Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মানবজনম পর্ব-৫

মানবজনম — পর্ব 5 | মানবজনম
সাদাত হোসাইন

মানবজনম

📖 উপন্যাস ✍️ EarnBD
📄 পর্ব 5 / 6

কী কারণে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ ইচ্ছেটাও তিনি পূরণ করলেন না ?

নয়ন এই প্রশ্নেরই উত্তর জানতে চায়।

কিন্তু সে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দেবে না।

নাকি তার সামনের এই মলিন মলাটের ধূসর খাতাগুলোই সেই উত্তর নিয়ে অপেক্ষায় আছে তার জন্য ?

হেমার ধারণা সে এক হাজার হাঁচি দিয়েছে। এখন আর হাঁচি দেওয়ার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। সেদিন বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল। এই মুহূর্তে বাসায় সে একা। কী এক সেমিনারে রেণু গিয়েছেন চট্টগ্রামে। ফিরতে দিন চারেক লাগবে। বাবার এখনো কোনো খবর নেই। কাজের মেয়েটিও আসে নি।

শরীর খারাপ হলে হেমা কাউকে কিছু বলে না। কিন্তু আজ মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর হঠাৎ খুব অসহায় লাগতে লাগল তার। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। বহুকষ্টে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় পানি ঢালল সে। তারপর আবার শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকার পর মনে হলো খানিকটা ভালো লাগছে। কিন্তু এই সময়ে আচমকা মন খারাপ হয়ে গেল তার। মরে যেতে চাওয়ার মতো খারাপ।

সে মোটেও অভিমানী টাইপ মেয়ে না। কিন্তু গত কিছুদিন ধরেই মাঝেমধ্যে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এই যে ভয়াবহ জ্বর নিয়ে সে একা একটা বাসায় আটকে আছে, এটা কি তার মা-বাবা টের পাচ্ছেন ?

হেমার হঠাৎ মনে হলো, তার এই দীর্ঘ জীবনে মা কি কখনো তার সঙ্গে অকারণ আহ্লাদে কথা বলেছেন ?

সে মনে করতে পারল না। আচ্ছা, এমনও কি হয় কখনো ? নাকি বাবা তাকে সব সময় আগলে রাখতেন বলে মা আর তেমন কাছে আসতেন না। নাকি সে নিজেই কখনো মাকে ওই জায়গাটা দেয় নি ? বরং বাবাই হয়ে উঠেছিলেন তার মা এবং বাবা উভয়ই। কে জানে! কিন্তু আজ এই একা একা ঘরে এমন ভয়ানক জ্বরে যখন সে প্রায় মারা যাচ্ছে, তখন কি তার মা সেটা টের পাচ্ছে ? মায়েরা নাকি সন্তানের সব বিপদ আগেভাগে টের পায় ? কিন্তু মা তো তাকে কখনো চায়ই নি। তার কাছে কখনোই প্রত্যাশিত কেউ ছিল না সে।

বাবার কাছেও কি ছিল ? নাকি কেবল একটা ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর উদ্দেশ্যেই তাকে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল ?

হেমার গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে উঠে আসতে চাইছে। কিন্তু সে কাঁদতে চায় না। এই ঘরে একা মরে পড়ে থাকলেও না। শীতে তার গা কাঁপছে। কিন্তু পায়ের কাছে পড়ে থাকা কাঁথাটা টেনে গায়ে দিল না সে। হেমা হঠাৎ আবিষ্কার করল, অসুস্থতার চেয়েও একটা তীব্র অভিমানবোধ কাজ করছে তার, যেন সে আর সুস্থ হতে চায় না কখনোই। বরং মরেই যাবে। কারও কাছেই তো আর কোনো গুরুত্ব নেই তার।

নয়নের কথা মনে পড়তেই এই অভিমানটা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। এই এতগুলো দিন, অথচ নয়নের কি এক মুহূর্তের জন্যও তাকে মনে পড়ে নি ?

আচ্ছা, ভালোবাসা পেতে হলে কী করতে হয় মানুষকে ? কীভাবে একজন মানুষ অন্যজনের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে ?

কী করলে কেউ কাউকে বলে, তোমাকে না দেখে আমি থাকতে পারি না ? আমার কষ্ট হয়, গলা শুকিয়ে আসে ?

কখন ?

হেমা জানে না।

নয়ন কখনোই তাকে এমন কিছু বলে নি।

অসুস্থ হলে মানুষ শারীরিকভাবে যেমন দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি মানসিকভাবেও। এসময় সে নানান এলেবেলে ভাবনা ভাবে। হেমাও কি সেকারণেই এসব ভাবছে ? এর আগে তো কখনো এমন হয় নি তার! নাকি তার অবচেতন মনজুড়ে এই তেষ্টাগুলো সব সময়ই ছিল ? কিন্তু বাইরে শক্ত, কঠিন, নিরাবেগ একজন মানুষ হিসেবেই নিজেকে দেখতে চাইত। যার কারও কাছে কিছু চাওয়ার নেই। কোনো অভিযোগ, অভিমান নেই। সকল কিছুতেই সে নির্বিকার, স্বাভাবিক।

আচ্ছা, মাকে কি একবার ফোন করবে ? কিন্তু ফোন করার পর মা যদি বলেন, ‘জ্বর এসেছে, দুটো প্যারাসিটামল খেয়ে ঘুমিয়ে থাকো। এটা তো এত রাতে ফোন করার মতো জরুরি কিছু না।’

মা কি এমন কিছু বলবেন ? নাকি বলবেন, ‘আমাকে ফোন করেছ কেন ? ডাক্তারকে ফোন করো। আর তোমার বাবা কই ? তাকে কল করো।’

ছিঃ! এসব কী ভাবছে সে ? মা নিশ্চয়ই এমন কিছু বলবেন না। কিন্তু কী বলবেন, হেমা তাও জানে না। বাবাকে ফোন করেও লাভ নেই। তার ফোন বন্ধ।

আচ্ছা সে কি নয়নকে একটা ফোন করে দেখবে ?

কিন্তু কী লাভ ? সেও তো সেই ফতেহপুর থেকে ফেরে নি। সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই, নেটওয়ার্ক নেই। এ যেন এক আদিম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। হেমা তারপরও ফোনটা হাতে নিল। নয়নের নামের সঙ্গে বহু আগের একটা ছবি ভেসে উঠেছে। দীর্ঘক্ষণ সেই ছবির দিকে তাকিয়ে রইল সে। তার বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে আসছে। এই তিনটে মাত্র মানুষ নিয়েই তার পৃথিবী। অথচ তাদের কারও পৃথিবীতেই যেন তার কোনো জায়গা নেই। সে যেন অনাহুত, অচ্ছ্যুৎ এক আগন্তুক।

হেমা যে ইচ্ছে করে নয়নকে ফোন করলো, তা নয়। কিন্তু তার অসতর্কতাতেই আঙুলের চাপ লেগে ফোনটা চলে গেল। অবাক ব্যাপার হলো, প্রথমবার রিং বাজতেই ফোন ধরল নয়ন। হেমা এতটাই হতভম্ব হয়ে গেল যে হাত থেকে ফোনটা কানে অবধি নিতেও ভুলে গেল।

নয়ন ‘হ্যালো হ্যালো’ করে যাচ্ছে। কিন্তু হেমা বুঝতে পারছে না সে কী করবে। নয়নের গলা শুনে কি তার ভালো লাগছে ?

হেমা হঠাৎ আবিষ্কার করল, তার বরং খানিক আগের সেই অভিমানটা ফিরে আসছে। কষ্ট হচ্ছে।

নয়ন ঢাকায়! অথচ একবারও তাকে ফোন করার প্রয়োজন বোধ করে নি ? হেমার মনে হলো সে ফোনটা কেটে দিয়ে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সেটা ছেলেমানুষি হয়ে যাবে ভেবে সে কথা বলল, ‘হ্যালো।’

নয়ন বলল, ‘কখন থেকে হ্যালো হ্যালো বলছি, তুমি কথাই বলছো না!’

হেমা সত্যিটাই বলল, ‘আসলে চাপ লেগে ফোনটা চলে গেছে। প্রথমে বুঝতে পারি নি।’

‘কেমন আছো তুমি ?’

‘হ্যাঁ ভালো। তুমি ?’

‘ভালোই।’

এ ক’দিনেই তারা যেন কেমন দূরের মানুষ হয়ে গেছে। হেমা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল, ‘যখন কেউ ভালোর সঙ্গে ই যোগ করে ভালো-ই বলে, তখন বুঝতে হবে সে ভালো নেই।’

নয়ন মৃদু হাসল, ‘তুমি তো দিন দিন তাত্ত্বিক হয়ে যাচ্ছো।’

‘ভুল বললাম ?’

‘উঁহু। তা ছাড়া তুমি তো জানোই আমি ভালো নেই।’

‘কীভাবে জানব ?’

‘আমাকে দেখলেই তো তুমি সব বুঝে যাও।’

‘তোমাকে দেখার সুযোগ কি আর আমার আছে ?’

নয়ন কথা বলল না। তবে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হেমার শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে। তবে সে তা নয়নকে বুঝতে দিতে চায় না। আচ্ছা, নয়ন কি তার গলা শুনে একবারের জন্যও বুঝতে পারছে না যে তার শরীর খারাপ ?

‘কবে ফিরলে ?’

‘তিন... চার...। উমমম... পাঁচ দিনও হতে পারে। এক্স্যাক্ট মনে নেই।’

হেমার গলার ভেতরের সেই দলা পাকানো জিনিসটা আবার ফিরে আসছে। নয়ন এত দিন হয়ে গেল ঢাকায় এসেছে, অথচ একবারের জন্যও তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করে নি ?

‘কী করবে এখন ?’

‘জানি না।’

হেমা আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না। নয়নও না। দুজনই ফোন কানে চেপে ধরে চুপচাপ বসে রইল। দীর্ঘ সময়। তারপর কথা বলল নয়ন, ‘অনেক রাত হয়েছে। এখন তাহলে ঘুমাও, হ্যাঁ ?’

হেমা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। তবে খানিক চুপ করে থেকে বলল, ‘আচ্ছা।’

নয়ন ফোন কেটে দিল। হেমা তারপরও ফোন কানে চেপে ধরে বসে রইল। সেই কেটে দেওয়া ফোনের ভেতর কী এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ্য! হেমার হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হলো। তাহলে হয়তো বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ওঠা ওই জমাট কষ্টটুকু বেরিয়ে আসতে পারত।

কিন্তু সে কাঁদল না।

কান্নার জন্যও নিজের একটা মানুষ দরকার হয় মানুষের। তাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে কাঁদা যায়। কিন্তু এই জগতে তেমন কি আর কেউ আছে হেমার ?

হেমা হঠাৎ হড়বড় করে বমি করে ফেলল। প্রথম দমক শেষ হওয়ার আগেই আবারও বিছানা ভাসাল সে। তারপর আবার। বমিতে ভেসে গেল তার শরীর, বিছানা, মেঝে। বার কয়েক সে ওই নোংরা গা ঘিনঘিনে তরলের ভেতর থেকে সরে আসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। বরং সেখানেই লুটিয়ে পড়ল।

জ্ঞান হারাল সে।

হেমার জ্ঞান ফিরল পরদিন ভোরে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, সে শুয়ে আছে পরিষ্কার শুভ্র এক বিছানায়। তার শরীরজুড়ে মায়াময় সৌরভ। সেই গা ঘিনঘিনে অনুভূতিটা আর নেই। কিন্তু কিছুতেই চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না তার। যদি এই অপার্থিব অনুভূতিটা কেটে যায়!

