Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ছদ্মবেশি_ছায়া (পর্ব: এক)

লেখক: সিহাব হোসেন

"আমার হাসবেন্ডকে আমি খুন করেছি। সে আমার জীবনটা গত পাঁচ বছরে আস্ত একটা নরক করে তুলেছিল। তাই একেবারে সব শেষ করে দিয়েছি।" 🔴

নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর তিশার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত শোনাচ্ছিল। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন ভারী গলায় কিছু নির্দেশনা দিচ্ছিল। তিশা একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে রক্তে ভাসছে তার স্বামী রেজার নিথর দেহ। 🔴 মাথার একপাশ দিয়ে জমাট বাঁধা রক্ত গড়িয়ে মেঝের কার্পেট ভিজিয়ে দিচ্ছে। 🔴

ফোনের ওপাশের কথা শেষ হতেই তিশা উত্তর দিল,
— "ঠিক আছে, আপনি যেভাবে বলছেন, আমি এখনই বের হচ্ছি। যে পথ দিয়ে যেতে বলছেন, সে পথেই যাব। এই অভিশপ্ত শহরে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না।" 🔴

কথাটা বলেই তিশা ফোন কেটে দিল। মোবাইলটার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে পেছনের কভার খুলে ফেলল সে। 🔴 সিম কার্ডটা বের করে দুহাতের চাপে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলল ঘরের এক কোণে। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের সাথে তার সব ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম সে এই মুহূর্তেই ছিন্ন করে দিল। 🔴

ধীর পায়ে সে রেজার লাশের পাশে এসে বসল। চোখের দৃষ্টিতে কোনো মায়া নেই, নেই কোনো অনুশোচনা বা ভয়। বরং সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক তীব্র ঘৃণা আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি। 🔴 রেজার মৃত মুখের দিকে তাকিয়ে তিশা হিসহিস করে বলে উঠল,
—"এবার ওপারে গিয়ে নিজের সব পাপের ফল ভোগ কর। আমি জানি, আমি তোকে মারিনি। 🔴 কিন্তু কাল সকাল হলে এই পৃথিবীর সবাই জানবে, আমিই তোকে খুন করেছি। তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তোর মতো একটা পিশাচের খুনি হিসেবে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতেও আমার কোনো আফসোস হবে না।" 🔴

কথাগুলো শেষ করেই তিশা রেজার মুখের ওপর ঘৃণায় থুতু ছিটিয়ে দিল। তারপর নিজের ছোট ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। 🔴 একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। 🔴

বাইরে তখন প্রকৃতির এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারন করেছে। তুমুল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘন ঘন বজ্রপাতে কেঁপে উঠছে রাতের আকাশ। 🔴 বৃষ্টির ছাঁটে চারপাশ ঝাপসা হয়ে আছে। তিশা গ্যারেজ থেকে নিজের গাড়িটা বের করল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গিয়ার ফেলতেই গাড়িটা তীব্র বেগে বেরিয়ে এল রাস্তায়। 🔴 শহরের ফাঁকা রাস্তাগুলো পার হতে তার খুব বেশি সময় লাগল না। বৃষ্টির তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। উইন্ডশিল্ডের ওয়াইপারগুলো সর্বোচ্চ গতিতে চালিয়েও সামনের রাস্তা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। 🔴

শহর পেরিয়ে গাড়িটা এবার একটা পাহাড়ি পথ ধরল। আঁকাবাঁকা, নির্জন এবং বিপজ্জনক একটা রাস্তা। তিশা ড্যাশবোর্ডের ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত ঠিক তিনটে বাজে। 🔴 তার গন্তব্য আর খুব বেশি দূরে নয়, বড়জোর ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। এত রাতে, এমন ভয়ানক একটা পরিবেশে যেখানে মানুষের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকার কথা, সেখানে তিশার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ খেলা করছে। 🔴 দীর্ঘ পাঁচ বছরের দমবন্ধ করা জীবন থেকে সে আজ মুক্ত। এই মুক্তির স্বাদ যেন তাকে মাতাল করে দিচ্ছে। 🔴

কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়। পাহাড়ি রাস্তার একটা খাড়া বাঁক ঘোরার সময়, তিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে প্রচণ্ড জোরে কিছু একটা তার গাড়িকে ধাক্কা দিল। 🔴 আচমকা এই ভয়ংকর ধাক্কায় তিশা স্টিয়ারিংয়ের কন্ট্রোল পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। আর গাড়িটা রাস্তার রেলিং ভেঙে ফেলল। 🔴

