইতের আন্ধারে আব্দুল ফইরের কল্লাখান কাইট্টা ফেলতে। বারবার চেষ্টা কইরাও পারে নাই। সে অবশ্য বলে যে সে নাকি আব্দুল ফইরের কল্লাখানও কাইট্যা ফালাইছিল। কিন্তু রাইতের আন্ধারে যে আব্দুল ফইরের কল্লা সে কাটছে, দিনের বেলায় লোকজন দেখলো সেই আব্দুল ফইরের শইলের উপর কল্লাও আছে। কল্লার উপরে মাথাও আছে। কল্লা আর মাথা লইয়া আব্দুল ফইর ঠিকঠিক ঘুইরা বেরাইতেছে। হা হা হা।’

বলেই আবারও সেই লোমহর্ষক শব্দ তুলে সাপের মতন হিসহিসে স্বরে হাসলেন আব্দুল ফকির। নয়নের প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারে তার চারপাশে অসংখ্য ভয়ংকর শ্বাপদ ওঁত পেতে আছে। মুহূর্তেই তারা দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু নয়ন তার জায়গা থেকে একচুলও নড়তে পারবে না। সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে, পাথরের মতো ভার হয়ে আছে তার শরীর।

আব্দুল ফকির হঠাৎ তার মুখ নিয়ে এলেন নয়নের মুখের কাছে। পচা বোটকা গন্ধে পেট গুলিয়ে উঠল নয়নের।

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

সে ঝট করে মুখ সরিয়ে নিল।

আব্দুল ফকির আবারও সাপের মতো হিসহিসে গলায় বললেন, ‘একবার... রাইতে ঘুমের মধ্যে রামদায়ের এক কোপে আব্দুল ফইরের কল্লা আলাদা কইরা ফালানো হইলো। শুধু যে আলাদাই কইরা ফালানো হইছিলো, তা-ই না। সেই কল্লা অন্ধকারেই লইয়াও যাওয়া হইছিলো। কিন্তু বেয়ান বেলা সকলে দেখলো, আব্দুল ফইর শইলের উপরে কল্লা লইয়া ঘুরতাছে। হা হা হা। কী বাজান, ঘটনা শুইনা কী বুঝতাছেন ? ঘটনায় কোনো প্যাঁচগোছ আছে ? আছে কোনো প্যাঁচগোছ ?’

নয়নের হঠাৎ কী যে হলো! সে পিছলে সরে গেল পেছনে। নৌকার ছইয়ের বেড়ার সাথে ঠেকে না যাওয়া অবধি পেছাতেই থাকল। যেন আব্দুল ফকিরের ওই আগুনের গোলার মতন ধকধকে চোখ আর লকলকে জিভ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চায় সে।

আব্দুল ফকির রক্ত হিম করা কণ্ঠে বললেন, ‘ডরাইলেন নি বাজান ? ডরাইলেন ?

নয়ন তীব্র আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে আব্দুল ফকিরের দিকে। আব্দুল ফকির বললেন, ‘কী ভাবতেছেন, আমার কল্লার উপরে এই মাথাটা আসল কি না ? কল্লায় রাম দায়ের আঘাতের দাগ আছে কি না ? নাকি ভাবতেছেন, সকলই চৌক্ষের ভুল ? নেন নেন, হাত দিয়া দেখেন। এই যে দেখেন, এই কল্লা আর এই মাথা আসল। একদম আসল।’

খানিক থেমে নিজের উত্তেজিত ভঙ্গিটাকে সংবরণ করলেন আব্দুল ফকির। তারপর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘ডরের কিছু নাই বাজান। আসল ঘটনা অন্য। এই ঘটনাও সবাই জানে, কিন্তু বিশ্বাস করতে চায় না। তারা ভাবে, আব্দুল ফইরের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আছে। হে হে হে। আব্দুল ফইরতো নিজের ক্ষমতার কথা নিজে কোনোদিন কয় না। কয় মাইনষে। তারাই ছড়ায়। শোনেন বাজান, কথায় আছে— মাইনষের মুখে জয়, মাইনষের মুখেই ক্ষয়।’

বলে কেশে গলা পরিষ্কার করলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘সেইদিন আসলে ঘটনা কী হইছিলো আপনেরে বলি শোনেন। ঘটনাচক্রে সেই মাঝরাইতে আমার বাড়িতে গিয়া হাজির হইছিলো আপনেগো ফতেহপুরেরই বজলু ব্যাপারী। গরমকাল। আমি আবার গরম সইতে পারি না। ঘরের সামনেই একখান ছোট দোচালা ঘর আছিলো। চাইরদিকে খোলা। হুড়মুড় কইরা বাতাস আইতো। সেই ঘরেই আমি ঘুমাইতাম। সেই দিন বজলু ব্যাপারী আইলো অনেক রাইতে। তার সাথেই ঘুমাইলাম। কিন্তু শ্যাষরাইতে শুরু হইলো বিষ্টি। বিষ্টির ছাটে ভিজ্যা যাওনের দশা। আমার আবার ঠান্ডার ধাঁত। বজলু ব্যাপারীরে কয়েকবার ডাকলাম। সে উঠল না। ঠান্ডা আর বিষ্টি পাইয়া আরামের ঘুম। কী আর করার ? সে যেন বিষ্টিতে না ভেজে, এইজন্য পাটির একপাশ উঠাইয়া তার গায়ে দিয়া তারে আমি ঢাইক্যা দিয়া ঘরে চইলা গেলাম। শ্যাষরাইতের আন্ধারে খুনি আসলো আমারে খুন করতে। কিন্তু আন্ধারে ভুল কইরা বজলুরে জাইত্যা ধইরা তার কল্লা কাইট্যা নিয়া গেলো। খুনি তো আর জানে না যে ওই বিছনায় আমি নাই। আছে বজলু ব্যাপারী। হে হে হে। আর দিনের বেলা ঘটনা ফাঁস হইলে সবাই ভাবলো ওইটা আব্দুল ফইরের কেরামতি। আপনের কী মনে হয় বাজান ? ওই ঘটনায় আব্দুল ফইরের কোনো কেরামতি আছে? না নাই?'

🇧🇩🇧🇩🇧🇩

নয়ন যুক্তিবাদী আধুনিক মানুষ। আব্দুল ফকিরের এইসব কথায়, কর্মকাণ্ডে তার ভয় পাওয়ার কথা না। কিন্তু সে ভয় পাচ্ছে। তীব্র ভয়।তার মাথা কাজ করছে না। আব্দুল ফকির বললেন, ‘কী ডাক্তার বাজান, পাইলেন নি কিছু খুঁইজা ? সেই রাইতে বজলু ব্যাপারীই ক্যান আমার বাড়িত যাইবো ? সে তো এর আগে আর কোনোদিন আমার বাড়িত যায় নাই! তাইলে ওইদিনই ক্যান গেলো ? বুঝলেন কিছু ? নাকি বোঝেন নাই ? শোনেন, বুঝলে বুঝপাতা... আর না বুঝলে ? না বুঝলে তেজপাতা। হে হে হে।’

নয়ন ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে। একটা বিষয় সে বুঝতে পারছে, আব্দুল ফকিরের কথা বলার ধরনটিই আসলে ভীতিকর। এবং তিনি জানেন তার উল্টোদিকে থাকা মানুষটিকে কীভাবে ভীত করে তুলতে হয়। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা তার রয়েছে।

‘আপনি মানুষকে ভয় দেখাতে খুব পছন্দ করেন, না ?’ নয়ন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো।

আব্দুল ফকির আবারও হাসলেন, ‘ভয় ? মানুষরে কি চাইলেই ভয় দেখান যায় ? আপনে পারবেন আমারে ভয় দেখাইতে ? আর আমি ভয় দেখামু ক্যান বাজান ? ভয় দেখাইয়া আমার লাভ কী ?’

‘ভয় দেখানোর অনেক লাভ আছে।’ বলল নয়ন। তার কণ্ঠ এতক্ষণে কিছুটা হলেও স্থির।

‘ভয় দেখানোর আবার লাভ কী ?’

‘মানুষ যা কিছু ভয় পায়, তা আর সহজে ঘাঁটাতে যায় না। হয় মেনে নেয়, না হলে এড়িয়ে চলে। আপনিও চান, মানুষ হয় আপনাকে মেনে নিক। অথবা না ঘাঁটাক। আপনার কাজকর্মে বাঁধা না দিক। সম্মান, সমীহ করুক। এতেই আপনার লাভ। এর ফলে আপনি অনেক বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠবেন।’

নয়ন হঠাৎ আবিষ্কার করল, তার ভয় কাটতে শুরু করেছে। সে খানিক সময় নিয়ে বলল, ‘মানুষ এই যে এত অর্থের পেছনে ছুটছে, রাজনীতি, ব্যবসা, যুদ্ধ করছে, আবিষ্কার করছে, এই যে এত কিছু করছে, এর পেছনে কারণ কী জানেন ?’

আব্দুল ফকির জবাব দিলেন না। তবে নয়নের হঠাৎ এই বদলে যাওয়া তাকে খানিক বিস্মিত করেছে। নয়ন বলল, ‘এই সবকিছুর পেছনে কারণ একটাই, আর সেটি হলো ক্ষমতা। সবাই ক্ষমতা চায়। কারণ ক্ষমতা থাকলে আর সবকিছু এমনিতেই পাওয়া যায়। ফলে পৃথিবীতে ক্ষমতা প্রাপ্তির চেয়ে অধিক আনন্দের কিছু নাই।’

আব্দুল ফকির হাসলেন। মৃদু মাপা হাসি। তারপর বললেন, ‘আপনে বলতেছেন সেই রাইতে বজলু ব্যাপারী এমনে এমনেই আমার বাড়িতে গেছিল ? আমার কোনো কেরামতি তাতে আছিলো না ?’

নয়ন মৃদু গলায় বলল, ‘নাহ। ... হতে পারে যে আপনি তাকে খবর দিয়ে বা অন্য কোনো কারণে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। আপনার কেরামতি বলতে ওইটুকুই। কিন্তু অলৌকিক কিছু না। এমনও হতে পারে, সে নিজেই কোনো কারণে সেদিন আপনার ওখানে গিয়েছিল।’

আব্দুল ফকির সময় নিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘দুনিয়াতে আল্লাহতালা দুই ধরনের মানুষ তৈয়ার করছেন। একধরনের মানুষ দেখে চামড়ার চোক্ষে। আরেকধরনের মানুষ চামড়ার চক্ষু ছাড়াও আরেক চোক্ষে দেখে। সেই চোক্ষের নাম গায়েবি চোখ। অন্তরচক্ষু। এই চোক্ষু সকলের থাকে না। অল্প কয়েকজনের থাকে। এই জইন্য বেশির ভাগ মানুষ তাদের কথা বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু এই চোখটাই আসল চোখ, বাজান।’ বলে সামান্য থামলেন। তারপর মুহূর্তেই আবার কণ্ঠ বদলে গেল তার। তিনি প্রায় হিসহিস করে বললেন, ‘দুম কইরা অবিশ্বাস কইরা বইসেন না বাজান। অবিশ্বাসে বিপদ। মহাবিপদ।’

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

নয়ন যেন আবারও গুটিয়ে গেল। আব্দুল ফকির বললেন, ‘শুনছি, ডাক্তাররা নাকি বিশ্বাস করে না যে গাঁওগেরামের ওঝারা সাপের বিষ নামাইতে পারে ? আপনে তো ডাক্তার, আপনের কী মনে হয় ? পারে ?’

নয়ন জবাব দিল না। যেমন বসে ছিল তেমনই চুপচাপ বসে রইল। আব্দুল ফকির বললেন, ‘হাজার হাজার বচ্ছর ধইরা এই দ্যাশে সাপের বিষ নামায় ওঝারা। সাপ বশ করে, এই যে আমার বাক্সের মইধ্যে এত্তগুলান সাপ, এইগুলান বশ না করলে এইভাবে রাখন সম্ভব ? এই যে বীণের সুরে সুরে সাপ নাচে, সব বীণেই কি সাপ নাচে ? দুই পাতা ডাক্তারি পইড়্যাই সব জাইন্যা ফালাইছেন ? দুইন্যাতে মানুষ এক চিমটি নুনের থেইকাও কম জানে। আর না জানার পরিমাণ আসমানের তারার চাইতেও বেশি। আর আপনেরা দুই পাতা বই পইড়াই হাজার বচ্ছরের নিয়মকানুন সব ভুয়া বইলা দেন ? সব বুজরুকি কন ? ’

নয়ন কথা বলে না। আব্দুল ফকির বলেন, ‘কী, কথা কন না ক্যান ? এই যে বাপদাদা চৌদ্দগুষ্টি ধইরা এই সাপ ধইর্রা খাই, সবই কি তাইলে হারাম ? মাইনষের চোক্ষে ধুলা দিয়া খাই ? মাইনষের জীবন বেইচ্যা খাই ?’

‘না না, তা কেন ?’ এবার কথা বলল নয়ন। ‘কিছু না কিছু তো আছেই।’

এবার যেন দপ করে জ্বলে উঠলেন আব্দুল ফকির, ‘কিছু না কিছু মানে কী, অ্যা ? কিছু না কিছু মানে কী ?’

‘মন্ত্রটন্ত্র আসলে কিছুই না। যা কিছু আছে, তা হলো ট্রিকস। কৌশল।’

আব্দুল ফকির যেন ফোঁস করে উঠলেন। বললেন, ‘টিরিকস ? কৌশল, হ্যাঁ ? কৌশল ? এখন এই বাক্সের মধ্যেরতন দুইটা গোক্ষুর সাপ ছাইড়া দেই আপনের কোলে ? দেখি, কি টিরিকসে আপনে সামলান ?’

নয়নের ভয় পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন যেন এবার আর ভয় পেল না সে। বরং বলল, ‘আসলেই ট্রিক্স। এই যে আপনি বললেন সাপ বাঁশির শব্দের তালে তালে নাচে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, সাপ বীণের শব্দই শুনতে পায় না। সে তার চামড়া বা পেশির মাধ্যমে মাটিতে হওয়া কোনো কম্পন টের পায় কেবল। তাহলে বাঁশির শব্দের তালে তালে সাপ নাচবে কী করে ?’