তবে সে চোখ মেলে তাকাল।

রেণু তাকিয়ে আছেন তার দিকে। হেমা বলল, ‘মা!’

রেণু হঠাৎ দুহাতে হেমার গাল চেপে ধরলেন। তারপর যেন সঙ্গে সঙ্গেই আবার সচকিত হয়ে উঠলেন। হাত সরিয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমার ফোনে টাকা ছিল না ?’

হেমা জবাব দিল না। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। রেণু কঠিন গলায় বললেন, ‘এটা বদলে একটা পোস্টপেইড নাম্বার নিয়ে নাও। আর আমি তো বুয়াকে রাতেও বাসায় থাকতে বলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে যে আর আসে নি তুমি সেটা আমাকে জানাবে না ?’

হেমা জবাব দিল না। তার মাথাটা রেণুর কোলে। রেণু আস্তে করে মাথাটা নামিয়ে রাখলেন পাশে। তার কাছে বাসায় ঢোকার চাবি ছিল। কিন্তু তিনি এমন দুম করে চলে আসবেন এটা হেমা ভাবে নি। তার তো আরও দুদিন থাকার কথা ছিল!

রেণু বললেন, ‘এই জ্বরে কিছু হয় না। এখন ওঠো। হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নাও।’

বলেই চলে গেলেন তিনি। হেমার আবারও মন খারাপ হয়ে গেল। সে জানে, তার শরীর কতটা খারাপ। মায়েরও না বোঝার কথা না। অন্তত এই সময়ে একটু ভালো করে কথা বলতে পারতেন তিনি। হেমার খুব ইচ্ছে করছিল, মায়ের কোলে মাথা রেখে আরও খানিক শুয়ে থাকতে। তাকে বলতে যে, মা, তুমি কি একটু আমার মাথায় বিলি কেটে দেবে মা ? আমার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দেবে ?

কিন্তু সেসবের কিছুই বলল না সে। বরং খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উঠে বসার চেষ্টা করল। মায়ের ঘরে থাকতে চায় না সে। কিন্তু মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল। অবশ্য তৃতীয়বারের চেষ্টায় উঠে দাঁড়াল। তারপর বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখে ধুয়ে এল। কিন্তু নিজের ঘরে এসে দেখল খাট থেকে সবকিছু নামিয়ে ফেলা হয়েছে। নোংরা জিনিসগুলো পরিষ্কার করতে দিয়েছেন মা।

হেমার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

বাবা বহুদিন থেকেই আলাদা ঘরে ঘুমায়। সে ধীর পায়ে হেঁটে বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাখানা ভেজানো। ধাক্কা দিয়ে খুলতে গিয়েই আচমকা থমকে দাঁড়াল সে। ভেতর থেকে কারও মিহি স্বরে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।

কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর আলতো হাতে দরজাটা খুলল। এখন সকাল দশটা। চারদিকে চড়চড়িয়ে রোদ উঠে গেছে। কিন্তু ঘরের মেঝেতে একখানা জায়নামাজ বিছানো।

সেই জায়নামাজে রেণু বসা। তিনি নামাজ শেষে আর জায়নামাজ থেকে ওঠেননি। বরং আল্লাহর কাছে দীর্ঘ মোনাজাতে বসে রয়েছেন।

তার দুই হাত মোনাজাতের ভঙ্গিতে ধরা। তিনি কাঁদছেন।

তার সেই কান্নার জলে, প্রার্থনায় হেমা।

রেণুর শরীর কাঁপছে। কন্যার ওইটুকু অসুস্থতায়ই চোখের জলে পরম করুণাময়ের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে তার আরোগ্য প্রার্থনা করছেন!

হেমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিক মায়ের কান্না শুনল।

তারপর হঠাৎই আবিষ্কার করল তার চোখ বেয়েও পানি নামছে।

কিন্তু সে এই পানি মাকে দেখাতে চায় না।

মাও হয়তো দেখাতে চান না কাউকে।

লুকিয়েই রাখতে চান।

জগতে যা না দেখেও দেখা হয়ে যায়, যা না শুনেও শোনা হয়ে যায়, যা না ধরেও স্পর্শ করা যায়, তার চেয়ে গভীর, তীব্র, শাশ্বত আর কী আছে!

মানুষের জীবনে কিছু সময় আসে যখন সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। নয়নেরও এখন সেই সময়টা যাচ্ছে। সে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারে না। চোখ বুজলেই এলোমেলো বীভৎস সব স্বপ্ন দেখে। তারপর রাত কাটে নির্ঘুম। এই সময়ে কত কত ভাবনা যে সে ভাবে!

আছমার মৃত মুখটাও অনবরত ভাসতে থাকে চোখের সামনে। তার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ঠা ঠা রোদের দুপুরে সে ক্লাস থেকে ফিরেছে। তেষ্টায় গলা চৌচির। এসময় ঘরে ঢোকামাত্রই আছমা কনকনে ঠান্ডা শরবতের গ্লাস নিয়ে হাজির হতো। কিন্তু সেদিন বার কয়েক ডেকেও তার সাড়া পেল না নয়ন। খানিক বাদে কোহিনুর এলেন।

নয়ন বলল,‘আছমা কই মা ?’

‘ওর মা খুব অসুস্থ। বাড়ি থেকে ওর বাবা এসেছিল ওকে নিয়ে যেতে। কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে।’

‘ও।’

ব্যস এইটুকুই। কিন্তু দিন দুই যেতে না যেতেই নয়নের মনে হলো, বাড়িটা খুব বেশি ফাঁকা। আছমা এ বাড়িতে এসেছে কম দিন হয় নি। চার-পাঁচ বছর তো হবেই।

জন্মের পর থেকেই একা একা বেড়ে ওঠা নয়নের হঠাৎই যেন মনে হলো, আছমা এ বাড়িরই কেউ। তার আপন কেউ। বোনের মতো। যার ওপর নানান উদ্ভট এক্সপেরিমেন্ট চালানো যায়। যখন তখন ফুটফরমায়েশ খাটানো যায়। রাগ-বকাঝকা করা যায়। এমনকি গল্প বলার একটা মানুষও হয়ে উঠেছিল আছমা। বাড়িতে ঢুকে সবার আগে সে চেঁচিয়ে আছমাকেই ডাকত।

আছমা নয়নের ব্যাগ নিয়ে জায়গামতো গুছিয়ে রাখত। নেইলকাটার থেকে জুতো, মানিব্যাগ থেকে ঘড়ি, খাতা, কলম এসবই ছিল আছমার নখদর্পণে। অগোচরেই নয়নের বিশাল এক নির্ভরতার নামও হয়ে উঠেছিল সে।

কদিন যেতে না-যেতেই নয়ন অতিষ্ঠ হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আছমা আসছে না কেন, মা ?’

কোহিনুর জবাব দিতে পারলেন না। আসলে তার কাছেও আছমার কোনো খবর নেই। নয়ন তখন রোজ বাড়ি ফিরেই মাসকয়েক আগে চিলেকোঠায় পাওয়া কোহিনুরের আত্মকথা লেখা সেই খাতাগুলো নিয়ে বসত। আছমা না থাকায় তার সময়ও ছিল অফুরন্ত। ফলে ওই সময়টাতে নয়ন পুরোপুরি ডুবে গেল খাতাগুলোতে। দিনের পর দিন কত কষ্ট করে যে একেকটা লাইন পড়ে তার অর্থোদ্ধার করতে হয়েছে, তা কেবল নয়নই জানে।

আছমা ফিরল প্রায় তিন মাস পর। তাকে দেখে সকলেই রীতিমতো হতভম্ব। বাড়ি যাওয়ার সময় যে রক্তমাংসের মানুষটা গিয়েছিল, সেই মানুষটাই যেন ফিরে এল আস্ত এক কঙ্কাল হয়ে। নয়ন তাকে দেখে স্বভাবসুলভ মজার ছলেই বলেছিল, ‘ভালোই হলো, এবার আর আমার কঙ্কাল কিনতে হবে না। তোকে দিয়েই কঙ্কাল সংক্রান্ত এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে নেওয়া যাবে।’

আছমা অবশ্য জবাব দিল না।

শুধু এই কথায় না, খুব প্রয়োজন না হলে সে মোটামুটি কোনো কথাতেই জবাব দেয় না। বিষয়টা নয়নকে খুব অবাক করল। সে নানাভাবে চেষ্টা করল তাকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু পারল না। আছমার মুখ থেকে একটি কথাও বের হলো না।

এমনকি গ্রামে যে তাকে সাপে কেটেছিল সে কথাও জানা গিয়েছিল আছমার বাবার কাছে। সে তাকে দিয়ে যেতে এসে বলেছিল নয়নের বাবাকে। নয়ন তার কাছ থেকে শুনেছিল দিন দুই বাদে। কিন্তু তখন থেকেই মনটা যেন কেমন খচখচ করছিল। তারপর হঠাৎই একদিন আছমার কাছে শোনা আব্দুল ফকিরের সাপের বিষ নামানোর নানান গালগল্পের কথা মনে পড়ে গেল তার। সে জিজ্ঞেসও করল বিষয়টা, ‘কিরে, তোর বিষ কে নামাল ? ওই যে মরা লাশ যে জিন্দা করতে পারে, সেই আব্দুল ফকির ?’

আছমা তাও কথা বলল না। তবে তীব্র আতঙ্কে যেন নীল হয়ে গেল সে। নয়ন সময় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলো না। বরং আছমার আচরণ অসংলগ্ন মনে হতে লাগল। এর পরের কয়েকটা দিন আছমাকে খুব চোখে চোখে রাখল নয়ন। এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল, সে প্রায়ই একা একা কাঁদে। অথচ জিজ্ঞেস করলেই এড়িয়ে যায়।

কী হয়েছে তার ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই নয়নের ডাক্তারি চোখ যেন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলল। কিন্তু সেটা বিশ্বাস করার মতো সাহস তার ছিল না। ততদিনে মেডিকেলে ফাইনাল পর্বও শুরু হয়ে গেছে। ফলে জগৎসংসার থেকে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে। আছমার ভাবনাও যেন বিস্মৃত হলো। কিন্তু শেষ দুটো পরীক্ষার আগে একরাতে কারও বমির শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।

রান্নাঘরের পাশেই আছমার ঘর।

তার বাথরুমটাও বেশ খানিকটা দূরে। ফলে রান্নাঘরের বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বমি করার চেষ্টা করছিল সে। দৃশ্যটা এমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু নয়নের মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল। পরের পরীক্ষাটা দিয়েই সে আছমাকে নিয়ে আবার বসল। আছমা হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, ‘আমারে বাঁচান ভাইজান। আমারে বাঁচান।’

নয়ন তার মাথায় হাত রেখে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী হয়েছে আমাকে খুলে বল ?’