পরের কয়েকটা মুহূর্ত তিশার কাছে অনন্তকাল বলে মনে হলো। গাড়িটা শূন্যে ভেসে গিয়ে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে পড়তে শুরু করল। পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়ে গাড়ির কাঁচগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে তিশার শরীরে বিঁধতে লাগল। 🔴 প্রতিটা ধাক্কাতেই তার হাড়গোড় যেন গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল। গাড়িটা ডিগবাজি খেতে খেতে পাহাড়ের একদম নিচে বয়ে চলা খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পাথুরে পাড়ে এসে সজোরে আছড়ে পড়ল। 🔴

চারপাশটা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর নদীর স্রোতের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। গাড়ির ভেতর তিশার অবস্থা তখন ভয়াবহ। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত, মাথা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। 🔴 শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।

তবুও বাঁচার আদিম প্রবৃত্তি তাকে হার মানতে দিল না। কাঁপা কাঁপা রক্ত মাখা হাতে সে সিট বেল্টটা খুলল। 🔴 গাড়ির দরজাটা দুমড়ে মুচড়ে গেছে, সেটাকে শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে কোনোমতে বাইরে বেরিয়ে এল সে। মাটিতে পা রাখতেই যন্ত্রণায় তার চোখ অন্ধকার হয়ে এল, ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সে কাদা-মাটির ওপর ছিটকে পড়ে গেল। 🔴

বৃষ্টির শীতল জল তার ক্ষত গুলোতে তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। তিশা বুঝল, এই দুমড়ানো গাড়ির কাছে পড়ে থাকলে তার মৃত্যু নিশ্চিত, অথবা যারা তাকে ধাক্কা দিয়েছে তারা এসে তাকে শেষ করে দেবে। 🔴 সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার উঠে দাঁড়াল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে, বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারের বুক চিরে সে গাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেল। কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। 🔴 নদীর পাড়ে একটা বিশাল পাথরের আড়ালে এসে সে বসে পড়ল। পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগল। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন আগুন ঝরছে। 🔴 সে বুঝতে পারল, তার সময় ফুরিয়ে আসছে। পাথরের সাথে হেলান দিয়ে বসে সে নিজের মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগল। 🔴

ঠিক সেই সময় পাহাড়ের ওপরে, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল একটা বিশাল ট্রাক। ট্রাকের ড্রাইভার বৃষ্টির মধ্যেই নিচে উঁকি দিয়ে দেখল। তারপর পকেট থেকে একটা পলিথিনে মোড়ানো ফোন বের করে ডায়াল করল।
— "বস, কাজ হয়ে গেছে। গাড়ি একদম নিচে নদীর পাড়ে পড়ে গেছে। বাঁচার কোনো চান্স নেই।" 🔴

ফোনের ওপাশ থেকে কেউ নির্দেশ দিল,
— "নিচে যা। গিয়ে গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দে। কোনো প্রমাণ বা বেঁচে থাকার কোনো সামান্যতম সম্ভাবনাও যেন না থাকে।" 🔴

ড্রাইভার মাথা নেড়ে বলল,
— "ঠিক আছে বস, আমি দেখছি।" 🔴

ড্রাইভার একটা পেট্রোলের গ্যালন হাতে নিয়ে সাবধানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এল। বৃষ্টির মধ্যেই সে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গাড়িটার ওপর পেট্রোল ঢালতে শুরু করল। 🔴 ভেতরে কেউ আছে কি না, বা তিশা আদৌ গাড়িতে আছে কি না, অন্ধকারে আর বৃষ্টির কারণে সে অতটা খেয়াল করল না। তার শুধু কাজ শেষ করে ফেরার তাড়া। পেট্রোল ঢালা শেষে সে একটা লাইটার জ্বালিয়ে ছুড়ে দিল গাড়ির দিকে। 🔴

মুহূর্তের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। বৃষ্টির পানিও সেই আগুনের লেলিহান শিখাকে দমাতে পারল না। কাজ শেষ করে ড্রাইভার দ্রুত ওপরে উঠে গেল এবং ট্রাক নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 🔴

বেশ কিছুটা দূরে পাথরের আড়ালে বসে তিশা আগুনের সেই লাল আভা দেখছিল। আগুনের আলোয় তার রক্তমাখা, ফ্যাকাশে মুখে এক অদ্ভুত শান্তির হাসি ফুটে উঠল। 🔴 ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা সেই হাসি যেন তার সমস্ত যন্ত্রণার উপশম। সারা পৃথিবী জানবে সে এই দুর্ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। সব কিছু থেকে সে আজ সত্যিই মুক্তি পেয়েছে। 🔴

চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে তিশার। স্মৃতির পাতাগুলো যেন চোখের সামনে সিনেমার মতো ভাসতে শুরু করল। 🔴