আব্দুল ফকির খপ করে নয়নের হাত ধরলেন। বার কয়েক চেষ্টা করেও সেই হাত ছাড়াতে পারল না নয়ন। তার হঠাৎ মনে হলো, এই পলকা শরীরের আড়ালেও অন্য একটা মানুষ বাস করে। সেই মানুষটা কঠিন, শক্তিশালী। কিন্তু তাকে চট করে কেউ দেখতে পায় না। মানুষ দেখে দুর্বল, বৃদ্ধ, ন্যুব্জ এক আব্দুল ফকিরকে।

আব্দুল ফকির বললেন, ‘তাইলে বাজারে যে গোক্ষুর সাপগুলান নাচল, তা এমনে এমনেই ?'

‘নাহ, এমনি তো আর নাচে নাই। এটা সাপুড়েদের খুব পুরোনো ট্রিকস। সাপ সরাসরি কানে শোনে না। সে শোনে তার পেশির মাধ্যমে। শোনে মানে মাটিতে সামান্য কোনো কাঁপুনি হলেও সাপ তা টের পায়। এ কারণে সাপুড়েরা বাঁশি বাজানোর আগে সাপের মুখে নানানভাবে আঘাত করে, মাটিতে হাত দিয়ে জোরে শব্দ বা কম্পন তৈরি করে। এতে সাপের শরীর সজাগ হয়ে যায়। তখন যিনি বীণ বাজান, তিনি সাপের চোখের কাছে বীণ নিয়ে গিয়ে নানাভাবে দুলে দুলে বীণ নাড়াতে থাকেন। এই বীণ নাড়ানোর কারণে সাপও নড়তে থাকে। সাপুড়েরা এটাকেই বীণের সুরে সাপ নাচছে বলে প্রচার করে। আর আমাদের দেশের গল্প, উপন্যাস, বিশেষ করে সিনেমায় এই বিষয়টা খুবই আকর্ষণীয় করে প্রচার করা হয়। ফলে সবার কাছে এটাই সত্যি হয়ে গেছে। আসলে তো তা না।’

আব্দুল ফকির খুব সতর্ক চোখে নয়নের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘একখান কথা শোনেন বাজান, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। বিশ্বাস না করলে এই জগতের সকলই মিছা, আর বিশ্বাস করলে সকলই হাছা। এই যে আপনেরে সাপে কাটল, আপনে তো একপ্রকার মারাই গেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুইখান ঢোলের বাড়িতে আব্দুল ফইর আপনেরে সুস্থ কইরা তুলছে। শত শত মানুষে দেখছে, সেইটারে আপনে কী বলবেন ? আপনেরে সেই মৃত্যু থেইক্যা যেই মানুষটা বাঁচাই তুলল, তারে আপনে বিশ্বাস করেন না ? তার ক্ষমতারে বিশ্বাস করেন না ? নাকি এইটারেও আপনে টিরিকস বলবেন ?’

নয়ন হঠাৎ হাসল। মৃদু, পরিমিত হাসি। তার চোখেমুখে তীক্ষ্ণ আলোর ঝলকানি। সে খুব দৃঢ় কিন্তু শীতল গলায় বলল, ‘আপনার কী মনে হয়, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন ?’

নয়নের কথা বলার ধরন ও এই ছোট্ট প্রশ্নে আব্দুল ফকিরকে হঠাৎ বিচলিত মনে হলো। সেদিন খাঁ বাড়ির উঠানে নয়নের জেগে ওঠার মুহূর্তে ফকিরের চোখে যে বিভ্রান্তি ফুটে উঠেছিল, আজ এই মুহূর্তেও যেন তা আবার দেখা গেল। তবে তিনি নিজেকে নিয়ে বললেন, ‘আমি বাঁচানোর কেউ না বাজান। জান বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। আমি আব্দুল ফইর উছিলামাত্র।’

ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে নয়ন শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল, ‘আমার সেইদিন কী হয়েছিল ফকির সাব ? আপনি আমাকে কী থেকে বাঁচিয়েছিলেন ?’

আব্দুল ফকির এবার যেন দ্বিধান্বিত হয়ে গেলেন, ‘আপনে কি সুস্থ বাজান ? নাকি এখনো অসুস্থ ? আপনেরে যে সাপে কাটছিলো, আপনের নানাজান যে সেই গভীর রাইতে আমারে আনতে পাঠাইছিলো, এইগুলা কিছুই আপনে জানেন না ? নাকি সব ভুইলা গেছেন ?’

‘আমি সবই জানি ফকির সাব। আর আমার ধারণা আমি যে সব জানি, এই কথা আপনিও জানেন। কিন্তু আপনি না জানার ভান ধরে বসে আছেন। কারণ, আপনি আমার মুখ থেকেই সব শুনতে চান। আর এইজন্যই আপনি আমারে এইভাবে নৌকায় তুললেন। কী, কথা ভুল বললাম ?’

আব্দুল ফকিরের চোখে যেন মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ খেলে গেল, ‘বলেন বাজান, আপনে কী জানেন, বলেন ?’

নয়ন এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সে মৃদু হেসে বলল, ‘আমাকে যে সেইদিন সাপে কাটে নাই, এইটা আপনিও যেমন জানেন, তেমনি আমিও জানি। তাইলে শুধু শুধু না বোঝার অভিনয় করছেন কেন ? আপনি এতদিন ধরে সাপের বিষ নামান, সাপে কাটা রোগী নিয়ে কাজ করেন, এই ঘটনা তো আপনার না বোঝার কথা না ?’

আব্দুল ফকির সাথে সাথেই জবাব দিলেন না। সরু চোখে সতর্ক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন নয়নের দিকে। এ যেন মুখোমুখি সাপ আর বেজি। মুহূর্তের অসতর্কতায় মরণকামড় বসে যেতে পারে যে-কারও শরীরে। আব্দুল ফকির আচমকা হাসলেন, ‘সেইদিন তাইলে আপনের কী হইছিল বাজান ? বলেন, সেইদিন আপনের কী হইছিলো ?’'

‘কেন ? আপনি বোঝেন নি ?’

আব্দুল ফকির এবার খানিক রুষ্ট হলেন। তিনি শক্ত গলায় বললেন, ‘আমি যেইটা বুঝছি, সেইটা তো আর আপনের কাছে জানতে চাইতেছি না। আপনের কথা আপনে বলেন বাজান।’

নয়ন হাসল, ‘আপনি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছেন ফকির সাব। উত্তেজনা ব্যাপারটা আপনার সঙ্গে যায় না। আপনার মতো মানুষেরা সাধারণত উত্তেজিত হয়ও না। কিন্তু যখন হয়, তখন বুঝতে হবে, তারা হেরে যাচ্ছেন। আপনি কি হেরে যাচ্ছেন ফকির সাব ? আপনি তো হেরে যেতে পছন্দ করেন না!’

আব্দুল ফকির এবার আর জবাব দিলেন না। হারিকেনের তেল সম্ভবত শেষ হয়ে এসেছে। নিভে আসছে আলো। ফলে আব্দুল ফকিরের শক্ত হয়ে আসা চোয়াল, আর ক্রমশ জেগে উঠতে থাকা কপালের শিরাগুলো দেখতে পেল না নয়ন। তারপরও সে স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আপনাকে নিয়ে যে কত গল্প আমি শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই ফকির সাব। আজগুবি সব গল্প। সেইসব গল্পের কতটুক সত্য, কতটুকু মিথ্যা, কতটুকু আসল আর কতটুকু ভান—তা জানার খুব ইচ্ছা ছিল। এইজন্যই এবার গ্রামে আসা আমার। আপনার সঙ্গে দেখা করারও খুব ইচ্ছা ছিল। হয়তো সেই দেখাটা খুব স্বাভাবিকভাবেই হতে পারত। কিন্তু আমি তা চাই নি। আমি চেয়েছিলাম দেখাটা অন্যভাবে করতে। কারণ, সেটা না হলে এই আদি ও আসল আব্দুল ফকিরকে তো আর চট করে আবিষ্কার করতে পারতাম না আমি। এভাবে দেখতেও পারতাম না এই লোক আসলে কী ? পারতাম বলেন ?’

আব্দুল ফকির এবারও কথা বললেন না। তবে সাপের মতন ঠান্ডা চোখে তিনি নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন। নয়নই বলল, ‘আপনি তো জানেন আমি ডাক্তার ?’

‘হুম।’ মাথা নাড়লেন ফকির।

‘সেই রাতে আমি সাড়ে সাত মিলিগ্রামের তিনখানা মিডাজোলাম ট্যাবলেট খেয়েছিলাম। এগুলো উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ। খেলে মানুষ টানা আট থেকে দশ ঘণ্টা মরার মতন ঘুমায়। আমিও ঘুমিয়েছিলাম। তবে তার আগে খুব সাবধানে আমার আঙুলে সাপে কাটার আঘাতের মতন কতকগুলো সরু আঁচড় কেটেছিলাম।’

আব্দুল ফকিরের চোখের পাতা যেন মুহূর্তের জন্য নড়ল।

নয়ন বলল, ‘তারপর চিৎকার করে সবাইকে বলেছিলাম আমাকে সাপে কেটেছে। তন্নতন্ন করে খুঁজেও কেউ সাপটাকে আর পেল না। কিন্তু আমি ততক্ষণে ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে গেছি। যেন মৃতপ্রায় মানুষ।’

নয়ন মুহূর্তের জন্য থামল। অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে। সে খানিক ঢোক গিলে আবার বলল, ‘কাজটা খুব ছেলেমানুষী ছিল আমি জানি। কিন্তু ছেলেমানুষী কে না করে বলেন ? আপনি করেন না ? করেন। আমরা সকলেই করি। আমার হাতে ওই আঁচড়ের চিহ্ন দেখে তো আপনার না বোঝার কথা না যে, ওগুলো সাপে কাটার দাগ না। তাহলে ? তাহলে এরপরও আমাকে বিষধর সাপে কেটেছে বলে কেন আপনি হইচই শুরু করে দিলেন ? বিষ নামানোর অতসব আয়োজন করলেন ? কেন ? নাকি ওই ঘরের আবছা অন্ধকারে আপনি দাগ দেখে কিছু বুঝতেই পারেন নি ?’

নয়ন ভেবেছিল তার কথা শুনে আব্দুল ফকির ক্ষেপে যাবেন। কিংবা অপ্রতিভ হবেন। কিন্তু তার চেহারায় তেমন কিছুই দেখা গেল না। বরং খুব সহজ ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘বাজান, আপনে বুদ্ধিমান মানুষ। শহরে লেখাপড়া জানা বড় ডাক্তার। আপনের বুদ্ধির সাথে কি আর আমাগো গাঁও-গেরামের মানুষের বুদ্ধি কুলায় ? কুলায় না। তয় একখান কথা, আপনেরে যে সেদিন সাপে কাটে নাই, এই সামান্য জিনিস আব্দুল ফইরের না বোঝনের কথা না।’

‘তাহলে ? তাহলে আপনি অত আয়োজন করে বিষ নামানো শুরু করলেন কেন ?’

আব্দুল ফকির গলায় জমে থাকা শ্লেষ্মা পরিষ্কার করতে করতে বললেন, ‘আচ্ছা, শোনেন তাইলে। আপনেরে সেইদিন কীভাবে সাপে কাটছে এই ঘটনা আমি কার কাছে শুনছি ?’

‘কার কাছে ?’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

‘আপনের মামা খবির খাঁর কাছে। সে আমারে বিস্তারিত বলছে। আপনি নাকি নিজ চোখে দেখছেন যে সাপ আপনারে ছোবল মারছে। তো আপনেরে যদি সাপে না-ই কাটে, তাইলে আপনে ক্যান মিথ্যা কথা বইলা চিক্কুর দিয়া ফিট হইয়া গেলেন ? এর রহস্য কী ? আর ওই ঝড়বৃষ্টির রাইতে অতদূর থেইকা আমারে ওইরকম জরুরি খবর দিয়া আনানোর কারণটাই-বা কী ছিল ? এই রহস্যটা সমাধান করা তো দরকার আছিলো আমার, বাজান। খাঁ বাড়ির সাথে আমার হিসাব-নিকাশ তো অত সহজ কিছু না।’

আব্দুল ফকির সামান্য থেমে বললেন, ‘আমি জানতাম, আর যা-ই হোউক সাপে আপনেরে কাটে নাই। কিন্তু আব্দুল ফইর তো এই অঞ্চলে একটা নাম। সে সাপে কাটা রুগিরে এমনে এমন ছাইড়া দিয়া আসবো, তাও আবার ফতেহপুরের খাঁয়গো বাড়ির রুগি, এই কথা চারদিকে চাউর হইলে সমস্যা। তারওপর আপনের আসল ঘটনাও তো আমার জানতে হইব। সেইটা না জাইনা চইলা আসনের মানুষ আব্দুল ফইর না, বাজান। এই দুই কারণেই আমি আপনেরে উঠানে নামাইছিলাম। আমার আসল ঘটনাটা বোঝন খুব দরকার আছিলো। আর গ্রামের লোকজনের দরকার ছিলো বিষ নামানির বিশাল আয়োজন। আব্দুল ফইর তো আর যেমন তেমন ওঝা না।’ বলেই হঠাৎ চাপা শব্দে হাসলেন তিনি, ‘নাও ঘাটে আইছে, আপনের নামনের সময় হইছে।’

নয়ন অবাক চোখে তাকাল। এমন বিস্ময়কর মানুষ আর কখনো দেখে নি সে। আব্দুল ফকির বললেন, ‘তয় আরেকখান কথা। আপনে সেইদিন যখন ঢোলের বাড়িতে জাইগা উঠলেন, আমি তখনই পুরোপুরি কিলিয়ার হইলাম যে ঘটনা অন্য। এইজন্যই হঠাৎ থম মাইরা গেছিলাম। কিন্তু বাজান, একটা ঘটনা এহনও পরিষ্কার না।’

‘কী ঘটনা ?’

‘আপনে এতো কিছু করলেন শুধু আমার সাথে দেখা করনের লাইগা ? শুধু আমি কতটুক আসল আর কতটুক নকল, এইটা বোঝনের লাইগা ?’

‘হুম।’ গম্ভীর গলায় বলল নয়ন।

‘এই কথা আমারে বিশ্বাস করতে বলেন ?’

জুলফিকার ঘাটে নাও ভিড়িয়েছে। মনিরকে সাথে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। আব্দুল ফকির বললেন, ‘বলেন বাজান, আসল ঘটনা বলেন।’

এবার নয়ন তার মুখখানা নিয়ে এল আব্দুল ফকিরের মুখের কাছে। তারপর অনুচ্চ কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আপনি আছমাকে চেনেন, আছমা ?’