আছমা তার সাপে কাটা থেকে শুরু করে আব্দুল ফকিরের বিষ নামানোসহ পুরো ঘটনাই খুলে বলল। ঘটনা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল নয়ন। এত অবাক বোধহয় এর আগে কখনো হয় নি সে। গ্রামগঞ্জের ওঝা-ফকিরদের এমন নানা ঘটনার কথা বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় পড়েছে সে। কিন্তু সেসব যে তার পরিচিত কারও জীবনে ঘটতে পারে এটা কখনো ভাবতেও পারে নি নয়ন।

আছমা যেন পত্রিকা থেকে বের হয়ে আসা সেরকম এক চরিত্র! নয়ন ভেবেছিল, তার শেষ পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই আছমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে সে। কিন্তু আছমা তাকে সেই সুযোগটা দিল না।

আছমার মৃত সেই মুখখানা দেখে আব্দুল ফকিরকে খুন করার কথা অবধি ভেবেছিল নয়ন। কিন্তু সেটি সম্ভব নয়। তার পক্ষে আসলে সম্ভব নয় কিছুই। সে বহুকাল ফতেহপুর যায় না। সেখানকার কিছু চেনে না, জানে না। এমনকি আব্দুল ফকিরকেও না।

নানাজান তৈয়ব উদ্দিন খাঁকে কি সে ঘটনা খুলে বলবে ?

নয়ন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। আবার নিজেকে নিস্তারও দিতে পারছিল না। যেন ভয়ংকর এক আগুনের পিণ্ডে অবিরাম পুড়ে যাচ্ছিল সে। পরীক্ষা শেষ হতে খানিকটা অবসর। সেই অবসরে মায়ের খাতাগুলো নিয়ে আবার বসল সে। যেন নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চাইল সবকিছু থেকে। কিন্তু মায়ের রহস্যময় সেই শৈশবের গল্পও আর বিরাম দিল না। বরং এক গভীর রাতে আছমার গল্পখানা আরও ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিল নয়নের সামনে। সেই দুঃস্বপ্ন থেকে আর কিছুতেই বের হতে পারল না সে। প্রচণ্ড দিশেহারা আর অসহায় লাগতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। একাকী এক অন্ধকার ঘরে নিজের সঙ্গে অন্তহীন এক যুদ্ধে শামিল হলো সে।

তারপর সিদ্ধান্ত নিল, ওই ভয়ংকর মানুষটাকে সে নিজের চোখে দেখতে চায়। দেখতে চায় মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আব্দুল ফকির নামের মানুষটার সত্যিকারের মুখ ও মানস।

এমবিবিএস শেষ করে সবাই যখন উচ্চতর ডিগ্রির জন্য আঁটঘাট বেঁধে প্রস্তুতি নেয়, নয়ন তখন সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলে গেল ফতেহপুর নামের এক অজপাড়াগাঁয়ে। তার ফোন, ফেসবুক বন্ধ। পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়ন ফতেহপুরে দীর্ঘ এক সময় কাটাল। কিন্তু এই সময়টায় সেখানে সে কী করেছে, কেন করেছে এই নিয়ে তার নিজের কাছেই যেন স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে একটা বিষয়ে নয়ন নিশ্চিত, যে ভয়ানক মানসিক দশার ভেতর দিয়ে সে এখন যাচ্ছে, তাতে এই সময়টা ঢাকার চেয়ে ফতেহপুর থাকাটা তার জন্য অনেক বেশি ভালো ছিল।

আব্দুল ফকির নামের মানুষটার প্রতি অবিশ্বাস্য ক্রোধ আর ঘৃণা নিয়েই সে ফতেহপুর গিয়েছিল। কিন্তু নয়ন জানত না, এই ঘৃণা বা ক্রোধে সে আব্দুল ফকিরকে কতটুকু আঘাত কিংবা আহত করতে পারবে। নাকি সে কেবল তাকে দেখতেই চেয়েছিল ?

দ্বিধান্বিত নয়ন জানে না।

তবে সে ফিরে এসেছে দ্বিগুণ ঘৃণা নিয়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এই ঘৃণার সঙ্গে তার ওপর একটা ভয়মিশ্রিত সমীহও আছে।

কিন্তু এখন কী করবে সে ?

পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিবে ? নাকি সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে নিজেকে ? আজ অনেক ভেবে অবশেষে এইসব সিদ্ধান্তহীনতা থেকে নিজেকে মুক্তি দিল নয়ন। পড়াশোনাসংক্রান্ত বিষয়টা নিয়ে আপাতত আর ভাবতে চায় না সে। মানসিকভাবে সেই অবস্থাও নেই। মা অবশ্য তার এই সিদ্ধান্তে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না।

বাবা ফজরের নামাজ শেষে তার ঘরে এলেন। নয়ন তখন মশারির ভেতর বসে আছে। ফখরুল আলম কিছুটা অবাক হলেও কিছু বললেন না। তিনি খুব যত্ন করে মশারি সরিয়ে খাটে বসলেন। তারপর মোলায়েম গলায় বললেন, ‘এখনো জেগে আছিস ?’

‘হু।’

‘শরীর খারাপ লাগছে ?’

‘না।’

‘তাহলে ?’

‘কিছু না।’

ফখরুল আলম ছেলের পিঠে আলতো করে হাত রাখলেন, ‘কী হয়েছে ?’

নয়ন হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘মেয়েমানুষের মতো এত প্রশ্ন করছ কেন ? এত প্রশ্ন করছ কেন ? যাও। এখনই আমার ঘর থেকে বের হও।’

ফখরুল আলম খুবই অবাক হলেন। কিন্তু জায়গা থেকে উঠলেন না। নয়ন এবার ছাদের দিকে মুখ তুলে বসে রইল। তার চোখ টকটকে লাল। মাথার চুল উষ্কুখুষ্কি। ফখরুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘চা বানিয়ে আনি ? একটু চা খেলে ভালো লাগবে।’

নয়ন কথা বলল না। ফখরুল আলম ছেলের খাট থেকে নেমে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে রইলেন। নয়ন এর আগে কখনোই তার সঙ্গে এমন কিছু করে নি।

কী হয়েছে নয়নের ?

ফখরুল আলম রান্নাঘরে গিয়ে ছেলের জন্য চা বানালেন। বাজারে নতুন এক ধরনের নোনতা বিস্কুট এসেছে। চায়ের সঙ্গে এই বিস্কুট তার পছন্দ। তিনি পিরিচে সাজিয়ে কখানা বিস্কুটও নিলেন। তারপর নয়নের ঘরে এসে জানালার পর্দাগুলো সরালেন। বাইরের আলোয় ঘরখানা মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে উঠল। ফখরুল আলম নয়নের পাশে এসে বসে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন, ‘একটু চা খেয়ে নে। আর এই বিস্কুটটা দেখ, বেশ ভালো।’

নয়ন কোনো কথা বলল না। ফখরুল আলম কাপ-পিরিচ নয়নের কাছে নিয়ে এসে বললেন, ‘একটা চুমুক দিয়ে দেখ...।’

তিনি তার কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই চায়ের কাপ আর বিস্কুটসমেত পিরিচখানা নয়ন ছুড়ে মারল মেঝেতে। ভোরের নিস্তব্ধতায় কাচ ভাঙার শব্দটা বড় বেশি কানে বাজল। নয়ন তারচেয়েও জোরে চিৎকার করে বলল, ‘তোমাকে বলেছি না আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ? এক্ষুণি যাও। এক্ষুণি। বের হও।’

ফখরুল আলম এবার যেন ভয় পেয়ে গেলেন। তবে সেই ভয়ের ভেতর একটা বিস্ময়ও।

হঠাৎ কী হলো ছেলেটার ?

হেমার সঙ্গে কোনো ঝামেলা হলো না তো ? 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

ফখরুল আলম মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপ-পিরিচের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে জড়ো করলেন। তারপর ঘরের মেঝেটা যত্ন করে ঝাড়ু দিলেন।

নয়ন ঘর থেকে বের হলো দুপুরেরও পর। ফখরুল আলম আজ অফিসে যান নি। তার রান্নার হাত ভালো। আজ তিনি নিজে রান্না করেছেন। নয়ন সকাল থেকে কিছু খায় নি বলে তিনিও খান নি। তার অম্বলের সমস্যা আছে। বার কয়েক পেট গুলিয়ে টক পানি উঠে এসেছিল গলা অবধি। তারপরও তিনি খেতে বসেন নি। একবার ভেবেছিলেন কোহিনুরের ঘরে গিয়ে তাকে ডেকে আনবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলায় নি।

ফখরুল আলম এমনই।

তিনি যেন তার চারপাশের সবাইকে ভয় পান। নয়নের চোখ লাল। চোখেমুখে উদ্ভ্রান্ত ভঙ্গি। তারপরও খানিক সাহস সঞ্চয় করে ফখরুল আলম বললেন, ‘একটা কথা বলি বাবা ?’

নয়ন শান্ত এবং কঠিন গলায় বলল, ‘না।’

‘কিছু খেতে বলব না বাবা। অন্য একটা কথা ?’

‘না।’

ফখরুল আলম কাতর গলায় বললেন, ‘তোর কষ্ট হলে আমার অস্থির লাগে। আমি খেতে পারি না যে বাবা। আমাকে একটু বলবি, তোর কী হয়েছে ?’

নয়ন এবার আগের চেয়েও কঠিন গলায় বলল, ‘না।’

ফখরুল আলম ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলেন।

নয়নের চোখের ভাষা ভয়ঙ্কর।

তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হরিণ শাবকের মতো গুটিয়ে গেলেন, ‘ঠিক আছে।’

ফখরুল আলমকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন। অসহায়, নিঃস্ব এক মানুষ মনে হচ্ছে তাকে। নয়ন হঠাৎ ফখরুল আলমের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর অদ্ভুত এক কাজ করল সে। ফখরুল আলমকে চমকে দিয়ে হঠাৎ তার পায়ের কাছে বসে পড়ল। তারপর তার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ফখরুল আলম কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

নয়ন বাবার পা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদতে লাগল, ‘আমাকে মাফ করে দাও বাবা, আমাকে মাফ করে দাও। বাবা... ও বাবা। আমাকে মাফ করে দাও।’

ফখরুল আলম কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য, তার চোখ এমন ঝাপসা হয়ে আসছে কেন ? তিনি এদিক-সেদিক তাকিয়ে চোখ মোছার কিছু খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু পেলেন না। এই কান্না কেউ দেখে ফেললে সেটা ভারি লজ্জার ব্যাপার হয়ে যাবে।

কিন্তু এখন কী করবেন তিনি ?