পাঁচ বছর আগের কথা। তখন সে সবেমাত্র অনার্স শেষ করেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাধারণ, কিন্তু ভীষণ সুন্দরী একটা মেয়ে ছিল সে। টানা টানা মায়াবী চোখ, কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া ঘন কালো চুল, গোলাপি নরম ঠোঁট আর ছিপছিপে গড়ন, একবার দেখলে যে কোনো পুরুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই রূপই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল। 🔴

রেজার মতো একজন প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নজর পড়েছিল তার ওপর। তিশার কোনোমতেই এই বিয়েতে রাজি ছিল না। কিন্তু বাবা-মায়ের ভয় আর রেজার টাকার ঝলকানির কাছে তার অমত টেকেনি। একপ্রকার জোর করেই রেজার সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয়। 🔴

বিয়ের পর তিশা ভেবেছিল, হয়তো স্বামী হিসেবে রেজা তাকে ভালোবাসবে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরেই রেজার মুখোশ খসে পড়ে। সমাজে রেজা একজন বড় ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও, তার আসল ব্যবসা ছিল অন্ধকার জগতের। তরুণ-তরুণীদের ভুল বুঝিয়ে, নেশার ফাঁদে ফেলে সে পর্ণ ভিডিও তৈরি করত। ডার্ক ওয়েবে সেসব বিক্রি করে সে রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়েছিল। 🔴

রেজার বিকৃত মানসিকতা আর ফ্যান্টাসি এতটাই জঘন্য ছিল যে, একসময় সে নিজের স্ত্রীকেও ছাড়েনি। তিশাকে সে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সে তিশাকে তার সেই নোংরা জগতেও পা রাখতে বাধ্য করেছিল। রাতের পর রাত রেজার নির্যাতনের শিকার হতে হতো তাকে। তিশা কাঁদতে কাঁদতে তার বাবা-মাকে সব জানিয়েছিল, তাদের কাছে আশ্রয় ভিক্ষে চেয়েছিল। কিন্তু সমাজের ভয় আর রেজার ক্ষমতার কাছে অসহায় বাবা-মা তাকে মুখ বুজে সব সহ্য করার উপদেশ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। 🔴

সব দরজা যখন বন্ধ হয়ে গেল, দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেল, তখন তিশা সিদ্ধান্ত নিল৷ সে আর এই নরকে থাকবে না। সে রেজাকে খুন করবে। 🔴

আজ রাতে তারই প্রস্তুতি নিয়েছিল সে। রেজার ড্রিংকসে ঘুমের ওষুধ মেশানোর কথা ছিল তার। কিন্তু রেজা আজ অন্য মেজাজে ছিল। তিশার প্ল্যান সে কোনোভাবে বুঝে ফেলেছিল। শুরু হয় দুজনের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি। রেজা যখন তিশার গলা টিপে ধরে তাকে মেরে ফেলার উপক্রম করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। 🔴

খোলা জানালা দিয়ে একটা বুলেট এসে সোজা রেজার মাথায় আঘাত করে। রেজার মাথার খুলি উড়ে যায়, রক্তের ছিটে এসে লাগে তিশার মুখে। রেজা ছিটকে পড়ে মেঝের ওপর। কে গুলি করল, কেন করল, তিশা কিছুই জানে না। হয়তো রেজার অন্ধকার জগতের কোনো শত্রু তাকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তিশার মনে হয়েছিল, সৃষ্টিকর্তা হয়তো আজ তার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। তাই সে মৃত রেজার পাশ থেকে সেই অচেনা কলারের ফোন ধরে সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিতে দ্বিধা করেনি। 🔴

পাহাড়ি নদীর শীতল হাওয়া তিশার রক্তমাখা শরীরটাকে জমিয়ে দিচ্ছে। চোখের পাতা দুটো আর খোলা রাখতে পারছে না সে। আগুনের শিখাটা ক্রমশ তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। তার আর কোনো আক্ষেপ নেই। সে হেরে যায়নি, সে মুক্তি পেয়েছে। 🔴

ধীরে ধীরে তিশার চোখ দুটো বুজে এল। প্রকৃতির এই ভয়ংকর সুন্দর রাতে, ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে একটি অভিশপ্ত জীবনের নিঃশব্দ সমাপ্তি ঘটলো। কিন্তু সে ওই অবস্থায় অনুভব করলো তাকে কেউ একজন পাজকোলা করে তুলে নিলো। তারপর কি হলো জানা নেই। 🔴

অভিশপ্ত জীবন থেকে কি তিশা সত্যিই মুক্তি পেল? জানতে চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে।

Post a Comment

0 Comments