আব্দুল ফকির কুঞ্চিৎ কপালে দ্বিধামিশ্রিত গলায় বললেন, ‘আছমা ? কোন আছমা বাজান ?’

‘আছমাকে সাপে কেটেছিল। আপনি গিয়েছিলেন তার বিষ নামাতে।’

‘কত রুগিরই তো বিষ নামাইছি বাজান। তাগো সবাইরেই কি মনে থাকে ?’

‘আছমার কথা আপনার মনে থাকার কথা।’

‘বয়স তো আর কম হয় নাই। বয়স বাড়লে মানুষের ইয়াদশক্তি কইম্যা যায়। আপনে ডাক্তার মানুষ, আপনের ভালো জাননের কথা। ঘটনা খুইলা বলেন বাজান।’

‘খুলে বলার তো তেমন কিছু নেই ফকির সাহেব। আপনি সবই জানেন। আছমা এই গ্রামেরই মেয়ে। খুবই দরিদ্র পরিবারে জন্ম তার। এইজন্য ঢাকায় মানুষের বাসায় কাজ করত সে। কিন্তু সেই মেয়েটা শহর থেকে ফিরল লাশ হয়ে। আপনার ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। আছমার জানাজার নামাজ পড়তেও আপনি গিয়েছিলেন। সেই নামাজে ইমামতিও করেছেন।’

আব্দুল ফকির এবার যেন সতর্ক হলেন। তবে সেটা তিনি বুঝতে দিলেন না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, ‘ওহ, গহর মাঝির মাইয়া আছমা ? আহারে সোনার বরন মাইয়াডা। অভাবের সংসার বইলা বাপ-মায়ে সেয়ানা মাইয়াডারে ঢাকার শহরে কামে দিছিল। মাইয়া ফিরা আসলো লাশ হইয়া।’

‘এই তো আপনার ইয়াদ আসছে ফকির সাব।’ নয়নের গলায় শ্লেষ।

‘কিন্তু বাজান, আছমার সাথে এইসবের সম্পর্ক কী ?’

‘সম্পর্ক আছে ফকির সাব। গভীর সম্পর্ক।’

‘কী গভীর সম্পর্ক ?’

‘খুন আর খুনির সম্পর্ক।’ নয়নের কণ্ঠ শীতল। সে ভেবেছিল এই কথায় আব্দুল ফকির মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যাবেন। ভয় পাবেন। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটল না। বরং নয়নকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনে কি অসুস্থ বাজান ? সেই রাতের সেই ঘুমের ঔষুধের নেশা কি আপনার এখনো কাটে নাই ? আপনাগো এই অষুধের গুণ তো দেখি মাশাল্লাহ ভালোই।’

নয়ন আব্দুল ফকিরের আচরণে যারপরনাই অবাক হলো। সে বলল, ‘আপনি কি জানেন, আপনি ভয়াবহ বিকৃত একজন মানুষ ? এরকম একটা অজপাড়াগাঁয়ে আপনার মতন এমন ভয়াবহ বিকৃত মানসিকতার একজন মানুষ থাকতে পারে, এটা আপনাকে দেখে কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না।’

‘কদমগাছ চেনেন ?’ নয়নকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হঠাৎই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন আব্দুল ফকির। ‘কদমগাছের পাতা ? চেনেন ?’

নয়ন এতটাই অবাক হলো যে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। বরং এই লোকটার সামনে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগতে লাগল তার। আব্দুল ফকির অবশ্য তার জবাবের অপেক্ষাও করলেন না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘গ্রামগঞ্জে একটা গাছ আছে। আমরা বলি লোট পিপিলগাছ। এর পাতা কিছুটা কদমগাছের পাতার মতন দেখতে। সেই পাতা পানিতে ভিজাই রাখলে পানি হইয়া যায় আঠার মতন ঘন। খাইতে কোনো টেস্ট নাই। তয় কাজে পাক্কা। দিনে দুই বেলা ওই পাতা পানিতে ভিজাইয়া সেই পানি খাইবেন। বায়ু চড়লে, উদবাগ হইলে, ঘুম না হইলে আর মাথায় এইসব আবোলতাবোল চিন্তা আইলে এই পাতা পানিতে ভিজাইয়া রেগুলার খাইবেন। খুব কাজে লাগবো। আপনের মাথায় বায়ু চড়ার লক্ষণ আছে। খাইয়া দেইখেন, এইসব দূর হইবো। এই যে আবোলতাবোল কথাবার্তা বলেন, এইগুলাও।’

আব্দুল ফকির থামলেও নয়ন কথা বলতে পারল না। সে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছে। আব্দুল ফকির নির্বিকার ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন নয়নের শিশুসুলভ কর্মকাণ্ড দেখে তিনি বেশ চিন্তিত। নয়নের হঠাৎ কী হলো! সে চট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার মাথা ঠুঁকে গেল নাওয়ের ছইয়ের সাথে। কিন্তু আঘাতটাকে পাত্তা দিল না সে। বরং ঘুরে আব্দুল ফকিরের দিকে তাকিয়ে হড়বড় করে বলল, ‘আপনার সম্পর্কে একদম কিছু না জেনে শুনে আমি এখানে আসি নি ফকির সাহেব। আর... শুধু আমি একা না, আপনার অনেক ঘটনা আরও অনেকেই জানেন, কিন্তু কেউ লজ্জায়, কেউ ভয়ে আপনাকে কিছু বলে না। আমার নানাজানও আপনাকে চেনেন। হাড়ে হাড়ে চেনেন। কিন্তু তিনিও আপনাকে ভয় পান।’

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

আব্দুল ফকির এবার শব্দ করে হাসলেন, ‘আপনার নানাজান তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আমারে ভয় পান ? আপনের মাথাডা সত্যি সত্যিই গেছে বাজান। এই তল্লাটে তৈয়ব খাঁর নামে বাঘে-মহিষে একঘাটে পানি খায়। আর আপনে বলতেছেন সে আমারে ভয় পায় ? আপনে তো এহনো নিজের নানাজানরেই চেনলেন না, আমারে কী চেনবেন বাজান ?’

আব্দুল ফকিরও নাওয়ের বেড়ায় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ‘আপনে জানেন, আমার পায়ের এই অবস্থা কে করছে ? কে আমারে খুন করতে গিয়া বজলু ব্যাপারীরে খুন করছে ?’

‘জানি।’

আব্দুল ফকির যেন কিছুটা চমকিত হলেন, ‘কী জানেন ?’

‘আপনাকে সেই রাতে খুন করতে গিয়েছিলেন আমার নানাজান। কিন্তু ভুলে তিনি অন্য একজনকে খুন করে ফেললেন। ঘটনা বহুবছর আগের। তখনো এইসব গাঁওগ্রামে আইনকানুনের তেমন বালাই নাই। চর দখলে মানুষ খুনের ঘটনা অহরহ। নানাজানের বয়সও কম। শরীরে শক্তি আছে। দাপট আছে। সে-ই তখন এইখানে সব।’

‘এই তো। আপনে তো দেখি সবই জানেন। তাইলে যে আবার বললেন, আপনার নানাজানে আমারে ভয় পায় ?’

‘এইটাই আপনার আসল খেলা। নানাজান একবার আপনাকে খুন করতে গিয়ে ভুল করে ফেললেন। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতেই আবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেবারও ব্যর্থ হলেন। তখন থেকেই তিনি মনে মনে আপনাকে ভয় পেতে শুরু করেন। তারও মনে হতে থাকে যে আপনার অতিপ্রাকৃত কোনো ক্ষমতা আছে।’

নয়ন হেঁটে ছইয়ের বাইরে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জুলফিকার আর মনির। সে নয়নকে দেখে বলল, ‘ভাইজান, মাছের বিষয়টা ভালো কইরা শোনছেন তো ?’

নয়ন কথা বলল না। সে তাকিয়ে আছে মনিরের পেছনে। সেখানে হারিকেনের আলোয় সামান্য জায়গা আলোকিত হয়ে আছে। বাদবাকি জায়গা ঢেকে আছে গাঢ় অন্ধকারে।

কে জানে, হয়তো মানবজীবনও এমনই। এখানে ওই সামান্য কিছু অংশেই কেবল আলো ফেলে দেখতে পারে মানুষ। আর বাদবাকি সব ঢেকে থাকে গাঢ় অন্ধকারে।

সেই অন্ধকার হয়তো না দেখাই ভালো!

পারুল মন খারাপ করে বসে আছে পুকুরঘাটে। সে আব্দুল ফকিরের একমাত্র কন্যা। বাবাকে বলেছিল বিলকুড়ানির হাট থেকে রঙ ফর্সাকারী ক্রিম আনতে। আব্দুল ফকির এনেছেনও। কিন্তু তিনি এনেছেন নকল ক্রিম। আসল আর নকল ক্রিমের ফারাক বোঝা অবশ্য সহজ নয়। প্যাকেট, নাম, নকশা—সবই প্রায় একরকম। কেবল সামান্য দু-একটা অক্ষর এদিক-সেদিক। একারণে পারুল কাগজে স্পষ্ট অক্ষরে নাম লিখেও দিয়েছিল। বলে দিয়েছিলো বারবার। কিন্তু আব্দুল ফকির সেই কাগজ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি এনেছেন নকল ক্রিম।

মন খারাপ করে বসে থাকতে থাকতে পারুলের হঠাৎ মনে হলো, এই বছরটাই তার জন্য অপয়া। হঠাৎ করেই ওজন বেড়ে গেছে। শরীরে অতিরিক্ত মাংস জমতে শুরু করেছে। গায়ের রঙও কেমন মলিন হয়ে যাচ্ছে। রোজ দুবেলা সাবান, স্নো ঘষেও কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তারওপর এবছরই সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। পাস করেছে তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী লতা। লতার পাস নিয়ে যে তার কোনো দুঃখ আছে, বিষয়টা এমন নয়। তার দুঃখ অন্য জায়গায়। পাস করতে না করতেই লতার একটা প্রেমও হয়ে গেছে। ছেলের নাম আশিক। সে থাকে ঢাকায়। আর লতা তার মামা বাড়ি রায়গঞ্জের কলেজে ভর্তি হয়েছে।

রায়গঞ্জ বড় নদীবন্দর। সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি আছে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক আছে। লতা পাস করার সাথে সাথেই তার মামা তাকে একটা মোবাইল ফোনও কিনে দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার প্রেমও হয়েছে সেই ফোনেই।

🇧🇩🇧🇩🇧🇩

পারুলের দুঃখটা এখানেই।

লতারও প্রেম হয়ে গেল! অথচ সে রয়ে গেলো একাই! লতার চেয়ে দেখতে ঢের বেশি সুন্দরী সে । ছিপছিপে লম্বা গড়ন তার। গভীর কালো চোখ। গায়ের রং উজ্জ্বল। লম্বা বাঁশির মতো টিকালো নাক। ফলে তার চারপাশে পুরুষমানুষের অভাব নেই।

কিন্তু গাঁয়ের কোনো ছেলেকেই তার ভালো লাগে না। বরং দেখলেই গা জ্বলে। এর অবশ্য কারণও আছে। সে চায় লতার প্রেমিকের মতো ঠাটবাটওয়ালা পুরোদস্তুর শহুরে ছেলে। কিন্তু এই গণ্ডগ্রামে অমন শহুরে ছেলে সে পাবে কই!

পারুলের বুকের ভেতরটা আবারও হুহু করে উঠল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ আর ভাত খাবে না। ভাত না-খাওয়ারও কারণ আছে। লতার কাছে সে শুনেছে, শহুরে ছেলেরা নাকি স্বাস্থ্যবতী মেয়েদের পছন্দ করে না। তারা পছন্দ করে টিনটিনে পাতলা শরীরের মেয়েদের। লতার মোবাইল ফোনে হিন্দি সিনেমার গানের কিছু ভিডিও-ও সে দেখেছে। সেইসব ভিডিওতে গানের নায়িকাগুলো দেখতে যে কী সুন্দর! তাদের দেখার পর থেকেই নিজের শরীর নিয়ে আক্ষেপ হতে শুরু করেছে পারুলের।

ইশ, সেও যদি আর খানিকটা পাতলা হতে পারত!

পারুল তার পা দুখানা ছড়িয়ে রেখেছে স্বচ্ছ জলে। পুকুরের পশ্চিম দিকের ঢিবিতে এক সারি গাছ। সেই গাছের ফাঁক দিয়ে তেড়ছাভাবে বিকেলের সোনারঙা রোদ এসে পড়েছে তার গায়ে। সেই আলোয় পারুল হঠাৎ খেয়াল করল, দীর্ঘসময় জলে থাকার কারণে তার পাজোড়া কেমন ফর্সা হয়ে উঠেছে। খানিক ফ্যাকাশেও। কিন্তু ওই অতিরিক্ত ফর্সা রঙটুকুর কারণেই তার হঠাৎ মন ভালো হয়ে গেল। সে এক পা দু পা করে ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে জলের ভেতর নামল। গত ক’দিন বৃষ্টি না হওয়ায় গরমও খানিক চড়েছে। আষাঢ় মাসের ভরভরন্ত পুকুর। সেই পুকুরে গলা অবধি গা ডুবিয়ে ভারি আরাম হতে লাগল তার।

সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘসময় জলে ভেসে রইল।

‘মারে, এই সইন্ধ্যাবেলা সময় ভালো না। এইসময় সেয়ানা মাইয়াগো ঘরের বাইর হইতে হয় না। চুল খোলা রাখতে হয় নারে মা।’

বাবার গলা শুনে চোখ মেলে তাকাল পারুল। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এতটা সময় জলে ভেসে আছে সে! থাকলে থাকবে। তার আর কিছুই ভালো লাগছে না। পারুল বাবার কথার উত্তর দিল না। আব্দুল ফকির মোলায়েম গলায় বললেন, ‘মারে, তুমি এইরকম কইরো না। ভালো মন্দ কিছু একটা হইয়া গেলে তখন কানলেও লাভ হইব নারে মা।’

‘কী ভালো মন্দ হইব ?’

‘তোমার মায়রে দেখো না ? তোমার মায়ও আছিল তোমার মতন। আমার কোনো কথাই শুনত না। হাবড়ে জাবড়ে ঘুইরা বেড়াইতো। সেই থেইকা এই অবস্থা। কতরকমের খারাপ জিনিস যে মানুষের চোক্ষের অগোচরে আছেরে মা...। মানুষ তো আর সব তার চামড়ার চোক্ষে দেখে না।’

‘আপনে তো দেহেন ?’