এই মুহূর্তে তার চোখ আটকে গেল বাঁ-পাশের বারান্দার শেষ মাথায় ঘরের দরজায়। সেখানে দাঁড়িয়ে পিতা পুত্রের এই দৃশ্য দেখছেন কোহিনুর। কিন্তু তার চোখের ভাষা ফখরুল আলম পড়তে পারলেন না।

এই জীবনে পারেনও নি কখনো।

তাবারনের ঘা শুকিয়েছে। কিন্তু যথাসময়ে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তার বুকে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে। পারুল দেখেছে, তার দুই স্তনের বেশির ভাগ জায়গাই ভয়াবহভাবে পুড়ে গেছে। সেখানে তৈরী হয়েছে বীভৎস পোড়া দাগ। তারপরও কাজকর্ম শুরু করতে হয়েছে তাকে। এতে অবশ্য পারুলের আবার অবসর মিলেছে।

এই অবসরে তার সময় কাটে নয়নকে ভেবে। যদিও কোনো ভাবনায়ই বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না সে। বরং সারাক্ষণ চড়ুই পাখির মতো ছটফট করে। এই ভাবনা থেকে ওই ভাবনার, অনুভূতির ডালে লাফিয়ে বেড়ায়। তার ভালো লাগা-মন্দ লাগাও হঠাৎ হঠাৎ ওঠানামা করে।

তবে তারপরও নয়নকে ভাবতে এখনো ভালো লাগে তার।

ভাদ্র মাস শেষ হয়ে আশ্বিনেরও দিন পনেরো চলে গেছে। এখন শরৎ। বৃষ্টিবাদল তেমন নেই। তবে গ্রামের চারপাশজুড়ে প্রকৃতিতে কেমন ঝকমকে আভা।

বিশেষ করে নদীর দুধারে শুভ্র ফুলে ছেয়ে যাওয়া কাঁশবন দেখলে বুকের ভেতরটা অকারণেই তড়পায়। এমনই এক শরতের বিকেলে লতা এল। তবে প্রচণ্ড মন খারাপ তার। দুদিন ধরে আশিকের ফোন বন্ধ। পারুল বলল, ‘আশিক ভাইর কোনো বন্ধুর নাম্বারে ফোন দে।’

লতা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আমার কাছে তো আর কারও নাম্বার নাই।’

‘তার ঠিকানায় চিঠি লেখ ?’

লতা এবার কেঁদেই ফেলল, ‘আমার কাছে তো কোনো ঠিকানাই নাই।’

পারুল আঁতকে ওঠা গলায় বলল, ‘কী বলিস ?’

লতা পারুলকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বুক ভাসাল। পারুলের মনে তখন অন্য চিন্তা। সে হঠাৎ লতার চুল ধরে টেনে তার মুখ তুলে বলল, ‘ওই ছ্যামড়ি, সবকিছু ঠিকঠাক তো ?’

লতা ভেজা গলায় বলল, ‘কী ঠিকঠাক ?’

‘কত আজায়াগা, কুজায়াগায় দুইজনে গেছিস, লঞ্চের কেবিনেও তো আছিলি একলগে। কিছুই কি হয় নাই তোগো মধ্যে ?’

লতা মাথা নিচু করে ফেলে বলল, ‘এগুলান জিগাস ক্যান ?’

‘ক্যান জিগাই বুঝস না ?’

লতা এবার আর জবাব দিল না। পারুল বলল, ‘শহরের পোলা পোলা কইরা মরি। কিন্তু তাগো তো চিনি জানি না। এই কথাখান একবারও ভাবি নাই। তারা কিন্তু খুব চালাক। মৌমাছির মতন মধু খাওয়া শ্যাষ, উড়াল দিয়া চইলা যাইব। আর খুঁইজাও পাবো না। এমন কিছু হয় নাই তো ?’

লতা জোর গলায় বলল, ‘তুই আশিকরে চিনস না। সে এমন না। তার মতন মানুষ হয় না। ওর কোনো বিপদ হয় নাই তো পারুল ?’

পারুল আর কিছু বলল না। সেও চায় আশিক ঠিকঠাক ফিরে আসুক। লতার প্রতি তার সূক্ষ্ম একটা ঈর্ষার ব্যাপার রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে লতার খারাপ কিছু চায়। তবে লতা যে প্রায়ই আশিকের সঙ্গে লঞ্চের কেবিনে যেত এটা সে জানে।

আশিক ঢাকা থেকে কেবিন ভাড়া করে সকালের লঞ্চে আসত। সেই কেবিনেই আবার বিকেলে ফিরে যেত। ফলে দিনভর যদি সেই কেবিনে লতাকে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে সময় কাটায়, তা কে দেখবে? কে কী বলবে ?

বিষয়টা নিয়ে লতাকে বারকয়েক সতর্কও করেছিল পারুল। কিন্তু হঠাৎই কলেজ ছাত্রী বনে যাওয়া লতা কেন ম্যাট্রিক ফেল পারুলের কথা শুনবে!

লতার মন ভালো করতেই তারা গেল নদীর পাড়ে ঘুরতে। আর সেখানে গিয়ে সত্যি সত্যিই তাদের মন ভালো হয়ে গেল। বড় খোলা নৌকায় জুলফিকার আর আব্দুল ফকিরকেও দেখা গেল। পারুলকে দেখেই আব্দুল ফকির নৌকা তীরে ভেড়াতে বললেন। পারুল বায়না ধরল, ‘ও আব্বা, আমাগো দুইজনরে একটু নৌকায় ঘুরান। আইজ নদীখান মাশাল্লাহ খুব সুন্দর লাগতেছে।’

আব্দুর ফকির বললেন, ‘একটা জরুরি কাজ আছিলো যে মা ?’

‘জরুরি কাজ তো আপনের সব সময়ই থাকে। আইজ তার চাইতেও জরুরি কাজ আছে। আমার বান্ধবীর মন খারাপ।’

আব্দুর ফকির একপলক তাকিয়ে লতাকে দেখলেন। মেয়েটার মুখ শুকনা। কিন্তু সেই শুকনা মুখজুড়েও একটা আলাদা ব্যাপার রয়েছে। ভারি মায়া মায়া চেহারা। নৌকা যেখানে ভিড়েছে, সেখানে সামান্য খাড়া ঢাল। পারুল ছোট্ট লাফে ঢাল পেরিয়ে নৌকায় চলে এলেও লতা পারল না। জুলফিকার নাওয়ের অন্যপ্রান্তে বৈঠা ধরে আছে বলে লতাকে নৌকায় উঠাতে যেতে হলো আব্দুল ফকিরকেই।

তিনি লতাকে ধরে নৌকায় ওঠালেন।

নদীর দুধারে শুভ্র কাশফুল। আকাশে নীল-সাদা মেঘ। ফুরফুরে হাওয়ায় ভারি ভালো লাগছিল পারুলের। সে গুনগুন করে গানও গাইছিল। কিন্তু লতা বসে আছে চুপচাপ। বার দুয়েক তাকে আমোদিত করার চেষ্টা করল পারুল, কিন্তু তাতে লাভ হলো না।

তারা বড় নদী থেকে ঢুকে গেল সরু খালে। এই খাল ধরেই তীব্র স্রোতে নেমে আসছে বিলের পানি। সাথে মাছও। ফলে খালের এখানে সেখানে বাঁশের বেষ্টনী তৈরি করে মাছধরার নানানরকমের ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। তারা খুব সাবধানে সেই বেষ্টনীগুলো পার হতে লাগল। চার নম্বর বেষ্টনীর পর থেকেই শুরু তৈয়ব উদ্দিন খাঁর বিশাল চর।

সেখানে আসতেই হঠাৎ থমকে গেল জুলফিকার। সে বিস্ফারিত চোখে তাকালো, যা দেখছে তা সত্যিতো? নাকি ভুল দেখছে সে? অন্য কিছুও হতে পারে। কোন বস্তা বা প্রাণী।

কিন্তু না। জুলফিকার কাছে আসতেই বুঝল, সে যা ভেবেছিল তাই।

পানিতে ভেসে বাঁশের বেড়ার সঙ্গে আটকে আছে একটা মানুষের লাশ। লাশটা পানি খেয়ে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। তার মুখখানা হা হয়ে আছে বীভৎস ভঙ্গিতে।

লতা হঠাৎ চিৎকার দিয়ে পারুলকে জড়িয়ে ধরল। তার শরীর কাঁপছে। স্থির হয়ে গেছে পারুলও। প্রথমবার আপনাআপনি চোখ পড়ে গিয়েছিল বলে লাশটা দেখতে পেয়েছে সে। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো না। সেও লতাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।

আব্দুল ফকির সময় নিয়ে লাশটা দেখলেন। মানুষটাকে চেনেন তিনি। তৈয়ব উদ্দিন খাঁর উত্তর দিকের বিলের ফসল দেখাশোনা করত সে। চরের মাঝখানে মাটি কেটে উঁচু ঢিবি করে সেখানে তাকে একখানা বাড়িও করে দিয়েছিলেন খবির খাঁ। কিন্তু শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছু দিন ধরে ঠিকঠাক ফসলের হিসাব দিচ্ছিল না সে। টাকা পয়সাও না। এমনকি বসতবাড়ি ছাড়তেও চাইছিলো না।

আব্দুল ফকির পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর হঠাৎ জুলফিকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি নাও ঘোরা জুলফিকার।’

‘লাশের বিষয়ে কী করবেন কাকু ?’

আব্দুল ফকির মুখে আঙুল চেপে ইশারা করে বললেন, ‘চুপ। একদম চুপ। এই লাশ এইখানে দেখছোস, এই কথা কাউরেই বলন যাইব না। বললেই বিপদ। আমার নামে মার্ডার কেস হইয়া যাইবো।’

জুলফিকার কিছুই বুঝল না। সে নাও ঘুরিয়ে নিল। তারা বাড়ি ফিরল মাগরিবের আজানের আগে আগে। লতা বাড়িতে বলে এসেছিল যে আজ পারুলের সঙ্গে থাকবে সে। ফলে তারা দুজন ঘরের ভেতর চুপচাপ বসে রইল।

চোখের সামনে মৃত মানুষের এমন পচা গলা লাশ এর আগে কখনো দেখে নি তারা। সন্ধ্যার অন্ধকারটা নামল চাপা আতঙ্ক নিয়ে।

সেই আতঙ্কে যেন মিশে রইল তীব্র ভয়ংকর এক অশনি সংকেতও!

আব্দুর ফকির বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন বাহির ঘরের দরজার সামনে। তার মাথায় ঝড়ের বেগে নানান হিসাবনিকাশ চলছে।

এই হিসাবের ফলাফল ভুল হওয়ার কথা নয়।

তিনি ঘটনা বুঝে গিয়েছেন। বহু বহু বছর আবার তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মুখোমুখি পড়ে গিয়েছেন তিনি। জেগে উঠেছেন ঘুমিয়ে থাকা ভয়ংকর তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। তার ক্রোধ জেগে উঠেছে। এই ক্রোধ বড় ভয়ানক। বড় প্রলয়ঙ্করী।

আব্দুল ফকির বুঝে গেছেন, ওই লাশ এমনি এমনি এই চরের খালে পড়ে থাকে নি।

এটা তৈয়ব উদ্দিন খাঁর তরফ থেকে একটা সুস্পষ্ট যুদ্ধের বার্তা। সতর্ক সংকেতও হতে পারে। এবং সেই সংকেত তার এবং ফজু ব্যাপারীর প্রতি।

এর আগে যতবার তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ও আব্দুল ফকিরের মধ্যে দ্বৈরথ হয়েছে, ততবারই হারতে হারতেও কীভাবে কীভাবে যেন অলৌকিক কোনো উপায়ে জিতে গিয়েছিলেন আব্দুল ফকির। কিন্তু এখন দুজনেরই বয়স হয়েছে। বিশেষ করে তৈয়ব উদ্দিন খাঁর। সুতরাং যে খেলা এবার শুরু হয়েছে, তা যেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আর আব্দুল ফকিরের চূড়ান্ত খেলা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা শীতল এক দ্বৈরথের শেষ অধ্যায়। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

তবে এবারের যুদ্ধটা খানিক জটিল। এই যুদ্ধে আব্দুল ফকির সরাসরি যুক্ত নন। কিন্তু ঘটনাচক্রে তিনি এই যুদ্ধে জড়িয়ে গেছেন। অবশ্য তৈয়ব উদ্দিন খাঁর মতো মানুষের সঙ্গে হেরেও আনন্দ। আব্দুল ফকির সাহসী, বুদ্ধিমান মানুষ পছন্দ করেন।

সমস্যা হচ্ছে বেশির ভাগ সাহসী মানুষই হয় বোকা।

কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ একই সঙ্গে অসম্ভব সাহসী ও তুখোড় বুদ্ধিমান।

খানিক গাঢ় অন্ধকার নামতেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন আব্দুল ফকির। পারুল আপাতদৃষ্টিতে ছটফটে, দায়িত্বজ্ঞান, অনুনমেয় হলেও ভেতরে ভেতরে যে অন্যরকম এক সত্তাও তার আছে, আব্দুল ফকির তা জানেন। কোনো কিছুই তার চোখ এড়ায় না। ফলে কন্যাকে তিনি স্নেহ যেমন করেন, তেমনি এমন বিশেষ পরিস্থিতিতে তার প্রতি নিঃসংকোচে আস্থাও রাখেন। বিভিন্নসময়ে তাই মেয়েদের একা বাড়িতে রেখেই নানান জায়গায় গিয়েছেন তিনি। এবারও গেলেন।

তার সঙ্গে জুলফিকারসহ আরও তিন যুবক। তাদের দ্রুত ফতেহপুরে বজলু ব্যাপারীর বাড়ি পৌঁছাতে হবে।

আব্দুল ফকিরের ধারণা, সেই বাড়িতে আজ রাতেই কোনো অঘটন ঘটবে। তিনি বাড়ি থেকে বের হলেন অন্ধকারে। তারওপর কালো চাদরে গা ঢেকে নিলেন। মাথার ওপর মেঘমুক্ত ঝকঝকে আকাশ থাকা সত্ত্বেও ওই রাতেও সঙ্গে একখানা কালো ছাতা নিলেন তিনি।

মাঝরাতে ফতেহপুরের বড় নদী থেকে গ্রামের ভেতরে ঢোকার সরু খালে প্রবেশ করলেন তারা। ফজু ব্যাপারীর বাড়ি অবধি পৌঁছাতে হলে খাঁ বাড়ির মূল ঘাট পার হয়ে যেতে হবে। এইজন্য খাঁ বাড়ি সামনে এসে মাঝিও বদলে নেওয়া হলো।

বাকিরা জড়সড় হয়ে বসে রইল নৌকার ভেতর।

নিভিয়ে দেওয়া হলো আলো।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, খাঁ বাড়ির সামনে কিছুই ঘটল না। কেউ নেই সেখানে। বিষয়টা অস্বাভাবিক। আব্দুল ফকির এমন ভাবেননি। ফলে কপাল কুঁচকে রইলো তার।

মূল ঘাট নিরুপদ্রুবে পেরিয়ে যেতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল নৌকায় থাকা অন্যরা। তবে আব্দুল ফকির জানেন, এরপর রয়েছে খাঁ বাড়ির জামে মসজিদ। সেই মসজিদের ঘাটও তাদের পার হতে হবে।

পানি অনেকটাই নেমে যাওয়ায় মসজিদের শানবাঁধানো ঘাটের দু-তিনখানা সিঁড়ি জেগে উঠেছে। তারা সেই সিঁড়ি পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। মূল রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে খাঁ বাড়ি থেকে ফজু ব্যাপারীর বাড়ির যতটা দূরত্ব, খাল ধরে গেলে সেই দূরত্ব অর্ধেকেরও কম। ফলে সকলের মধ্যেই একটা বিপদ কাটানোর স্বস্তি। নৌকার মাঝি যদিও সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছেন চারপাশে।

দৃশ্যটা তার চোখেই প্রথম ধরা পড়ল।

হঠাৎই নাওয়ের ডগায় একসঙ্গে অনেকগুলো হারিকেন জ্বলে উঠল। যেন জলের ভেতর থেকে জেগে উঠেছে হারিকেনগুলো। নিকষ অন্ধকার, তীব্র আতংক আর তাড়াহুড়ায় এতোক্ষণ কেউ খেয়ালই করে নি যে তাদের ঠিক সামনেই পুরো খালজুড়ে আড়াআড়ি দুখানা নৌকা পথরোধ করে আছে।

সেই নৌকায় আট-দশজন বলশালী জোয়ান ছেলে দাঁড়ানো। তাদের প্রত্যেকের হাতেই জ্বলন্ত হারিকেন। সমস্যা হচ্ছে আব্দুল ফকিরের নৌকাখানা তারপরও থামল না। সরাসরি গিয়ে আঘাত করল পথরোধ করে থাকা নৌকা দুটোকে। তাতে তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও খাঁ বাড়ির ছেলেগুলো হৈহৈ করে উঠল। চারপাশ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।

খবির খাঁ মসজিদের শান-বাঁধানো ঘাট বেয়ে নেমে এলেন। তারপর বাঁজখাই গলায় বললেন, ‘এই নাও কার ? এত রাইতে এই নাও কই যায় ?’

আব্দুল ফকিরের নাওয়ের ভেতর থেকে জুলফিকার বেরিয়ে এল। সে আদবের সঙ্গে সালাম দিয়ে বলল, ‘চেয়ারম্যান সাব, গ্রামে এক রুগিরে সাপে কাঁটছে। তারে নিয়া যাইতে আসছি। ফইর সাবে আছেন দক্ষিণ রূপাতলী, তার এক সাগরেদের বাড়িতে। তার শইলডাও ভালো না। এইজন্য তিনি আসতে পারেন নাই। আমারই রুগি নিয়া রূপাতলী যাইতেছি।’

খবির খাঁ নিশ্চিত খবর জেনেই এসেছেন যে আব্দুল ফকির এই নাওয়ে আছেন। কিন্তু জুলফিকারের কথা শুনে রীতিমতো বোকা বনে গেলেন তিনি। সামান্য ঝুঁকে উঁকি দিয়ে দেখলেন নৌকার ভেতর। কী আশ্চর্য, আব্দুল ফকির সেখানে নেই!

নেই কোথাওই!

অথচ এই কিছুক্ষণ মাত্র আগে ফতেহপুরের মূল নদী থেকে নৌকাখানা যখন সরু খালে ঢুকেছে, তখনো তিনি খবর পেয়েছেন যে আব্দুল ফকির এই নাওয়ে আছেন। তাকে স্বচক্ষে দেখা গিয়েছে। দেখেছে সেখানে পাহারায় থাকা মনির।

তাহলে ? এরমধ্যে তিনি গেলেন কোথায় ?

খবির খাঁ দুজন লোক নিয়ে নৌকায় উঠলেন। নৌকার মেঝেতে আঠারো-কুড়ি বছরের এক ছেলে শুয়ে আছে। তার পা হাঁটুর নিচ থেকে শক্ত করে বাঁধা। সে পড়ে আছে মৃত মানুষের মতন। তার মুখের কোষ গড়িয়ে ফেনা পড়েছে।

এই ছেলেকেই কি তাহলে সাপে কেটেছে!

এর তো ভয়াবহ অবস্থা।

ছেলেটিকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু আব্দুল ফকির গেলেন কই ?

নাকি আবারও তার সেই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা কিংবা জাদুর বলে অদৃশ্য হয়ে গেলেন তিনি ?

খবির খাঁ দীর্ঘ সময় তল্লাশি করেও কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।

কিন্তু রোগীকে নিয়ে এরা এই পথে কই যাচ্ছে ? এদিকেতো আব্দুল ফকিরের বাড়ি না!

জুলফিকার অবশ্য প্রথমেই বলেছিল যে আব্দুল ফকির বাড়ি নেই। তিনি রয়েছেন দক্ষিণ রূপাতলী। তো সেখানে যাওয়ার অবশ্য সবচেয়ে সহজ পথ এটিই।

তারপরও মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল তার।

আব্দুল ফকির এই নাওয়ে নেই এটি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। বড় নদী থেকে গ্রামের খালে ঢোকার মুখে আব্দুল ফকিরকে নিজ চোখে নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে মনির।

তারপর সে-ই ছুটে এসে খবরটা দিয়েছে।

তাহলে এই এইটুকু পথে কোথায়, কীভাবে হাওয়া হয়ে গেলেন তিনি ?

এখন তৈয়ব উদ্দিন খাঁর সামনে গিয়ে কী করে দাঁড়াবেন তিনি? কী জবাব দেবেন তাকে? তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মাঝরাতে ফজুর বাড়ির কাছের খাল থেকে আব্দুল ফকিরকে সরাসরি হাতেনাতে ধরতে চেয়েছিলেন। এতে ফজু ব্যাপারীর সঙ্গে তার ষড়যন্ত্রের বিষয়টা প্রমাণিত হয়ে যেত। শুধু তা-ই না, এই মাঝরাতে মানুষভর্তি নৌকাসহ যদি আব্দুল ফকিরকে এখানে আটকে ফেলা যেত, তাহলে উত্তর চরের খুনের দায়টাও খুব সহজেই তার ঘাড়ে চাপানো যেত।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ এই পরিকল্পনাই করেছিলেন। কিন্তু আরও একবার আব্দুল ফকিরের কাছে ব্যর্থ হলেন তিনি।

তবে এই ব্যর্থতার দায় খবির খাঁর।

বিষয়টা মোটেই হেলফেলার নয়। কিন্তু এখন কী করবেন তিনি ? এমন মুমূর্ষু রোগীসহ এই নৌকা আটকে রাখাও ঠিক হবে না। সেটা বরং খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। অনেক ভেবে খবির খাঁ নাও ছেড়ে দিতে বললেন।

আব্দুল ফকির তাহলে কই?