‘দেখিগো মা।’

‘তাইলে আপনে বলেন তো, এইখানে এখন কতগুলা খারাপ জিন আছে ? আমার চেহারা তো ভালো। তার উপর ভরা সন্ধ্যায় আমি চুল খুইলা পুষ্কুনিতে ভাসতেছি। তাইলে আমার চাইরপাশে তো জিনের মেলা বইসা যাওনের কথা আব্বা।’

‘এইভাবে কথা বলে না মা। তোমারে উঠতে বলছি, তুমি উঠো। তুমি যদি ঠান্ডা লাগাইয়া জ্বর বাঁধাও, তাইলে তোমার ঘরে পড়া অসুস্থ মায়রে কে দেখবে ?’

পারুল পানি থেকে উঠল না। আব্দুল ফকির মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে তাবারনকে পাঠালেন। তাবারন এই বাড়িতে কাজকর্ম করে। ছেলেপুলে হয় না বলে বাজা মেয়েছেলের অপবাদ নিয়ে তার দুই স্বামীর সংসার ছাড়তে হয়েছে। আজ কদিন হলো তার জ্বর। কিন্তু সেই জ্বর-শরীর নিয়েই তাকে পারুলকে পানি থেকে তুলতে হলো।

পারুল অবশ্য রাতে ভাত না খাওয়ার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারল না। তার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। সে আয়োজন করে ভাত খেতে বসল। কিন্তু ভাত খেতে বসে আবিষ্কার করল, তার শরীর কাঁপছে।

পারুলের জ্বর এল গভীর রাতে। ভয়াবহ জ্বর। কিন্তু এতরাতে এই জ্বরের কথা সে কাকে বলবে ?

পারুলের হঠাৎ খুব মন খারাপ লাগতে লাগল। মনে হলো, এই জগতে তার মতো একা, নিঃসঙ্গ আর কেউ নেই। কেউ নেই যে তাকে এই অন্ধকার অসুখের রাতে বুকে জড়িয়ে রাখবে। আলতো আদরে ঘুম পাড়িয়ে দিবে। কপালে চুমু খেয়ে হাত বুলিয়ে দিবে। এমন কেউ নেই তার। আর সবার যেমন মা থাকে, যার কাছে আনন্দে-অসুখে গিয়ে নিজেকে নির্ভাবনায় সমর্পিত করে দেওয়া যায়, তার তাও নেই।

পারুলের মা নুরুন্নাহার বহুবছর ধরে অসুস্থ। তার ঘরখানা বেশির ভাগ সময় বন্ধই থাকে। তিনি সাধারণত কাউকে চিনতে পারেন না। পারুলকেও না। তবে কালেভদ্রে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তখন ভালো মানুষের মতো আচার-আচরণ করেন। পারুলকে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথার চুল আঁচড়ে দেন। তেল দিয়ে দেন। তার বিয়েশাদি নিয়ে নানান কথাবার্তা বলেন। কিন্তু তা ওই বড়োজোর এক-আধদিন মাত্র। তারপর আবার আগের অপ্রকৃতস্থ এক মানুষের মতোই অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করেন।

তখন তাকে আটকে রাখতে হয় বদ্ধ ঘরে।

মাকে নিয়ে অবশ্য পারুলের আলাদা কোনো অনুভূতিও নেই। বরং সুস্থতার সময়টুকুতে মা তাকে নিয়ে যা করেন, পারুলের তাও ভীষণ বিরক্তিকর মনে হয়। এসব কারণে সে পারতপক্ষে নুরুন্নাহারের আশপাশে ভেড়ে না। কিন্তু আজ এই গভীর রাতে পারুলের হঠাৎ মনে হলো, এই জ্বর শরীর নিয়ে সে যদি এখন মায়ের গা ঘেঁষে বসে থাকতে পারত, তার গায়ের স্পর্শ নিতে পারত, তাহলে বোধহয় খানিক ভালো লাগত। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

পারুল বিছানা থেকে উঠল। জ্বরে তার শরীর কাঁপছে। সেই কম্পিত শরীর নিয়েই সে বাতি জ্বালাল। তারপর ঘরের টিনের দেয়াল ধরে ধরে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু নুরুন্নাহারের ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। এই তালার চাবি কার কাছে আছে পারুল জানে না। কারণ সে কখনো মায়ের ঘরে আসে নি। তার অবস্থা দেখতেও চায় নি।

কিন্তু আজ এই গভীর রাতে তার বুকের ভেতর এক অনাবিষ্কৃত অনুভূতি হঠাৎই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ফিরে আসতে গিয়ে শুনল তার মা কাঁদছেন। এই গভীর গহীন অন্ধকারে একা এক বন্ধ ঘরের ভেতর বসে কাঁদছেন তিনি। তার কান্নার মৃদু গুনগুন শব্দ যেন সূক্ষ্ম সুঁইয়ের ফলার মতোন পারুলের বুকের ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে লাগল।

আরও বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল পারুল। চুপচাপ। নিঃসাড়। তারপর হঠাৎ মায়ের বন্ধ দরজার এপাশে মেঝেতে বসে পড়ল। এই এতটা বছরেও কেন সে কখনো মায়ের কাছে আসে নি ? কেন জানতে চায় নি, মায়ের কী অসুখ করেছে ? কেন তিনি এই গভীর একাকী রাতে এমন নিঃসঙ্গ কান্নায় নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন ? অথচ তিনি জানেন তার এই কান্না শোনার কেউ নেই। তাকে একটু জড়িয়ে ধরার কেউ নেই। তিনি জানেন, এই কান্না কেবল তার একার। এই কান্নাই তার এই অন্ধকার, একাকী জীবনের একমাত্র সঙ্গী।

পারুল হঠাৎ আবিষ্কার করল সে কাঁদছে। তার গালে উষ্ণ জলের ছোঁয়া। কিন্তু এই কান্না যেন তার কাছে অচেনা। এই কান্নার অনুভবও। অথচ আজ বিকেলেও সে রং ফর্সাকারী ক্রিমের জন্য কেঁদেছে।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, জগতের সব অশ্রুর রং এক হলেও সব কান্না এক নয়। বরং কিছু কিছু কান্না আর সব কান্নার চেয়ে গভীর।

আর সব কান্নার চেয়ে তীব্র।

ফজু ব্যাপারী দাঁড়িয়ে আছে খালপাড়ে।

রেইনট্রি গাছের ডাল ভেঙে পানিতে পড়ে গিয়েছিল সে। আষাঢ় মাস। একটানা বৃষ্টি। বৃষ্টিতে রেইনট্রির পাতায় পানি জমে জমে পাতা ভার হয়ে গেছে। ফলে রেইনট্রির ডালও নুয়ে পড়েছে। ফজু ব্যাপারীর স্ত্রী সালেহা ভেবেছিল পাতার এই ওজনে ডাল আপনাআপনিই ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা হয় নি। দুদিন কেটে গেলেও ডাল ভেঙে পড়ে নি। বরং ডালের অগ্রভাগ নিচু হতে হতে প্রায় মাটি ছুঁয়ে কুর্ণিশ করার ভঙ্গিতে ঝুঁকে রইল।

সেই ডাল কাটতেই গাছে উঠেছিল ফজু ব্যাপারী। আর তখনই কাণ্ডটা ঘটল। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল ডাল। তাল সামলাতে না পেরে ডালের সাথে পড়ল ফজুও। তবে তাতে অসুবিধা কিছু হওয়ার কথা নয়। কারণ গাছের ঠিক নিচেই বর্ষায় ভরভরন্ত খাল। ফজু গিয়ে পড়ল সেই খালের পানিতে। সমস্যা হচ্ছে, এই খালের পানিতে পড়েও ফজুর হাত মচকে গেছে।

🇧🇩🇧🇩🇧🇩

কিন্তু পানিতে পড়লে তো তার হাত মচকানোর কথা না? তাহলে?

হাত মচকালো কী করে?

খালপাড়ে দাঁড়িয়ে সে কথাই ভাবছিল ফজু।

হাত মচকানোর রহস্য উদ্ঘাটিত হলো আরও কদিন পর। ততদিনে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ ঝলমল করে রোদও উঠেছে। একটানা বৃষ্টিতে পানি যতটা বেড়েছিল এই কদিনে তার খানিকটা নেমেও গেছে।

ফজু ব্যাপারী তার মচকানো হাত নিয়েই আজ ভোরবেলা খালপাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েই তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। টানা বৃষ্টিতে খালের পাড় ধ্বসে গেছে। সেই ধ্বসে যাওয়া অংশ এতদিন পানিতে ডুবে ছিল। দুদিনের টানা রোদে জায়গাটা আবার সামান্য জেগে উঠেছে।

সেই জেগে ওঠা জায়গায় রুপালি রঙের কিছু একটা ঝিলিক মারছে।

ফজু কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ভোঁ দৌড়ে নেমে এল ঢাল বেয়ে।

একখানা কলসি!

কলসির তিনভাগের দুইভাগ বের হয়ে আছে। বাকি একভাগ এখনো মাটির ভেতর। সেই কলসি দেখে ফজু নড়তে ভুলে গেল।

তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

এই কলসিখানার কথাই কি সে জন্মের পর থেকে অসংখ্যবার শুনে এসেছে ?

এদিক-সেদিক তাকিয়ে হঠাৎ খালের পানিতে নেমে গেল ফজু। খানিক সাঁতার কেটে পৌঁছে গেল কলসিটার কাছে। কলসির বেশির ভাগ অংশই মাটির ভেতর থেকে বের হয়ে আছে।

পুরু চামড়ার বন্ধনি দিয়ে শক্ত করে মুখটা বাঁধা।

কত আগের কলসি!

ফজুর ধারণা ছিল, হালকা টানতেই মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে কলসিখানা। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও একটুও নড়াতে পারল না সে। এর অবশ্য কারণও আছে। সেদিন গাছ থেকে পড়ে তার বাঁ হাত মচকে গেছে। ফলে তাকে চেষ্টা করতে হচ্ছে একহাতে।

একটা কোদাল বা শাবল হলে ভালো হতো। কিন্তু এই জিনিস এখানে এভাবে অরক্ষিত রেখে মুহূর্তের জন্যও কোথাও যেতে মন সায় দিচ্ছে না তার। যদি সে ফিরে আসার আগেই কেউ দেখে ফেলে!

ফজু বেশ কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে বসে রইল।

তারপর হঠাৎ দম বন্ধ করা এক দৌড়ে বাড়ি পৌঁছাল। বাড়িতে শাবল বা কোদাল কিছুই চট করে খুঁজে পেল না। চিৎকার করে বউ সালেহাকে ডাকল। কিন্তু সালেহা কোথাও নেই। শেষ অবধি রান্নাঘরের বেড়ার সঙ্গে রাখা কাস্তেখানা চোখে পড়ল তার। সে সেই কাস্তে নিয়েই একদৌড়ে খালপাড়ে ফিরে এল। কিন্তু এসেই মনে হলো, এখনই তার দম বন্ধ হয়ে যাবে।

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

কলজেটা ছিটকে বেরিয়ে আসবে বুক থেকে।

খালের উত্তর দিক থেকে একখানা ডিঙি নাও আসছে। নাওয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে লগি মারছে মনির। তার সঙ্গে আরও কেউ একজন আছে। কিন্তু সে পাটাতনে ঝুঁকে বসে আছে বলে ফজু ব্যাপারী তাকে ঠিক চিনতে পারল না। অবশ্য চেনার চেষ্টাও করল না। বরং হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল পানিতে।

নাহ, কলসিখানা এখনো ঠিকই আছে।

সমস্যা হচ্ছে, মনির নাও বেয়ে এদিকেই আসছে। বিষয়টা দুশ্চিন্তার। কারণ সে যদি এই কলস কোনোভাবে দেখে ফেলে তা হলে আর রক্ষা নেই।

অর্ধেক পানিতে ডুবেও ফজু ব্যাপারীর কপালের দুই পাশ বেয়ে দরদর করে ঘাম নামতে লাগল।

কী করবে এখন সে ?

ফজু ব্যাপারীর মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে হাত দুয়েক দূরের জলা থেকে ঘ্যাচঘ্যাচ করে ক’মুঠো লম্বা ঘাস কেটে ফেলল। মচকে যাওয়া হাতখানাতে প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা পাত্তা দিলে চলবে না। সে বরং যত্ন করে ঘাসগুলো ছড়িয়ে দিল কলসির ওপর। এতে অবশ্য দারুণ কাজ হয়েছে । কলসির অনেকটাই ঢেকে গেল ঘাসে।

এবার মন দিয়ে আরও ঘাস কাটয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল ফজু। যেন ঘাস কাটতেই এখানে এসেছে সে।

মনির পৌঁছালো তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। সে ফজু ব্যাপারীকে দেখে হাঁক ছেড়ে বলল, ‘কী ফজু কাকা, এই বেয়ান বেলা খালের মধ্যে ঘাস কাটেন কোন দুঃখে ?’

ফজু ব্যাপারী বলল, ‘গরু দুইটারে যে কোনোখানে ঘাস খাওয়াইতে নিমু, সেই উপায় কি আর আছেরে মনির ? ঘাসের জমি তো সব বন্যার পানিতে ডুইব্যা শ্যাষ।’

‘তা ঠিক আছে। কিন্তু পানির ঘাস তো গরুতে খাইতে চায় না কাকা। গরু খায় শুকনা মাঠের ঘাস।’

‘মোটে মায় রান্ধে না, পান্তা না গরম! ' তিক্ত গলায় বললো ফজু। 'আরে ব্যাটা, গরু মরতে আছে না খাইয়া। এখন ভিজা-শুকনা চিন্তা করলে জান বাঁচব ? যা দিবো তাই খাইবো।’

‘তারপরও কাকা খেয়াল কইরেন...। এই কাঁচা ঘাস খাইয়া না আবার গরুর পেট নাইমা যায়!’

‘তোর খালি অলক্ষইন্যা কথারে মনির। তা এইখানে এই বেয়ান বেলা কী কামে আইছস ?’

‘আপনের বাড়ির পাশে নাকি এইবার মাছ পড়ছে ভালো। ইছা মাছেরও নাকি খুব ঝনঝনানি। এইজন্য এইখানে চাঁই পাতছিলাম কাইল। এহন আইছি উঠাইতে। দেখি কিছু ধরা পড়ল কি না!’

ফজু ব্যাপারীর বুকখানা আবার ধ্বক করে উঠল। এখানে তো তাহলে বেশ কিছুক্ষণ থাকবে মনির। তারপর চাঁই তুলতে তাকে নামতে হবে খালের পানিতেও। তখন যদি কিছু দেখে ফেলে সে ? এর পর আর ভাবতে পারল না ফজু। ভয়ে তার দম বন্ধ হয়ে এল। মনিরও থামল ঠিক তার উল্টোদিকে। আর তখনই নাওয়ের মেঝেতে বসে থাকা নয়নকে চিনতে পারল ফজু। এই ছোট নৌকায় চড়ে অভ্যাস নেই বলেই হয়তো মেঝেতে ওভাবে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে সে।

ফজু হঠাৎ বলল, ‘কী ভাইগ্না, আছেন কেমন ? আপনের শরীল এহন ভালো ?’

‘জি ভালো।’

‘আপনের মায় কেমন আছে ? বহুদিন তারে দেহি না। সে আর আমি কিন্তু এক বয়সী। বুঝছেন ভাইগ্না ? কিন্তু আমরা থাকি গাঁও গেরামে। খাটাখাটনিতে আমাগো শরীল যায় বুড়া হইয়া। এইজন্য আমাগো দেখতে বয়স লাগে বেশি।’

‘না না। আপনাকে দেখে তেমন বয়স মনে হয় না।’

ফজু নয়নের কথা শুনে ফ্যা ফ্যা করে হাসল। তারপর বলল, ‘মাছ ধরা দেখতে আইছেন ?’

‘জি।’

মনির গামছা পরে পানিতে নেমেছে। সে দুই হাতে ঢেউ তুলে পানিতে ভেসে যাওয়া কচুরিপানা সরাল। তারপর ঝুপ শব্দে ডুব দিল। নয়নকে অবাক করে দিয়ে দীর্ঘসময় ডুবে থাকল সে। তারপর চাঁইভর্তি খলবল করা মাছ নিয়ে ভেসে উঠল। বাঁশের তৈরি এই ফাঁদে মাছ খুব সহজে ঢুকতে পারলেও আর বের হতে পারে না।

মনির নয়নের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল, ‘দেখলেন ভাইজান, পুরা খালের কোনো জায়গায় মাছের গন্ধ পর্যন্ত নাই, আর এইহানে মাছের খনি।’

নয়নও মৃদু হাসল, ‘তা ঠিক। কিন্তু এত মাছ খাবে কে মনির ?’

মনির এই প্রশ্নের জবাব দিল না। ফজু ব্যাপারী বলল, ‘তোর মাছের ভাগ্য খুব ভালো রে মনির। এই যে এইহানে আমার ঘরের লগের পানিতে এত মাছ, কিন্তু আমি কিচ্ছু জানি না।’

‘যার যা জাননের দরকার সে সেইটাই জানবে কাকা।’ বলল মনির। ‘কিন্তু আপনে বেয়ান বেলা কলস লইয়া ঘাস কাটতে আইছেন ক্যান ?’

ফজু ব্যাপারীর মনে হলো কেউ যেন তার কলিজা ধরে টান দিল। জবাব দেওয়ার মতো কোনো কথা সে খুঁজে পেল না। মনির বলল, ‘চাচিজান কি আইজকাল আপনেরে দিয়া ভাত রান্ধনের পানিও টানায় নাকি কাকা ?’

ফজু ব্যাপারী বুঝতে পারছে না আজ তার সঙ্গে কী ঘটছে। মনির কি কলসের বিষয়ে কিছু বুঝতে পেরেছে ? নাকি সে না বুঝেই বলেছে ? দুই দফা ঘাস দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পরও কলসির অবয়ব সামান্য বোঝা যাচ্ছে।

কিছু ঘাস সরে গিয়ে কলসের কালচে রূপালি পেটের কিছুটা চোখে পড়ছে। ফজু দ্বিধান্বিত হলেও গলায় খানিকটা জোর ঢেলে বলল, ‘তোর চাচির বাতের ব্যথাডা আইজকাল বাড়ছে রে মনির। কাজ কাম করতে পারে না। এইজন্য গরুর ঘাস থিকা শুরু কইরা রান্ধনের পানি পর্যন্ত সবই আমার জোগাড় করা লাগে।’

মনির তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘এই কাজ আপনে নিজ থিকাই করেন ফজু কাকা। আপনের বউ-ডরানি নাম তো আর এমনে এমনে হয় নাই।’

‘বিয়াশাদি তো করস নাই। কর। দেখবি সুন্দরবনের বাঘও বউয়ের সামনে কেমনে বিলাইর মতন ম্যাও ম্যাও করে!’

‘সবাই করে না।' গলার রগ টানটান হয়ে উঠল মনিরের। 'আমরা খাঁ বংশের পোলা। তারওপর তৈয়ব উদ্দিন খাঁর নাতি। আমাগো আপনের পাল্লায় মাপলে হইবো না। আপনে হইলেন বজলু ব্যাপারীর পোলা। আর আমি খবির খাঁর। তা খাঁ বাড়ির রক্ত কেমন তা তো আর আপনের না জানার কথা না, ফজু কাকা।’ মনিরের কণ্ঠে স্পষ্ট ঔদ্ধত্য।

ফজু ব্যাপারী এই কথায় চুপসে গেল। যেন জোঁকের মুখে হঠাৎ নুন পড়েছে। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

কিন্তু মনিরের একটা কথা খট করে কানে বিঁধে গেল নয়নের। এই ফজু ব্যাপারীই তাহলে বজলু ব্যাপারীর ছেলে!

আব্দুল ফকিরকে খুন করতে গিয়ে ভুল করে যাকে খুন করে ফেলেছিলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ? তারপর অন্ধকারে যার কাটা মাথা নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে!

বাকিটা সময় আর কিছুতেই মন বসাতে পারল না নয়ন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফজুকে লক্ষ করতে লাগল সে। মনিরের কথায় তার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সে। ফজু অবশ্য ততক্ষণে ঘাস কাটায় মনোযোগ দিয়েছে। নয়নের খুব ইচ্ছে করছিল তার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু কী ভেবে নিরস্ত রইল।

ফজু ব্যাপারীও আর কথা বলল না।

যেন মনিরের শেষ কথাগুলো হঠাৎ স্তব্ধ করে দিয়েছে তাকে।

কিন্তু তার ওই স্তব্ধতার আড়ালেও কি কিছু আছে? চাপা কোনো কষ্ট? দুঃখ? ক্ষোভ? আক্রোশ? নয়ন জানে না। কিন্তু তারপরও সে নিস্পলক তাকিয়ে রইলো ফজু ব্যাপারীর দিকে।

মনিররা চলে যেতে ফজু কলসটা তুললো। ভারি কলস। ভাঙা হাতে বয়ে আনতে ভীষণ কষ্ট হলো তার। সে ঘরের চৌকির তলায় রেখে দিল কলসটা।

এতক্ষণ যে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা নিয়ে এই কলসের জন্য সে অপেক্ষা করছিল, তা যেন হঠাৎই মিইয়ে গেছে। সালেহা এখনো ফেরে নি। ফজু এই অবেলায় টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার পায়ে কাদা। ভেজা শরীর। কিন্তু তাতেও যেন কিছুই যায় আসে না তার। বরং কিছুক্ষণের মধ্যেই কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে। তার সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল আজ থেকে প্রায় বছর পঁচিশেক আগের এক তুমুল বর্ষার দিনের কথা।

সেদিন তার বাবা বজলু ব্যাপারীর খণ্ডিত মস্তক পড়ে ছিল ফতেহপুর নদীর ধারে বটতলায়। সেই মাথা ঘিরে ভনভন করছিল মাছি।

বোকাসোকা কিসিমের কিশোর ফজু গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলো বাবার রক্তাক্ত কাটা মাথার দিকে। একটা বড় মাছি হঠাৎ ভনভন করতে করতে টুপ করে মুখে ঢুকে পড়ল বজলু ব্যাপারীর কাটা মাথার মুখের ভেতর। তারপর আর বেরোলো না। বিষয়টি নিয়ে ভারি চিন্তিত হয়ে পড়ল ছোট্ট ফজু।

তার তখন ভয়ানক দুশ্চিন্তা, মাছিটা বাবার মুখ থেকে বের হবে তো ?

নাকি ওই মাছিসহই তার বাবার ছিন্ন মাথাখানা কবর দিয়ে দিবে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ?

বজলু ব্যাপারীর মুণ্ডুবিহীন শরীর তখনও পড়ে আছে আব্দুল ফকিরের বাড়ি হোসনাবাদে। সেখান থেকে তা আনাতে হবে। থানা-পুলিশ জানাজানি হওয়ার আগেই কবর দিয়ে ফেলতে হবে মাথা ও শরীর।

ফলে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর বিশেষ দেহরক্ষী হায়দার আলীকে পাঠানো হলো দলবলসহ। সে বজলু ব্যাপারীর মুণ্ডুবিহীন শরীর নিয়ে আসামাত্র তা মাথার সঙ্গে জোড়া দিয়ে কবরস্থ করা হবে।

ফজুর বয়স তখন পনের বা ষোল। বাবার এমন নৃশংস মৃত্যু তার না বোঝার কথা না। কিন্তু সেই সারাটা দিন সে চুপচাপ বসে রইল ওই নদীর পাড়ে। একফোঁটা কাঁদল না। ভয় কিংবা শোকে মূর্ছাও গেল না। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসে রইল দিনভর। কিন্তু তাকে সেখান থেকে কিছুতেই সরানো গেল না।

আজ এতো বছর বাদে ফজুর চোখের সামনে যেন হরর সিনেমার গা শিউরে ওঠা ভয়ংকর দৃশ্যের মতো সেইসব দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল।

সালেহার ডাকাডাকিতে অবশ্য তার তন্দ্রা কেটে গেল। অবেলায় কাদাপানি মেখে বিছানায় শুয়ে থাকার কারণে সালেহা তাকে একচোট গালমন্দও করল।

কিন্তু ফজুর টকটকে লাল চোখ দেখে আচমকা থমকে গেল সে।

এই চোখের ফজুকে সে এর আগে কখনো দেখেনি! কী ভয়ংকর সেই চোখ। যেন ভাটার আগুনের মতো ধকধক করে জ্বলছে।

কেন ঝ্বলছে অমন?

রাত নামতে না নামতেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এল ফজুর। সেই জ্বরের ঘোরে সে প্রলাপ বকতে শুরু করল। আতঙ্কিত সালেহা স্বামীর মাথায় পানি ঢালতে গিয়ে আবিষ্কার করল তাদের চৌকির তলায় একখানা কলস। কলসের মুখ বাঁধা। সে সেই কলস টেনে আনতে গিয়ে দেখল অসম্ভব ওজন। কৌতূহলী সালেহা কলসের মুখ খুলতেই হতভম্ব হয়ে গেল।

ভেতরে উঁকি দিচ্ছে একখানা ঝলমলে সোনার হার!

সে সেটা বের করল। এই জীবনে এমন সোনার হার পরার সৌভাগ্য কখনো হয় নি তার। সালেহা রুদ্ধশ্বাস ভঙ্গিতে কলসটা উপুড় করে ধরল মেঝেতে।

তারপর অবাক বিস্ময়ে দেখল, কলসের ভেতর থেকে ঝনঝন শব্দে বের হচ্ছে একের পর এক পুরনো আমলের গহনা!

মাঝরাতের সেই গভীর নৈঃশব্দ্যে, অসুস্থ স্বামীকে পাশে নিয়ে সালেহা ঘোরগ্রস্তের মতন বসে রইল। তার সামনে স্তূপ হয়ে পড়ে রয়েছে এক কলসি সোনার অলংকার!!

পারুলের জ্বর সেরেছে সাত দিন বাদে।

এই সাত দিনে তার চোখ বসে গেছে। গাল ভেঙে, মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। ফলে প্রথম দিন আয়নায় নিজেকে দেখে প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে গেল তার। তবে তা বেশিক্ষণ থাকেও নি। এর অবশ্য কারণও আছে। পারুলের হঠাৎই মনে হলো, চোখের নিচে কালি পড়ে যাওয়ায় তাকে আরও সুন্দর লাগছে। যেন কেউ কাজল পরিয়ে দিয়েছে চোখে। একটা মায়া মায়া ভাব চলে এসেছে মুখে। সবচেয়ে বড় কথা, বেশ খানিকটা শুকিয়েছেও সে।

এমন হলে জ্বর ব্যাপরটা তো মন্দ না!

পারুল আজ দুপুরের আগে আগে সময় নিয়ে গোসল করল। যত্ন করে চুল আঁচড়াল। কপালে টিপ দিল। পাটভাঙা কমলা রঙের একখানা শাড়ি পরল। তারপর আয়নার সামনে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে রইল।

এবং নিজেকে দেখে তার মন ভালো হয়ে গেল।

খেতে গিয়ে অবশ্য কিছুই খেতে পারল না। মুখ বিস্বাদ হয়ে আছে। এই সময়ে দুটো ভাজা মরিচ আর খানিক কাচা আমের টক ডাল হলে পেটপুরে ভাত খাওয়া যেত।

মুখটা যেন টক-ঝালের তেষ্টায় চিড়বিড় করছে।

কিন্তু এই অসময়ে কাঁচা আম কই পাবে ? খানিক চালতা হলেও মন্দ হতো না। চুলায় টগবগ করতে থাকা ডালের সঙ্গে নুন-মরিচে সেদ্ধ হওয়া দুফালি চালতা পাতে পড়লেও আশ মিটিয়ে ভাত খাওয়া যেত।

পারুল ঘর থেকে বেরোল। বাইরে মেঘ-রোদের খেলা। ফুরফুরে মৃদু হাওয়াও বইছে। সে ধীর পায়ে হেঁটে পুকুরপাড়ে চলে এল। উত্তর দিকের ঢিবির ওপর সামান্য কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা কদমগাছ। গাছভর্তি ফুল। এমন না যে পারুল আজই প্রথম কদম ফুল দেখছে। কিন্তু কোনো কারণে আজকের সবকিছুই তাকে প্রবল মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখছে। টানা বর্ষায় পুকুরের ঢিবি ছুঁইছুঁই বিলের পানি। সেখানে কচি ধানের সবুজ ডগা তিরতির করে হাওয়ায় কাঁপছে। একটা মাছরাঙা ঝপ করে পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে ফুড়ুৎ উড়ে গেল।

জলে ঢেউয়ের ছোট্ট বৃত্ত তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারপাশে।

কাছেই কোথাও বউ কথা কও ডাকছে। একটা কাঠঠোকরাও ঠুকঠুক শব্দে কাঠ ঠুকছে। বাঁশের পাতায় শিস কেটে যাচ্ছে হাওয়া।

আহা কী শান্ত, স্নিগ্ধ সময়!