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো আব্দুল ফকির তখন ফজু ব্যাপারীর সঙ্গে তার বাড়ির পাশের নলখাগড়ার ঝোঁপের মধ্যে বসে অন্ধকারে ফিসফিস করে কথা বলছেন।

তার গা, মাথা বেয়ে টুপটাপ পানি ঝরে পড়ছে। খাঁ বাড়ির জামে মসজিদের ঘাটের ওখান থেকে বেশ কিছুটা পথ অন্ধকারে খালের পানিতে সাঁতার কেটে আসতে হয়েছে তাকে।

মূল নদী থেকে সরু খালে নৌকা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মাঝিকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই নৌকা বাইতে শুরু করেছিলেন।

যেন আগেভাগেই তার ষষ্ঠেন্দ্রীয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল। কালো চাদরে আবৃত আব্দুল ফকির খাঁ বাড়ির ঘাট পার হতে না হতেই চারপাশে হঠাৎ অস্বাভাবিক শব্দ, নড়াচড়া টের পেয়েছিলেন। ফলে সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আর ঠিক তখনই মসজিদের সামনের জলে আবছায়া স্পন্দন দেখতে পান। সন্দিগ্ধ, অভিজ্ঞ আব্দুল ফকি্র সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনা আঁচ করলেন। তার আর বুঝতে বাকি রইল না কিছুই।

তিনি নিঃশব্দে নেমে গেলেন পানিতে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কী করতে হবে সেসবও আগেভাগেই শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল জুলফিকারকে। ফলে তিনি যতক্ষণে দীর্ঘ এক ডুবে সামনের নৌকাগুলো পেরিয়ে ওপাশের অন্ধকারে গিয়ে মাথা তুললেন, ততক্ষণে জুলফিকারও উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে ফেলেছিলো। আর সামনের লোকগুলো উত্তেজিত থাকায় আব্দুল ফকির যে এমন কিছু করেছেন, নৌকা থেকে অন্ধকারে পানিতে ডুব দিয়ে তাদের ডিঙিয়ে ওপারে চলে গেছে্ন তা তা্রা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি।

বরং তারা যতক্ষণে আব্দুল ফকিরের নাও তল্লাশি শুরু করেছে খবির খাঁর নেতৃত্বে , আব্দুল ফকির ততক্ষণে স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে চলে এসেছেন ফজু ব্যাপারীর বাড়ির নলখাগড়ার বনে!

তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘আইজ আমি এতো রিস্ক নিয়া আসছিলাম খারাপ কিছু চিন্তা কইরাই। কিন্তু এখন মনে হইতেছে সামনে আরও খারাপ সময় আইতেছে ফজু।’

‘ক্যান কাকু ? খারাপ ক্যান ? কী করবো সে ?’

‘কী করবো সেইটা এখনো বলন যায় না। তয় একখান কথা বলি, আমার ধারণা কোনো কারণে তৈয়ব খাঁ সন্দেহ করতেছে।’

‘কী সন্দেহ করতেছে ?’

‘তুই তার জমিজমা নিয়া কিছু একটা করতেছস। আর ফিরত পাওনের চেষ্টা করতেছত। আর তোর সেই কামে আমিও যোগ দিছি। তোরে সাহায্য সহযোগিতা করতেছি।'

‘এইটা আইজ হোউক কাইল হোউক, সে তো জানতোই।’

‘তা জানতো।’

‘এই জইন্যই তো আপনের উপর ভরসা কাকু। আপনে ছাড়া আর কেউ তার লগে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিতে পারব না।’

‘তোর জইন্য আমি সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিলে তোর সব গোপন কথা তো আমার জানন লাগবো। লাগবো না?'

‘আমার তো কোনো গোপন কথা নাই কাকু। যা বলার সব তো আমি আপনেরে বইলাই দিছি!’

আব্দুল ফকির হঠাৎ ফজু ব্যাপারীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘আব্দুল ফইর যে কুত্তার মতন ঘ্রাণ পায়, সেইটা জানোস ?’

ফজু হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল। সে আব্দুল ফকিরের এই রূপের সঙ্গে সরাসরি এতোটা পরিচিত না। হয়তো লোকের মুখে শুনেছে যে সে ভয়ংকর। কিন্তু সামনাসামনি এভাবে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। আব্দুল ফকির বললেন, ‘তুই কিছু একটা আমার কাছে গোপন করছস ফজু।'

'কী গোপন করব কাকু?'

'খুব বড় কিছু। ঘটনাটা আমার জানন দরকার। আরেকটা কতজা। আমি না জানলে সেই জিনিস তুই তৈয়ব উদ্দিন খাঁর থিকাও বাঁচাইতে পারবি না। কথাটা মনে রাখিস।’

ফজু কাঁপা গলায় বলল, ‘আল্লাহর কছম ফইর কাকু। যা বলার সব আমি আপনেরে বলছি। আপনেরে না বললে আর কারে বলবো ? আপনে ছাড়া এই বিপদে আমাগো আর কে আছে ?’

‘তোগোর আর বিপদ কিসের রে ফজু ? 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩 ’

বিজ্ঞাপন

ফজু প্রসঙ্গ বদলাতে পেরে যেন খানিক স্বস্তি বোধ করল, ‘এই যে তৈয়ব খাঁ, খবির খাঁ... পুরা খাঁ বংশ আমাগো শত্রু।’

‘এহ, ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম।’ শ্লেষাত্মক স্বরে বললেন আব্দুল ফকির। ‘তোগো ব্যাপারীগো কী এমন আছে যে খাঁ বংশ এখনো তোগো শত্রু ভাবব ?’

‘দেখেন না, এই যে নতুন কইরা আবার পুরান জমিজমার খোঁজ শুরু করছি আমরা ? কাগজপত্রে তো ওইসব জমি এখনো ব্যাপারীগো নামেই কাকু। আপনে তো সবই জানেন।’

‘জানি দেইখাই তো জিগাইতেছি। এত বছর তোগো তিন বেলা ভাত জোটে নাই, আর এখন হঠাৎ কী এমন হইল যে খাঁয়গো লগে টক্কর দেওনের কথা ভাবতেছস ? ঘটনা কী এতো সহজ ফজু ? আসল ঘটনা খুইলা বল। না বললে তুই-ই পস্তাইবি। আমি তো তোর শত্রু না। আর খাঁয়রা তোর যেমন শত্রু, আমারও শত্রু। শত্রুর শত্রু হয় আসল বন্ধু। আপন। তাইলে তুই আর আমি তো আপনই।’

‘এই জইন্যই তো আপনের কাছে গেছি কাকু। আপনে ছাড়াতো আমাগো আপন আর কেউ নাই।’

‘তাইলে আসল ঘটনাখান খুইলা বল। হঠাৎ এত পয়সাপাতি কই পাইলি ?’

‘আপনেরে তো বললামই কাকু, আমরা বংশের সবাই মিল্যা দিতাছি। আমার ভাইয়েরাও ঢাকার থিকা পাঠাইতেছে। আর বংশের যে যেইখানে আছে, সবাইই চায় ব্যাপারী বংশের জমি ফিরা আসুক। এইজইন্য সবাই সাহায্য করতেছে।’

আব্দুল ফকির কথা বললেন না।

কিন্তু অন্ধকারে তার চোখজোড়া ভয়ংকর শিকারি কোনো জন্তুর মতো ধ্বকধ্বক করে জ্বলতে লাগল।

আব্দুল ফকির যা সন্দেহ করেছিলেন তাই সত্যি হলো। প্রমাণিত হলো ফজু তার কাছে মিথ্যে বলেছিলো। কারণ পরদিন রাতেই ডাকাতি হলো ফজু ব্যাপারির বাড়িতে। এবং ডাকাতির এই ধরনটা অদ্ভুত। ডাকাতরা ফজুর বাড়ি থেকে কিছু নেয় নি। একটা সুতোও না। তবে তারা ফজু ও তার স্ত্রীর হাত-মুখ বেঁধে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে কিছু একটা খুঁজেছে। কিন্তু প্রত্যাশিত সেই জিনিস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তার ঘরের মেঝে, চৌকির তলা এমনকি উঠানের মাটি অবধি খুঁড়েছে তারা।

এই নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড!

ভোরবেলা ফজু নিজেই ভীত সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে খাঁ বাড়ি গেলো। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ সব শুনে চুপ করে বসে রইলেন।

খবির খাঁ বললেন, ‘ঘটনা খুবই চিন্তার বাজান। ফজুর ঘরে কে ডাকাতি করতে যাইবো ? তার ঘরে ডাকাতি করনের কী আছে ?’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এইটাই তো চিন্তার বিষয়। ফজু, তোর সাথে কারও কোনো শত্রুতা নাই তো ?’

‘আমি গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। আমার লগে কার শত্রুতা থাকবো ?’

‘গর্দভের মতন কথা বলিস না ফজু। শত্রু সবারই থাকে।’

‘আমি তো কিছুই বুঝতেছি না খাঁ সাব। কার কথা বলব ?’

তৈয়ব উদ্দিন খবির খাঁকে বললেন, ‘খোঁজ নে। আমি বাঁইচ্যা থাকতে আমার গ্রামে এইসব চলবো না। আর এই ঘটনা দূরের কেউ করে নাই। করলে কাছের কেউই করছে। সবাইর সাথে কথা বল। এইটা বাইর করন কঠিন কিছু না।’

'জে বাজান।’ বললেন খবির খাঁ। ফজু চলে যেতেই তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘ঘটনা কিছু বুঝছস ?’

‘কী ঘটনা বাজান ?’

‘ফজু আগেই সন্দেহ করছিল যে তার বাড়িতে ডাকাতি হইবো।’

‘কী বলেন বাজান ? সে জানবো কেমনে ?’

‘জানছে...। আচ্ছা, অর বাড়িতে রাইতে ডাকাতি করতে কারে কারে পাঠাইছিলি ?’

খবির খাঁ একে একে সবার নাম বললেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘এদের মধ্যেই কেউ ফজুরে আগেভাগে জানাই দিছে। আর সে এইটাও জানত যে আমরা ওই বাড়িতে কী খুঁজতে যাইতেছি। এইজন্যই খবর পাওয়ামাত্র ফজু জিনিস সরাই ফেলছে।’

খবির খাঁ একই সঙ্গে বিস্মিত এবং সংকুচিত হয়ে গেলেন। তৈয়ব খাঁ পইপই করে সব শিখিয়ে দেওয়ার পরও তিনি বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। কোনোকিছুই ঠিকঠাক করতে পারছেন না।

গতকাল ভোরেই বাবা তাকে ডেকে বলেছিলেন, তিনি যেন রাতের অন্ধকারে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে ফজু ব্যাপারীর ঘরে আচমকা তল্লাশি চালান। তবে কাজটা এমনভাবে করতে হবে যাতে লোকে সন্দেহ না করে। তারা যেন ভাবে এটা আর দশটা সাধারণ ডাকাতির মতোই কোনো ঘটনা। তৈয়র উদ্দিন খাঁর নিশ্চিত বিশ্বাস, ফজু সেই গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে। আর পেয়েই নিজের পূর্বপুরুষের জমিজমার উদ্ধার কার্যে লেগে গেছে। সুতরাং যে-কোনোভাবেই হোক, খাঁয়েদের উচিত সবার আগে সেই গুপ্তধন হস্তগত করা।

খবির খাঁর মাথা কাজ করছে না। তিনি ভীত গলায় বললেন, ‘বাজান, আপনে কেমনে বুঝলেন যে ফজু এই ঘটনা আগেই জানত ?’

‘ফজুর কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি দেইখা মনে হইছে। তারে দেইখা মনে হইছে, সে আগে থেইকাই রেডি আছিলো যে ঘটনা ঘটার পর বেয়ান হইলেই সে আমার কাছে নালিশ লইয়া আসবো।’

‘এখন কী করবো বাজান ?’