পারুল ক্রমশ অবাক মুগ্ধতায় ডুবে যাচ্ছিল।

তার মুগ্ধতায় ছেদ টানল জুলফিকার, ‘তুমি এইহানে পারুল ? আর তোমারে আমি সারা বাড়ি খুঁইজা পেরেশান।’

পারুল ঝট করে মুখ তুলে তাকাল। এই লোকটাকে দেখলেই রাগে তার গা রি রি করে। এখন আরও বেশি করছে। কারণ, সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, জুলফিকার এতক্ষণ আশপাশেই কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল।

এই কাজটা সে প্রায়ই করে।

পুকুরে গোসল করার সময় হঠাৎ হঠাৎ তাকে আশপাশে দেখা যায়। পারুলের ইচ্ছে হচ্ছিল কড়া গলায় কিছু বলতে। কিন্তু এই সুন্দর সময় আর অনুভূতিটা নষ্ট করতে চাইল না সে। ফলে চুপচাপ জুলফিকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

জুলফিকার বলল, ‘তুমি নাকি ভাত খাও নাই ? কাকুজান বড় পেরেশানিতে আছেন। তিনি আমারে বলছেন তোমার খোঁজখবর নিতে। এতোদিনের জ্বর, এহন প্যাট ভইরা ভাত না খাইলে কি চলব ? শইলের অবস্থা দেখছো তোমার ?’

পারুল ঠান্ডা গলায় বলল, ‘বুঝি নাই আপনের কথা। আমার শরীরের কী অবস্থা ?’

‘কী সোন্দর শইল স্বাস্থ্য আছিলো তোমার। এই কয়দিনের জ্বরে পাটকাঠির লাহান হইয়া গেছো। ব্লাউজ পরছ, সেই ব্লাউজ হইছে ঢিলা। মনে হইতেছে তোমার মাপের না, অন্য কেউর মাপের ব্লাউজ পরছো।’

পারুলের হঠাৎ কী যে হলো!

সে চট করে উঠে দাঁড়াল। তারপর দুই কদম আগে বেড়ে একদম জুলফিকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনে কি আমার ব্লাউজের মাপ নিতে আইছেন ? আমি কোন মাপের ব্লাউজ পরি, সেইটা জানতে আসছেন ? আসলে বলেন, আমি ব্লাউজ খুইলা দেই।’

পারুলের উত্তর শুনে হতভম্ব হয়ে গেল জুলফিকার। মেয়েটাকে সে পছন্দ করে। কিন্তু বুঝতে পারে না, কখন কোন মেজাজে সে থাকে। এই আগুন, তো এই পানি অবস্থা তার।

জুলফিকার মিনমিন করে বলল, ‘ছিঃ ছিঃ, তুমি এইটা কী বললা পারুল ? এই কথা মাইনষে শুনলে কী বলব ?’

‘আহারে আমার লজ্জাবতী লতা। শরমে এক্কেবারে চোখমুখ টকটকা লাল হইয়া গেছে, না ?’ পারুল মুখ ঝামটা মেরে বলল। ‘মাইনষেরে খুব ডর আপনের ? কী ভাবছেন, আমি কিছু বুঝি না ? আপনে যে আমার গোসলের সময় নানান ছুঁতায় পুস্কুনির ঘাটে আসেন, ঝোপঝাড়ের পিছনে লুকাই থাকেন, এইটা মনে করছেন আমি জানি না ? বলব আব্বারে ?’

জুলফিকারের মাথা কাজ করছে না। সে এমন কী বলেছে যে পারুল এমন ক্ষেপে গেল ? তার চুলের গোড়া বেয়ে দরদর করে ঘাম নামছে।

পারুল বলল, ‘চলেন আব্বার কাছে যাই। আব্বার কাছে গিয়া বলি আপনে আমার ব্লাউজের মাপ জানতে চাইছেন।’

জুলফিকার ঝপ করে পারুলের পায়ের কাছে বসে পড়ল। তারপর দুহাতে তার পা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি দোষ-মনে কিছু কই নাই পারুল। তারপরও আমার ভুল হইয়া গেছে, আমারে তুমি মাফ কইরা দাও।’

পারুল নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘আপনে জোয়ান পুরুষপোলা। মাইয়া মানুষের ব্লাউজের মাপ খুঁজবেন, এইটাই তো স্বভাবিক ঘটনা। এতে দোষের কী আছে ? চলেন আব্বার কাছে যাই।’

জুলফিকার এবার প্রায় কেঁদে ফেলল, ‘কাকুজান আমারে আস্তা রাখব না পারুল। আমারে সে জ্যাতা মাটিতে পুইত্যা ফালাইবো।’

‘ভালোই তো। তারপর আপনের শিকড় বাকড় গজাইবো। আমার আব্বা বিশাল পির ফকির মানুষ। দেখা গেলো তার কেরামতিতে আপনার গাছে ফল-পাকড়ও ধরতে থাকল। কাচা ফল, পাকা ফল, পোকায় খাওয়া নষ্ট ফল!’

জুলফিকার অসহায় চোখে পারুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আব্দুল ফকির উঠানে বসে আছেন। তার হাতপায়ে তেল মালিশ করছে রতন। সে তেল মালিশ করতে করতে বলল, ‘আমারে আসল মন্তর শিখাইবেন না দাদাজান ? আমার গোক্ষুর সাপ ধরনের খুব শখ।’

আব্দুল ফকির বললেন, ‘তাড়াহুড়া করন যাইবো না রে রতন। এইগুলান হইলো সাধনার ব্যাপার। সাধনার বিষয়ে তাড়াহুড়া করলে সাধনা হয় না।’

রতন আর কথা বলল না। সে একমনে তেল মালিশ করছে। মালিশ শেষ হলেই আব্দুল ফকির গোসলে যাবেন। তিনি সাধারণত ঘুম থেকে উঠেই গোসল করেন। কিন্তু আজ বহুবছর বাদে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারেন নি।

পারুলকে দেখে বললেন, ‘মারে, তুমি নাকি দুপুরেও ভাত খাও নাই ? নিজের মুখের দিকে চাইয়া দেখছো ? কী সোনার বরণ মুখখান কী হইছে ?’ 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

পারুল হাসল, ‘জ্বর হইলে তো এমন একটু হইবোই আব্বা।’

‘তা ঠিক আছে। কিন্তু মা, এই জন্যই তো অসুখবিসুখের সময় খানা-খাদ্য খাইতে হয় বেশি। শইলের যত্ন করতে হয় বেশি।’

‘মা থাকলে না অসুখের সময় যত্ন-আত্তি করে। আমার তো মা-ই নাই আব্বা।’

‘তোমার মা নাই কে বলল ?’

‘আপনের কি ধারণা, আমার মা আছে ?’

আব্দুল ফকির বুঝতে পারছেন, পারুলের মনে কিছু একটা চলছে। সে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে। কিন্তু উদ্দেশ্যটা তিনি ধরতে পারছেন না। তিনি বললেন, ‘তোমার মা আল্লাহর রহমতে সুস্থ হইয়া যাইবো। তার আগে তোমারও তো সুস্থ থাকতে হইবো মা। তুমি সুস্থ না থাকলে তোমার মা’র যত্ন করবো কে ?’

পারুল এই বিষয়ে আর কথা বলল না। সে খানিক সরে গিয়ে জুলফিকারের পাশে দাঁড়াল। জুলফিকার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেও কিছুই বুঝতে পারছে না। পারুল হঠাৎ বলল, ‘আপনের সাথে আমার একখান জরুরি কথা আছে আব্বা।’

আব্দুল ফকির মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠলেন। এই মেয়েকে নিয়ে তার রাজ্যের দুশ্চিন্তা। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পারুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলো মা ?’

‘কথাখান জুলফিকার ভাইয়ের বিষয়ে। আমি অনেক দিন থেইকাই ভাবছি কথাটা আপনেরে বলা দরকার। কিন্তু আপনে আবার কী না কী মনে করেন, এই জন্য আর বলি নাই। কিন্তু আজকে আর না বইলা পারতেছি না।’

মুহূর্তেই জুলফিকারের হৃদকম্পন বেড়ে গেল। ঘটনা শোনার পর আব্দুল ফকির কী করবেন সেটা ভেবে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে গলায় সামান্য জোর ঢেলে কিছু বলার চেষ্টা করল সে, ‘পারুল... আমার একখান কথা শোনো... আমি...।’

পারুল অবশ্য জুলফিকারকে কথা বলতে দিল না। সে গলা চড়িয়ে বলল, ‘আপনে চুপ থাকেন। যা বলার আমারে বলতে দেন।’ জুলফিকার দমকা হাওয়ায় নিভে যাওয়া বাতির মতন দপ করে নিভে গেল। আব্দুল ফকির বিস্মিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন পারুলের দিকে।

পারুল ধীরস্থির গলায় বলল, ‘জুলফিকার ভাইর বিয়ার বয়স হইছে অনেক আগেই। তারে একখান বিয়া দেওন জরুরি আব্বা।’

‘ক্যান ? হঠাৎ এই কথা ক্যান ?’

জুলফিকারের মাথা-কান ঝা ঝা করছে। সে জানে, এর পরের কথাটি কী হবে। খানিক আগের ঘটনায় নানান রংচং মিশিয়ে বলবে পারুল।

সেসব শুনে কী করবেন আব্দুল ফকির ?

‘আব্বা।’ বলতে শুরু করল পারুল। ‘আপনের ঘরে সেয়ানা মাইয়া। এই বয়সে সব বাপ-মা-ই তার মাইয়ার বিয়ার জন্য ছেলে দেখে। আমার তো মা থাইকাও নাই। এখন এই দায়িত্ব তো আপনের। আমারেও তো আপনের বিয়া দিতে হইব। হইব না ? আবার জুলফিকার ভাইরও বিয়ার বয়স অনেক আগেই হইয়া গেছে। তো এহন তো দুইজনেরই বিয়া দেওন দরকার। দরকার না ?’

আব্দুল ফকির রীতিমতো ধাক্কা খেলেন।

পারুল কি জুলফিকারকে বিয়ে করার কথা বলছে ?

জুলফিকারেরও ঘোর কাটছে না। পারুল কী বলছে এসব ? সে কি সত্যি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায় ? নিজেকে পুরোপুরি বোকা মনে হচ্ছে জুলফিকারের।

নাকি স্বপ্ন দেখছে সে ?

আব্দুল ফকির চাপা গলায় বললেন, ‘তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারতেছি না মা।’

‘আমার আর জুলফিকার ভাইর বিয়ার ব্যবস্থা করেন আব্বা।’ শান্ত গলায় বলল পারু।

‘মানে!’ প্রায় চিৎকারের ভঙ্গিতে কথাটা বললেন আব্দুল ফকির। তার গলা কাঁপছে। 'জুলফিকার আর তোর বিয়া!'

পারুল অবশ্য তা গ্রাহ্য করল না। সে আবারও নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘হ, আমাদের দুইজনেরই বিয়ার ব্যবস্থা করেন। আমার জন্য ছেলে দেখেন। আর জুলফিকার ভাইর জন্যও মাইয়া দেখেন। বিয়ার পর আমি শ্বশুরবাড়ি চইলা যাবো। তখন আপনে থাকবেন একলা। এইজন্য একটা ভালো মাইয়া দেইখ্যা জুলফিকার ভাইরেও বিয়া করাই দেন। তার বউ থাকবো এই বাড়িতে। তারা জামাই-বউ মিল্যা তখন এই বাড়িঘর সামলাইবো। আপনেরে, মারে দেইখা শুইন্যা রাখব।'

🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

পারুল কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না।

আব্দুল ফকিরের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। এই মেয়েকে নিয়ে তিনি আর পারেন না। একে বোঝার সাধ্য তার নেই। এই সামান্য কথা বলতে গিয়ে কী ভয়াবহ পরিস্থিতিই না সে তৈরি করল!

পারুল অবশ্য কিছুদূর গিয়েই আবার ফিরে এল। তারপর বলল, ‘আমার জন্য কিন্তু গাঁও গেরামের ছেলে দেখবেন না আব্বা। আমার টাউনের ছেলে বিয়া করনের খুব শখ। তার সঙ্গে আমি টাউনে গিয়া থাকব। এই কাদাপানির গ্রাম আমার আর ভালো লাগে না।’

জুলফিকার কিছুই বুঝতে পারল না। সে দাঁড়িয়ে রইল বজ্রাহত মানুষের মতন।

বিকেলে মেয়ের জন্য ব্যাগভর্তি আমড়া নিয়ে এলেন আব্দুল ফকির। বাড়ির পেছনের বাগান থেকে দুটা বড় জাম্বুরাও পাড়ালেন। তারপর ঝাল-নুনে সেসব মাখিয়ে পারুলের ঘরে গেলেন। কিন্তু পারুল তখন গভীর ঘুমে অচেতন। তিনি এশার নামাজ অবধি অপেক্ষা করলেন। কিন্তু পারুল জাগল না। সে জাগল পরদিন ভোরে।

তার পেটে তখন রাজ্যের খিদে। ঝাঁঝালো পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ ডলে প্লেটভর্তি পান্তা ভাত খেয়ে ফেলল সে। ঝালে তার জিভ পুড়ে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে দরদর করে পানি পড়ছে। কিন্তু তারপরও পারুলের মনে হলো বহুকাল পরে তৃপ্তি করে কিছু খেয়েছে সে। শরীরে যেন বল ফিরে এসেছে। খানিকটা রোদ চড়তেই মায়ের ঘরের সামনে গেল সে।

আজ তার ঘরের দরজায় তালা নেই।

ভেজানো পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকল পারুল। দরজার ঠিক উল্টোদিকে টিনের বেড়ার গা ঘেঁষে যে চৌকিখানা রাখা, তার ঠিক পাশে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন নুরুন্নাহার। তার পরনে নোংরা তেল চিটচিটে পেটিকোট আর ব্লাউজ। চোখের কোলে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। খানিকটা এগোতেই বিদঘুটে কিছুর বোটকা গন্ধে নাড়িভুড়ি উল্টে যাওয়ার দশা হলো।

পারুল অবশ্য তা গ্রাহ্য করল না। সে ধীর পায়ে হেঁটে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। তারপর বসেই রইল দীর্ঘসময়।

দুপুরের দিকে সে তাবারনকে ডেকে মায়ের ঘর পরিষ্কার করাল। বিছানায় ধোয়া চাদর পেতে দিল। মায়ের কাঁথা-কাপড় ধুইয়ে শুকাতে দিল রোদে। তারপর তাকে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘসময় ধরে পুকুরে গোসল করাল। নুরুন্নাহার অবশ্য এই পুরোটা সময় বাধ্য মেয়ের মতন শান্ত হয়েই রইল। তবে ঝামেলা শুরু করল খাওয়ার সময়। প্লেটে রাখা ভাতগুলো কেবল আঙুলের ডগায় নাড়াচাড়া করতে লাগল সে। কিন্তু মুখে তুলল না।

পারুল বলল, ‘মা, ভাত খাও।’

নুরুন্নাহার আচমকা মুখ ঝামটা মারলেন, ‘এই ছেমড়ি, তোর মা কেডা ?’