‘এক কাজ কর। ফজুর সঙ্গে উঠাবসা বেশি এমন দুই-তিনজনরে খুঁইজা বাইর কর। তারপর সালিস ডাক। সালিসে আমারে ডাকিস না। এলাকার অন্য ময়মুরব্বি যারা আছে, তাদের নিয়া কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা কর।’

খবির খাঁ কিছুই বুঝলেন না।

অবশ্য তৈয়ব উদ্দিন খাঁর চিন্তা-ভাবনা যে তিনি এই জনমে আর বুঝবেন না, এটা তিনি মেনেই নিয়েছেন। তিনি বাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তৈয়ন উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘গত দুই-তিন বছর যারা যারা বর্গা জমিনের ফসল ঠিকঠাক মতন দেয় নাই, উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলছে, এমন উঠতি কয়েকজনরেও এই সন্দেহের দলে যোগ কর। সালিসে বিচার যেন কড়া হয়।'

'জে বাজান'।

' কিন্তু শাস্তি দেওন দরকার নাই। শাস্তি দেওনের আগে আমার কাছে পাঠাবি। আমি তাগো মাফ কইরা দিবো। কথা বুঝছস ?’

‘জে বাজান।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ হঠাৎ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘কিচ্ছু বুঝস নাই। কিচ্ছু না।’

খবির খাঁ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘ক্ষমতা রাখতে হইলে শক্ত যেমন হওন লাগে, তেমন নরমও হওন লাগে। ক্ষমতায় কঠিন শাস্তি দিয়া নিজের যেমন শক্তি প্রমাণ করন লাগে, তেমনে আবার দয়ামায়াও দেহান লাগে। সেই দয়ামায়া হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষমা'।

খবির খাঁ এবার কথা বললেন না। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ বললেন, ‘উত্তর বিলের মতি মিয়ার লাশ নিয়া কিছু হইছে ?’

‘এখনো কেউ কোনো খবর দেয় নাই বাজান।’

‘এস্কান্দাররে বলা হইছিলো কঠিন শাস্তি দিতে। কিন্তু সে মতি মিয়ারে খুন করল ক্যান? খুন ছাড়া কি কঠিন শাস্তি দেওন যায় না ?' বলে উষ্মা প্রকাশ করলেন তিনি। 'আমার চাইরপাশ হইছে গাধা-গরুতে ভরপুর। এদের দিয়া দুনিয়ায় চলন যাইব না। আমি চোখটা বুজব আর সঙ্গে সঙ্গে এই খাঁ বংশটারে বারো ভূতে লুইটা পুইটা খাইবো। দফাদার বাড়ির মতোন খাঁ বাড়ির উঠানেও ঘাস, লতাপাতা গজাইবো। শেয়াল কুকুরের আবাস হইব। লাঙ্গলের ফলা পড়বো। আর তারপর মাইনষে আনন্দফুর্তি কইরা এই খাঁ বাড়ির উঠানে ধান-পাঁটের চাষ করব। নানান জাতের ফসল ফলাইবো।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁর কপালের শিরা কাঁপছে। সচরাচর তাকে এমন রাগতে দেখা যায় না। তিনি ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, ‘তুই এখন যা। আমার সামনে থেকে দূর হ।’

খবির উদ্দিন খাঁ যত দ্রুত সম্ভব ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। কিন্তু তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তাতেও শান্তি পেলেন না। তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরছে।

ফজু ব্যাপারীকে আগেভাগে এই ডাকাতির কথা কে জানিয়েছে ?

এটা খুবই ভয়াবহ ব্যাপার।

ঘরের ইঁদুরে বাঁধ কাটলে ঘরের বেড়া রাখা যায় না।

এই ইঁদুরকে অতিসত্বর খুঁজে বের করতে হবে।

সেই রাতে আর ঘুম হলো না তার। অনেক ভেবেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলেন না তিনি।

ফজরের নামাজ শেষ করে সেদিন ভোরে আর হাঁটতেও বের হলেন না। খাবার খেয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। তার মাথার বাঁ দিকটায় চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। এস্কান্দারকে ডেকে পান খেতে চাইলেন। কিন্তু সেই পান খেতে পারলেন না। তার আগেই হড়বড় করে বমি করলেন। এস্কান্দার ছুটে এসে তাকে ধরতে গেল।

কিন্তু তিনি হাত তুলে নিষেধ করলেন।

এস্কান্দার স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আরও বার দুই বমি করলেন। তারপর নিজে নিজেই টেবিল থেকে পানির জগ টেনে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

বাইরে ভোরের ঝলমলে আলো। খাঁ বাড়ির কাজের লোকদের পদচারণায়, কোলাহলে মুখরিত উঠান। কার এক ছোট্ট শিশু আদুল গায়ে বসে আছে সেখানে। তার সামনে বাটিভর্তি মুড়ি। কিন্তু সে মুড়ি খাচ্ছে না। বরং মুঠো করে ছিটিয়ে দিচ্ছে মাটিতে। সেখানে কতগুলো মুরগির বাচ্চা ভিড় করেছে। তারা মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে।

শিশুটি চোখভর্তি আনন্দ নিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ মুখে পানি নিয়ে বার কয়েক কুলি করলেন। তারপর এস্কান্দারের কাছে জগটা দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে রইলেন। শিশুটির দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভালো লাগছে। কী আনন্দ নিয়েই না সে মুরগির বাচ্চাগুলোকে খাবার দিচ্ছে! আর খানিক বাদে খিলখিল করে হাসছে। তার চোখেমুখে রাজ্যের আনন্দ। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ওই দৃশ্য থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন না।

তার হঠাৎ মনে হলো, জীবনজুড়েই মানুষের সবচেয়ে বড় পিপাসার নাম দর্শন। দেখা।

মানুষ আসলে জগতের সবকিছুই দেখে নিতে চায়। প্রিয় জায়গা, প্রিয় মানুষ যেমন দেখতে চায়, তেমনি দেখতে চায় অন্যরা তাকে সম্মান করছে, সমীহ করছে, ভালোবাসছে। রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে মানুষ দিনের আলো দেখতে চায়। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখতে চায়। জোছনার রাত, বৃষ্টির দিন দেখতে চায়।

এই দেখাদেখির ইচ্ছাই মূলত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। একারণেই মানুষ আরও বাঁচতে চায়। এ কারণেই মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। কারণ মৃত্যু এক অনন্ত অন্ধকার জগতের নাম। সেখানে দেখার কিছু নেই।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার কাছ থেকে সরে এলেন। তার মধ্যে অবচেতনেই প্রবল মৃত্যুচিন্তা কাজ করছে। বিষয়টা তিনি সাধারণত গ্রাহ্য করেন না। কিন্তু আজ পারলেন না। ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসলেন। এস্কান্দার তার পাশে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমার অসুস্থতার কথা কাউরে বলিস না।’

এস্কান্দার মাথা কাঁত করে বলল, ‘জে, বলব না।’

‘এই জীবনরে নিয়া কখনো ভাবছোস এস্কান্দার ?’

‘কোন জীবন দাদাজান ? ধলপারের জীবন মাতুব্বর ? তারেও কি খুন করন লাগবো ? লাগলে খালি একবার কন। আপনের আদেশ আমার কাছে জজ সাবের রায়ের মতন। বলামাত্র পালন'।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আর কথা বললেন না। 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

বিজ্ঞাপন

তিনি ভেবে পান না, চারপাশে এমন মাথামোটা গরু-গাঁধার পাল নিয়ে তিনি কীভাবে এখনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতন বেঁচে আছেন!

এস্কান্দার বলল, ‘উত্তর চরের মতি মিয়ারে কিন্তু আমি খুন করতে চাই নাই দাদাজান। আপনের কথার উল্টা কিছু করনের সাহস আমার নাই। কিন্তু ঘটনা ঘইটা গেছে হঠাৎ। লাথি মারছিলাম তলপেট বরাবর। বেশি জোরেও মারি নাই। কিন্তু দম আটকাইয়া মইরা গেল। তয় কথা কী জানেন দাদাজান, আপনের কাছে বাপজানের এতো কেচ্ছাকাহিনি শুনছি যে মনে মনে দুই-চাইরখান খুন করনের খায়েশ আমারও ছিল। এই সুযোগে সেই খায়েশ পূরণ হইয়া গেল। তয় দাদাজান, খুন অনেকটা নেশার মতন। একবার করলে খালি করতেই ইচ্ছা হয়। আপনে বললে আমি জীবন মাতবররেও খুন করতে চাই।’

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন।

আপাতদৃষ্টিতে বোকাসোকা, নিরীহ এই এস্কান্দারের ভেতরও কী ভয়ানক এক খুনি ওঁত পেতে ছিল! সময় সুযোগ বুঝে সে জেগে উঠেছে। মৃত্যু যেমন ওঁত পেতে থাকে মানুষের ভেতর। সেও অপেক্ষায় থাকে সময়েরই।

আজ কী হয়েছে তার ?

ঘুরেফিরে বারবার কেন কেবল ওই মৃত্যুচিন্তাই আসছে!

খানিক আগের ওই চিনচিনে মাথাব্যথা, তারপর বমি আর সেই থেকেই ক্রমাগত মৃত্যুচিন্তা, এসব কি কিছুর ইঙ্গিত ?

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ ধীরেসুস্থে বললেন, ‘শোন...। জীবন হইলো সময়। ধর, তুই এক থিকা একশ বছর বাঁচলি, এইটা কী ? এইটা আসলে সময়ই। সময় ছাড়া তো আর কিছু না, তাই না ?’

বলে সামান্য থামলেন তিনি। যেন বুঝতে পারছেন না ঠিক কীভাবে বললে এস্কান্দার বুঝবে।

‘ধর...। সমুদ্রভর্তি পানি থিকা তুই যদি এক কলসি পানি আনস, তাইলে কি সমুদ্রের পানি কমবে ? কমবে না। কারণ ওই সমুদ্রের পানির শ্যাষ নাই। কিন্তু কলসের পানির শ্যাষ আছে। ঢাললেই শ্যাষ। জীবনও ওইরকম।’

‘কলসির পানির মতন ? অল্প ?’