‘ক্যান, তুমি।’

‘আমার তো বিয়াই হয় নাই। আমি তোর মা হইতে যাবো কোন দুঃখে ?’

‘তোমার বিয়া না হইলে তুমি এই বাড়িতে ক্যান আইছো ?’

নুরুন্নাহার হঠাৎ এদিক সেদিক তাকাতে লাগলেন, ‘ফইরসাবে কই ? তারে তো দেহি না। সে কই ?’

‘সে কাজে গেছে। তারে খোঁজো ক্যান ?’

‘এমনেই। সে না থাকলে আমারে ভাত খাইতে দে।’

‘তোমার সামনেই তো প্লেটভর্তি ভাত।’

নুরুন্নাহারের হঠাৎ যেন মনে পড়ল তার সামনে প্লেটভর্তি ভাত। তিনি অনেকক্ষণ ভাতের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ প্লেটটা ছুড়ে মারলেন বাইরে। পারুল হতভম্ব চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মা ভাত না খেলেও এমন তো কখনো করে না। সে বলল, ‘এটা তুমি কী করলা ?’

নুরুন্নাহার বললেন, ‘আমারে বিষ খাইতে দিছস ? ভাতের মইদ্যে বিষ দিছস। আর ফইরসাবের পড়া তাবিজ। এইসব কইরা আমারে পাগল বানাবি ? বলদ পাইছস আমারে ? আমি বলদ না। হা হা হা।’

নুরুন্নাহার শরীর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলেন। পারুল অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। নুরুন্নাহার হাসি থামিয়ে বললেন, ‘ভাত দে।’

পারুল গামলা থেকে প্লেটে ভাত বাড়তে যেতেই নুরুন্নাহার আবারও চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘হারামজাদি মাগি, তোরে আমি কইছি ভাত দিতে। তুই আমারে আবারও বিষ দিতেছস ?’

‘ভাতই তো দিতেছি!’

‘ওই ভাত-শালুনের মইদ্যে কী আছে, আমি সব জানি। আমারে পাগল বানাবি ? জানে মারবি ? হা হা হা। পারবি না। পারবি না।’

পারুলের বুকের ভেতর কী যে হচ্ছে! সে নুরুন্নাহারের গা ঘেঁষে এসে বসল। তারপর বলল, ‘মাগো, দুইটা ভাত তুমি খাও মা।’

নুরুন্নাহার গা ঝাড়া দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘আমার সামনে বইস্যা চাউল ধুইয়া আবার ভাত রানবি। আমি সেই ভাত খাবো।’

পারুল নুরুন্নাহারকে সামনে বসিয়ে চাল ধুয়ে ভাত বসাল চুলায়। রান্না শেষে তাকে আবার ভাত খেতে দিল। নুরুন্নাহার বললেন, ‘ভাতে শালুন দিবি না। আমি ভাত খাব শালুন ছাড়া।’

‘শালুন ছাড়া ভাত খাওন যায় মা ?’

'শালুনে বিষ দেওয়া, আমি জানি। নাইলে ফইরসাবে মন্তর পইরা দিছে, আমারে পাগল বানাইবো। এতো সহজে পাগল আমি হমু না। হে হে হে। যতই চেষ্টা করুক, আমারে খুন করন, পাগল বানানো অতো সহজ না। হি হি হি।'

'তুমি এইসব কী কও মা?'

নুরুন্নাহার পারুলের কথার জবাব দিলেন না। তিনি বড় বড় নলা মুখে তুলে শব্দ করে নুন-তরকারি ছাড়াই সাদা ভাত খেতে লাগলেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সহস্র বছরের বুভুক্ষু এক মানুষ। যেন জীবনের শেষ বেলার আহার গ্রহণ করছে। এরপর আর কোনোদিনও খেতে পাবে না সে।

নুরুন্নাহার ভাত খাওয়া শেষে উঠলেন। বিকেলের নরম রোদে পারুল মাকে নিয়ে উঠানে পিঁড়ি পেতে বসল। তারপর তার জট পড়ে যাওয়া চুলের জটা ছাড়িয়ে তেল দিয়ে দিতে লাগল। এই সময়ে সে মায়ের সাথে নানান কথাবার্তা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু নুরুন্নাহার সেইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না।

অবাক ব্যাপার হলো, এর কয়েকদিন পর নুরুন্নাহার হঠাৎ সুস্থ হয়ে উঠলেন। সেদিন আছরের আজানের সময় তিনি পারুলকে বললেন, ‘সেয়ানা মাইয়া হইছস। আজানের সময় যে মাথা উদলা রাখতে হয় না, এইটাও জানস না ? ঢাক, মাথা ঢাক।’

বলেই তিনি শাড়ির আঁচলে নিজের মাথা ঢাকলেন। বললেন, ‘নামাজ পড়বো। ওজুর পানি দে। আমার পরনের এই কাপড় পাক না নাপাক কে জানে! একখান ধোয়া কাপড় দে। আর তোর কি নামাজ আছে ? নামাজ থাকলে ওঠ। কাপড় পাল্টাইয়া ওজু কইরা আয়, একসাথে নামাজ পড়বো।’

পারুল ভারি অবাক হলো। কিন্তু কিছু বলল না। সে মাকে ধোয়া শুকনো কাপড়, ওজুর পানি দিল। তারপর মা-মেয়ে মিলে আছরের নামাজ পড়ল। নামাজে পারুলের ভালো ঘরে বিয়ের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে কাঁদলেন নুরুন্নাহার। তারপর তারা হাঁটতে বেরোল। পুকুরের ঘাটে বসে মেয়েকে নানান উপদেশ দিলেন নুরুন্নাহার। মেয়ের গায়ের রং খানিক ময়লা হয়েছে দেখে তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বললেন, ‘প্রত্যেক বেয়ান বেলা খালি প্যাডে কাঁচা হলুদ খাবি। গোসলের আগে হলুদ মুখে মাইখা বইসা থাকবি। দেখবি, মুখের রং হইবো কাঁচা হলুদের লাহান।’

পারুল মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

কী সুন্দর সুস্থ মমতাময়ী এক মা তার! অথচ সেই ছোটবেলা থেকে সে নিজেকে ভেবে এসেছে ভয়াবহ দুর্ভাগা মাতৃহীন এক মেয়ে। নুরুন্নাহার একটানা কথা বলে যাচ্ছেন। সেইসব কথার কিছুই পারুল শুনছে না। সে বাকিটা সময় কেবল মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার আগে আগে নুরুন্নাহার বললেন, ‘মাগরিবের আজান হইব এখন। এতক্ষণ যা বকবক করলাম, তাতে অজু থাকনের কথা না। আবার অজু কইরা নেই।’

অজু শেষে তারা বাড়িতে ফিরল। উঠানে রতন দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে বিশাল এক বোয়াল মাছ। সে মাছটা উঠানের মাটিতে রাখতে রাখতে বলল, ‘ও ফুপু, দাদাজানে এইটা পাঠাইছেন। বলছেন, বেশি কইরা ঝাল আর পেঁয়াইজ দিয়া রানতে। আপনের মুখে নাকি স্বাদ নাই ? এই জন্য এই মাছ পাঠাইছে।’

পারুল অবশ্য মাছ নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাল না। তবে আগ্রহ দেখালেন নুরুন্নাহার। তিনি ঝাঁঝালো গলায় বললেন, ‘মাছ মাটিতে রাখছস ক্যা ? মাছ মাটিতে রাখলে মাছের স্বাদ কইম্যা যায়। এইটা পানির জিনিস, রাখতে হয় পানিতে। যা গামলায় কইরা পানি নিয়ায়।’

মাগরিবের নামাজ শেষে পারুলকে নিয়ে উঠানে মাছ কুটতে বসলেন নুরুন্নাহার। সঙ্গে রাজ্যের গল্প, ‘শোন, একবার তোর নানায় মাছ আনছে। আইড় মাছ। যেমন তেমন আইড় না, বাঘা আইড়। সেই মাছ রানতে রানতে ভোররাইত হইল। আমরা তহন ঘুমে পইড়া যাইতেছি। বাজানে তো আমাগো ঘুমাইতেই দিবো না। আমরা ঘুমাই আর সে টাইন্যা ধইরা জাগায়। শ্যাষ পর্যন্ত মাছ যহন রান্ধা হইলো, তহন আমরা ঘুমাই পড়ছি। আমাগো আর জাগাইতেই পারলো না। আর এইজন্য বাজানেও কিছু খাইলো না। যেই মাছ দিয়া ভাত খাইবো বইলা সারা রাইত না খাইয়া জাইগা থাকলো, সেই মাছ না খাইয়া আমাগো লইয়া ঘুমাইয়া পড়লো। বেয়ানে আমরা উঠলে তারপর সবাই মিলা খাইবো। কিন্তু বেয়ান বেলা উইঠা দেখে বিড়ালে মাছের পাতিল উল্টাই ফেলছে। মাছ, তরকারি সব গড়াগড়ি খাইতেছে মাটিতে। বাজানের এতো শখের মাছ, কিন্তু আমাগো জন্য আর খাওয়া হইলো না। আহারে আমার বাজান। বাজান গো!’

নুরুন্নাহারের চোখ বেয়ে জল নামতে লাগল, ‘সেই বাজান আমারে তার মরণের সময়ও দেখতে পারে নাই। আমি যাইতে পারি নাই তারে দেখতে। বংশের মুখে চুনকালি দিয়া তোর বাপের সঙ্গে পালাইয়া আসছিলাম। তারপর থিকা তোর বাপেও আর কোনো যোগাযোগ রাখতে দেয় নাই।’

এসব কথা যে পারুল জানে না, তা না। কিন্তু আজ মায়ের মুখে সেসবই যেন নতুন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে গভীর অনুভূতির স্পর্শ।

পারুল বা তাবারনকে কোনো কাজেই হাত দিতে দিলেন না নুরুন্নাহার। তিনি একাই সব কাজ করলেন। ফলে রান্না শেষ হতে বেশ রাত হয়ে গেল। ততক্ষণে খিদেয় দিশেহারা অবস্থা সকলের।

খাবার বাড়তে গিয়ে একজন পরিপূর্ণ গৃহকর্ত্রীর মতো নিজের ঘরকন্না সামলানোর তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল নুরুন্নাহারের চোখেমুখে। তিনি সবার পাতে ভাত-তরকারি বেড়ে দিতে লাগলেন। আব্দুল ফকির এতক্ষণে কথা বললেন, ‘তোমার শইল এহন কেমন নুরুন্নাহার ? ভালো ঠেকতেছো ?’

নুরুন্নাহার আব্দুল ফকিরের কথার জবাব দিলেন না। তিনি তাবারনকে বাদ দিয়ে জুলফিকারের পাতে তরকারি দিলেন।

আব্দুল ফকির বললেন, ‘তারা কি এখনো তোমার লগে দেখা দেয় ? নাকি আনাগোনা কিছু কমছে ?’

নুরুন্নাহার আব্দুল ফকিরের দিকে না তাকালেও তার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, ‘কারা দেখা দিবো ?’

‘তুমি জানো না কারা দেখা দিবো ?’

‘না, জানি না।’

‘এইখানে সেইখানে ঘুইরা যে বদজিনের নজর লাগাইছো সেই বদজিনে। চেষ্টা তো আমি কম করতেছি না। কিন্তু তারা তোমারে ছাইড়া যাইতেছে না। আমার কথা তো শুনবা না। এতো কইরা বলছি ঘরে থাকবা। বাড়ির বাইরে যাবা না। শইল রাখবা ঢাইকা। মাথায় কাপড় রাখবা। তা তো শোনো না। আমার কথা শুনলে এই বদজিনের আছর এতোদিন থাকতো না। আব্দুল ফইর দুনিয়ার সব মাইনষের চিকিৎসা কইরা বেড়ায়, খালি নিজের ঘরের মাইনষের চিকিৎসা করতে পারে না। কেমনে পারব ? এই ঘরে কেউ তারে দুই পয়সার দাম দেয় ? কেউ তারে মানে ? মানে না। কথায় আছে, মানলে তালগাছ, না মানলে দুর্ব্বা ঘাসও না। এতো বছর ধইরা আব্দুল ফইরের বউরে জিনে আছর কইরা রাখছে। এইটা তো একটা লজ্জা শরমেরও ব্যাপার আমার লইগা। নাকি ?’

‘লজ্জা শরম লাগলে আইজ থিকা আপনে বোরকা পইরা চলাফেরা করেন।’ শান্ত গলায় বললেন নুরুন্নাহার। ‘আর এখন বেশি কথা না বইলা ভাত খান। বেশি কথা আমার পছন্দ না। মাথায় রাগ উঠে। শইল কিড়মিড় করে।’

‘মাইয়া মাইনষের এতো রাগ থাকন ভালো না নুরুন্নাহার। এই রাগই তোমার সর্বনাশ করছে। আমার একটা কথাও কোনোদিন শোনো নাই। মানো নাই। এহন নিজের কী অবস্থা করছ দেহো। রাগ হইলো পুরুষ মানুষের বিষয়। মাইয়া মানুষ হইবো পানির লাহান ঠান্ডা আর নরম।’

নুরুন্নাহার হঠাৎ হি হি হি করে হাসতে লাগলেন। তারপর অদ্ভুত গলায় বললেন, ‘মাইয়া মাইনষের সবকিছুই খালি নরম হইব, না ? গতর নরম হইবো, মন নরম হইবো। ব্যাটা মাইনষের তাইলে খুব আরাম লাগে, না ?’