‘হুম। আর সময় হইছে সমুদ্রের পানি। জীবন শ্যাষ হইয়া যায়, কিন্তু সময় শ্যাষ হয় না। সে সমুদ্রের পানির মতন অফুরন্ত। আর ওই কলসির পানি হইলো জীবনের মতন ফুরন্ত... প্রত্যেকদিন একটু একটু কইরা ঢাললেও শ্যাষ হইতে থাকে। তা যত বড়ো কলসিই হোক না ক্যান! তুই যত বছরই বাঁচস না ক্যান, তোর আয়ু একদিন না একদিন শ্যাষ হইবোই। জীবনের কলসিতে থাকা সময় ফুরাই যাইবো। কিন্তু দুনিয়া চলতে থাকবো। সময়ের সমুদ্রের পানি ফুরাবে না। চলতেই থাকবো।’

এস্কান্দারের কাছে তৈয়ব উদ্দিন খাঁ জগতের সর্বশেষ কথা।

সে কিছু না বুঝলেও মুগ্ধদৃষ্টিতে তার কথা শোনে। এখনো শুনল। যদিও সে জানে, তৈয়ব উদ্দিন খাঁ আসলে তাকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলছেন না। তিনি বলছেন নিজেকেই। এই কাজ তিনি মাঝেমধ্যেই করেন। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন। তবে এস্কান্দার এসময় তার কথা বলার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ খানিক চুপ থেকে বললেন, ‘সবাই জীবনভর সহজ কাজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সহজ কাজে আনন্দ নাই, আনন্দ কঠিন কাজে। একটা কথা মনে রাখিস, মানুষ খুন করা কঠিন কোনো কাজ না। এইটা সহজ কাজ। কঠিন কাজ হইলো মানুষ বাঁচাই রাখা।’

‘জে দাদাজান।’

‘আমার অজুর পানি দে। নামাজ পড়বো।’

‘এখন কোন ওয়াক্তের নামাজ দাদাজান ?’ অবাক গলায় বলল এস্কান্দার।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ তার কথার জবাব দিলেন না। কোনো একটা অবচেতন চিন্তা তাকে অস্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু চিন্তাটা তিনি স্পষ্ট ধরতে পারছেন না। ঘরে ঢুকে তিনি জামাকাপড় বদলালেন। তারপর জায়নামাজ পেতে নামাজে বসলেন। নামাজ শেষে সালাম ফেরাতে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করলেন, যে চিন্তাটা অনেকক্ষণ ধরে তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিলো, সেই চিন্তাটা তিনি ধরতে পেরেছেন।

খাটের নিচে একটা ধেড়ে ইঁদুর আঁতিপাঁতি করে কিছু খুঁজছে। কিংবা গর্ত খোঁড়ার চেষ্টা করছে। তৈয়ব উদ্দিন খাঁর চোখ পড়েছে সেই ইঁদুরের উপর। ইঁদুরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ তার এতোক্ষণের অস্বস্তিকর অথচ বুঝতে না পারা চিন্তাটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

গতকাল তার ঘরের খবর ফজু ব্যাপারীকে কে আগেভাগে পৌঁছে দিয়েছিল সেটি তিনি ধরতে পেরেছেন।

তৈয়ব উদ্দিন খাঁ প্রবল বিষ্ময় নিয়ে ইঁদুরটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এতকাল এমন করেই নিজের ঘরে একটা ধেড়ে অথচ অদৃশ্য ইঁদুর তিনি পেলেপুষে রেখেছিলেন। বোকাসোকা ভেবেছিলেন।

অথচ সেই ইঁদুরই তার ঘরের বাঁধ কাটতে শুরু করেছে!

ব্যাপারটা ভাবতেই তীব্র অস্বস্তি হতে লাগল তৈয়ব উদ্দিন খাঁর।

তিনি রাগে, ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।

প‍র্ব- ২২ [মানবজনম — সাদাত হোসাইন]

হেমার শরীর এখন বেশ ভালো। বাবা আর বাড়ি না ফিরলেও সেদিন ফোন করে খোঁজখবর নিলেন। হেমা অবশ্য কিছু বলে নি। এমনকি তার অসুস্থতার কথাও না। মূলত আসলাম সাহেবই কথা বলেছেন। হেমা কেবল চুপচাপ শুনেছে। তবে ফোন রাখার পরপরই হেমার মনে হলো, বাবার গলায় একটা চাপা আনন্দ ছিল। অনেক চেষ্টা করেও তিনি সেই আনন্দ লুকাতে পারেন নি। এ যেন মুক্তির আনন্দ।

মানুষ আর সব আনন্দ চেপে রাখতে পারলেও মুক্তির আনন্দ চেপে রাখতে পারে না।

বাবা কি তবে এই সংসার, সম্পর্ক থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলতে পেরেছেন ? তার কি একটুও মায়া হচ্ছে না ?

মানুষ যদি দীর্ঘ বন্দিজীবন থেকে হঠাৎ মুক্তি পায়, তখন মুক্তির আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্দিখানার জন্যও তার মন কেমন করে। হয়তো সেখানে কোনো আনন্দের স্মৃতি নেই। আছে কেবলই অসহনীয় যন্ত্রণার গল্প। তারপরও একটা মন কেমন করা অনুভূতি তার হয়। একটা মায়া থেকেই যায়। সেই মায়া বন্দিখানার ওই কঠিন গরাদ, কংক্রিটের শক্ত মেঝে, অসংখ্য আঁকিবুকির দেয়াল কিংবা অখাদ্য খাবারের জরাজীর্ণ প্লেটে থেকেই যায়।

এই মায়া কাটানো সহজ নয়।

আচ্ছা বাবার কাছে কি তবে এই সংসার-সম্পর্ক সেই বন্দিখানার চেয়েও ভয়ংকর কিছু হয়ে উঠেছিল ?

বাবার জীবনে কি সত্যি সত্যিই কেউ এসেছে ?

যার সান্নিধ্য তাকে খরতাপে পুড়ে যেতে থাকা অন্তহীন মরুভূমিতে হঠাৎ করেই সবুজ এক মরূদ্যান দেখিয়েছে ?

এমন কিছু হয়ে থাকলে কি বাবাকে দোষ দিতে পারবে সে ?

হেমা দীর্ঘদিন কোথাও যায় না। ফোনও বন্ধ করে রেখেছে। ফলে কারও সঙ্গেই কোনো যোগাযোগ নেই তার। আচ্ছা, এমনকি হতে পারে যে এই গৃহবন্দিত্ব কিংবা বিচ্ছিন্নতাই তাকে আরও বিষণ্ন করে তুলছে ?

নয়নকে একবার ফোন করার কথা ভাবল সে। কিন্তু তারপর আবার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিল।

এটা কি অভিমান ?

হেমা কখনো অভিমানী মেয়ে হতে চায় নি। এমনকি কথায় কথায় যারা গাল ফোলায় তাদের খুব একটা পছন্দও না তার।

হেমার বরং ধারণা, যারা একটুতেই অভিমান করে, তারা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ধরনের মানুষ। এরা কোনো যুক্তি বুঝতে চায় না। যে মানুষটির প্রতি তারা হুটহাট অভিমান করে, সেই মানুষটির বাস্তবতাও বুঝতে চায় না। এই কথায় কথায় অভিমানী শ্রেণি যা বোঝে, তা হলো কেবল নিজের আনন্দ, নিজের প্রাপ্তি। সেই প্রাপ্তি না ঘটলেই তারা অভিমানে গাল ফোলায়। হেমা কখনোই এদের দলের হতে চায় নি। সে তার আশপাশটা বুঝতে চেয়েছে। যতটা সম্ভব অভিযোগহীন থাকতে চেয়েছে।

নয়নের সঙ্গে একটা দীর্ঘ যোগাযোগহীনতা চলছে তার। এবং সেটি নয়নের কারণেই। সে ভয়াবহ কোনো মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। কিন্তু বিষয়টা কাউকে বলতে চায় না। এমনকি হেমাকেও না। হেমা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু লাভ হয় নি। বরং নয়ন তাতে বিরক্ত হয়েছে। নিজেকে আরও আড়াল করেছে। চারপাশে তুলে দিয়েছে অলঙ্ঘনীয় সীমানা প্রাচীর।

তবে হেমা তাতে মন খারাপ করে নি।

বরং সে এটি ভেবে নিয়েছে যে, প্রতিটা মানুষের একান্ত নিজস্ব একটা জগৎ থাকে। সেই জগতে সে ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার থাকে না। সেখানে সে থাকতে চায় একা। বোঝাপড়া করতে চায় নিজের সঙ্গে।

নয়নও হয়তো তেমন কিছুই চাইছে। ফলে সে আর তার সেই সংরক্ষিত সীমানা লঙ্ঘন করতে চায় নি।

অনেক দিন পর বাসা থেকে বের হলো হেমা। কিন্তু বের হওয়ার পরই মনে হলো, কোথায় যাবে ? দুপুর পড়ে এসেছে। একটা মৃদু হাওয়া চারধারে। গত কিছুুদিনের ভ্যাপসা গরমটাও কেটে গেছে। এই সময়ে রিকশায় ঘোরার চেয়ে আনন্দদায়ক কিছু নেই।

কিন্তু সে রিকশাও নিল না।

শরীরটা খানিক দুর্বল হলেও লালমাটিয়া থেকে হেঁটে ধানমন্ডি সাতাশের দৃক গ্যালারির সামনে চলে এল সে। গ্যালারিতে কোনো একটা প্রদর্শনী চলছে। কী মনে করে সেখানে ঢুকে পড়ল হেমা। কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরল। তারপর বের হয়ে এল গ্যালারি থেকে। ততক্ষণে বিকেলের আলো প্রায় মরে এসেছে। সন্ধ্যা নামবে খানিকবাদেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝুপড়ি চায়ের দোকান থেকে এক কাপ চা খেল সে।

তারপর রবীন্দ্র সরোবরের বটগাছটার তলায় দীর্ঘসময় চুপচাপ বসে রইল।

চারপাশে এই যে এত মানুষ, এত কোলাহল, এসবের কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করতে পারল না। লেকের পানিতে নৌকায় তরুণ-তরুণীরা ঘুরছে। হাসিখুশি সুখী মানুষ। হেমা সহজে ঈর্ষান্বিত হয় না। কিন্তু আজ কেন যেন তার খুব ঈর্ষা হতে লাগল। নাকি কষ্ট ?

সে ঠিকঠাক বুঝতে পারল না। তবে ওই হাস্যোজ্বল তরুণ-তরুণীদের দেখে মুহূর্তের জন্য তার নিজেরও যেন অমন একজন হয়ে যেতে ইচ্ছে করল। এক তরুণী তার মাঝবয়সী বাবা-মাকে নিয়ে নৌকা বাইছে। নৌকার দুলুনিতে বেশ ভয় পাচ্ছেন তারা। ফলে একে অপরকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। মেয়েটি তা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। ফলে ইচ্ছে করেই যেন নৌকাখানা আরও খানিকটা দোলাচ্ছে সে। আর খিলখিল করে হাসছে।

কে জানে, সে হয়তো চাইছে, তার এই ঢেউ তোলা দুলুনিতে বাবা-মা আরও শক্ত করে পরস্পরকে ধরে রাখুক!

হেমার আচমকা মনে হলো, তার কাছে কি এমন ঢেউ তোলার মতো কিছু আছে যা দিয়ে সেও তার বাবা-মাকে পরস্পরের সঙ্গে এমন শক্ত করে ধরে রাখতে পারবে ?

…..

নয়নকে দেখে চমকে গেল রাহাত।

মাঝরাতে হঠাৎ ইউনিভার্সিটির হল থেকে বের হয়েছিল সে। কিন্তু পলাশীর মোড়ের ঝুপড়ি দোকানগুলোর সামনে নয়নকে বসে থাকতে দেখে ভারি অবাক হলো। খানিক আগেই তো হেমার সঙ্গে কথা হলো। কই, সে তো কিছু বলল না!

নাকি নয়ন যে ঢাকায় এসেছে হেমা তা জানেই না ?

বিষয়টা কেমন অদ্ভুত লাগল রাহাতের।

দুজনের মধ্যে কোনো সমস্যা হয় নি তো ?

রাহাত অবশ্য ওই সম্ভাবনাটুকুকে পাত্তা দিল না। সে নয়নের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নয়ন তাকাতেই বলল, ‘কেমন আছেন ভাই ?’

অবাক ব্যাপার হলো নয়ন রাহাতকে চিনতে পারল না। সে দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো। আপনি ?’

‘আপনি ঠিক আছেন তো ভাই ? আপনাকে কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছে।’

Post a Comment

0 Comments