নুরুন্নাহারের কণ্ঠ শুনে আব্দুল ফকির ও পারুল সতর্ক হয়ে উঠল। এই গলা, এই ভঙ্গি তারা চেনে। আব্দুল ফকির বললেন, ‘থাক এইসব কথা। প্লেট আইনা ভাত খাইতে বসো। আর তাবারনরে সালুন দেও। ও খালি প্লেট লইয়া কখন থিকা বইসা আছে।’

নুরুন্নাহার আচমকা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তিনি তারস্বরে চিৎকার করে বললেন, ‘ক্যান ? তাবারনের লইগা এতো দরদ ক্যান ? তাবারনের শইলও খুব নরম না ? তার নরম শইলে খুব আরাম ? আমি এহন শক্ত হইয়া গেছি, না ?’

প্রবল খিদে নিয়ে খেতে বসা প্রতিটা মানুষ মুহূর্তেই সচকিত হয়ে উঠল। এ যেন ভয়ংকর কোনো বিপদের পূর্বাভাস। আব্দুল ফকির বললেন, ‘এইগুলান তুমি কী বলতেছ আবোলতাবোল ?’

নুরুন্নাহার প্রথমে কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। তবে গা হিম করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক লাফে তাবারনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর সাক্ষাৎ উন্মাদিনীর ভঙ্গিতে তার চুল টেনে ধরে দাঁড় করিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘ওই খানকি মাগি, ওই! তোর বুকের কাপুড় কই ? তুই এইহানে তোর ওলান দেখাইতে বসছস ? ওই বুড়া শয়তানটারে দেহাস ? দেখ, তোর শইল আমি কী করি। দ্যাখ।’

নুরুন্নাহারের হাতের ধোঁয়া ওঠা গরম তরকারির বাটিখানা কেউ এতক্ষণ খেয়াল করে নি। পারুল যতক্ষণে দেখল, ততক্ষণে তিনি আগুনগরম তরকারিসুদ্ধ বাটিখানা উপুড় করে দিলেন তাবারনের শরীরে। তাবারন তীব্র চিৎকারে দুহাতে বুক চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

আব্দুল ফকির লাফ দিয়ে তার জায়গা থেকে উঠে এলেন। কিন্তু মেঝেতে লুটিয়ে পড়া তাবারন তখন কাটা মুরগির মতন তড়পাচ্ছে। জুলফিকার আর পারুলের হতভম্ব ভাব তখনো কাটে নি। চোখের সামনে এইমাত্র ঘটা ঘটনাটি তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

নুরুন্নাহার যেমন ছিলেন, তেমনই দাঁড়িয়ে রইলেন।

আব্দুল ফকির অবশ্য নুরুন্নাহারকে কিছু বললেন না। তিনি পারুলকে ডেকে শান্ত গলায় বললেন, ‘তাবারনরে তোমার ঘরে নিয়া যাও মা। আর ডিম থাকলে ওর পোড়া জায়গায় কয়ডা ডিম ভাইঙা দেও। কাঁচা ডিম পোড়া জায়গায় উপকারী।’

সেই রাতে কারোই আর খাওয়া হলো না। নুরুন্নাহারের পাগলামি আবার বাড়তে লাগল। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুললেন। আব্দুল ফকির নুরুন্নাহারকে জোর করে ঘরে ঢুকিয়ে তালবন্ধ করে রাখলেন।

পরদিন তিনি যাবেন মাদারীপুর শহরে।

তার সঙ্গে যাবে জুলফিকার। ফিরতে দুদিন দেরি হবে তাদের। কিন্তু এই দুদিন পারুল একা সবকিছু সামলাবে কীভাবে ?

আব্দুল ফকির অবশ্য পারুলকে একা রেখে গেলেন না। তিনি তাবারনের বড় বোন ছবিরনকে খবর পাঠালেন। তাকে বাড়িতে রেখে মাদারীপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন।

আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা বলতে তিনি যতটুকু যা জানেন, তা হলো মধু বা ডিম ক্ষতস্থানে দিয়ে রাখা। এতে জ্বলুনিভাব কমে। মধু ক্ষতস্থানে পচন ধরার সম্ভাবনা কমায়। পারুল আর ছবিরনকে তিনি সেসব বুঝিয়েও দিয়ে এসেছেন।

কিন্তু তাবারনের এই ঘটনা তিনি আড়াল করবেন কী করে ?

নুরুন্নাহার কেন তাকে এভাবে পুড়িয়ে দিল- এই নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠবে। দশ জনে দশ কথা বলবে। এসময়ে তিনি বাড়ি থাকতে পারলে ভালো হতো। হয়তো কোনোভাবে বিষয়টা সামাল দিতে পারতেন। কিন্তু আজই তাকে মাদারীপুর শহরে যেতে হবে।

প্রবল দুশ্চিন্তা নিয়ে ট্রলারে উঠলেন আব্দুল ফকির।

কিন্তু ট্রলারে ওঠামাত্রই তার দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল। এই দুশ্চিন্তার কারণ অবশ্য তাবারন না। এই দুশ্চিন্তার কারণ নয়ন!

আব্দুল ফকিরের ট্রলার যখন ঘাট ছাড়ল, ঠিক সেই মুহূর্তে আরও একখানা ট্রলার এসে ভিড়ল হোসনাবাদ ঘাটে। সেই ট্রলার থেকে দুজন মানুষ নামল। তাদের একজন হলো নয়ন। অন্যজন মনির।

তাদের চিনতে কষ্ট হলো না আব্দুল ফকিরের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অসময়ে তারা এখানে কেন ?

বিষয়টা আব্দুল ফকিরের ভালো ঠেকলো না।

তিনি গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে হোসনাবাদ ছাড়লেন।

পারুল জানে তার বাবা আব্দুল ফকির বুদ্ধিমান মানুষ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি মোটেই বুদ্ধিমান নন। এটি মনে হবার কারণ তাবারনের বোন ছবিরন। খালি বাড়িতে পারুলকে সাহায্য করার জন্য তিনি ছবিরনকে রেখে গিয়েছেন। কিন্তু সাহায্যের বদলে ছবিরন যা করছে তার নাম হুলস্থুল। সে বাড়িতে ঢোকার পর থেকে বাড়ি ঘর মাথায় তুলে চিৎকার করে কাঁদছে। তার সাথে তার চার বছরের ছেলে, আর সাত বছরের মেয়ে। এদের দু’জনের খানিক পরপর খিদে পায়। খিদে পেলে তারা মুখ ফুটে খাবারের কথা কিছু বলে না। যা করে তা হলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার।

সকাল থেকে এই তিনের চিৎকার চেঁচামেচিতে পারুলের কান ঝালাপালা। এখন আবার তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে তাবারন। মাঝখানে সে খানিক ক্ষ্যান্ত দিয়েছিল, এখন সেও সমানে চেঁচাচ্ছে। তার নাকি পোড়া ক্ষতের ব্যথা বেড়েছে।

পারুলের ভীষণ অসহায় লাগছে।

উঠানে মানুষের ভীড় লেগে গেছে। ভীড় করা মানুষের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। এরা একদল নুরুন্নাহারকে দেখতে চাইছে। আরেকদল দেখতে চাইছে তাবারনকে। পারুলের মাথা সত্যি সত্যি খারাপ হওয়ার দশা। সে অসহায় ভঙ্গিতে বসে রয়েছে ঘরের দাওয়ায়। কারো কোন প্রশ্নের উত্তর সে দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে চুপচাপ পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। কিন্তু সেটিও সম্ভব না। এই অবস্থায় সে পুকুর পারে গিয়ে বসে থাকলে নানান কথা উঠবে।

তাবারনের গলায়- বুকে ডিমের সাদা অংশ মেখে দিয়েছে সে। এই জিনিস তাবারনকে খানিকটা আরাম দিলেও কিছুক্ষণ পরপরই সে চিৎকার করে উঠছে। আব্দুল ফকির বলেছিলেন তাবারনের পোড়া জায়গায় মধুও মাখাতে। কিন্তু ঘরে মধু নেই। রতনকে পাঠানো হয়েছে মধুর খোঁজে। অবশ্য এই অসময়ে সে মধু কোত্থেকে আনবে, পারুল তা জানে না।

গতরাতের ঘটনার কথা ভাবলে এখনও ভয় হচ্ছে পারুলের। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, সত্যি সত্যিই তার মা নুরুন্নাহার বেগম এই কাজ করেছেন! এর আগে কোনোদিন তাকে এতোটা ভয়ংকর হতে দেখেনি সে!

তাবারনের জন্যও ভীষণ খারাপ লাগছে। মেয়েটা এমনিতেই দুঃখী। বাবা-মা কেউ নেই। স্বামী-সংসার নেই। পারুলের জন্মেরও আগে থেকে এ বাড়িতে থাকে সে। এখান থেকেই বার দুয়েক বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু সেই সংসার টেকে নি। এখন থাকার মধ্যে ওই এক বড় বোন। কিন্তু সেও যে তার খুব একটা খোঁজখবর নেয়, তা নয়। বাঁজা মেয়েমানুষ বলে তাবারনকে নিয়ে নানান সংস্কার আছে। তো ছবিরন চায় না, ছেলেমেয়ে নিয়ে তার ভরভরন্ত সুখের সংসারে বন্ধ্যা তাবারনের ছায়া পড়ুক। অথ এখন এখানে এসে বোনের জন্য মায়াকান্না কেঁদে পাড়া মাথায় তুলছে। যেন এই বোন তার জীবনের চেয়েও প্রিয়!

খিদেয় পারুলের গা গোলাচ্ছে। কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এই বৃষ্টিতেও উঠানে মানুষের ভিড় কমছে না। বরং বাড়ছে।

পারুল অবশ্য কাউকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না। নুরুন্নাহারও মাঝেমধ্যেই চিৎকার করে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে চলেছে। উঠানে জড় হওয়া মানুষগুলো দু:খী দু:খী মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।। যেন তাবারন, নুরুন্নাহার আর পারুলদের দু:খে তারা কাতর। কিন্তু পারুল স্পষ্ট টের পাচ্ছে, মানুষগুলো এই পরিস্থিতি তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। নুরুন্নাহারের অশ্লিল গালাগালেও তারা নিষিদ্ধ আনন্দ পাচ্ছে। এসব কিছুই অবশ্য অস্বাভাবিক বা ভয়ের কিছু নয়। আসল যা ভয়ের, তা হলো এরা এখান থেকে গিয়ে নানান রসালো গল্প তৈরি করবে। সেসকল গল্প ক্রমশই আরো ডালপালা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে চারধারে। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই এই ঘটনা নিয়ে নানান জায়গায় আদি রসাত্মক আড্ডাও বসে গিয়েছে।

হোসনাবাদের বাজারের চায়ের দোকানে, মাছের বাজারে এই গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলার জমায়েত ইতিমধ্যেই বসে যাওয়ার কথা।

পারুলের ধারণা যে মিথ্যে নয় তা প্রমাণ হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। রতন বাড়ি ফিরেছে। তবে সে একা ফেরে নি। তার সঙ্গে গাঁয়ের কজন ছেলেছোকরা, বয়ষ্ক লোকও এসেছেন। এদের পারুল চেনে। তবে তাদের সঙ্গে অচেনা দুজন তরুণও রয়েছে। পারুল তাদের একজনকে দেখে থমকে গেল।

মানুষটির চেহারা, হাঁটা, ভঙ্গি দেখে সে একপলকেই বুঝে গেল, এই ছেলে এ গাঁয়ের কেউ নয়। এ নিশ্চয়ই শহর থেকে এসেছে। সে একদৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল।

পুরুষমানুষ এত সুন্দর হবে কেন ?

এই বেশুমার বিপদের দিনেও পারুলের হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

হারু মুনসী মসজিদে নামাজ পড়ান। বয়স্ক মানুষ। তিনি এগিয়ে এসে পারুলকে বললেন, ‘ও পারুল ? তাবারনের অবস্থা এখন কী ?'

'ভালো'।

'কিন্তু ফইরসাবের লগে ট্রলার ঘাটে দেখা হইল। সে তো আমারে কিছু বললো না! তয় এইসব কথা কি আর অগোচর রাহন যায়নি? এইসব কথা বাতাসের আগে ছড়ায়। ঘটনা লইয়া তো হাট-বাজারে মানুষের মজমা বইসা গেছে। কত আজাইরা বাজাইরা কথা যে সেইখানে ছড়াইতেছে!’

পারুল কোনো কথা বলল না। সে তাকিয়ে আছে হারু মুনসীর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শহুরে যুবকটির দিকে। হারু মুনসী বললেন, ‘এখন ব্যবস্থা কী ? আগুনে পোড়া রুগি। সঙ্গে সঙ্গে কোনো ব্যবস্থা না নিলে বিপদ। আর তোর মায়ের কী অবস্থা ? পাগলামি কি আগেরতন বাড়ছে ?’

‘আব্বায় বলছিলো ডিমের সাদা অংশ মাখাইতে। আমি মাখাইছি।’ এবার কথা বলল পারুল। ‘আর মধুও দিতে বলছিলো। কিন্তু ঘরে মধু নাই। রতনরে পাঠাইছিলাম আনতে, কিন্তু ও মনে হয় মধু পায় নাই।’

সামান্য থেমে পেছনে দাঁড়ানো যুবকের দিকে ইঙ্গিত করে পারুল বলল, ‘এরা কারা কাকু ? ওনাগো তো আগে কখনো দেখি নাই ?’

হারু মুনসী খানিক সরে গিয়ে বললেন, ‘এনারা সম্মানী মানুষ। এই যে ইনি, ইনি হইছেন ফতেহপুরের চেয়ারম্যান খবির খাঁর পোলা মনির খাঁ। আর তার সঙ্গের জনের নাম নয়ন। খবির খাঁর ভাইগ্না, ঢাকা শহর থাকেন। বড় ডাক্তার।’

🇧🇩🇧🇩🇧🇩

‘ওনারা এইখানে ক্যান আসছেন ?’

‘তা তো জানি না। তারা বাজারে আইসা ফইরসাবের কথা জিগাইতেছিলেন। তোদের বাড়ির খোঁজখবর করতেছিলেন। তখন কথায় কথায় গত রাইতের ঘটনাও উঠল। আর তহনই জানলাম, উনি ডাক্তারও। এইজন্যই তাড়াহুড়া কইরা নিয়া আসলাম। দ্যাখ, কিছু ব্যবস্থা যদি উনি করতে পারেন।’

Post a Comment

0 Comments